Page loading ... Please wait.

ভূমিকা

রাহাত খানের গল্পঃ 'খুব বেশি আশা করতে নেই'

প্রাককথন
 

 প্রিন্ট
 
ষাটের দশক বাংলাদেশের সাহিত্যে উপহার দিয়েছিলো এক ঝাঁক উজ্জ্বল সাহিত্য কর্মী- কী কথাসাহিত্যে, কী কবিতায়, কী প্রবন্ধ বা সমালোচনায়- এক সঙ্গে এত অধিক সংখ্যক শক্তিশালী লেখকের আগমন আর কোনো সময় ঘটেনি। সাহিত্য-সংস্কৃতি-জাতীয়তাবোধ-স্বাতন্ত্র্যবোধ ও আত্মপরিচয় নির্মাণের সেই দ্বন্দ্ব ও সংকটমুখর সময়ে ষাটের সাহিত্যকর্মীরা নিয়ে এসেছিলেন প্রথা ভাঙার অঙ্গীকার, নতুন কিছু নির্মাণের আন্তরিক-উদ্দাম-উচ্ছ্বল প্রচেষ্টা। অগ্রজদের ভুরু কুঁচকে দেয়ার মতো নানা কার্যকলাপ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আর সৃষ্টিশীলতার অভিনব সংজ্ঞা নির্মাণ করে রীতিমতো ঝড় তুলে ফেলেছিলেন তারা। এর জন্য যে দীপ্ত-উজ্জ্বল তরুণ গোষ্ঠী প্রয়োজন, ষাটের তা ছিলোও। একটু আগে-পরে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের কয়েকজন দিকপাল- হাসান আজিজুল হক, মাহমুদুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, জ্যেতিপ্রকাশ দত্ত আব্দুল মান্নান সৈয়দ, আহমদ ছফা ও সেলিনা হোসেন- এলেন এই সময়েই। এঁরা সবাই অসামান্য প্রতিভাধর, জাতশিল্পী। সেই তুমুল সময়ে এসেছিলেন আরেকজন- রাহাত খান-এঁদের সবার থেকে আলাদা। বস্তুতপক্ষে এঁরা সবাই একে অন্যের থেকে আলাদা, তবু রাহাত খান যেন খানিকটা অধিক ব্যতিক্রম। ষাটের দ্রোহ ও বিক্ষোভ থেকে খানিকটা দূরেই ছিলেন তিনি। সম্ভবত তাঁর তীব্র বিকাশের জন্য সত্তরই প্রযোজ্য ছিল; কিন্তু এ সময়ে দেখা গেল- কী বিষয়ে, কী প্রকরণে, কী ভাষায় তাঁকে যেন ঠিক ষাটের চরিত্রের সঙ্গে মেলানো যাচ্ছে না, মেলানো যাচ্ছে না সত্তরের সঙ্গেও। যেন এক নিঃসঙ্গ চিত্রকর নির্জনে এঁকে চলেছেন সমকাল ও পরিপার্শ্বের নিখুঁত চিত্র, বিষয় হিসেবে যিনি বেছে নিয়েছেন তাঁর চারপাশের সব শ্রেণীর মানুষকে। তাদের বেঁচে থাকার অবিরাম সংগ্রাম, তাদের প্রত্যাশা-স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, তাদের আনন্দ ও গৌরবের পাশাপাশি তাদের নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা, জীবনের প্রতি নির্লিপ্ততা আর পরাজয়ের কাহিনী তিনি লিখে ফেললেন এক সহজ-সরল হৃদয়গ্রাহী ভাষায়। পাঠক তাঁর কাছ থেকে পেলেন আমাদের বিষবৃক্ষ, ইমান আলীর মৃতু্য, চুড়ি, ভালোমন্দের টাকা, অন্তহীন যাত্রা প্রভৃতির মতো কালজয়ী গল্প, অমল ধবল চাকরি'র মতো ক্যামেরা দৃষ্টিসম্পন্ন উপন্যাস, হে অনন্তের পাখির মতো একদল মানুষের আনন্দ-বেদনার অসামান্য চিত্রায়ণ। তারপর হঠাৎ করেই তাঁর দীর্ঘ নীরবতা। বহুদিন পাঠক তাঁর চুম্বক-আকর্ষণী লেখা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। সুখের বিষয়, তিনি আবার ফিরে এসেছেন তাঁর মুগ্ধ পাঠকের কাছে।

১.
রাহাত খান তাঁর গল্পে পরিপাশর্্ব ও সমকালকে তুলে আনেন তার সব আলো-অন্ধকার, সংকট-সম্ভাবনা, সারল্য-শঠতা, ভন্ডামি-সততা সহ আর এসবের মধ্যে বাস করা মানুষগুলো উঠে আসে তাদের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা-কষ্ট-ক্লান্তি-ভালোবাসা-মমতা-নিস্পৃহতা-বিচ্ছিন্নতাসহ। তারুণ্যের হতাশা, পরাজয়, প্রেম ও আকাঙ্ক্ষা; মুক্তিযুদ্ধের প্রাপ্তি ও হারানোর চিত্র নিপুণ কুশলতায়, পরম মমতা দিয়ে নির্মাণ করে পাঠকদের আপ্লুত করেন তিনি। সহজ-সরল ভাষায় তিনি পাঠককে জানিয়ে দেন-জীবনটা এরকম, পৃথিবীটা এরকমই-যাবতীয় ইতি-নেতিবাচকতা পাশাপাশি মিলে গেছে এখানে। আর এর মধ্যে মানুষের একটাই স্বপ্ন-সে বেঁচে থাকতে চায়, বেঁচে থাকার স্বপ্ন থেকেই সে তৈরি করে অন্যান্য স্বপ্ন, বেঁচে থাকার জন্যই তার যাবতীয় আয়োজন।

২.
মানুষের এতসব আয়োজনের পেছনে যে মধুর স্বপ্নগুলো লুকিয়ে থাকে, এই বিপন্ন সময় আর সুকঠিন বাস্তবতা তার সঙ্গে এক চিরন্তন দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। রাহাত খানের গল্পের বিচিত্র শ্রেণী-পেশার মানুষগুলোকে এই রকম বহুবিধ দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত হতে দেখা যায়। যেমন চুড়ি গল্পে আমরা বস্তির সর্দার কালু মিয়ার ভাষ্যে পিওন বৈদর আলী আর তার বউ জৈগুনের সঙ্গে পরিচিত হই যে, কেবল সুখের ইস্তিরিই না, আপদ-বিপদের বউও। বাতাসী, মজিদী, আগুনির মা এদের কারোর সাথে মিল নাই। কালু মিয়ার ঘরের পাশেই ওদের প্রেমময় সুখের সংসার এবং মিলন মুহূর্তে-
 
টুংটাং করে আর এক রকমের মিঠা আওয়াজ।... হাতের ক'টা চুড়ির বাজনা জৈগুনের দিলভরা রোশনীর জানান দেয়। বুকভরা পিরিতির মধুর গীত বাজায়।... মহব্বত ছাড়া আন্ধার বিছানায় আর যাই হোক মেয়ে মানুষের হাতের চুড়ি বাজে না। কক্ষনো না।

কালু মিয়া পোড়-খাওয়া অভিজ্ঞ মানুষ। সে মানুষের মুখ দেখে তার স্বভাব-চরিত্র বলে দিতে পারে। প্রায় পুরো গল্পজুড়ে কালু মিয়ার নিজস্ব ভাষায়, গভীর ভালোবাসা আর মমত্ববোধ দিয়ে অংকিত হয় জৈগুন। কিন্তু ওই 'মিঠা আওয়াজের' পেছনে হা করে দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষুধা-দারিদ্র্য এবং বৈদর আলীর স্বল্প বেতনের পরিপ্রেক্ষিতে অনিবার্য টানাটানি ও সংকট অবশেষে বৈদরকে বাধ্য করে বউকে, বউয়ের টান করা শরীরকে ব্যবহার করতে। গল্পের শেষ দিকে দেখি ওদের ঘরের বারান্দায় মাংস-লোভী মানুষের আগমন এবং শেষ পর্যন্ত জনৈক কন্ট্রাক্টরের সঙ্গে জৈগুনের ঘরের ভেতর প্রবেশ-

বুঝলাম ঘরের ভিতরে যে মানুষটা কাঁপা হাতে সিগারেট ফুঁকছে আর ফিসফিস হাসছে, এই মাস্টার কন্ট্রাক্টরই জৈগুনের মানুষ, সে-ই আজ ঘরের বাতি নিভাবে।... কিন্তু... চৌকির কঁ্যাচ কঁ্যাচ আওয়াজ শুনলাম, ভারি একটা দমের হাঁসফাঁস শুনলাম। তারপর সব থামল। কিন্তু, আরে আরে, জৈগুনের তো হাতভরা রেশমি চুড়ি, চুড়ির আওয়াজ শুনলাম না তো।

জৈগুনের চুড়ির ওই 'মিঠা আওয়াজ' হারিয়ে গেছে। কারণ, এই মিলনে আর যাই থাক 'মহব্বত' নেই। এ শুধু দারিদ্র্য ও ক্ষুধার কাছে আত্মসমর্পণ। জীবনের এই ভয়াবহ চিত্রই হয়তো বাস্তবতা, হয়তো এই সমর্পণ অনিবার্যও বটে, কিন্ত রাহাত খান তাঁর গল্পে পাঠকদের বুঝিয়ে দেন_ওই 'মিঠা আওয়াজ'টা তিনি প্রবলভাবেই শুনতে চান, সেটিই কাম্য তাঁর। রেশমি চুড়ির ওই মনোরম শব্দ বৈদর-জৈগুনের প্রেমপূর্ণ আনন্দময় জীবনযাপনের প্রতীক হয়ে পাঠককে জানিয়ে যায়_ ক্ষুধার সুবিশাল হা-এর মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে ওই প্রেম, অনিবার্যভাবে, অবিরল।

লেখকের 'মিঠা আওয়াজ' শোনার বাসনা-প্রত্যাশা এই গল্পে নিপুণভাবে চিত্রিত বটে, কিন্তু তিনি তো শিল্পী, মানবজীবনে সৃষ্ট ও রচিত নানাবিধ দৃশ্যের মেধাবী চিত্রকর- তিনি তাই ওই প্রত্যাশাকে পাঠকের ওপর চাপিয়ে দেন না। তিনি জানেন- জীবনের বহুমাত্রিক জটিলতা ও সংকট, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য সব ইতিবাচকতাকে প্রশ্নের মুখোমুখি করে তোলে। স্নেহ-মমতার বন্ধন, ভালোবাসার শক্তি সবই যেন ক্ষয়ে যায়, বেঁচে থাকাটার আকাঙ্ক্ষাটিই তখন একমাত্র বিষয় হয়ে মানুষকে স্বার্থপর করে তোলে। আর এসব জানেন বলেই আমরা তাঁর কাছ থেকে পেয়ে যাই ইমান আলীর মৃতু্য'র মতো কালজয়ী গল্প। এই গল্পের প্রথমেই আমরা মৃতু্যদশায় পতিত ইমান আলীর সন্তানদের আহাজারি, পুত্রবধূদের বিলাপ দেখতে পাই, যেন তার আসন্ন মৃতু্য তাদেরকে কতটাই না বিকারগ্রস্ত করে তুলেছে! এ অবস্থা থেকে প্রায় অলৌকিকভাবে জীবন ফিরে পেলে পাঠকের মনে বিস্ময় জন্মে, জাগে প্রশ্ন- তবে কি ইমান আলীর মৃতু্য এরচেয়েও কোনো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করবে? খানিকটা সুস্থ ইমান আলীকে অতঃপর আমরা দেখি যৌথ পরিবারের স্নেহ-মমতার অবিচ্ছেদ্য বন্ধন হিসেবে, দেখি এক স্নেহময় জনকের বিশাল হৃদয়ের পরিপ্রেক্ষিতে। কিন্তু তারপরই গল্পে চলে আসে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আসে বন্যা। আসে অভাব, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রিলিফের অপর্যাপ্ত চাল আর তাদের ক্লিষ্ট বেঁচে থাকার খুঁটিনাটি চিত্র। বন্যার জল নেমে গেলে খাদ্যের অভাব আরও বাড়ে, মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে খাদ্যের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে_ইমান আলীর ছেলেরাও সেই দলে অন্তর্ভূক্ত হয় এবং সেটা বাপকে ছাড়াই। কিন্তু-

রাতেই ওরা তৈরি হয়ে যায়। কিছু হাঁড়িপাতিল-বাসন, কিছু গাঁটরি-বোঁচকা আর ফকির চানের পোলাপানগুলো, এই হলো বোঝা। চলে যাওয়ার আগে চুপচাপ শেষ দেখার জন্য তারা যায় ইমান আলীর ঘরে, গিয়ে দ্যাখে লম্বা পিরহানটা গায়ে দিয়ে টুপি মাথায় লোকটি তৈরি হয়ে বসে আছে। ওদের আওয়াজ পেয়েই ভাঙা গলায় কেঁদে ফেলে ইমান আলী। বলে, পুত, আমারে থুইয়া তোমরা কই যাও? আমি কার কাছে থাকতাম?

অতঃপর ইমান আলীও ওদের সঙ্গী হয় (খাদ্যের সন্ধানে এই অনিশ্চিত যাত্রা আমাদের কি আদিম মানুষের কথা মনে করিয়ে দেয়?)। এবং-

ইমান আলী মুচকি মুচকি হাসে। চালাকি না করলে বাঁচনের জোগাড় আছে? আর একটু হলেই তো তিন পোলা তাকে ফেলে চলে এসেছিল!...তিন পোলার চালাকি-ষড়যন্ত্র সে যে ভণ্ডুল করে দিয়েছে এজন্য তার আমোদ লাগছিল খুব।

কিন্তু এই দীর্ঘ যাত্রা, দু-দিন দু-রাত উপবাসের পর ক্লান্ত শরীর এক সময় ভেঙে পড়ে_

হাঁটু ভেঙে সে বলল, 'ইয়া আল্লাহ, ইয়া আল্লাহ।' মেন্দি 'কি অইছে মেছাব' জিজ্ঞেস করলে ইমান আলী বলে, আল্লা রহম কর, রহম কর। এই সময় বুক একেবারে ভেঙেচুরে বিষম কাশি উঠল বুড়োর, বুকে হাত দিয়ে কাশতে লাগল।...ইমান আলী গাছতলায় চোখ বুজে শুয়ে আছে, হাঁপরের মতো ওঠানামা করছে বুক, বোধহয় মরেই গেছে। এই অবস্থায় তিন ভাইয়ের মধ্যে চোখ ঠারাঠারির একটা পরামর্শ হয়ে গেল। ফিসফিস করে রহিম চান বলে, 'আর উপায় নাই কুনো উপায় নাই।'

অতঃপর বাপকে ফেলেই রওনা দেয় তারা। গল্পের শেষ অংশে মৃতপ্রায় পিতাকে ফেলে পুত্রদের এই পলায়ন দৃশ্য পাঠককে ভয়াবহভাবে চমকে দেয়। গল্পের শুরুতে যখন অভাব ও ক্ষুধার প্রকোপ এতটা তীব্র ছিল না, ইমান আলীর আসন্ন মৃতু্যর সম্ভাবনায় যারা আহাজারি-হাহাকার-কান্না আর বিলাপে পরিবেশ ভারি করে তুলেছিল, তারাই এই দুর্ভিক্ষপীড়িত সংকটকালে মৃতপ্রায় পিতাকে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে লঙ্গরখানার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছে! এমনকি ছোট ছেলে আবু চান যখন টের পায় তার 'পিরানের খুঁট'টা মুমূর্ষু ইমান আলী চেপে ধরেছে তখন-
 
মাথাটা ঘুরে উঠল আবু চানের। দুইদিন দুই রাত উপোসের পর এভাবে রাস্তার ধারে গাছতলায় আটকা পড়ে গিয়ে এবং কিশোরগঞ্জের লঙ্গরখানা এখনো পনেরো মাইল দূরে সেই চিন্তায় ও ভয়ে দিশা হারিয়ে পাগলের মতো উঠে দাঁড়ায় সে, 'ভায়ু গো, ভায়ু গো, মল্লাম, মল্লাম, এই চিৎকারে আকাশ ফাটিয়ে সে ছুটল।

ক্ষুধা মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে তার একটি অসামান্য বর্ণনা পড়ে আমরা শিউরে উঠি। ইমান আলীর মৃতু্য ঘটছে_একটি গ্রামের সম্মানিত ব্যক্তি, একজন স্নেহময় পিতা, মমতা-ভালোবাসা-পারিবারিক বন্ধনের প্রতীক সে_অথচ তার মৃতু্য নিয়ে ভাবাবেগে ভোগার কোনো অবকাশই পাঠকের আর থাকে না। রাহাত খান তর্জনী তুলে পাঠককে সাবধান করে দেন_এখানে কোনো ভাবাবেগের স্থান নেই; বরং আবু চানের ওই দৌড়ে পালাবার দৃশ্যটি ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতীক হয়ে ধ্রুপদী দৃশ্যের মতো পাঠকের সামনে চিরকালের জন্য ঝুলে থাকে।

আবু চানের ওই পালিয়ে যাওয়া কিংবা ইমান আলীর ওই 'পিরানের খুঁট' আঁকড়ে ধরার দৃশ্যগুলো তাদের বেঁচে থাকার তীব্র আকুতিকেই মূর্ত করে তোলে। 'বাঁচতে চাই' এর চেয়ে বড় কোনো সত্য নেই তাদের কাছে। সম্পর্কবোধ নয়, স্নেহ-মমতা-ভালোবাসার বোধ নয়- বেঁচে থাকাটাই সর্বস্ব।

এই আকুতি, বেঁচে থাকার এই অভিলাষ আমরা দেখতে পাই 'উদ্বেল পিপাসা' গল্পেও। জীবনবোধ নির্মাণে গল্পটি তুলনারহিত। একজন অসুস্থ লোক, ঘরে বন্দি, ওষুধ-ডাক্তার ও খাদ্যের জন্য স্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল। স্ত্রী কর্মহীন, অতএব পাশের কামরাটি এক বন্ধুকে সাবলেট দেয়া ছাড়া উপায় থাকে না। একদিন ঘটনাক্রমে লোকটি স্ত্রীকে তার বন্ধুর বাহুলগ্ন অবস্থায় দেখতে পায়। ঈর্ষায়, ক্রোধে সে জ্বলে ওঠে। প্রতিশোধ স্পৃহায় পাগল হয়ে ওঠে-হাসান আমি ভালো হবার পর তোমাকে শিক্ষা দিয়ে ছাড়বো শালা। সে দাঁত কিড়মিড় করল। খালেদাকেও ছাড়বে না। একদিকে ক্ষুধা, পেটে তীব্র দহন, আরোগ্যাতীত অসুস্থতা অন্যদিকে ঈর্ষা, ক্রোধ ও কষ্টে সে নীল হয়ে গেলো। বউকে গালাগালি করলো, অভিশাপ জানালো সমগ্র বিশ্ব জগতের প্রতি। কিন্তু সে বাঁচতে চায়, সেজন্য খালেদার ওপর নির্ভরতা ছাড়া তার কোনো উপায় নেই। সে খেতে চায়, ওষুধ চায়, মমতা চায় ওই 'চরিত্রহীন' স্ত্রীর কাছেই, এমনকি বাঁচার জন্য হাসানকে 'সুহৃদ' বলেও মনে হলো তার। স্ত্রীর মমতাময়ী রূপটি ভেবে কষ্ট ভুলতে চাইলো। একই সঙ্গে ঘৃণা ও ভালোবাসা, প্রেম ও আক্রোশ, ঈর্ষা ও নির্ভরতা, ক্রোধ ও বাঁচার আকুতিতে সে এক অদ্ভুত চরিত্রে পরিণত হলো। ছোট একটি গল্পে একটি চরিত্রের এমন বহুমাত্রিক প্রকাশ দেখে আর সবকিছুর মধ্যে ওই চরিত্রের বেঁচে থাকার তুমুল আকাঙ্ক্ষাকে আবিষ্কার করে বিস্ময়ে পাঠক অভিভূত হয়ে যায়। পৃথিবী- সে যেমনই হোক, জীবন- সে যতই পীড়াদায়ক হোক-একটি জীবনের জন্য একবার মাত্র পৃথিবীতে বসবাসের সুযোগ ঘটে-চরিত্রটি যেন সেই সত্য আরেকবার জানিয়ে যায় পাঠকের কানে কানে।

৩.
এভাবেই বিভিন্ন রকমের বেঁচে থাকা মানুষের। বেঁচে থাকবার জন্য, একটু ভালো থাকবার জন্য জীবনের বর্ণ-গন্ধময় আয়োজনকে আরেকটু উজ্জ্বল করে তুলবার জন্য জৈগুনকে নিজের শরীর বিলিয়ে দিতে হয় 'পরপুরুষের' কাছে। আবু চানকে জনকের স্নেহময়তার বন্ধন ভুলে দৌড়ে পালাতে হয় কিংবা প্রবল ঈর্ষায় কাতর হয়েও সুযোগসন্ধানী বন্ধুকে 'সুহৃদ' বলে ভাবতে হয়। এত এত বিভিন্ন মাত্রিক আয়োজন বিভিন্ন মানুষের। জীবনকে যে যেভাবে দেখে সেভাবেই নির্মাণ করে বেঁচে থাকবার কৌশল। ভাল মন্দের টাকা গল্পের রহিমদাদ হয়তো জীবনকে নিয়েছিল এক নিষ্ঠুর কৌতুক হিসেবে। কোনো বিষয়েই যেন কোনো মোহ নেই তার, এক অদ্ভুত নিরাসক্তি তাকে ঘিরে থাকে। এই নিমের্াহতা ও নিরাসক্তি নিয়ে সে এক বিচিত্র কৌতুকে মেতে ওঠে যেন। 'পর্নোগ্রাফি' আর 'থ্রিলার' লিখে জীবনধারণ করে সে কিন্তু এতেও যেন তার বিশেষ কোনো অংশগ্রহণ নেই। বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই লেখা আর এজন্যই বিচিত্র সব মানুষের সংস্পর্শে আসা। 'হীরু মিয়া', 'আমিনা' কিংবা 'হাজী সাহেবের' মতো লোকজনের সঙ্গে তার মেলামেশা স্রেফ ব্যবসায়িক প্রয়োজনে_তাদের আচার-আচরণ তার ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলে না। হীরু মিয়া অবলীলায় তার লেখা পর্নোগ্রাফি 'কিছু হয় নাই' বলে মুখের ওপর ফেরত দিয়ে গেলেও তার তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না, সে বরং আমিনার সঙ্গে গল্প জমাতে চেষ্টা করে। হেনাবুর সংসার ভাঙার সংবাদ শুনে সে অবসন্নতা কাটিয়ে 'ঠিক আগের মতো জেগে উঠল'। বন্ধু সাখাওয়াত প্রায় ভিখারি সদৃশ জীবনযাপন করে_রহিমদাদের এতেও কোনো বিকার নেই। রায়হানার পাশে শুয়েও নিজেকে অনুত্তেজিতই দেখতে পায় সে। যেন এক জীবন-মৃত মানুষ সে_ অনুভূতিশূন্য, প্রতিক্রিয়াহীন। বন্ধু জামিল মৃতু্যপথযাত্রী, অথচ এ নিয়ে তার কোনো দুঃখ নেই, কষ্ট নেই। আছে দুশ্চিন্তা_জামিল মরে গেলে কে তাকে থ্রিলারের রসদ জোগাবে! জামিলের আসন্ন মৃতু্য নিয়েও সে এক বিস্ময়কর কৌতুকে মেতে ওঠে। যেন বন্ধুর মৃতু্যও একটি ঠাট্টার বিষয়। রহিমদাদের এই আচরণ আমাদের চমকে দিয়ে যায়। এমন নিস্পৃহ, নিরাসক্ত আচরণের ব্যাখ্যা কি? সে কি কোনো কারণে হারিয়ে ফেলেছে মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা, নাকি জীবনকে অতিমাত্রায় ক্যাজুয়ালি নিয়েছে সে? অর্থহীন আর বৈশিষ্ট্যহীন এই জীবনের জন্য এত আয়োজন কি হাস্যকর মনে হয় তার কাছে? জামিলের সঙ্গে কথোপকথনে তার নিস্পৃহ কৌতুকপ্রবণ আচরণটি ফুটে ওঠে-
 
জামিল মরে যাওয়ার আগে তার সম্পত্তির কাকে কি দিয়ে যাবে সেই কথা হচ্ছিল। রহিমদাদ বলল, দোস্ত, তুই লেখাপড়া করে এই তিনতলাটা আমাকে দিয়ে যা না।

পাগল নাকি। জামিল বলল। তুই আমার কে যে বাড়িটা দিয়ে যাব?
রহিমদাদ বলে, কেন আমি তো তোর ফ্রেন্ড। দিয়ে যা না বাড়িটা।
জামিল বলে, না। আমি তোকে লেখার টেবিল আর বইগুলো দিয়ে যাব।
আর জামাকাপড়? তোর পার্কার পেনটা? চেনওয়ালা সোয়েটারটা?
জামিল হাসতে হাসতে বলেঃ আর কিছু না। লেখার টেবিল আর বইগুলো, ব্যস।
রহিমদাদ দুঃখিত হয়ে বলেঃ ঠিক আছে তাই দিস। কিন্তু তুই মরে গেলে আমার সিরিজটা মার খেয়ে যাবে।

চমকে উঠতে হয়, এ কি কোনো মৃতু্যপথযাত্রী বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথন? এত নিস্পৃহতা, এমন নিষ্ঠুর কৌতুক কি করে সম্ভব একজন অনুভূতিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে? পাঠককে আবারও চমকাতে হয় জামিলের মৃতু্যসংবাদ শোনার পর রহিমদাদ ও রায়হানার আচরণ দেখে। মৃতু্যসংবাদ শুনে-

রহিমদাদঃ  মারা গেছে। দুপুরবেলা? ইস!
রায়হানরাঃ  দুপুর একটা পঁচিশে মারা গেল। খুব শান্তভাবে মরল। একটাও কথা বলেনি। কারো দিকে তাকায়নি।
রহিমদাদঃ  যাক, জামিল তাহলে মারা গেল। উঃ কদ্দিন থেকে মারা যাওয়ার কথা। জামিল নিজেই টায়ার্ড হয়ে পড়েছিল।
এখানেই মৃতু্যর আলোচনা শেষ, অতঃপর দুজনেই প্রবেশ করে জীবনের আলোচনায়। যেন জামিলের মৃতু্য বিশেষ কোনো ঘটনা নয় তাদের কাছে, যদিও রায়হানা জামিলের একদা প্রেমিকা, রহিমদাদ বন্ধু। আবারও দেখতে পাই জামিলকে সমাধিস্থ করে এসে_
বাসায় নামিয়ে দিয়ে রায়হানা বললো, তুমি কবিতা লিখেছিলে?
রহিমদাদ বলেঃ নাহ।
রায়হানা বলেঃ তুমি পারবেও না।
রহিমদাদ বলেঃ তাই। আমি থ্রিলারও লিখতে পারছি না আর।...
রায়হানার গাড়িটা চলে গেলে রহিমদাদ কিছুক্ষণ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল। পরে নিজেকে নিজে বলল ঃ হয়তো আমি একটা কবিতা লিখতে চাই। এছাড়া উপায় নেই আমার। আমাকে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উপায় নেই আমার।

গল্পের একেবারে শেষ পঙ্ক্তি নতুন করে ভাবিয়ে তোলে পাঠককে-যেন এতক্ষণে রহিমদাদের মধ্যে খানিকটা মানবিক বোধের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে আর থ্রিলার লিখতে পারছে না। একটি কবিতা খিতে চায় সে, কারণ, 'এছাড়া উপায় নেই' তার। কেন? কে তাকে নষ্ট করেছে? রায়হানা? যে আশ্চর্য নিরাসক্তি নিয়ে সে বরাবর জীবনকে দেখে এসেছে, থ্রিলার লিখেছে, পর্নোগ্রাফি লিখেছে, একটি কবিতা লেখার প্রেরণা-যা রায়হানা কর্তৃক প্রদত্ত-কি সেই নিরাসক্তিকে ধসিয়ে দিলো?

রহিমদাদ বাংলা গল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্যে এক বিস্ময়কর চরিত্র। জীবনকে এত ক্যাজুয়ালি, এত ঠাট্টা-মশকরা, কৌতুক-বিদ্রূপের বস্তু হিসেবে দেখাটা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। রহিমদাদ তাই দেখেছিল। এভাবেই হয়তো জীবনকে দেখতে চেয়েছিল অন্তহীন যাত্রা'র কমরউদ্দিন। প্রায় লম্পট এক নাগরিক চরিত্র সে, একজন 'খারাপ মহিলা'র বাসা- আরামবাগ- থেকে নিজের বাড়ি- ভূতের গলিতে- ফিরছে সে, মধ্যরাতে, মাতাল হয়ে। জীবনযাপনে সম্ভবত ব্যর্থ একজন মানুষ সে, নিস্পৃহ এবং অনুতাপহীন। সাহায্যপ্রার্থী বন্ধুর মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিতে পারে সে, 'বাবার মতো' দেখতে ভিখারিকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিতে পারে, যে কোনো দুর্ঘটনা যেন তাকে উল্লসিত করে তোলে। অনুতাপহীন সে, কিন্তু সম্ভবত এজন্য তার দুঃখও আছে। 'আমার কোনো অনুতাপ নেই'-এ কথা বলার একটি অর্থ কি এই নয় যে, এজন্য আমার ভেতরে প্রশ্ন আছে, ক্ষরণ আছে? গভীর রাতের এই দীর্ঘ পরিক্রমণের এক পর্যায়ে সে ওই 'খারাপ মহিলা'র প্রাক্তন স্বামীর হাতে বেদম মার খায়। কষ্টের চেয়ে তার বিস্ময় বাড়ে অধিক মাত্রায়-লোকটি কি আশ্চর্য প্রেমিক! প্রেমিকদের পক্ষেই সম্ভব ঈর্ষা করা এবং 'প্রাক্তন' হওয়া সত্ত্বেও লোকটির ঈর্ষা কি প্রবল! নিজেকে ওই প্রেমিকের সঙ্গে মিলিয়ে সে দেখে-কোনোদিন প্রেমিক হতে পারেনি, চিরকাল সে নিছক একজন পুরুষ। সে বস্তুত কিছুই পারেনি। মোটামুটিভাবে একজন ব্যর্থ লোক হিসেবে তাকে চিহ্নিত করা যায়। এখন সে অনুতাপহীন, নিস্পৃহ। স্ত্রীর মৃতু্যপথযাত্রাও তাকে টলাতে পারে না। একদিন 'বুভুক্ষু শিশু'দের ম্লান মুখ যার চোখ সজল করে তুলতো, ওদের জন্য যে কোনো 'রক্তাক্ত বিপ্লবে' অংশ নিতে চাইতো, তার এই পরিণতি অবশেষে তাকে কোথায় নিয়ে যাবে?

গল্পের শেষাংশে আমরা দেখি কমরউদ্দিন হেঁটে চলেছে একটা অচেনা শবযাত্রীদের দলের সঙ্গে- গন্তব্যহীন, উদ্দেশ্যহীন, অন্তহীন এক যাত্রার পথিক হয়ে। তবে কি মৃতু্যই তার অনিবার্য পরণতি এই মুহূর্তে-যে অস্বাভাবিক নিস্পৃহতা তাকে ঘিরে আছে-মুতু্য ছাড়া তা থেকে মুক্তি নেই?

নাগরিক মানুষের এসব নিস্পৃহতা ও নিরাসক্তি- যেন তারা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে যাবতীয় মানবিক অনুভূত-রাহাত খানের কলমে চমৎকার কুশলতায় চিত্রিত হয়ে পাঠককে মুগ্ধ করে।


৪.
রাহাত খানের গল্পের এক প্রধান অংশ জুড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধ। তাঁর নির্বাচিত গল্পের গ্রন্থটিতে মধ্যিখানে চর, দীর্ঘ অশ্রুপাত, এই বাংলায়, মুক্তিযোদ্ধার মা প্রভৃতি গল্পে মুক্তিযুদ্ধ চিত্রিত হয়েছে এক ভিন্ন মাত্রায়। যুদ্ধ নয়, যুদ্ধ-পরবর্তীকালের এই দেশ ও সময়ই তার কলমে অধিক মর্যাদা পেয়েছে।

মধ্যিখানে চর গল্পের সবুজ যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের ক্ষয়ে যাওয়া, বিভ্রান্ত, স্বপ্নশূন্য তারুণ্যের প্রতিনিধি। যে সাহস ও ত্যাগ নিয়ে, যে হিরন্ময় স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্রাণ হাতে করে তারা যুদ্ধ করেছিল, সদ্য স্বাধীন দেশ তার সবকিছুকেই অস্বীকার করেছে, কিছুই পায়নি তারা। সমাজ পাল্টায়নি, দেশ ক্রমশ অন্ধকারের অতল গহ্বরগামী, তারা বিভ্রান্ত ও স্বপ্নশূন্য না হয়ে কী-ইবা করবে? অতএব আতিক কিংবা মিজান বা হাজারী অথবা সবুজ এখন অবসাদগ্রস্ত, ক্লান্ত, বিপন্ন। এখন তারা 'ডাকাতি কইরা' বেড়ায়। যে হাত একদা পাঞ্জাবি সৈন্যদের বুকে বেয়নেট চার্জ করেছে, এখন সেই হাত ডাকাতির জন্য ছুরি বসায়। 'বুড়ো পাইকারের পেটে লাথি' বসায়। তাঁদের চারপাশে এখন 'মৃতু্য, রক্তপাত, গভীর পতন ও চিৎকার।' তাদের আর ফেরার উপায় নেই স্বাভাবিক জীবনে। তারা তাই ক্ষুব্ধ, জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ও অবসাদগ্রস্ত।

অথচ এমন তো হবার কথা ছিল না। স্বপ্ন যখন তৈরি হয় তখন তার বিস্তার তো আকাশ-ছোঁয়াই হয়। তার পুরোটা হয়তো পূরণ হয় না কখনো, সেটা সম্ভবও নয়। তা-ই বলে কিছুই থাকবে না স্বপ্ন দেখার মতো? ঘাতকরা শেষ পর্যন্ত বসবে সমাজের উঁচু উঁচু পদে! এতটা কি মেনে নেয়া যায়? এই বাংলায় গল্পের মৃত আত্মারা তাই যখন এই মর্তলোকে এসে বিজয় উৎসবের মঞ্চে ঘাতকদের বসে থাকতে দেখে, অপমানিত হয়ে ফিরে যাওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকে না। মৃত আত্মারা না হয় সইতে না পেরে আকাশ বিহারে চলে যেতে পারে; কিন্তু যারা বেঁচে আছে তারা কি করবে? মুক্তিযোদ্ধার মা গল্পের শহীদ আবু চানের মাকে তো জীবনধারণ করতে হচ্ছে ভিক্ষা করে। ছেলের পরিচয় দিতে সে গর্বই বোধ করে; কিন্তু তাতে খিদে তো আর মেটে না। ফলে ভিক্ষা করতে গিয়ে ওই পরিচয়টি তাকে প্রায় ঠাট্টা-মশকরা করার মতো একটি চরিত্রে পরিণত করে ফেলে। গল্পের শেষে পাড়ার যুবকদের কাছে তার মার খাওয়ার দৃশ্যটি হয়তো বর্তমান সময়ের একটি সার্বিক চিত্রকেই নির্দেশ করে যায়। আমাদের এই দুর্বিনীত সময়ে মুক্তিযুদ্ধ-মুক্তিযোদ্ধা কিংবা তাদের স্বপ্ন, তাদের প্রত্যাশা কিংবা অর্জন ক্রমাগতই কি মার খেয়ে যাচ্ছে না ঘাতকদের কাছে?

তবে কি মুক্তিযুদ্ধ কিছুই দেয়নি আমাদের? যে দীর্ঘ অশ্রুপাত শুরু হয়েছিল একাত্তরে, আজও কি তার শেষ হলো না? মুক্তিযুদ্ধ কি তবে ছিল কেবল পতাকা বদলের যুদ্ধ, কেবল এক দল শোষকের হাত থেকে অন্যদলের হাতে ক্ষমতা অর্পণের যুদ্ধ? রাহাত খানের গল্পে এসব প্রশ্ন অনুক্ত থেকেও যেন তীব্র হয়ে ওঠে পাঠকের সামনে।

উপসংহারের পরিবর্তে
রাহাত খানের প্রায় সব গল্পই ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে লেখা। ভাষায় কোনো রকম জটিলতা নেই, নিমেষে পড়ে ফেলা যায়_সংযত আবেগ, সংহত বর্ণনা। যেন জীবন এমনই_এরকম ক্যাজুয়াল, নিস্তরঙ্গ। চুড়ির মতো ইঙ্গিতবাহী গল্প, ভাল মন্দের টাকা কিংবা ইমান আলীর মৃতু্য'র মতো অসামান্য গল্পও তাঁর কলমে নিরাসক্ত বর্ণনায় মূর্ত হয়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে মধ্যরাতে গল্পটির কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে। পুরো গল্পটিই রচিত হয়েছে সংলাপের মাধ্যমে। দুজন মধ্যবয়স্ক মানুষ_বিপরীত লিঙ্গের_রং-নাম্বারে পেয়ে গেছে পরস্পরকে, মধ্যরাতে। তাদের কথোপকথনেই রচিত হচ্ছে নিজেদের জীবনচিত্র। নিঃসঙ্গ, অচেনা দুজন মানুষ যেন এই মধ্যরাতে পরস্পরের কাছে অকপট ও আপন হয়ে উঠেছে। কিন্তু গল্পের শেষদিকে যখন লোকটি 'মাঝে-মধ্যে এরকম আলোচনা'র ইচ্ছে প্রকাশ করে তখনই লাইন কেটে যায় এবং পরিশেষে

লেখকের কথাঃ মানুষের সব গল্পই এরকম। জীবন ভরে বহু রং নাম্বার। কখনোই খুব বেশি আশা করতে নেই।

পুরো গল্পটি সংলাপমুখর রেখে একদম শেষ পঙক্তিতে লেখকের উপস্থিতি পাঠককে কৌতূহলী করে তোলে এবং 'মানুষের সব গল্প এরকম' মন্তব্যে রাহাত খান জীবন সম্বন্ধে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি খানিকটা জানিয়ে দেন। মানুষের গল্প এমনই- অচেনা দুজন মানুষের মধ্যরাতের অনিশ্চিত, রহস্যময় কথোপকথনের মতো। তারপর 'জীবন ভরে বহু রং নাম্বার'। মানুষ তাহলে প্রধানত রং নাম্বারেই ডায়াল করে যায়! রাহাত এ কোন জীবনের কথা বললেন? মাত্র একটি পঙক্তিতেই কি বুঝিয়ে দিলেন মানুষের নিঃসঙ্গতা ও নিঃস্বতার বিষয়? কারো সঙ্গেই কারোর কার্যকর যোগাযোগ ঘটে না-মূলত মানুষ তো একা, 'তার চিবুকের কাছে ভীষণ অচেনা ও একা'- পুরোপুরি যোগাযোগ হবার আগেই কেটে যায়, যেহেতু তা রং নাম্বার! গল্পের শেষ পঙ্ক্তি 'কখনোই খুব বেশি আশা করতে নেই' -যেন জীবন সম্বন্ধে এক সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়। এত কিছু এই জীবন নিয়ে-এত প্রেম, ভালোবাসা, ঈর্ষা, ক্ষোভ, ক্রোধ, দ্রোহ, যুদ্ধ-অথচ কত অনিশ্চিত আর ক্ষণস্থায়ী! এই জীবনের কাছে, এই পৃথিবীর কাছে তাই 'খুব বেশি আশা' করা অনুচিত-আশা করতে নেই!



আহমাদ মোস্তফা কামাল
জানুয়ারি ২০০৭