আমাদের দেশে অহরহ রাজনৈতিক দল ভাঙে, নতুন দল গড়ে ওঠে; 'বড় দলের ছোট
নেতা'রা 'ছোট দলের বড় নেতা' হয়ে ওঠেন। কিছুদিন তাদের উচ্চকণ্ঠ শোনা
যায়, খবরের কাগজ ও টেলিভিশনের পর্দায় তাদের সরব উপস্থিতি দেখা যায়।
মিডিয়াগুলো যে তাদের প্রতি আগ্রহ দেখায়, তাদের কথা সাড়ম্বরে প্রচার
করে সেটা যতোটা না নতুন দলের প্রতি জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য
তারচেয়ে বেশি পুরনো দলগুলোর ভেতরকার খবর বের করে আনার জন্য। এই
নেতারা তা বোঝেন না, তারা মনে করেন- জনগণের কাছে বিপুল
গ্রহণযোগ্যতার কারণেই সাংবাদিকরা তাদের পেছনে ছুটতে বাধ্য হচ্ছেন!
উত্তেজনার বশে, প্রবল বিক্রমে, তারা সদ্য ছেড়ে আসা দল ও নেতৃত্বের
প্রতি বিষোদগার করেন। তাদের কমনসেন্স লুপ্ত হয়, ভুলেই যান যে- এই
দলটি যদি এতই খারাপ হবে তাহলে এর সঙ্গে আপনি এতদিন ছিলেন কেন এবং
কিভাবে- প্রশ্নটি করলে তিনি বা তারা কী উত্তর দেবেন! তারা আসলে
সংবাদকর্মীদের কৌশলী ফাঁদে পা দেন। সাংবাদিকরা তাদের মুখ থেকে
পুরনো দলের যাবতীয় দুস্কর্ম ও নীতিহীনতা ও বর্বর কার্যকলাপের বিবরণ
তুলে এনে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন- এই লোকটিও এতদিন এই সমস্তকিছুর
সঙ্গেই ছিলেন! নতুন দলের নীতি-আদর্শ-কর্মসূচি নিয়ে কথা বলার সুযোগ
তাদের খুব একটা হয়ে ওঠে না- প্রকৃতপক্ষে তাদের কোনো
নীতি-আদর্শ-কর্মসূচি থাকেও না। যা নেই তা নিয়ে তারা কথা বলবেন
কীভাবে? ফলে কিছুদিনের মধ্যেই এসব দলের মৃতু্য ঘটে। যেহেতু
নেতাকেন্দ্রিক দল, দলকেন্দ্রিক নেতা নয়্ল- অতএব দলের মৃতু্য ঘটলেও
নেতার মৃতু্য ঘটে না। তারা রয়ে যান- সুযোগ খোঁজেন পুরনো দলে ফিরে
যাবার অথবা নতুন কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত
করার।
এই প্রক্রিয়া চলছে দীর্ঘদিন ধরে। যেন এই অনিবার্যতা থেকে আমাদের
মুক্তি নেই। কিন্তু কেন এরকম ঘটে? কেন রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো
দর্শন-আদর্শ-কর্মসূচি থাকে না? একটি রাজনৈতিক দলের যে দর্শন থাকার
কোনো বিকল্প নেই সেকথা কি তারা বোঝেন না? নাকি বুঝলেও একটি দর্শনের
জন্ম দিতে, কিংবা পুরনো দর্শনেরই একটি চলনসই নতুন রূপ দিতে তারা
অক্ষম? যদি তা-ই হয়ে থাকে তাহলে তো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দেবার
যোগ্যতাই তাদের নেই।
২.
পৃথিবীর সব দেশেই শক্তিশালী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান ভিত্তি তাদের
দর্শন। দ্বিতীয় ভিত্তি- কর্মসূচি। বাংলাদেশের প্রধান দুটো দলের কথা
বিবেচনা করলেও এর সত্যতা মিলবে। বিচার করা যেতে পারে অন্য কয়েকটি
ছোটখাটো দলের কথাও- তাতে রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মসূচির গুরুত্ব বোঝা
যাবে। বাংলাদেশের প্রধান দুটো দল- আওয়ামী লীগ ও বিএনপি'র প্রথম
থেকেই দর্শন এবং কর্মসূচি ছিলো এবং এখনো আছে। আওয়ামী লীগের কথাই
ধরা যাক। 'আওয়ামী মুসলিম লীগ' হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে কিছুকালের
মধ্যেই নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে এই দলটি অসামপ্রদায়িকতার
পক্ষে তাদের আদর্শিক-দার্শনিক অবস্থান পরিষ্কার করেছিলো। পাকিস্তান
আমলে, যখন সবকিছুতে 'ইসলাম' 'মুসলিম' ইত্যাদি শব্দের যথেচ্ছ
ব্যবহার চলছে, তখন দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়াটাই ছিলো
এক দুর্দান্ত সাহসী ও প্রগতিশীল সিদ্ধান্ত। সেই থেকে শুরু করে দলটি
নিজেকে একটি অসামপ্রদায়িক, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক আদর্শের পক্ষের
শক্তি বলে প্রমাণ করতে চেয়েছে ও পেরেছে। অবশ্য শুধু দর্শন বা
আদর্শের বুলি কপচানোতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি তাদের কর্মকাণ্ড। জনগণের
আকাঙ্খা উপলব্ধি করে, তাদের আবেগ-অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করে
নিয়মিতভাবে কর্মসূচি নির্ধারণ করে গেছে তারা। পাকিস্তানি অপশাসনের
বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের ভূমিকা ছিলো বরাবরই জনগণের পক্ষে।
এই আন্দোলন-সংগ্রামকে একটি পরিণতির দিকে নিয়ে যাবার ব্যাপারেও
তাদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি ছিলো না। ঊনসত্তরের গণঅভু্যত্থান আর
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ প্রধানত তাদেরই সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির
ফলাফল। একটি কথা বলে নেয়া ভালো- মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী আর
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী আওয়ামী লীগ দার্শনিকভাবে এক নয়। পাকিস্তান
আমলে আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যস্থা প্রবর্তনের জন্য
আন্দোলন করলেও এবং জাতীয়তাবাদী চেতনাকে লালন করে একে বিকশিত রূপ
দেয়ার চেষ্টা করলেও তাদের দর্শনের মধ্যে সমাজতন্ত্র বা
ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো স্থান ছিলো না। আওয়ামী লীগ দলগতভাবে এবং এর
শীর্ষ নেতৃত্ব ব্যক্তিগতভাবে কখনোই সমাজতন্ত্রকে গ্রহণ করেননি।
কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়ার মাধ্যমে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও
উপলব্ধি এবং জনগণের আকাঙ্খাকে মর্যাদা দেবার মানসিকতা থেকে আওয়ামী
লীগ দার্শনিকভাবে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরেপেক্ষতার পক্ষে চলে আসে,
এবং রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে এগুলোকে গ্রহণ করা হয়। দলের
মূলনীতিতেও এগুলোই স্থান পায়। বলা প্রয়োজন, রাষ্ট্রীয় মূলনীতি এবং
দলীয় মূলনীতি এক নাও হতে পারে, রাষ্ট্র পরিচালনায় তাতে কোনো সমস্যা
হওয়ার কথা নয়। যেমন, ভারতের রাষ্ট্রীয় মূলনীতির সঙ্গে বিজেপির দলীয়
মূলনীতির বড় ধরনের বিরোধ রয়েছে। তারা ক্ষমতায় গিয়েও রাষ্ট্রীয় বা
দলীয় মূলনীতির কোনোটিতেই পরিবর্তন না এনেই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে।
তবে আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে যে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ও দলীয় মূলনীতি
মিলেমিশে গেলো তার কারণ- মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে
অর্জিত উপলব্ধি তাজউদ্দিন আহমদকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম বেতার
ভাষণে (বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে এবং তাঁর কোনো রকম পরামর্শ ছাড়াই)
ওগুলোকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করতে উদ্বুদ্ধু করে। তবে
দলীয় মূলনীতি হিসেবে এগুলোকে গ্রহণ করা হবে কীনা, সে সিদ্ধান্ত
তিনি গ্রহণ করেননি। বঙ্গবন্ধু ফিরে আসার পর এগুলোকেই দলীয় মূলনীতি
হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বোঝা যাচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর দর্শন কোনো
অনড় বিষয় নয়- সময়ের সঙ্গে, জনগণের আকাঙ্খার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে
এগুলোর সংযোজন বিয়োজন ঘটতে পারে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত- এই দুই যুগের মধ্যে
আওয়ামী লীগ দার্শনিকভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ দল হয়ে ওঠে। গণতন্ত্র,
সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি বিষয়গুলো তাদের
অলংকারে পরিণত হয়। দর্শনের ক্ষেত্রে নয়, বরং স্বাধীনতার পর থেকে
আওয়ামী লীগের যা কিছু ব্যর্থতা সেটি প্রকৃতপক্ষে তাদের কর্মসূচির
ব্যর্থতা। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে তারা জনগণের আকাঙ্খা পূরণে ব্যর্থ
তো হয়ই, ব্যর্থ হয় তাদের নূ্যনতম চাহিদা পূরণেও। সার্বিক পরিস্থিতি
এতটাই নাজুক হয়ে ওঠে যে, জনগণ অতিদ্রুত আওয়ামী লীগ থেকে নিজেদের
মুখ ফিরিয়ে নেয়। শুধু তাই নয়, জনগণের আকাঙ্খার সঙ্গে তাল মিলিয়ে
কর্মসূচি প্রণয়নে দলটি নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়। একটি উদাহরণ দিয়ে
ব্যাপারটা বোঝানো যেতে পারে। স্বাধীনতার পর খেয়ে-পড়ে বাঁচার
নিশ্চয়তা যেমন মানুষ প্রত্যাশা করেছিলো, প্রত্যাশা করেছিলো
আর্থিক-সামাজিক-রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা, তেমনই
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এক বিশাল যুবগোষ্ঠি নিজের দেশকে দেখতে
চেয়েছিলো একটি আত্ননির্ভরশীল ও আত্নমর্যাদা সম্পন্ন দেশ ও জাতি
হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে থাকায় এবং রাজনৈতিক
দূরদর্শিতা ও দার্শনিক প্রজ্ঞার কারণে তাজউদ্দিন আহমদের পক্ষে এই
বিষয়টি যত সহজে উপলব্ধি করা সম্ভব ছিলো, বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তা সম্ভব
হয়নি। ফলে তাজউদ্দিন আহমদ যেসব নীতি ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু তার
অনেককিছু থেকে সরে আসেন। যেমন, প্রথম বেতার ভাষণে তাজউদ্দিন 'দেশ
গঠনে মার্কিন সহায়তা' নেয়ার প্রস্তাবে সরাসরি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন
করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে ন্যাক্কারজনক
ভূমিকা পালন করেছিলো, তাতে স্বাধীনতার পর তাদের কাছ থেকে সাহায্য
গ্রহণ করা ছিলো আত্নমর্যাদা ও আত্নসম্মানবোধ বিসর্জনের সামিল।
তাছাড়া বিষয়টিকে তিনি দেখেছিলেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের
সুদূরপ্রসারি চক্রান্ত হিসেবে। কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের মাথায়
তাজউদ্দিন ঘোষিত এই সিদ্ধান্ত স্বয়ং শেখ মুজিব পরিবর্তন করেন এবং
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা গ্রহণে সম্মত হন! শুধু তাই নয়, দিন দিন
তাদের ওপর অধিকমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়তে থাকেন তিনি ও তাঁর
সরকার। এর ফলাফল যে কী ভয়াবহ হবে তা তিনি ভাবতেও পারেননি, কিন্তু
'৭৪-এ 'সাহায্য' বোঝাই জাহাজ আটকে দিয়ে, দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিতে ব্যাপক
ভূমিকা রেখে তারা শেখ মুজিবের এই আস্থার জবাব দিয়েছিলো, যা তৎকালীন
সরকারের জনপ্রিয়তাকে নামিয়ে এনেছিলো শূন্যের কোঠায়। আজও যে
যুক্তরাষ্ট্রের থাবা থেকে নিজেদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ছে আমাদের
জন্য, এমনকি বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এর মতো সর্বনাশা প্রতিষ্ঠানগুলো
রাষ্ট্র পরিচালনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে, তার বীজ রোপিত হয়েছিলো
সেই '৭২ সালেই- তাজউদ্দিন আহমদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের দিনে। এটি
কোনো মামুলি ব্যাপার ছিলো না, এর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও দার্শনিক
গুরুত্ব ছিলো অপরিসীম। আওয়ামী লীগ অবশ্য এর পরেও অনেকবার দলীয়
দর্শন-বিরোধী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। '৭৪-এর একদলীয় সরকার ব্যবস্থা
এবং মৌলিক অধিকার বিরোধী বহুবিধ কালাকানুন প্রণয়ন যার অন্যতম।
(যার অনেকগুলোই আজ পর্যন্ত বাতিল করা হয়নি বরং সবগুলো সরকার
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য এগুলো ব্যবহার করেছে। নিয়তির
পরিহাস এই যে, এই কালাকানুনগুলো সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ করা হয়েছে
আওয়ামী লীগের ওপরই। এ যেন গিলোটিনের প্রথম শিকার স্বয়ং উদ্ভাবক
নিজেই- এরকম ব্যাপার। আরো পরে, মুক্তবাজার অর্থনীতিকে রাষ্ট্রীয়
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূলনীতি ঘোষণা করা ছিলো এরকম আরেকটি
সিদ্ধান্ত। এটিও আওয়ামী লীগের দর্শন বিরোধী। '৯১-এর জাতীয়
নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকে আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি থেকেও
প্রকাশ্যেই সরে আসতে থাকে। ওই নির্বাচনের পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার
দাবি করে 'ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি'র নেতৃত্বে তীব্র গণআন্দোলন
গড়ে তোলা হয়। সেই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যেই সমর্থন দেয়।
নির্মূল কমিটি যেদিন গণআদালতের আয়োজন করে, সেই সভায় স্বয়ং শেখ
হাসিনাও উপস্থিত ছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, গণআদালত যাদের বিরুদ্ধে
যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসির আদেশ দেয়, শেখ হাসিনা বছরখানেকের মধ্যে
তাদের সঙ্গেই যুগপৎ আন্দোলন শুরু করেন! স্বয়ং গোলাম আজম এই যুগপৎ
আন্দোলন সম্বন্ধে মন্তব্য করেছিলেন যে, এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের
কাছ থেকে জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে! আহমদ
ছফা একবার বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ যখন জেতে তখন একা আওয়ামী লীগই
জেতে, আর যখন হারে তখন সারা বাংলাদেশ হারে।' বিষয়টি আওয়ামী লীগ
বোঝে কীনা, সন্দেহ জাগে। যাহোক, নীতিবিরুদ্ধভাবে সামপ্রদায়িক
শক্তির সঙ্গে আঁতাত-চেষ্টার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০০৭ সালের
নির্বাচনের আগে চরম-সামপ্রদায়িক একটি দলের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে।
দার্শনিকভাবে কতোটা পতন ঘটলে এমনটি ঘটা সম্ভব তা ভাবা যায় না। এর
কোনোটিই এই দলটির কাছে প্রত্যাশিত ছিলোনা। সারাজীবন ধরে গণতন্ত্রের
জন্য সংগ্রাম করে, জেল-জুলুম সহ্য করে, শেষ জীবনে এসে বঙ্গবন্ধু
একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করবেন সেটা ভাবা যায়? মানুষের অধিকার
নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার কণ্ঠ ছিলেন যে শেখ মুজিব, তিনিই মানুষের
মৌলিক অধিকার হরণের জন্য কালাকানুন তৈরি করবেন এটিও কি
কল্পনা-সম্ভব বিষয়? ৬০ বছর ধরে অসামপ্রদায়িকতার প্রতীক দলটি
ক্ষমতায় যাবার জন্য একটি চরম সামপ্রদায়িক দলের দাবি-দাওয়া
বাস্তবায়নের চুক্তি করবে তা-ও কি সম্ভব? যাহোক, অনেক প্রসঙ্গ
উত্থাপন না করেও বলা যায়- কর্মসূচির ব্যর্থতার কারণেই মুক্তিযুদ্ধে
নেতৃত্ব দেয়া দলটি দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে দূরে
থাকতে বাধ্য হয়। কিন্তু সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং দেশের সকল
সংকটে জনগণের পাশে থাকার মাধ্যমে তারা যে আস্থা অর্জন করেছে, তার
শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। আর তাই আওয়ামী লীগ-ই এখন এবং আরও বহুকাল
পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানতম রাজনৈতিক দলই রয়ে যাবে।
৩.
একটি দলের রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মসূচির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার বা
একে প্রত্যাখান করার সম্পূর্ণ অধিকার জনগণের আছে, কিন্তু দর্শন না
থাকলে জনগণ সেই দলকে গ্রহণই করে না। যেমনটি ঘটেছে জাতীয় পার্টির
ক্ষেত্রে। নয় বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেও দলটি মানুষের কাছে
গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। কিন্তু সে প্রসঙ্গে যাবার আগে আরেকটি প্রধান
দল বিএনপির কথা বলে নেয়া দরকার।
'বিএনপির জন্ম হয়েছিলো সামরিক শাসকের পকেট থেকে' - বিএনপি-বিরোধী
বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিবিদদের মুখে এরকম কথা প্রায়ই শোনা যায়। কথাটি
মিথ্যেও নয়। কিন্তু সামরিক শাসকের পকেট থেকে জন্ম নিলে কোনো দলের
রাজনীতি করার অধিকার আছে কী না, থাকলে জনগণের কাছে সেই দলটির
গ্রহণযোগ্যতা পাবার সম্ভাবনা আছে কী না- এ বিষয়ে তারা কিছু বলতে
চান না! বিএনপির বিরুদ্ধে এই সমালোচনা- বলা যায় দূর্বল সমালোচনা-
থাকলেও, দলটি যে বিপুল গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে- ভোটসংখ্যার দিক
থেকে (প্রাপ্ত আসনসংখ্যা নয়, প্রাপ্ত মোট ভোট) আওয়ামী লীগ ও
বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা প্রায় সমান সমান। এরকম গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার
কারণটি কি? এর পেছনেও আছে ওই একই জিনিস- দলটির দর্শন ও কর্মসূচি।
এই দর্শনের সঙ্গে আপনি সহমত পোষণ না-ও করতে পারেন, দেশের অধিকাংশ
প্রগতিশীল মানুষ সেটা করেনও না, কিন্তু তাদের যে একটি দর্শন আছে
সেটি এড়িয়ে গেলে বা অস্বীকার করা হলে তাদের গ্রহণযোগ্যতার কারণটি
ব্যাখ্যা করা যাবে না।
কোন সময়ে এবং কোন প্রেক্ষাপটে দলটির জন্ম হয়েছিলো সেটি মনে রাখলে
এই দর্শনের স্বরূপ এবং এরকম একটি দর্শনের গ্রহণযোগ্যতার কারণও বোঝা
যাবে। শেখ মুজিবের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড, খুনিদের মাস তিনেকের
পৈশাচিক উল্লাস ও কর্মকাণ্ড, সেনা অভু্যত্থান, পাল্টা সেনা
অভু্যত্থান, কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে একটি সফল-সর্বাত্নক সিপাহী
বিদ্রোহের ভেতর দিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায়
অধিষ্ঠিত হন। কর্নেল তাহেরের পেছনে জাসদের রাজনৈতিক সমর্থন থাকলেও
তাঁর বা জাসদ-নেতৃত্বের যে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা বলতে কিছু ছিলো না,
সেটি জিয়াউর রহমানকে ক্ষমতায় টেনে আনার সিদ্ধান্ত থেকেই বোঝা যায়।
কর্নেল তাহের হচ্ছেন বাঙালির ইতিহাসের সেই দুর্লভতম নেতা যিনি-
'দুদিনের মধ্যে বিপ্লব ঘটিয়ে দিতে পারি'- ঘোষণা দিয়ে সত্যি সত্যি
সেটি ঘটিয়ে দিয়েছিলেনও। তাঁর এই বিপ্লবী ক্ষমতা সম্বন্ধে আর কারো
সম্যক উপলব্ধি ছিলো কী না জানা নেই, কিন্তু জিয়াউর রহমানের যে সেই
উপলব্ধি ঘটেছিলো সেটি জীবন-রক্ষাকারী বন্ধুকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানোর
মধ্যে দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন। নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার
জন্য জিয়ার সামনে এর কোনো বিকল্প খোলা ছিলো না। কেবলমাত্র এবং
একমাত্র কর্নেল তাহেরই পারেন আরেকটি বিপ্লব সংঘটিত করে তাঁকে উৎখাত
করতে, একথা জিয়া খুব পরিষ্কারভাবেই বুঝে নিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান
ছিলেন কঠোর বাস্তববাদী, রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন
মানুষ, অন্যদিকে কর্নেল তাহের ছিলেন আবেগপ্রবণ-রোমান্টিক বিপ্লবী।
রোমান্টিসিজম ছাড়া বিপ্লব হয়ও না, সেজন্যই বিপ্লবকে সংহত করার
জন্য, তার ফসল ঘরে তুলবার জন্য একটি রাজনৈতিক সংগঠনের দরকার হয়,
একা বিপ্লবীর পক্ষে বিপ্লব করে আবার ক্ষমতা সংহত করা কঠিন হয়ে
দাঁড়ায়। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য যে, তাহেরের মতো এমন একজন বিপ্লবী
জন্মেছিলেন অথচ তাঁকে নির্ভর করতে হয়েছিলো জাসদের মতো একটি নপুংসক
ও হটকারী রাজনৈতিক দলের ওপর, যার নেতা ছিলেন সিরাজুল আলম খানের মতো
একজন আপাদমস্তক বিশ্বাসঘাতক ব্যক্তি। বস্তুত তাহের হত্যাকাণ্ডের
জন্য জিয়াউর রহমানের যতটুকু দায়, সিরাজুল আলম খানের দায় তার সমান
(ইতিহাসের এই অজানা অধ্যায়টি নিয়ে খুব বেশি লেখালেখি হয়নি। ৭
নভেম্বর, ১৯৭৫-এর প্রথম প্রহরে সিপাহি বিদ্রোহের সূচনা করার জন্য
যিনি প্রথম 'ফায়ার ওপেন' করেছিলেন, সেই নায়েব সুবেদার মাহবুবুর
রহমান সমপ্রতি তাঁর লেখা সৈনিকের হাতে কলম বইটিতে এসব অজানা
অধ্যায়ের দ্বার উন্মোচন করেছেন। উল্লেখ্য, এই মাহবুবুর রহমানই পরে
কর্নেল তাহেরের 'বিচারের' জন্য গঠিত কোর্টমার্শালে রাজসাক্ষী হন
সিরাজুল আলম খানের প্ররোচনায়। জনাব খান নাকি তাঁকে নিশ্চয়তা
দিয়েছিলেন যে, তিনি রাজসাক্ষী হলে কর্ণেল তাহেরকে মুক্ত করা সম্ভব
হবে। কিন্তু বিচারের রায়ে কর্ণেল তাহেরের ফাঁসির ঘোষণা শুনে তিনি
চিৎকার করে এর প্রতিবাদ করেন। পরে তাঁকে জার্মানিতে নির্বাসনে
পাঠানো হয়।)। যাহোক, জিয়া যখন দল গঠন করলেন- তার সামনে আসলে
প্রগতিপন্থী কোনো পথ খোলাই ছিলো না। ওই সময় আওয়ামী লীগের মতো একই
আদর্শের কোনো দল গঠন করার যে মানেই হয় না, সেটা তো পরিষ্কারভাবেই
বোঝা যায়। আবার কর্নেল তাহেরের হত্যাকাণ্ড জাসদের বিপুলসংখ্যক
নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছে জিয়াকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে পরিচিত করে
তুলেছিলো, ফলে জাসদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সুযোগই ছিলো
না। তাঁর নিজের কোনো রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ডও ছিলো না, ফলে তাকে
একটি ঝুঁকি নিতে হলো এবং প্রগতিবিরোধী সমস্ত শক্তিগুলোকে নিজের
পক্ষে নিয়ে আসার কথা ভাবতে হলো। 'ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি আস্থা,
সামাজিক ন্যায় বিচার, গণতন্ত্র, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ' এই চার
মূলনীতিকে শুধু দলীয় নয়, রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবেই ঘোষণা করলেন
তিনি। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে অর্জিত রাষ্ট্রীয়-সাংবিধানিক দর্শন
'ধর্মনিরপেক্ষতা' প্রতিস্থাপিত হলো 'ইসলামী মূল্যবোধের ওপর আস্থা'
দিয়ে; 'সমাজতন্ত্র' নির্বাসিত হলো তথাকথিত 'সামাজিক ন্যায়বিচারের'
কাছে; 'জাতীয়তাবাদ' চেহারা পেলো 'বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের'।
'গণতন্ত্র' রইলো ঠিকই - ওটা রাখতে হয়, বিশ্বাস না করলেও রাখতে হয়।
আর তাছাড়া, সম্ভবত ওই শব্দটির বিকল্প কোনো শব্দ তিনি বা তাঁর
পরামর্শকরা খুঁজে পাননি, পেলে সেটিই ব্যবহার করতেন। বোঝাই যাচ্ছে-
বিএনপির দর্শনগুলো সর্বতোভাবেই মুক্তিযুদ্ধের ফসল আমাদের রাষ্ট্রীয়
মূলনীতি তথা দর্শনের বিরুদ্ধে। কিন্তু রাষ্ট্রীয়-সাংবিধানিক
মূলনীতিগুলো যে কেবলমাত্র ঘোষণা দিয়ে পরিবর্তন করা যায় না, জনগণের
মতামত নিতে হয়- এ কথাটিও তিনি ও তাঁর সহকর্মী-পরামর্শকরা উত্তেজনার
বশে ভুলে গেলেন। যখন মনে পড়লো তখন আর ঘোষণাটি ফিরিয়ে নেয়ার মতো
বাস্তবতা তাদের ছিলো না, নিলে তাদের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়তো।
ফলে, পঞ্চম সংশোধনীর সময় যখন এই ঘোষণাকে বৈধতা দেয়ার বিষয়টি সামনে
চলে এলো তখন ভুলক্রমে খন্দকার মোশতাক সরকারের এবং বঙ্গবন্ধুর
খুনিদের সমস্ত কার্যক্রমকেও তিনি বৈধ করে দিলেন। একটি ভুল অনেকগুলো
ভুলের জন্ম দেয়। নইলে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড, জাতীয় চারনেতার
হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি জঘন্য অপরাধের দায় বিএনপি যেচে পড়ে নিজের কাঁধে
নিতে যাবে কেন? এসব অপরাধের কোনো দায়দায়িত্ব তো তাদের ছিলো না!
জিয়াউর রহমান প্রত্যক্ষভাবে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন-
তেমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। বঙ্গবন্ধুর হত্যা-পরিকল্পনার
বিষয়টি তাঁর গোচরে ছিলো, সেটি তখনকার সমস্ত ঊধর্্বতন সামরিক
কর্মকর্তারই গোচরে ছিলো। পরিকল্পনার বিষয়টি জানা সত্ত্বেও, ঘটনাটি
ঘটার আগেই, তিনি কেন এইসব খুনিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি এই
প্রশ্ন করলে, সেই একই দায়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল
শফিউল্লাহকেও দায়ী করা যায়। তিনি তো সেনাপ্রধান ছিলেন, এবং বিষয়টি
তিনিও জানতেন, তিনি কেন তাঁর অধ্বস্তনদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি?
তাঁর জন্য তো সেটি অনেক সহজ ছিলো! যাহোক, বিএনপি কেন পঞ্চম
সংশোধনীর মাধ্যমে এর দায়দায়িত্ব নিয়েছে সেটি একটি জটিল প্রশ্ন।
কোনো উন্মাদের পক্ষেও কোনো হত্যাকাণ্ডের দায়দায়িত্ব যেচে পড়ে নিজের
কাঁধে নেয়া সম্ভব নয়। নিয়েছে, তারচেয়ে বলা ভালো, নিতে বাধ্য হয়েছে-
কারণ, নতুন ধরনের একটি রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়া, তাকে
জনগণের কাছে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য যে প্রজ্ঞার
প্রয়োজন, এই দলের নেতাকর্মীদের তা ছিলো না। ছিলো না বলেই তারা
তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। অনেকেই হয়তো বলবেন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা
রক্ষার খাতিরেই মোশতাক সরকারের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। ওই
যুক্তিতে সেটা করা হলেও, মোশতাক সরকারের সবকিছুকেই বৈধতা দেয়ার
কোনো বাধ্যবাধকতা তো ছিলো না! বঙ্গবন্ধুর খুনিদেরকে রক্ষার জন্য যে
ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিলো সেটিকে অবৈধ ঘোষণা করেও তো ওই
সরকারকে বৈধতা দেয়া যেত! সেক্ষেত্রে কি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা
ক্ষণ্ন হতো? হতো না, হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। নিজেদের ভুলত্রুটিগুলোর
বৈধতা দিতে গিয়ে অন্যের ভুলত্রুটি-অপরাধ নিজের কাঁধে নেয়ার এমন
ঘটনা ইতিহাসে বিরল। যাহোক, আগেই বলা হয়েছে- সমস্ত প্রগতিবিরোধী
শক্তিকে নিজের দিকে টানতে গিয়ে এমন এক দর্শনকে গ্রহণ করতে হয়েছিলো
এই দলটিকে যা রাষ্ট্রীয় মূলনীতি বিরোধী। এর কারণ জিয়া এবং তাঁর
পরামর্শক-সহকর্মীরা ভেবেছিলেন- যেহেতু আওয়ামী লীগ এই রাষ্ট্রীয়
দর্শনের ঘোষণা দিয়েছিলো, এবং স্বাধীনতার পর যেসব দল রাজনৈতিক
কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ পেয়েছিলো তারাও এই মূলনীতির সঙ্গে দ্বিমত
পোষণ করেনি, অতএব রাষ্ট্রীয় মূলনীতি এবং এইসব দলের দর্শন একই
ব্যাপার। এটি ছিলো একটি বিরাট ভুল। রাষ্ট্রের দর্শন এবং দলের দর্শন
যে আলাদা হতে পারে, আলাদা হলেও যে ক্ষমতায় আরোহন করা যায়, এবং
রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড চালানো যায়- এটা তারা ভাবেননি, ভাবার মতো
দার্শনিক প্রজ্ঞাও তাদের ছিলো না। আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক
দলের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে তারা তাই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে
পড়লেন। ভারতে বা পাকিস্তানে গত ৬০ বছরেও এমনটি ঘটেনি। আগেও বলেছি,
ভারতের রাষ্ট্রীয় মূলনীতির সঙ্গে বিজেপির দলীয় মূলনীতির বড় ধরনের
বিরোধ রয়েছে- তারা ক্ষমতায় গিয়ে রাষ্ট্রীয় বা দলীয় মূলনীতির
কোনোটিতেই পরিবর্তন না এনেই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। পাকিস্তানেও
এমনটি ঘটেছে। পিপিপি'র দর্শন রাষ্ট্রীয় দর্শনের সঙ্গে সম্পূর্ণ
সঙ্গতিপূর্ণ ছিলো না। কিন্তু দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও
তারা রাষ্ট্রীয় মূলনীতিগুলোতে হাত দেয়নি। বিএনপি যে হাত দিয়েছিলো
তার কারণ- তারা বুঝতেই পারেনি, রাষ্ট্র কতোগুলো মৌলিক মূলনীতির
ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেগুলো অক্ষুণ্ন রাখাটা রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক
শিষ্টাচারের অন্যতম শর্ত। জিয়াউর রহমান নিজে তাঁর দলের দর্শনের
সঙ্গে একমত ছিলেন বলেও মনে হয় না। বাংলাদেশী জাতীয়বাদের কথা বললেও
বাঙালী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ তাঁকে নিতে দেখা যায়নি,
বরং অনেকক্ষেত্রেই পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। ধর্মনিরেপেক্ষতাকে সংবিধান
থেকে সরিয়ে দিলেও তিনি নিজে সামপ্রদায়িক ছিলেন এমন কোনো আচরণ
করেননি। বোঝাই যায়- আওয়ামী বিরোধী সেন্টিমেন্টকে পুঁজি করে একটি
জনগোষ্ঠির সমর্থন পেতে চেয়েছিলেন তিনি, এবং সেটি পেয়েছিলেনও।
অচিরেই আওয়ামী বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি এবং চিন্তাশীল অংশটিকে আকর্ষণ
করতে সক্ষমও হয়েছিলো দলটি। ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী একটি গোষ্ঠি,
বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে যারা স্রেফ পাকিস্তানের ভাঙন হিসেবে ভাবতো,
মুক্তিযুদ্ধ যাদের কাছে কোনো আলাদা মহিমা নিয়ে হাজির হয়নি কখনো,
এমনকি স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী ব্যক্তিবর্গ ও গোষ্ঠিসমূহ জড়ো হলো
বিএনপির পতাকাতলে। শুধু তাই নয়, বিস্ময়কর হলো - বামপন্থীদের একটি
বিরাট অংশও এলো তাদের সঙ্গে। বিএনপির দর্শন যে কোনোভাবেই তাদের
দর্শনের সঙ্গে যায় না, এটা তাদের বিবেচনাতেই এলো না। তারা বরং
আওয়ামী বিরোধী সেন্টিমেন্ট এবং ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করার জন্যই
গেলেন। কিন্তু এই শ্রেণীর ব্যক্তি বা গোষ্ঠি কোন দলে এলো বা কোন দল
থেকে বেরিয়ে গেলো তাতে জনগণের কিছু যায় আসে না। নেতার দল ও আদর্শ
পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সমর্থকরাও সেটি পরিত্যাগ করেন সেটাও
বলা যায় না। অতএব, তারা যে বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠির সমর্থন সঙ্গে
করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন সেটি একেবারেই সত্য নয়। তাদের কারণে
বিএনপি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে তা-ও সত্য নয়। তাহলে প্রশ্ন তো ওঠেই
যে, বিএনপির দর্শন যদি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী হয়ে থাকে তাহলে এত
বিপুল জনসমর্থন পেলো কিভাবে? এদেশের ৯৯ ভাগ মানুষই তো
মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক, অধিকাংশ লোক সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও করেছে,
তারা কিভাবে বিএনপির সমর্থকে পরিণত হলো? এর কারণ একাধিক। প্রথমত:
দর্শন না থাকলে জনগণ একটি দলকে আদৌ গ্রহণ করে না এটি যেমন সত্যি,
তেমনই সত্য হলো এই যে- একটি দলের দর্শন প্রাথমিক অবস্থায় জনগণের
কাছে বিমূর্ত রূপে হাজির হয়। এইসব দার্শনিক কথাবার্তা তাদের কাছে
কেতাবি কথাবার্তার অধিক মর্যাদা পায় না বা তাদের বোধগম্যতায় প্রবেশ
করে না, এর কোনো প্রত্যক্ষ রূপও তারা দেখতে পায় না। দর্শনগুলো
জনগণের কাছে বোধগম্য হতে বা পরিস্ফূট হতে অন্তত ২৫/৩০ বছর সময়
লাগে। বিএনপির দর্শনগুলো এখন পর্যন্ত জনগণের কাছে ধোঁয়াটে রূপে
অবস্থান করছে। 'ইসলামী মূল্যবোধের ওপর আস্থা' না হয় বোঝা যায়,
'গণতন্ত্র' ব্যাপারটা বোঝা না গেলেও এর সঙ্গে নির্বাচন ইত্যাদি
জড়িত সেটুকু অনুভব করা যায়, কিন্তু 'সামাজিক ন্যায়বিচার' কি জিনিস?
জনগণ মোটাদাগেও হলেও সমাজতন্ত্র ব্যাপারটা বোঝে, কিন্তু 'সামাজিক
ন্যায়বিচার' বিষয়টি বিএনপির কর্মী-সমর্থক তো দূরের কথা, স্বয়ং
নেতারা বোঝেন কীনা সন্দেহ আছে। সম্ভবত বিএনপি-পন্থী বুদ্ধিজীবীরাও
বোঝেন না। এমনকি দলটি গত ৩০ বছরে এর কোনো প্রত্যক্ষ রূপ প্রদর্শন
করতেও ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশী জাতীয়াবাদও বিতর্কের বেড়াজাল কেটে
বের হতে পারেনি। জিয়াউর রহমানের লেখালেখি-বক্তৃতা ইত্যাদি থেকে মনে
হয় জাতীয়তাবাদ বলতে তিনি ভৌগলিক পরিচয় অর্থাৎ নাগরিকত্বকে
বুঝিয়েছেন। অন্যদিকে এর সমালোচকরা একে পাকিস্তানপন্থী মুসলিম
জাতীয়তাবাদের সমার্থক বলে উল্লেখ করে থাকেন। বিষয়টি আসলে কি, সেটা
এখন পর্যন্ত জনগণ বুঝেই উঠতে পারেনি। (এমনই আরেকটি না-বোঝা বা
ভুল-বোঝা শব্দ 'ধর্মনিরপেক্ষতা'। ইসলামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা
ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা বলে প্রচার করে মানুষের মনে ভীতির
সঞ্চার করেছেন। এই প্রচার যে আদৌ সত্য নয়, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে যে
ধর্মহীনতা নয়- সেটি জনগণকে বোঝাতেও নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে এর
পক্ষের শক্তি। ধর্মের ব্যাপারে রাষ্ট্র নিরপেক্ষ থাকবে, কোনো বিশেষ
ধর্মের প্রতি পক্ষপাত দেখাবে না- মোটাদাগে এই হলো ধর্মনিরপেক্ষতার
অর্থ, এটুকু বুঝিয়ে বলা গেলেও বিরুদ্ধবাদীরা অপপ্রচারে জয়ী হতে
পারতো না।) অতএব বলা যায়, প্রাথমিক অবস্থায় বিএনপির দর্শনগুলো
সাধারণ মানুষের কাছে দলটির গ্রহণযোগ্যতা তৈরির ব্যাপারে বড় কোনো
ভূমিকা বা প্রভাব রাখতে পারেনি। বরং এই গ্রহণযোগ্যতা সীমাবদ্ধ ছিলো
আওয়ামী-বিরোধী শিক্ষিত-সচেতন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠির মধ্যে। তবে
মোটাদাগে এই দলটি যে দার্শনিকভাবে আওয়ামী লীগ বিরোধী সেটি বুঝিয়ে
দিয়েছিলো ওই দর্শনগুলোই। আর তাই, স্বাধীনতার পর ক্ষমতায় আসীন দলটির
সীমাহীন ব্যর্থতায় ক্ষুব্ধ জনগণ প্রাথমিকভাবে বিএনপিকে গ্রহণ
করেছিলো। সিপাহী বিদ্রোহের পর জিয়াউর রহমানকে ক্ষমতায় না এনে জাসদ
যদি নিজেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতো, জনগণ সেটিও একইভাবে গ্রহণ করতো
ওই আওয়ামী লীগের প্রতি বিরক্তি এবং ক্ষোভ থেকেই। তবে যে কথাটি না
বললেই নয় সেটি হলো, বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার পেছনে মূল
চালিকাশক্তি এবং দ্বিতীয় কারণ হিসেবে কাজ করেছে দলটির কর্মসূচি।
আগেও বলেছি- শুধু দর্শন দিয়ে জনগণের কাছে পৌঁছানো যায় না,
পৌঁছাতে হয় কর্মসূচি দিয়েও। জিয়াউর রহমানের অসংখ্য ত্রুটি যেমন
ছিলো, তেমনি দুর্লভ কিছু গুণও ছিলো। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনিই প্রথম
রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা এনেছিলেন, জনগণকে সরকারী কর্মসূচির
সঙ্গে একাত্ন করে তাদের মধ্যে উদ্দীপনা জাগাতে সক্ষম হয়েছিলেন,
অভিনব সব কর্মসূচির উদ্ভাবন করে চমক সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বিশেষ করে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদন-ব্যবস্থাপনা-ব্যবহার ও
বাজারজাতকরণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে জনগণের পরিচয় করিয়ে
দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের গত '৩৭ বছরের ইতিহাসে আর কোনো রাষ্ট্রনায়ক
সশরীরে জনগণের এত কাছাকাছি যেতে সক্ষম হননি। কৃষকের কাঁধে বন্ধুর
মতো হাত রেখে বৃক্ষ রোপণ, মৎস চাষ, অধিক ফসল উৎপাদনের ব্যাপারে
উৎসাহ প্রদান করার দুর্লভ দৃশ্য তিনিই এদেশের রাজনীতিতে প্রবর্তন
করেছিলেন। অবশ্য এরশাদও জনগণের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেছেন,
কিন্তু তাঁর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা ছিলো না বলেই এই চেষ্টা ব্যর্থ
হয়েছে। তাঁর চেষ্টাটিকে জনগণ বিবেচনা করেছে জিয়ার অনুকরণ হিসেবে,
কিন্তু জিয়ার সততা ও আন্তরিকতা নিয়ে মানুষের মনে কোনো প্রশ্ন ছিলো
না, এরশাদের ব্যাপারে তা প্রবলভাবেই ছিলো। জিয়ার ব্যক্তিচরিত্রের
এই দৃঢ়তা, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বীরোচিত ভূমিকা, জনগণের মধ্যে
উদ্দীপনা সৃষ্টির ক্ষমতা এবং তাদেরকে ভবিষ্যতের সুন্দর স্বপ্ন
দেখাবার প্রবণতাও বিএনপিকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার পেছনে উল্লেখযোগ্য
ভূমিকা পালন করেছে। যাহোক, তাঁর শাসনামল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, ক্ষমতাও
তাঁর জন্য স্বস্তিকর হয়নি। শক্তিশালী বিরোধী দল তখন ছিলো না বটে-
তাঁকে তাই বিরাট কোনো রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়নি-
কিন্তু সামরিক বাহিনীর মধ্যে ঘটে যাওয়া অসংখ্য বিদ্রোহ তাঁকে
ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিলো, এবং এগুলো তাঁকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে
দমন করতে হয়েছে। বিদ্রোহ দমনে যে নির্মমতার পরিচয় তিনি দিয়েছেন
সেটি যে কোনো কল্প-কাহিনীকেও হার মানাবে। একটি সর্বক্ষণিক
অস্থিতিশীলতায় তাঁর সরকার টলমল করেছে যদিও অভ্যন্তরিণ এইসব বিদ্রোহ
বাইরে তেমন একটা প্রকাশিত হয়নি। বরং জাতীয় জীবনে একটি আপাত
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিলো। তাঁর মর্মান্তিক
হত্যাকাণ্ড সেটিকে নষ্ট করে দেয়।
জিয়ার জীবদ্দশায় বিএনপি কোনো রাজনৈতিক চরিত্র অর্জন করে উঠতে
পারেনি, কোনো শক্তিশালী ভিত এবং সাংগাঠনিক কাঠামোও তৈরি করতে
পারেনি। ক্ষমতার মধ্যে জন্ম নেয়া কোনো দলের পক্ষে সেটি কঠিনও বটে।
ফলে এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর এই দলের ছোটবড় নেতারা ঝাঁকের কৈ-এর মতো
নতুন সামরিক শাসকের পদতলে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। বিএনপির দর্শন নয়,
ক্ষমতা এবং কেবলমাত্র ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করার জন্যই যে এরা জিয়ার
সঙ্গে ভিড়েছিলেন সেটিও এর ঘটনার মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হয়ে যায়। আর
ওই সময়টিই ছিলো বিএনপির জন্য এক অগি্নপরীক্ষার কাল। দলটির বৃহত্তম
অংশ এরশাদের সঙ্গে যোগ দেয়ার পরও বিএনপি আদৌ টিকে থাকবে কী না তা
নিয়ে সংশয়ের যথেষ্ঠ কারণ ছিলো। দলে রয়ে যাওয়া ক্ষুদ্র অংশটি তাই
গৃহবধু খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে নিয়ে আসে। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক
প্রজ্ঞা বা দূরদর্শিতা ছিলো এমন কোনো প্রমাণ তিনি দেখাতে না পারলেও
ব্যক্তিগত আবেগে তাড়িত হয়েই হয়তো তিনি এরশাদের বিরুদ্ধে অবস্থান
গ্রহণ করেছিলেন। এর দুটো কারণ ছিলো। প্রথমটি- এরশাদই বিএনপিকে
ক্ষমতাচু্যত করেছিলেন, দ্বিতীয়টি- তিনি বিশ্বাস করতেন যে, জিয়া
হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এরশাদের সংশ্লিষ্টতা ছিলো। এরশাদ-বিরোধী
আন্দোলনের এক পর্যায়ে প্রকাশ্য জনসভায় তিনি এরশাদকে জিয়া হত্যার
জন্য অভিযুক্তও করেছিলেন। এরশাদ প্রশ্নে তাঁর এই আপোসহীন অবস্থানটি
ব্যক্তিগত আবেগ থেকে উদ্ভুত হলেও জনগণের কাছে সেটি পরিষ্কার না
হওয়ার তিনি পরিণত হন এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের আস্থা ও আপোসহীনতার
প্রতীকে। আর বিএনপি পায় আপোসহীন দলের ইমেজ। আর এই আন্দোলনের মধ্যে
দিয়েই বিএনপি রাজনৈতিক চরিত্র অর্জন করে এবং রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা
লাভ করে। বলা প্রয়োজন, সামরিক স্বৈরশাসন বিরোধী ওই আন্দোলনটির
সঙ্গে জনগণের, বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত জনগণের সম্পর্কটি ছিলো
আবেগতাড়িত- আর এ কথা তো সবাই জানেন ও মানেন যে, এ দেশের সমস্ত
আন্দোলন-সংগ্রামের প্রাণকেন্দ্রে সবসময়ই অবস্থান করেছে
মধ্যবিত্তরা। বিএনপি সেই আবেগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সক্ষম
হয়েছিলো। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে দলটির শীর্ষ
নেত্রীর বিরুদ্ধে আন্দোলনের নানা পর্যায়ে এরশাদ সরকারের সঙ্গে
আঁতাত ও আপোসের অভিযোগ ওঠে এবং দলটি এই অভিযোগের সন্তোষজনক জবাব
দিতে ব্যর্থ হয়। বরং '৮৬-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ এই অভিযোগের
তীব্রতাকে বাড়িয়ে দেয়। এমন একটি আত্নঘাতি সিদ্ধান্ত দলটি কেন
নিয়েছিলো সেটি এখন পর্যন্ত পরিষ্কার নয়। শুধু তাই নয়, এরশাদ
ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার আগ বাড়িয়ে 'আমি অখুশি নই' জাতীয়
মন্তব্য জনগণ ভালোভাবে নেয়নি। এরশাদের সঙ্গে লং ড্রাইভে গিয়ে
আন্দোলনকে ছুরিকাঘাত করার অভিযোগও তাঁর ও দলের জন্য বিব্রতকর
অবস্থার তৈরি করে (অভিযোগটি আবার তুলেছিলেন এরশাদ সরকারের
উপরাষ্ট্রপতি ডিগবাজি-বিশারদ মওদুদ আহমদ!)। এসবের প্রতিফলন দেখা
যায় '৯১-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে
সরকার গঠন করবে- এ কথা কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি। কারণ, তিনশ' আসনে
প্রার্থী দেবার মতো যোগ্য লোকও তাদের ছিলো না। সাংগাঠনিক অবস্থাও
ছিলো করুণ। গ্রাম পর্যায়ে তো দূরের কথা, থানা পর্যায়ে- এমনকি কোনো
কোনো জেলায়ও তাদের সাংগাঠনিক কর্মকাণ্ড ছিলো না। অন্যদিকে
নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ এমন আচরণ শুরু করে যেন তারা ক্ষমতায়
এসেই পড়েছে! 'বিএনপি ১০টির বেশি আসন পাবেনা' আওয়ামী-নেত্রীর এই
জাতীয় মন্তব্য, নির্বাচনের দু-তিনদিন আগে জাতির উদ্দেশ্যে
বেতার-টেলিভিশন ভাষণে জিয়া ও এরশাদকে এক কাতারে ফেলে তীব্র
সমালোচনা করার মধ্যে দিয়ে সেইসব আচরণ প্রকাশিত করেছিলো। সাংগাঠনিক
দিক দিয়েও আওয়ামী লীগ ছিলো শত মাইল এগিয়ে। যোগ্য-অভিজ্ঞ প্রার্থীর
অভাবও তাদের হয়নি- তবু নির্বাচনে জয়লাভ করলো বিএনপি। এটি ছিলো
স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলনে বিএনপির ভূমিকার প্রতি জনগণের আস্থার
প্রতিফলন এবং আওয়ামী লীগের প্রতি অনাস্থার জবাব। এ ঘটনা থেকেও বোঝা
যায়- জনগণের মনমতো কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে গেলে জনগণ তার পুরস্কার
দেয়। '৬০ দশকে আওয়ামী লীগ যেমন বাঙালি জনগোষ্ঠির প্রতিটি
আশা-আকাঙ্খাকে বুকে ধারণ করে, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় জনগণকে
জাগ্রত করে আন্দোলনকে একটি গণঅভু্যত্থানের দিকে নিয়ে গিয়েছিলো এবং
এর পুরস্কার পেয়েছিলো '৭০-এর নির্বাচনে, ঠিক ওই মাত্রার না হলেও
'৮০-এর দশকে বিএনপির আপোসহীন ইমেজ ও কর্মকাণ্ড দলটিকে
রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছিলো।
৪.
এতক্ষণ ধরে যা যা বলা হলো তাতে মনে হতে পারে- রাজনৈতিক দলের
কর্মসূচি বলতে শুধুমাত্র আন্দোলন-সংগ্রামকেই বোঝায়, এবং এই ধরনের
কর্মসূচি দিলেই জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়! বিষয়টি আদৌ
সেরকম নয়। মূল বিষয় হচ্ছে_ রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই হোক বা
ক্ষমতার বাইরে থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম-দাবিদাওয়া আদায়ের ব্যাপারেই
হোক, জনগণের আশা-আকাঙ্খা-স্বপ্ন-প্রত্যাশা ইত্যাদি উপলব্ধি করে
কর্মসূচি নির্ধারণ করলেই কেবল গ্রহণযোগ্যতা মেলে। আন্দোলনের
প্রশ্নে, আন্দোলনটি কার বিরুদ্ধে করা হচ্ছে, কেন করা হচ্ছে, এর
ফলাফল কী, আন্দোলনরত দলটি ক্ষমতায় গেলে জনগণের কল্যাণে কী কী
কর্মসূচি গ্রহণ করবে- সেই বিষয়গুলো জনগণ অবশ্যই বিবেচনায় রাখে।
আওয়ামী লীগের জন্মের পর থেকে অন্তত এক যুগের মধ্যে দলটির তেমন কোনো
প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতে ছিলো না। '৬০-এর দশকে সেটি তারা অর্জন করে
নেয় মূলত ছয় দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে। '৬৯-এর গণঅভূ্যত্থান এবং
'৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অভূতপূর্ব জয়লাভের মূলভিত্তিও ছিলো
ওই ছয় দফা কর্মসূচি। সবাই জানেন যে, এই ছয় দফায় ছিলো পূর্ণমাত্রার
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি বা প্রস্তাব। কেতাবি
ভাষায় এই দাবিগুলো লিখিত হলেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সহজ ভাষায়
জনগণকে একথা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, ছয় দফা বাস্তবায়িত হলে
পশ্চিম পাকিস্তানিদের রাজনৈতিক নিপীড়ন থেকে যেমন মুক্তি মিলবে
তেমনি নিজেদের সম্পদ নিজ দেশে রেখে তার সর্বোত্তম ব্যবহার করে
উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালনা করা যাবে যার ফলে জনগণের অর্থনৈতিক
মুক্তি অর্জিত হবে। জনগণ চায়ও ওই দুটো জিনিসই- আর্থিক ও সামাজিক
নিরাপত্তা, এবং জীবন-যাপনে অবাধ স্বাধীনতা। '৭০-এর নির্বাচনের পর
আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে, এই কর্মসূচি আদৌ বাস্তবায়ন
করতে পারতো কী না সেটি নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে। অর্থাৎ
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আদৌ তা বাস্তবায়ন করতে দিতো কী না সেটা
নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা চলে। কিন্তু যেহেতু তারা ক্ষমতায় যেতে
পারেনি, তাদের বিরুদ্ধে তাই ব্যর্থতার অভিযোগ বা প্রতিশ্রুতি
ভঙ্গের অভিযোগ তোলাও অবান্তর বলে মনে হয়েছে জনগণের কাছে। আওয়ামী
লীগের প্রতি জনগণের সমর্থন ও আস্থা তাই অব্যাহতই ছিলো। ফলে, যুদ্ধ
শুরু হলে দলমত নির্বিশেষে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ আওয়ামী লীগের
নেতৃত্বে মেনে নিতে আপত্তি করেনি, যদিও তখন আরও অনেকগুলো দল
সক্রিয়ভাবে স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলো, বঙ্গবন্ধুর
অনুপস্থিতিতে মওলানা ভাসানীর মতো অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতাও উপস্থিত
ছিলেন। এমনকি যুদ্ধের পর সদ্য-স্বাধীন দেশে এককভাবে আওয়ামী লীগের
সরকার গঠনের অধিকার আছে কী না সেটি নিয়েও কেউ প্রশ্ন তোলেনি। দেশ
স্বাধীন হবার পরে পাকিস্তান আমলের নির্বাচনী ফলাফল তো বাতিলই হয়ে
যাবার কথা, সেক্ষেত্রে গণতন্ত্র ও নির্বাচনে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ
তো নিজেদেরকে নির্বাচিত সরকার দাবি করতে পারে না! আওয়ামী লীগের
সরকার '৭৩-এর জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তা ছিলোও না, ছিলো
বিপ্লবী সরকার। কিন্তু বিপ্লবী সরকারই বা কেন একদলীয় হবে- যুদ্ধ তো
তারা একা করেনি, এই প্রশ্নও কেউ উত্থাপন করেনি। এসবই ঘটেছে
বঙ্গবন্ধুর আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা এবং আওয়ামী লীগের প্রশ্নাতীত
গ্রহণযোগ্যতার জন্য। ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগ জনগণের প্রত্যাশা
পূরণ করতে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং জনগণ তাদের ওপর থেকে
সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলো। যদিও বঙ্গবন্ধুর কোনো বিকল্প ছিলো
না, কিন্তু দল হিসেবে আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জনগণ
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বেদনায়, স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় কাতরাতে থাকে।
অন্যদিকে বিএনপির জন্মই ক্ষমতা কাঠামোর ভেতর থেকে, ফলে ক্ষমতায়
যাওয়ার আগে প্রতিশ্রুতি দিতে হয়নি তাদের, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের
প্রশ্নও ওঠেনি তাই। তাছাড়া বিএনপির সরকার তুলনামূলকভাবে আওয়ামী
লীগের চেয়ে সফল সরকার বলেই বিবেচিত হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ
অল্পতেই খুশি হয় বলে এই সফলতাকেই বিপুলভাবে সম্বর্ধিত করেছিলো।
যাহোক- কর্মসূচি যেমনই হোক না কেন জনগণ সেগুলোর মধ্যে নিজেদের
আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন দেখতে চায়, তাদের সংকট-সমস্যার সমাধান দেখতে
চায়। সেটা পেলে সেই কর্মসূচিকে তারা সমর্থন করে, নিজেরা তাতে
অংশগ্রহণও করে। আর জনকল্যানমুখী কর্মসূচির গুরুত্বই এখানে।
৫.
দুটো বিষয়ের কথা আমরা এই লেখায় বারবার উল্লেখ করেছি- দর্শন ও
কর্মসূচি। এ দুটো বিষয়ের সমন্বয়ই একটি দলকে জনগণের কাছে নিয়ে যেতে
পারে। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে বামপন্থী দলগুলোর তেমন কোনো
গ্রহণযোগ্যতা বাংলাদেশে তৈরি হলো না কেন? এই দলগুলো আর কিছু না হোক
দর্শনের চর্চা খুব কঠোরভাবেই করে থাকে। এমন কোনো বামপন্থী দল নেই
যাদের দর্শন ও কর্মসূচি বিষয়ক দলিল নেই। এ দুটোর আনুষ্ঠানিক চর্চা
তারা এত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে যে, গন্তব্যের কথা তারা ভুলেই যায়,
আদৌ তাদের কোনো গন্তব্য আছে কী না তা-ও বোঝা যায় না। তবু কেন
বাংলাদেশে তাদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হলো না? এ দেশে বিপ্লবের সমস্ত
কারণ-উপাদান-লক্ষণ-সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, এবং এসব দলের
নেতাকর্মীদের প্রশ্নহীন আন্তরিকতা থাকলেও কেন বিপ্লবী কোনো
পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব হলো না? এই ব্যর্থতা প্রধানত তাদের
কর্মসূচির ব্যর্থতা। বাংলাদেশের মানুষ গত ৬০ বছরেও বুঝে উঠতে
পারেনি- এই দলগুলো আসলে কি চায়! এমনকি সহজ ভাষায় নিজেদের
নীতি-আদর্শ-দর্শন বা কর্মসূচি জনগণকে বুঝিয়ে বলতেও এঁরা চরমভাবে
ব্যর্থ হয়েছে। এঁরা কতোগুলো মুখস্থ শব্দে বক্তৃতা দেন- বুর্জোয়া,
সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক চক্রান্ত, সামন্ততন্ত্র, পুঁজিবাদের
থাবা- ইত্যাদি তাদের খুবই প্রিয় শব্দ। নেতারা তো বটেই, এইসব দলের
নিচুস্তরের কর্মীরাও এইসব শব্দ অহরহ ব্যবহার করে থাকেন। একটু কান
পাতলেই এসব ভারি ভারি শব্দের অত্যাচারে কান ভারি হয়ে ওঠে। যাদের
উদ্দেশ্যে এই কথাগুলো বলা হয় সেই কৃষক-শ্রমিক-খেটে খাওয়া মানুষ এসব
শব্দের মানেই বুঝতে পারে না- সাড়া দেবে কিভাবে? বাংলাদেশের বাম
দলগুলো ক্ষমতায় গেলে কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে সে সম্বন্ধে
কিছু বলা তো দূরের কথা, আজ পর্যন্ত ক্ষমতায় যাওয়ার ডাক-ই দেয়নি।
এঁরা নানারকম কর্মসূচি দিয়ে থাকে, সেগুলো অবশ্যই জনগণের পক্ষে।
যেমন, গত কয়েকবছরে তেল-গ্যাস-কয়লা-বিদু্যৎ-বন্দর রক্ষার জন্য যেসব
আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে তার সবগুলোই সংগঠিত হয়েছে বাম দলগুলোর
নেতৃত্বে। বড় দলগুলো যখন এই সমস্তকিছু বিদেশীদের হাতে তুলে
দেওয়াটাকে নিজেদের পবিত্র কর্তব্য বলে মনে করছিলো, তখন বামদলগুলোই
কেবল দেশ ও জাতির সম্পদ রক্ষার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। জনগণ এসব
আন্দোলনে বিপুলভাবে সাড়াও দিয়েছে। কিন্তু এ-ও সত্য- জনগণ ভাবে, এই
দলগুলো বোধহয় তাদের কর্মকাণ্ড এই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রাখবে, ক্ষমতায়
তারা যেতেই চায় না। অন্যদিকে ছোটখাটো কারণে দল ভেঙে যাওয়া প্রায়
নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার। এসব ভাঙনের পেছনে নাকি আদর্শিক কারণ থাকে,
কিন্তু কী কারণে দলটি ভাঙলো সে সম্বন্ধে কোনো ব্যাখ্যা জনগণের কাছে
দেবার প্রয়োজনও তারা অনুভব করে না। খুঁজলে হয়তো দেখা যাবে- অতি
তুচ্ছ কারণে দলের ভাঙন ঘটেছে। বড় কোনো লক্ষ্য থাকলে, বিপ্লব সংঘটিত
করার আকাঙ্খা থাকলে, রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন থাকলে, সর্বোপরি
দেশে একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের প্রতিজ্ঞা থাকলে এসব তুচ্ছ
কারণ এড়িয়ে যাওয়া যেত! আবার একমাত্র নিজেদেরকে বামপন্থী দল হিসেবে
দাবি করে অন্যান্য বামপন্থী-দাবিদার দলগুলোর বিরুদ্ধে বিষোদগারও
তাদের এক প্রিয় অভ্যাস। ধারণা করি- বাম দলগুলো যেন জেনে ফেলেছে যে,
তাদের পক্ষে কোনোদিনই বিপ্লব সংগঠিত করা সম্ভব নয়, এমনকি সম্ভব নয়
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়াও; আর তাই তারা এসব
ছোটখাটো কারণ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আমার ধারণা, সব বামদল মিলে একটি
দলে পরিণত হওয়া অসম্ভব হলেও, নূন্যতম কর্মসূচির ভিত্তিতে একত্রিত
হয়ে একটি মোর্চা গঠন করে তারা যদি তাদের কর্মসূচিগুলো জনগণের সামনে
হাজির করে, কিংবা ক্ষমতায় যাওয়ার ডাক দেয়, তাহলে বিরাট একটি সাড়া
পাওয়া তাদের জন্য অসম্ভব নয়। তাদের সততা, ত্যাগ, প্রতিজ্ঞা,
মানুষের প্রতি ভালোবাসা, নীতি, আদর্শ ইত্যাদি নিয়ে জনগণের মনে কোনো
প্রশ্ন নেই। কিন্তু এই কাজটি করাই তো তাদের জন্য এক অসম্ভব
ব্যাপার!
৬.
এ প্রসঙ্গে জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামিক দলগুলোর কথাও বলা যেতে
পারে। এদেশের সুবিধাবাদী মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো তো বটেই এমনকি
শিক্ষিত-প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা পর্যন্ত বলে থাকেন যে, আমাদের জনগণ
'ধর্মপ্রাণ' কিংবা 'ধর্মভীরু' কিন্তু 'ধর্মান্ধ' নয়। আবার ইসলামী
দলগুলোর দর্শন ও কর্মসূচি দুটোই ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের
লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। তারা ক্ষমতায় যাওয়ার কথা বলে, ক্ষমতায় গেলে
ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করার কথাও পরিস্কারভাবেই
বলে। তাহলে ধর্মের ধ্বজাধারী এই দলগুলোর কোনো জনভিত্তি নেই কেন?
'ধর্মভিরু-ধর্মপ্রাণ' জনগণ তাদের গ্রহণ করে না কেন? কোনো দলের
কাঁধে সওয়ার না হয়ে এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে জামায়াতের মতো
সুসংগঠিত দলও কেন চরমভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়? কারণটিকে জটিল বলে মনে
হতে পারে। কিন্তু একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখলে এর একটি সহজ উত্তরও
মেলে। আমাদের জনগণ সম্বন্ধে যা বলা হয় প্রকৃতপক্ষে তার কোনোটিরই
বাস্তব ভিত্তি নেই। ধর্মান্ধ তো নয়ই, এমন কি তারা ধর্মপ্রাণ বা
ধর্মভীরুও নয়। এদেশের মানুষ বড়জোর বিশ্বাস করে যে, একজন
আল্লাহ/ঈশ্বর আছেন, বিপদে পড়লে তাঁকে ডাকাডাকিও করে, কিংবা বিভিন্ন
সামাজিক কর্মকাণ্ডে- যেমন জন্ম, মৃতু্য, বিয়ে ইত্যাদি- ধর্মীয় রীতি
মেনে চলে, অথবা ঈদ-শবেবরাত-পুজা ইত্যাদি পালন করে কিন্তু তাদের
দৈনন্দিন জীবনাচরণে ধর্মের স্থান সামান্যই। এদেশের প্রায় ৮০ ভাগ
শ্রমজীবী মানুষ ধর্মকর্মের ধারে-কাছেও যায় না, এ নিয়ে তাদের কোনো
মাথাব্যথাও আছে বলে মনে হয় না। ধর্মকে ভয় পেলে বা ধর্ম-অন্ত-প্রাণ
হলে তো এমনটি হবার কথা নয়! আর তাই ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি এদেশের মানুষ
একেবারেই পছন্দ করে না। মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তাই
এদেশে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা প্রায় শূন্যের
কোঠায়। তাছাড়া, মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ন্যাক্কারজনক ভূমিকা এই
দলটির গ্রহণযোগ্য হবার ব্যাপারে একটা হিমালয়সম বাধা হিসেবে কাজ
করে। এখানটায় এসে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতার প্রসঙ্গ আবার আলোচনায় আসতে
পারে। বাংলাদেশের প্রায় পঁচাত্তর ভাগ মানুষ মোটাদাগে আওয়ামী-বিএনপি
ভাগে বিভক্ত বলে প্রগতিশীল রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বুদ্ধিজীবীরা
বিশ্বাস করেন এবং বলে থাকেন যে, আওয়ামী লীগ হলো অসামপ্রদায়িক,
প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি আর বিএনপি এর উল্টোটা।
সেক্ষেত্রে বিএনপির নেতাকর্মীসমর্থক সবাই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ
শক্তি! এই কথা বলার মাধ্যমে যে দেশের অন্তত অর্ধেক জনগোষ্ঠিকে
মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে- এই অতি
উৎসাহী বুদ্ধিজীবীরা সেটা ভুলে যান। বস্তুতপক্ষে বিএনপির আদর্শ ও
কর্মসূচিকে যারা সমর্থন করেন, তাদের অধিকাংশই মুক্তিযুদ্ধের প্রতি
শ্রদ্ধাশীল। বিএনপির 'ইসলামী মূল্যবোধে আস্থা' আর জামায়াত বা এই
ধরনের দলগুলোর ধর্ম-রাজনীতি এক জিনিস নয়। 'ধর্মনিরপেক্ষতার'
বিপরীতে দলটি এই শব্দগুলো ব্যবহার করেছে বটে কিন্তু এর প্রতিষ্ঠাতা
বা অধিকাংশ নেতাকর্মী কখনো সামপ্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেননি।
তাছাড়া এই দলের নেতাকর্মীদের এক বিরাট অংশ সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে
অংশগ্রহণ করেছেন। অতএব ঢালাওভাবে তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের-বিপক্ষ
শক্তি বলাটা সমীচীন হবে না। 'ইসলামী মূল্যবোধের' কথা বললেও এবং
মাঝে মাঝে 'আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে এদেশের মসজিদে আজানের বদলে
উলুধ্বনি শোনা যাবে' এই ধরনের ন্যাক্কারজনক সামপ্রদায়িক বক্তব্য
বিএনপি-নেত্রীর কণ্ঠে শোনা গেলেও জনগণের কাছে তারা নিজেদেরকে
খানিকটা মধ্যপন্থী দল হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। সেজন্যই
তাদের গ্রহণযোগ্যতা আছে, ইসলামী দলগুলোর নেই।
৭.
বিএনপির মতো জাতীয় পার্টির জন্মও হয়েছিলো সামরিক শাসকের পকেট থেকে।
কিন্তু এ দুটো দলের মধ্যে পার্থক্য হলো- শুরু থেকেই বিএনপির একটি
নতুন ধরনের দর্শন ও কর্মসূচি ছিলো, জাতীয় পার্টির তা ছিলো না।
তাদের দর্শন মূলত বিএনপির দর্শনেরই হুবহু নকল (যাকে বলে ট্রু
কপি')। জিয়ার ১৯ দফা কর্মসূচির আদলে এরশাদও ১৮ দফা কর্মসূচি
দিয়েছিলেন, সেটাও ওই ১৯ দফার প্রায় নকল। জনগণ এই দর্শন-কর্মসূচির
মধ্যে নতুন কিছু খুঁজে পায়নি। এরশাদ তাঁর পুরোটা শাসনকাল জুড়েই
জিয়াকে অনুকরণ করে গেছেন, কিন্তু জনগণের কাছে জিয়ার মতো
গ্রহণযোগ্যতা পাননি। এর কারণ বহুবিধ। জিয়ার ব্যক্তিগত সততা ছিলো
প্রশ্নাতীত এবং প্রবাদতুল্য, আর এরশাদের সততা নিয়ে সবসময়ই প্রশ্ন
ছিলো। নারীঘটিত কেলেংকারির সঙ্গে জিয়ার নাম উচ্চারিত হয়নি একবারও,
আর এরশাদের নারী-কেলেংকারি নিয়ে শত শত পর্ণো-উপন্যাস লেখা যায়!
জিয়ার নামের সঙ্গে দুর্নীতি শব্দটি যুক্ত হয়নি কখনো, আর এরশাদ হয়ে
উঠেছিলেন দুর্নীতির সমার্থক শব্দ। তাছাড়া এরশাদই এদেশে দুর্নীতিকে
প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন, জাতির নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেবার ব্যাপারে
সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন, প্রজাতন্ত্রের সৎ ও নিষ্ঠাবান
কর্মচারি-কর্মকর্তাদের জন্য নানারকম বিপত্তি সৃষ্টি করেন, এবং এমন
একটি ধারণার জন্ম দেন যে, দুর্নীতি করা তেমন একটা খারাপ জিনিস নয়,
টিকে থাকতে হলে দুর্নীতি করতে হয়! সামপ্রতিককালে রাষ্ট্রীয়
পৃষ্টপোষকতায় দুর্নীতির যে মহোৎসবের খবর এখন পত্রিকার পাতায় পাতায়
শোভা পাচ্ছে তার শুরুটা হয়েছিলো এরশাদের হাত ধরেই। রাষ্ট্রের
সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করার এমন ঘটনা এরশাদের
আগে আর কেউ ঘটাননি। দরিদ্র দেশগুলোতে দুর্নীতি হয়তো থাকে;
বাংলাদেশেও এরশাদের আগে থেকেই তা ছিলো, কিন্তু সেগুলো হতো
স্বল্পমাত্রায়, আড়ালে-আবডালে। দুর্নীতিবাজরা নিজেদেরকে অপরাধী মনে
করতো, অন্তত এতটুকু মূল্যবোধ সমাজে ছিলো। এরশাদ অত্যন্ত কৃতিত্বের
সঙ্গে সেই মূল্যবোধ ও নৈতিকতাবোধের গোড়া কেটে দিতে সক্ষম হন।
বাংলাদেশ যেহেতু নেতাকেন্দ্রিক দেশ, নেতাকে ঘিরেই আবর্তিত হয় দলীয়
ও জাতীয় রাজনীতি, জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতার এই দুর্নীতি, নারী
কেলেংকারী, শঠতা ইত্যাদি দলটিকে কখনো জনগণের কাছে পেঁৗছতে দেয়নি।
তাছাড়া তাদের দর্শন ও কর্মসূচির মধ্যে এমন কোনো নতুন বিষয় ছিলো না
যে, জনগণ বিএনপির বিকল্প হিসেবে তাদেরকে গ্রহণ করবে। ক্ষমতাচু্যত
হওয়ার পর দলটির জন্য তাই বিপর্যয় নেমে আসে। 'গণশত্রু' আখ্যা পাওয়া
এই দলের নেতাদের অন্য কোনো দলে স্থান দেয়া যাবে না- ছাত্রদের এই
দাবির মুখে তিন জোটভূক্ত দলগুলোতে পতিত নেতারা স্থান পাননি বলে
তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় পার্টির ভেতরকার অবস্থা বোঝা যায়নি। কিন্তু
মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই দলটি বহু ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এর নেতারা-
যারা একসময় এরশাদের পদতলে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়ে সুখী হতেন-
অন্যান্য দলে যোগ দেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ইতিহাসেও বিপর্যয় নেমে
এসেছিলো এবং দুই ক্ষেত্রেই এর শীর্ষনেতারা নিহত হয়েছিলেন। কিন্তু
জাতীয় পার্টির শীর্ষনেতা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তার দলে যে বিপর্যয়
নেমে এসেছে তাতে করেই এই দলের দার্শনিক ও কর্মসূচির সীমাদ্ধতা
প্রমাণিত হয়। দলটি অবশেষে তাদের দর্শন ও কর্মসূচির অভাবে একটি
আঞ্চলিক দলে পরিণত হয়েছে।
৮.
যে প্রসঙ্গ দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম, এখানটায় এসে তার
পুনরোল্লেখ করা দরকার। বাংলাদেশে দল ভাঙার সংস্কৃতি নতুন নয়।
কিন্তু কেন যে ভাঙে, দলত্যাগি নেতারা যে নতুন দলের জন্ম দেন তার
আদর্শ ও কর্মসূচি যে কী, তা কখনোই পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় না। ফলে,
মনে হয়- এই ভাঙনের পেছনে কোনো আদর্শিক কারণ কাজ করেনি, করেছে
নেতৃত্বের সংঘাত ও ক্ষমতার লোভ। কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যায়:
স্বাধীনতার আগেই আওয়ামী লীগ ভেঙে গিয়েছিলো। মার্কিন
সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ভূমিকা নেয়ার প্রশ্নে দলীয় অবস্থান বা
কর্মসূচি কী হবে মূলত এরকম একটি আদর্শিক বির্তক থেকেই এই ভাঙনের
উৎপত্তি। মাওলানা ভাসানী ছিলেন আপাদমস্তক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী
নেতা, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি তাঁর এই অবস্থান থেকে বিচু্যত
হননি। অন্যদিকে সোহরোয়ার্দি ছিলেন মার্কিনীদের কাছে আত্না ও
মস্তিস্ক বিকিয়ে দেয়া, ক্ষমতালোভী নেতা (প্রিয় পাঠক, মনে করে
দেখুন- অল্প সময়ের জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েই তিনি ঘোষণা
দিয়েছিলেন: পূর্ব পাকিস্তানকে ৯৮ ভাগ স্বায়ত্ত্বশাসন দেয়া হয়েছে!),
ফলে ওই প্রশ্নে তাদের একমত হওয়া সম্ভব ছিলো না। মাওলানা ভাসানী তাই
আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গিয়ে 'ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি' নামে
বামঘেঁসা নতুন দল গঠন করেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর এই আওয়ামী লীগই
বহুবার ভেঙেছে এবং কোনোবারই এর কারণ বোঝা যায়নি। বঙ্গবন্ধু নিহত
হবার পর থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত মিজানুর রহমান চৌধুরী, আবদুর
রাজ্জাক, কামাল হোসেন, কাদের সিদ্দিকী প্রমুখ নেতা আওয়ামী লীগ থেকে
বেরিয়ে গিয়ে নতুন দল গড়েছেন। কিন্তু তাদের নতুন কোনো আদর্শ বা
কর্মসূচি আছে কী না তা বোঝা যায়নি। মিজানুর রহমান চৌধুরী বা আবদুর
রাজ্জাক কেন দল ভেঙেছিলেন সেটা বোঝা কঠিন, অনেকে এর পেছনে সামরিক
সরকারের ইন্ধন ছিলো বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু কামাল হোসেন এবং কাদের
সিদ্দিকী যে স্রেফ শেখ হাসিনার সঙ্গে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব থেকেই
আওয়ামী লীগ থেকে সরে এসেছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মিজান
চৌধুরীর আওয়ামী লীগ বা আবদুর রাজ্জাকের বাকশাল বিলুপ্ত হয়ে গেছে,
কিন্তু কামাল হোসেনের গণফোরাম বা কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা
লীগ দলদুটোর অস্তিত্ব যেহেতু এখনো আছে, কৌতূহলী পাঠকরা ইচ্ছে করলে
এদের গঠনতন্ত্র-ঘোষণাপত্র ইত্যাদি পড়ে দেখতে পারেন এবং খুঁজে দেখতে
পারেন যে,তাদের এই দল গঠনের পেছনে এমন কোনো দার্শনিক-আদর্শিক কারণ
কাজ করেছে কী না! একই ব্যাপার ঘটেছে বিএনপির বেলায়ও। দলটি যে
কতোবার ভেঙেছে তার হিসেব আমার জানা নেই। এরশাদ ক্ষমতায় আসার পরপরই
শাসুল হুদা চৌধুরী, ডাঃ আবদুল মতিন প্রমুখের নেতৃত্বে দল ভেঙে
যায়। এই অংশটির পুরোটাই পরে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেয়। শওকত হোসেন
নীলুর নেতৃত্বে একবার, ওবায়দুর রহমানের নেতৃত্বে আরেকবার বিএনপি
ভেঙেছিলো। সামপ্রতিককালে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে একবার, অলি
আহমদের নেতৃত্বে আরেকবার বিএনপিতে ভাঙন ঘটেছে। কিন্তু এই নতুন
দলগুলোও কোনো নতুন নীতি-আদর্শ-কর্মসূচির কথা জনগণকে জানাতে পারেনি।
জাসদও বহুবার ভেঙেছে। জাসদ (রব), জাসদ (ইনু), বাসদ ইত্যাদি সবই মূল
জাসদের অংশ। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভেঙেছে বামপন্থী দলগুলো, কিন্তু কী
কারণে যে এই দলগুলো ভেঙেছে, কিংবা ভাঙার ফলে কোন লক্ষ্যটা অর্জিত
হয়েছে, সেসব সম্বন্ধে কিছুই জানতে পারেনি মানুষ।
৯.
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শ ও কর্মসূচিতে
মতভিন্নতা ছিলো, আছে এবং থাকবে। না থাকলে তো আর অনেকগুলো দলের
জন্মই হতো না, একটি দলই রাষ্ট্র পরিচালনার একচ্ছত্র অধিকার পেতো!
কিন্তু এই মতভিন্নতা, মতবিরোধ ইত্যাদি থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ দেশেই
রাষ্ট্রের দর্শন-আদর্শ-মূলনীতি সম্বন্ধে এক ধরনের জাতীয় ঐকমত্য
আছে, এবং রাজনৈতিক দলগুলো এইসব আদর্শ নিয়ে অহেতুক বিতর্ক তৈরি করে
না। বাংলাদেশে সেই ধরনের কোনো জাতীয় ঐকমত্য তৈরি হয়নি, এবং না
হওয়ার পেছনে দলগুলোর দায়দায়িত্বই সবচেয়ে বেশি। তারা নিজেদের দলের
আদর্শ রাষ্ট্রের কাঁধে চাপিয়ে দিতে চেয়েছে, কিন্তু একবারও জানার
চেষ্টা করেনি যে, এই রাষ্ট্রের বাসিন্দারা এই আদর্শ আদৌ মান্য
করবে কী না! স্বাধীনতার পর যেসব আদর্শকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে
ঘোষণা করা হয়েছিলো সেগুলোর কোনো বিশেষ দলের আদর্শ ছিলো না, বরং
মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে উঠে আসা ওই আদর্শে ছিলো জাতির
আশা-আকাঙ্খা-স্বপ্ন-প্রত্যাশার প্রতিফলন, যে জাতি এক বিপুল
ত্যাগ-তীতিক্ষার মাধ্যমে, রক্তপাত ও জীবনদানের বিনিময়ে এই
স্বাধীনতা অর্জন করে নিয়েছিলো। যেহেতু মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টিই ঘটেছিলো
একটি জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এবং সেটিতে কতিপয় জাতিদ্রোহী
গোলাম-নিজামী ছাড়া সবাই স্বতস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিলো, তাই ওই
আদর্শগুলো নিয়ে কারো কোনো দ্বিমত ছিলো না। কিন্তু পরবর্তীকালে
এগুলোকে রাষ্ট্রীয় উৎসাহেই বিতর্কিত করে তোলা হয়েছে। ফলে এখন এক দল
বাংলাদেশী তো আরেক দল বাঙালি, একদল রাষ্টীয় কর্মকাণ্ডে ইসলাম
ধর্মের একাধিপত্যে বিশ্বাসী তো আরেকদল ধর্ম নিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী।
এই ধরনের জটিলতা আর কোনো দেশে আছে কীনা সন্দেহ। স্বাধীনতার ৩৫ বছর
পরও এসব নিয়ে আমাদেরকে কথা বলতে হচ্ছে, যদিও অনেক আগেই এগুলোর
মীমাংসা হয়ে যাওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু হয়নি বলে যে কোনোদিন হবে না
তা তো আর নয়, আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এই দাবি জানাতে পারি-
তাদের দলীয় আদর্শ যা-ই হোক না কেন, রাষ্ট্রীয় আদর্শগুলোর বিষয়ে সব
দল একমত হয়েই একটি সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, এবং আগামী
সংসদে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এর প্রতিফলন ঘটাবেন। তবে একটি কথা
না বললেই নয়- এই আদর্শগুলো অতি অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে সামনে
রেখে নির্ধারণ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধই আমাদের বাতিঘর, একমাত্র এই
একটি বিষয়ই জাতিকে যে কোনো সময় যে কোনো পরিস্থিতিতে এক সুতোয় গেঁথে
দিতে পারে।
এ তো গেলো রাষ্ট্রীয় আদর্শের বিষয়, দলীয় আদর্শ? সেটিও যে যার মতো
করে ঠিক করে নেবে। গণতান্ত্রিক সমাজে এ বিষয়ে কারো কিছু বলার নেই।
কারণ এসব দলীয় আদর্শ গ্রহণ করবার বাধ্যবাধকতা যেমন নেই, তেমনই
প্রত্যাখ্যান করার অধিকারও সবার আছে। পছন্দ না হলে প্রত্যাখান
করলেই চলবে। কিন্তু কর্মসূচিগুলো কিভাবে নির্ধারিত হবে? গত কয়েক
বছরে দলগুলোর মধ্যে যে কর্মসূচি বিষয়ক অনীহা দেখা গেছে, তাতে মনে
হচ্ছে- সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও যে আদর্শ ও কর্মসূচির
পরিবর্তন-পরিমার্জন করে নিতে হয় এ কথা যেন তারা ভুলেই গেছে। আর এই
কর্মসূচির মূলে আছে দেশের অর্থনেতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য একটি
সুনির্দিষ্ট আদর্শ ও পরিকল্পনা ঘোষণা। বাংলাদেশের বড় দুটো দল তাদের
অর্থনৈতিক আদর্শ হিসেবে মুক্তবাজার অর্থনীতির আদর্শকে গ্রহণ করেছে
অনেক আগেই, কিন্তু এই আদর্শ আমাদের দেশের জন্য যে কল্যাণকর হয়নি
একথা এখন সবাই স্বীকার করেন। যে দেশের ৭০ ভাগ মানুষ দরিদ্র,
বাদবাকিদের অনেকেরই নুন আনতে পান্তা ফুরায় দশা, সেই দেশের বাজারকে
উন্মুক্ত করে দেয়ার চিন্তা করাটা শুধুমাত্র উন্মাদের পক্ষেই সম্ভব।
এই উদ্ভট ও অসম্ভব একটি আদর্শকে গ্রহণ করে যে তারা ভালো করেননি,
সেটি বেশ পরিষ্কারভাবেই বোঝা গেছে যখন বিগত সরকারের পক্ষ থেকে বলা
হয়েছে_ মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে থাকে
না! এই ডাহা মিথ্যে কথাটিও তাদের বলতে হয়েছে নিজেদের রক্ষা করার
জন্য, কিন্তু সরকার নিজেই যখন এরকম একটি অসহায় অবস্থাকে মূর্ত করে
তোলে তখন বাজার-নিয়ন্ত্রনকারী ব্যবসায়ী-লুটেরা-ফড়িয়ারা এই সুযোগ
পুরোমাত্রায় গ্রহণ করে এবং এভাবেই তথাকথিক সিন্ডিকেটের জন্ম হয়!
যাহোক, বুর্জোয়া দলগুলোর যে সীমাবদ্ধতা থাকে সেসব কারণেই বর্তমান
বিশ্বব্যবস্থায় এই দলগুলোর পক্ষে পুরোপুরিভাবে মুক্তবাজার
অর্থনীতির বিরুদ্ধে যাওয়া সম্ভব নয়। (রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে পারলে
বামদলগুলোর পক্ষে সেটি সম্ভব হলেও হতে পারে, কারণ আদর্শিকভাবেই
তারা মুক্তবাজার অর্থনীতির বিরুদ্ধে।)। সম্ভব না হলেও, এর বিশাল
থাবা ও গ্রাসকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখার কোনো বিকল্প নেই। সেজন্য
প্রয়োজন একটি কল্যাণমুখী অর্থনীতির আদর্শ ঘোষণা করা এবং সেই ঘোষণা
বাস্তবায়নের চেষ্টা করা। জনগণের মৌলিক অধিকার বলে স্বীকৃত যেসব
বিষয় আছে সেগুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব শুধুমাত্র সরকারী প্রচেষ্টায়ই।
বাংলাদেশের এক বিপুল জনগোষ্ঠি গৃহহীন-ভূমিহীন-উদ্বাস্তু। নদীভাঙন
বা এই ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বা মনুষ্যসৃষ্ট কোনো
দুর্যোগের শিকার হয়ে এই মানুষগুলো ভিটেমাটি হারিয়ে শহরে এসে ভীড়
জমায়। এতে করে শহরের ওপর যেমন চাপ পড়ে, তেমনি তাদের জীবনের নেমে
আসে অকল্পনীয় বিপর্যয়। স্বাধীনতার পর থেকে এই ধরনের মানুষের সংখ্যা
ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, অথচ কোনো সরকারই সমস্যাটির দিকে দৃষ্টিপাত
করেনি- যদিও এর সমাধান করা অসম্ভব কিছু নয়। বাংলাদেশের যে বিপুল
পরিমান খাসজমি আছে, যা বিভিন্ন তথাকথিত প্রভাবশালীদের দখলে রয়ে
যাচ্ছে বছরের পর বছর, সেগুলো উদ্ধার করে যদি এর চারভাগের একভাগও
গৃহহীন-ভূমিহীনদের মধ্যে বন্টন করা যায় তাহলে বাংলাদেশে কোনো
উদ্বাস্তুই থাকবে না। তবে ভূমিহীনদের নাম করে সেগুলো যেন আবার
টাউট-বাটপারদের দখলে চলে না যায়, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্বও
সরকারেরই! প্রয়োজন হলে সরকার নিজ উদ্যোগে বন্টনকৃত ওইসব জায়গায় ঘর
তুলে দিয়ে ভূমিহীনদের দখল বুঝিয়ে দেবে। এতে করে সরকারের যে অর্থ
ব্যয় হবে তা এই বিপুল মানবিক সমস্যা সমাধানের তুলনায় অতিশয় নগন্য।
এই কাজটি করা কি অসম্ভব? ওই প্রভাবশালীরা কি সরকারের চেয়েও
প্রভাবশালী? আসলে কোনো সরকারই ভূমি সংস্কারের কথা ভাবেনি, ভাবলে
সম্ভব হতো। কিন্তু এরপরই প্রশ্ন আসবে, শুধু ঘর তুলে দিলেই চলবে?
তারা খাবে কি? তাদের কর্মসংস্থানেরই বা কি ব্যবস্থা হবে? এই
সমস্যাটিরও সমাধান অসম্ভব নয়। ওই খাসজমিগুলোর মধ্যে যেগুলো
আবাদযোগ্য সেগুলো ভূমিহীনদেরকে চাষ করার জন্য শর্তসাপেক্ষে লিজ
দেয়া যেতে পারে, এবং এই ক্ষেত্রে সরকারের কৃষিবিভাগ সক্রিয়ভাবে
অংশগ্রহণ করতে পারে। তারা সর্বপ্রকার সহায়তা প্রদানের বিনিময়ে
(যেমন বীজ-সার-সেচ ইত্যাদি) ফসলের অর্ধেকটা সরকারী গুদামে জমা
করবে। অনেকটা সরকার ও ভূমিহীনদের মধ্যে আধাআধি বর্গা ব্যবস্থার মতো
ব্যাপার। এবং যেহেতু সরকার একটি সমস্যার সমাধান করতে চাচ্ছে সেজন্য
তাকেই উদ্যোগ নিতে হবে, এবং যাবতীয় সহায়তা প্রদান করতে হবে। এতে
করে সরকারী গুদামেও বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য জমা হবে, যার ফলে
সরকারের শস্যক্রয়-কর্মসূচির অর্থব্যয় কমে যাবে। আর যেসব খাসজমি
আবাদযোগ্য নয় সেগুলোতে সরকারী উদ্যোগে শিল্প কল-কারখানা গড়ে তোলা
যেতে পারে অথবা দেশীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে শর্তসাপেক্ষে লিজ দেয়া
যেতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে শর্ত থাকবে যে, লিজকৃত জমিতে শিল্প
কল-কারখানা গড়ে তুলতে হবে, এর অন্যথা করা যাবে না এবং সেসব
কলকারখানায় কর্মস্থানের ক্ষেত্রে ভূমিহীনরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
পাবে। মাথা গোঁজার ঠাঁই আর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হলে এই লোকগুলো
নিশ্চয়ই 'ভাত দাও' বলে সরকারের কাছে ভিক্ষা চাইবে না। এখনও চায় না,
তখন তো চাইবেই না। নিজেদের খাদ্য তারা নিজেরাই কিনে নেবে, নিজেদের
কাপড়চোপরের ব্যবস্থাও নিজেরাই করবে। এমনকি সরকারী ব্যবস্থাপনায়
শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য ইতিমধ্যেই যে অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে তাকে
কার্যকরী ও সচল করা গেলে দেশের অত্যন্ত ৭৫ ভাগ মানুষ- যারা সরকারী
প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণে ইচ্ছুক- এর সুবিধা লাভ করতে
পারবে।
বলাবাহুল্য, কথাগুলো যত সহজে বলা হলো, সেটি বাস্তবে পরিণত করা
এরচেয়ে হাজার গুন কঠিন। এটি একদিনের কাজও নয়। তবে উদ্যোগ নিলে
অন্তত একযুগের মধ্যে নিশ্চয়ই এইসব মৌলিক সমস্যা সমাধান করে বিপুল
মানবিক বিপর্যয় থেকে জাতিকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের প্রথম
জাতীয় অধ্যাপক- অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক তাঁর 'বাংলাদেশ জাতির
অবস্থা' বক্তৃতায় সেই ১৯৮০ সালে বাংলাদেশের দুটো জিনিসকে
গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন এবং সেগুলোর যথাযথ
ব্যবহারের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন।
এগুলো হলো- জনগণ এবং পানিসম্পদ। জনসংখ্যাকে তিনি জনসম্পদে রূপান্তর
করার কথা বলেছিলেন। এ পর্যন্ত আমরা তা করে উঠতে পারিনি, বরং
ক্রমাগত প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দিয়ে, মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য
করে তাদেরকে জাতির বোঝা হিসেবে চিহ্নিত করেছি।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে যেন আমরা এমন একটি দেশ দেখতে পারি
যেখানে জনগণ আর বোঝা হিসেবে গণ্য হবে না, বরং পরিণত হবে সম্পদে,
যাপন করবে একটি সম্মানজনক জীবন; রাষ্ট্র যেখানে নিপীড়কের ভূমিকা
পালন করবে না, বরং পাশে এসে দাঁড়াবে বন্ধুর মতো; প্রভুদের হাতে দেশ
ও জাতিকে ছেড়ে না দিয়ে রাষ্ট্র নিজেই হয়ে উঠবে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং
কল্যাণকামী- রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এই লক্ষ্যে কাজ শুরু করার জন্য
আমরা নিশ্চয়ই এসব দাবি জানাতে পারি!
ইমেইল : mkamal@secs.iub.edu.bd |
| |
 |
|