Page loading ... Please wait.

ষাট দশক : আমাদের পথিকৃৎ গল্পকারদের সামান্য মূল্যায়ন
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
প্রাককথন

ষাটের দশক বাংলাদেশের সাহিত্যে উপহার দিয়েছিলো এক ঝাঁক উজ্জ্বল সাহিত্য কমর্ী _ কী কথাসাহিত্যে, কী কবিতায়, কী প্রবন্ধ বা সমালোচনায় _ এক সঙ্গে এতো অধিক সংখ্যক শক্তিশালী লেখকের আগমন আর কোনো সময় ঘটেনি। এঁদের আগমনের সময়টি ছিলো অস্থিরতার, কিন্তু ক্ষেত্র তৈরী হচ্ছিলো স্থির লক্ষ্য তৈরী করার। কী আমাদের পরিচয় _ এই প্রশ্ন প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছিলো তখন। ততোদিনে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রতত্ত্বের মোহ কেটে গেছে, ক্রমশ উন্মোচিত হচ্ছে পাকিস্তানিদের প্রকৃত স্বরূপ, বাঙালি দাঁড়িয়ে আছে তার আত্নপরিচয়ের প্রশ্ন সামনে নিয়ে, ভাবতে শুরু করেছে স্বাধিকারের কথাও। একদিকে সামরিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সমস্ত মানবতা অন্যদিকে চলছে আন্দোলন-সংগ্রাম-প্রতিরোধ। একদিকে জাতীয়তাবোধ ও স্বাতন্ত্র্যবোধ নির্মাণের প্রবল প্রচুর প্রক্রিয়া, অন্যদিকে বাঙালির বিরুদ্ধে অব্যাহত ষড়যন্ত্র। এই অর্থে সময়টি নানাদিক থেকে সংকট ও নির্মাণেরও বটে। সাহিত্যের ভূমিটি তখনো ছিলো কিছুটা নরম-কর্দমাক্ত। বীজক্ষেত্র কিভাবে নির্মিত হবে সেটি নির্ভর করছিলো লেখকদের ওপরই। এই দ্বন্দ্ব ও সংকটমুখর সময়ে ষাটের সাহিত্যকর্মীরা নিয়ে এসেছিলেন প্রথা ভাঙার অঙ্গীকার, নতুন কিছু নির্মাণের আন্তরিক-উদ্দাম-উচ্ছ্বল প্রচেষ্টা। এর জন্য যে দীপ্ত-উজ্জ্বল তরুণ গোষ্ঠী প্রয়োজন, ষাটের তা ছিলোও। একটু আগে-পরে বাংলাদেশের গল্পের কয়েকজন দিকপাল _ হাসান আজিজুল হক, মাহমুদুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, জ্যেতিপ্রকাশ দত্ত ও আব্দুল মান্নান সৈয়দ _ এলেন এই সময়েই। এঁরা সবাই অসামান্য প্রতিভাধর, জাতশিল্পী। শুধু এঁরা নন, ষাটের লেখকদের তালিকায় আরও কয়েকজনের নাম শ্রদ্ধা পেতে পারে _ রাহাত খান, পুরবী বসু, কায়েস আহমেদ, বিপ্রদাশ বড়ুয়া, আহমদ ছফা, সুব্রত বড়ুয়া, রশীদ হায়দার, সেলিনা হোসেন, সাযযাদ কাদির, শহীদুর রহমান প্রমূখ। এঁদের হাত ধরেই বাংলাদেশের গল্প প্রথমবারের মতো দৃষ্টিগ্রাহ্য বাঁক পরিবর্তন করে। এই সময়ের সাহিত্যশিল্পীদের মধ্যে একে অপরের সঙ্গে মিল সামান্যই, বস্তুত এজন্যই ষাটের দশক নির্মাণ করতে পেরেছে বহুমাত্রিক সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রভূমি। এ সময়ের কয়েকজন গল্পকারের কথা-ই ধরা যাক। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আর আব্দুল মান্নান সৈয়দ একই সময়ের গল্পকার _ ব্যক্তিজীবনে তাঁদের বন্ধুত্বও ছিলো _ কিন্তু গল্পভাবনা, গল্পের বিষয়, ভাষা ও প্রকরণে তাঁদের মধ্যে রয়েছে কয়েকযোজন দূরত্ব। কিংবা রাহাত খান বা জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের মধ্যেও দূরত্ব একই রকম। হাসান আজিজুল হক এবং সেলিনা হোসেনের গল্পের বিষয়বস্তু কাছাকাছি _ প্রধানত নিম্নবিত্তের পোড় খাওয়া মানুষের জীবনযাপন _ হলেও নির্মাণ কৌশলে তাঁরা আলাদা। মাহমুদুল হক আবার এঁদের সবার থেকে আলাদা। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় _ মাহমুদুল হক এই সময়ের [এবং তাঁর পরবর্তীকালের] লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী, উজ্জ্বল ও অনন্য কথাশিল্পী। তাঁর সাফল্য উপন্যাসের পথ ধরে এলেও এবং তাঁর গল্পের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও _ ওই স্বল্পসংখ্যক গল্পেই তিনি রেখেছেন তাঁর শক্তিশালী লেখনির স্বাক্ষর। তিনি যে এক অনন্য প্রতিভাধর গল্পশিল্পী, সেটি তাঁর কয়েকটি মাত্র গল্প পাঠেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এই রচনায় আমি চেষ্টা করবো তাঁদের একটি সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন হাজির করতে। একটি কথা বলে নেয়া ভালো _ এঁদের প্রায় সবাইকে নিয়েই পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ রচনা করা সম্ভব, একটি মাত্র প্রবন্ধে সবাইকে মূল্যায়ন করতে গেলে তা কোনোভাবেই সম্পূর্ণতা পাবে না, এবং সেজন্যই এই লেখাটিকে একটি অসম্পূর্ণ মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচনা করার জন্য পাঠকদেরকে অনুরোধ করছি।

১.
লেখালেখির প্রাথমিক পর্বে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প অন্তর্মুখী আত্নকথনে ভরপুর, আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর এই প্রবণতাকে মর্বিডিটি বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু, আমরা দেখি, প্রায় এক যুগের এক রহস্যময় বিরতির পর সত্তরের মাঝামাঝিতে যখন আবার লেখালেখিতে ফিরলেন ইলিয়াস, ততোদিনে নিজেকে আমূল বদলে ফেলেছেন তিনি। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থভুক্ত গল্পগুলোর মধ্যে নিরুদ্দেশ যাত্রা ছাড়া আর কোনোটিতেই প্রাথমিক পর্বের নিদর্শন নেই, সেটি প্রথম গল্পগ্রন্থ অন্য ঘরে অন্য স্বর -এ সংকলিত, আর ওই একই গ্রন্থের দ্বিতীয় গল্প উৎসব-ই তাঁর বদলে যাওয়ার পরিচয় বহন করছে। পরবর্তীকালে তিনি সমাজ-বাস্তবতার ধ্রুপদি চিত্রকর এবং প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের পর এই ধারায় তাঁর মতো এতো সূক্ষ্নদর্শী নিপুণ গল্পশিল্পী বিরল। সমাজের আপাদমস্তক তুলে এনেছেন তিনি। বাস্তবতার চিত্রণে আপোসহীন, তবু পাঠকের ওপরে কোনো কিছু চাপিয়ে দেননি, চরিত্রগুলোর ওপরে অহেতুক আরোপ করেননি বিপ্লবের বোঝা। তাঁর গল্প পড়লে পাঠকের মনে হতে বাধ্য যে, এই সমাজ ব্যবস্থা, এই জীবন-পদ্ধতি কোনোভাবেই কাম্য নয় _ কিন্তু কোনটি কাম্য ও গ্রহণযোগ্য, সে সিদ্ধান্ত নেবার দায়িত্ব তিনি পাঠকের বিবেচনার ওপরই ছেড়ে দিতে চান। আর এ জন্যই তাঁর গল্প হয়ে ওঠে পাঠকের নিজস্ব সম্পদ এবং একটি সফল কালজয়ী গল্পের এটিই প্রধান বৈশিষ্ট্য যে সে পাঠকের একান্ত সঙ্গী হয়ে ওঠে।

বিরলপ্রজ ছিলেন ইলিয়াস। প্রায় ত্রিশ বছরের সাহিত্য জীবনে তাঁর গল্পসংখ্যা ২৫। এতো অল্প লিখে সাহিত্যজগতে নিজের নামটি যিনি স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ করে রাখার যোগ্যতা রাখেন, তাঁর দিকে মনোযোগ না দিয়ে উপায় থাকেনা। আর মনোযোগ দিলে আমরা দেখি _ কী বিষয়ভাবনা, কী চরিত্রচিত্রণ, কী বর্ণনাভঙ্গী সবকিছুতেই ইলিয়াস নির্মাণ করেছিলেন এক আশ্চর্য ব্যতিক্রমী জগৎ। জীবনকে তিনি দেখেছিলেন গভীরভাবে _ একেবারে ডুবুরির চোখ নিয়ে, এবং তার সবটুকুই বর্ণনা করেছেন এমন এক ভঙ্গীতে যেন চোখের সামনেই ঘটছে এতোসবকিছু; চরিত্র চিত্রণে তথাকথিত আভিজাত্য তিনি মানেননি কোনোদিন এবং ব্যবহার করেছেন এমন এক ভাষা যা দৈনন্দিন জীবন থেকে এতোটুকু আলাদা নয়। সাহসী তিনি _ জীবনকে ভয়ংকর নগ্নভাবে তুলে ধরতে তাঁর কুণ্ঠা নেই কোনো _ কুশলী তো বটেই, মনস্ক পাঠকের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তাই প্রশ্নাতীত। মানুষ এবং তার জীবনযাত্রা এবং তার পরিপাশর্্ব তাঁর কলমে চিত্রিত হয় সকল সম্ভাবনাসহ _ তার প্রেম-কাম-ভালোবাসা-স্নেহ-মমতা-ক্রোধ-হতাশা-প্রতিশোধস্পৃহা-প্রত্যাশা কিংবা হাসিকান্না সুখদুঃখ আনন্দ-বেদনার মতো অনুভূতিসঞ্জাত বিষয়গুলো যেমন তেমনি তার থুথু-কাশি-মল-মূত্রসহ। যা কিছু নির্মিত হয় তাঁর হাতে _ হয় প্রায় নিপুণ পরিপূর্ণতায়।

দু-একটি গল্পের উদাহরণ টানলে তাঁর প্রবণতা বুঝতে সুুিবধা হবে। যুগলবন্দি গল্পে 'রিটায়ার্ড পোস্টমাস্টার' পুত্র আসগরের নামের সঙ্গে তার সাহেবেরে কুকুর আরগসের নামের ভয়াবহ মিল দেখে আমরা আঁতকে উঠলেও অবাক হইনা। স্বল্প আয়-কৃপন-মিথ্যেবাদি পিতার পুত্র, দুই কামরার টিনের ঘরে বেড় ওঠা অথচ উচ্চাভিলাষী, যে-কোনো উপায়েই হোক না কেন বৈষয়িক জীবনের সাফল্য চাওয়া আসগরের জন্য সাহেবের প্রায় কুকুরে পরিণত হওয়া ছাড়া যেন আর কোনো উপায় থাকে না, কারণ সাহেব একটা ফোন করলেই তার ভাগ্য খুলে যায়! সারা গল্প জুড়ে আসগরের এই কুকুরপ্রতীম জীবনের বর্ণনা চলে দারুণ এক কৌতুকপূর্ণ ভাষায় আর গল্পের শেষে পাঠকের জন্য অপেক্ষা করে এক তীব্র আঘাত। আরগসের বাউয়েল পরিস্কার করতে গিয়ে আসগর নিজেই তিন-সিগারেটের কোর্স সম্পন্ন করলে আমরা বুঝে যাই, আসলে এই দুইটি জীবের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। পরাজয়ে বিবর্ণ নগ্ন জীবনের ভয়াবহ রূপটি আমাদের অসহায় ও বিমূঢ় করে তোলে। মধ্যবিত্তের সকল স্বপ্ন-সাধ-আকাঙ্ক্ষা-মূল্যবোধ ধরে আমূল এক টান দেন লেখক, চাবুক মারেন এসবকিছুর ওপর।

কুকুরের সঙ্গে একাত্ন বোধ করার এমন একটি ব্যাপার আছে উৎসব গল্পেও। এই গল্পের আনোয়ার বড়োলোক বন্ধুর বিয়ে বাড়ি থেকে ফিরে বিপদে পড়েছে, কারণ ওখানে চোখ ধাঁধানো জৌলুস আর তার ঘরে _

ভিজে ভিজে ভ্যাপসা ভোঁতা গন্ধ, ৮০ পাওযারের টকটক আলো। ওখানে সব স্মার্ট রূপবতী তরুণী আর এখানে তার স্ত্রী 'সালেহা বেগমের পুরু ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে একটা হলুদাভ ও একটা সাদা দাঁত নির্লজ্জ উঁকি দেয়। ঠোঁটের কোণে লালার আভাস, সমগ্র মুখমন্ডলে কেবল গ্রাম্যতা তোতলায়। ... শাড়ীর ভেতর বুক নেই পাছা নেই, দিনরাত হেঁটে বেড়াচ্ছে একটা বেঢপ কোলবালিশ।

আনোয়ার এই স্ত্রীর সঙ্গেই সঙ্গমের উদ্যোগ নিলে বিপদ বাড়ে, নিজের মধ্যে কোনো সাড়াই টের পায় না সে, তার চেতনা জুড়ে থাকে বিয়ে বাড়িতে দেখা 'ভালো ভালো মেয়ে'রা। অতপর ব্যর্থ হয়ে সে ঘরের বাইরে এসে দুটো কুকুরের রতিক্রিয়া দেখে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে এবং এবার সে সঙ্গমেও সফল হয়। বলাবাহুল্য, যদিও তার স্বপ্ন ও কল্পনা ওই 'ভালো ভালো' মেয়েদের পেতে চায়, কিন্তু তার জীবন তাকে কুকুরের নিকটবর্তী করে দেয়।

মিলির হাতে স্টেনগান গল্পের মিলি তার স্বপ্নের ধারক হিসেবে বেছে নিয়েছিলো যুদ্ধফেরত স্বপ্নবাজ আব্বাস পাগলাকে। মিলির ভাই রানা এবং তার বন্ধুরা মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালের বখে যাওয়া তরুণদের প্রতিনিধি _ আদর্শচু্যত, লক্ষ্যহীন, জীবনের পাক-কাদায় জড়িয়ে পড়া নিরুপায় _ এমন কিছুই তারা ধারণ করে না যা মিলির কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাবে _

সোহেল না সিডনি না ফয়সল নাম তিনটে এই তিনজনেরই, কিন্তু মিলির কাছে এদের সবাইকে একই রকম মনে হয়।... সেদিক থেকে বিবেচনা করলে সুনির্দিষ্ট নামে এদের একজনকে সনাক্ত না করাই ভালো।

কিন্তু আব্বাস পাগলা স্বপ্ন দ্যাখে, আর ওই স্বপ্নই তাকে মিলির কাছে অন্য সবার থেকে আলাদা গুরুত্বে অধিষ্ঠিত করে। আব্বাস শুধু নিজেই স্বপ্ন দ্যাখে না, দ্যাখাতেও জানে, আর এমনই তার স্বপ্নজগৎ যে তা আর পৃথিবীর সংকীর্ণ গন্ডীতে আবদ্ধ নেই, ডানা মেলেছে আকাশে, চাঁদ-গ্রহ-নক্ষত্রের জগতে, যে জগৎ তার শত্রুপক্ষ দখল করে নিতে চায় _

খানকির বাচ্চারা, তোমরা দুনিয়ার পুরাটাই কব্জা করছো, অহন আসমান চোদাইবার তালে আছো না? শত্রুপক্ষ চাঁদে গেছে _ এই চুতমারানিরা গেছে, খানকির বাচ্চাগুলি অহন নাম দিবো। নাম দিবো, দাগ দিবো, খতিয়ান করবো, কবলা করবো, দলিল করবো, মিউটেশন করবো... দুনিয়ার পানি বাতাস মাটি আগুন পাত্থর তো জাউরাগুলি পচাইয়া দিছে, অহন পচাইবো চান্দেরে।

(পাঠক, দেখুন কী সুকৌশলে একজন 'পাগলা'র জবানে ইলিয়াস এক তীব্র সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন, কিন্তু একে এতোটুকু আরোপিত বলে মনে হয় না।) এই শত্রুপক্ষের পরিচয় আব্বাসের জানা, ওদের যুদ্ধকৌশলও তার নখদর্পনে, কেবল একটা স্টেনগান পেলে সে ওদের সমস্ত আয়োজন তছনছ করে দিতে পারে! এই যার ভাবনার ধরন, মানব জাতিকে সমস্ত ষড়যন্ত্রমূলক কার্যকলাপ থেকে যে সহজেই মুক্ত করার প্রত্যয় ঘোষণা করতে পারে, সে যে মিলির মতো একজন স্বপ্নঘোরগ্রস্থ তরুণীর মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান করে নেবে, তা আর বিস্ময়কর কি? আব্বাসের এই স্বপ্নের জগৎ মিলিকেও তার গতানুগতিক, নিত্যমৈত্তিক ও সম্ভাবনাহীন বিবর্ণ জীবন যাপন থেকে কল্পনার বিশাল আকাশে বিচরণ করার সুযোগ করে দেয়, এনে দেয় গণ্ডীবদ্ধ অনটনময় জীবন থেকে মুক্তির স্বাদ, শেখায় স্বপ্ন-জগতের বিস্তার ঘটাতে। কিন্তু এই স্বপ্ন-মুক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় না, 'পাবলিক নুইসেন্স' আব্বাস পাগলাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হলে সে সুস্থ হয়ে ফিরে _ 'আমি ভালো হইয়া গেছি' বলে মিলির দেয়া স্টেনগান প্রত্যাখান করে। যে চোখে একদিন ছিলো অপরিমেয় স্বপ্ন, ছিলো শত্রুনিধনের দৃঢ় প্রত্যয়, এখন _ সেই চোখের বহুবর্ণ জমি ঘুমের ঘষায় ঘষায় পানসে সাদা হয়ে গেছে। এখন সে রানার ইন্ডেটিং ফার্মে 'প্রভাইডেড' হওয়ার পথ খুঁজছে। আব্বাসের সুস্থ হয়ে ওঠাটা মিলির জন্য স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়, কারণ সে এখন আরও হাজারো লোকের মতোই স্বপ্ন-কল্পনা-প্রতিজ্ঞাহীন এক অদভুত জীবমাত্র। স্বপ্নবাজ মিলির স্বপ্নগুলো যাকে কেন্দ্র করে ডানা মেলেছিলো সে-ও মিশে গেছে জনারণ্যের বামন-মানুষদের সঙ্গে, এমনকি 'যানবাহন ও রাস্তা ও ট্রাফিক পুলিশের দাঁড়াবার উঁচু জায়গা ও ফুটপাত ও রেস্টুরেন্ট ও দোকানপাট ও তারের জটা-মাথায় ইলেকট্রিক পোল'-এর সঙ্গে তার কোনো পার্থক্য নেই। এসবকিছু মিলির 'চোখের লেবেলের নিচে' _ একই সমতলের। এরা কেউ-ই মিলির স্বপ্নকে ধারণ করার বা বয়ে যাবার মতো যোগ্যতা রাখে না, আবার মিলির নিজেরও তো স্বপ্নকে সত্যিতে পরিণত করার মতো ক্ষমতা নেই, স্বপ্নগুলো তাই ওড়ার জন্য শুধু ডানা-ই ঝাপ্টায়, উড়তে পারে না। এই দেশে, এই বিপন্ন সময়ে গল্পটির প্রাসঙ্গিকতা তাই অনস্বীকার্য। আমাদের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ও তার কারণ এমন অসামান্য প্রতীকী কুশলতায় খুব একটা নির্মিত হতে দেখা যায়নি আমাদের সাহিত্যে।

ইলিয়াসের গল্প লিখতে গেলে তাঁর অধিকাংশ গল্প নিয়েই কথার বলার লোভ জাগে, বলা উচিতও। অল্প কয়েকটি গল্পে তিনি জীবনের বহুমাত্রিকতাকে ছুঁয়েছিলেন, তাঁর সবগুলো গল্প নিয়ে কথা বলতে পারলে বিষয়টি পরিষ্কার ভাবে বোঝা যায়, আমি অন্য একটি প্রবন্ধে এ নিয়ে কথাও বলেছি, এখানে সেই সুযোগ নেই বলে স্বল্প পরিসরে কিছু বলা যাক। ইলিয়াসের প্রায় অর্ধেক গল্পের বিষয় হিসেবে এসেছে মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত জীবন। কিন্তু এই মধ্যবিত্তকে তিনি দেখেছেন এক ভিন্নরকম চোখে, সেখানে মধ্যবিত্তের পুতুপুতু মার্কা আবেগের প্রতি পাঠকের সহানুভূতি কাড়ার চেষ্টা নেই, বরং আছে এই মানুষগুলোর সুবিধাবাদিতা ও পলায়ণপরাণতা, তাদের আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও প্রচলিত মূল্যবোধ ইত্যাদির প্রতি তীব্র বিদ্রুপ ও সমালোচনা। যেমন _ উৎসব, যুগলবন্দী, দখল, পায়ের নিচে জল, তারাবিবির মরদপোলা ইত্যাদি। কিন্তু শুধুমাত্র তাঁর বিদ্রুপটুকু দেখলে পিতৃবিয়োগ বা খোঁয়ারি বা অন্য ঘরে অন্য স্বর বা দোজখের ওম-এর মতো গল্পগুলো বুঝে ওঠা যাবে না। পিতৃবিয়োগ গল্পের ইয়াকুবের যে সংকট সেটি একসময় মধ্যবিত্ত পরিবারে অনিবার্য ও অতিপরিচিত সংকট ছিলো _ পিতা ইচ্ছেকৃতভাবে পুত্রের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতেন, সেই অনতিক্রম্য দূরত্ব পেরিয়ে পিতার প্রকৃত চরিত্রটি কোনোদিনই জানা হয়ে উঠতো না পুত্রের। এই গল্পেও সেটাই ঘটেছে। পিতার মৃতু্যর পর ইয়াকুব বিভিন্ন লোকের মুখে এমন সব কথাবার্তা শোনে যা তার চেনা বাবার সঙ্গে যায়-ই না, ফলে তার মনে হয় _ 'এসব উক্তি কার সম্বন্ধে করা হচ্ছে' কিংবা দাফনের পর শহরে ফিরে আসতে চাইলে মামা'র মুখে 'কুলখানি সেরেই যা' শুনে তার প্রতিিিক্রয়া _ 'কার?' কিংবা 'তোর বাবাকে এখানকার লোক খুব ভালোবাসতো' শুনে সে প্রশ্ন করে 'কাকে?' অর্থাৎ এখানকার লোকজন যাকে ভালোবাসতো তাকে সে চেনে না, তাকে সে নিজের বাবা বলে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। পিতা-পুত্রের মধ্যে যে অমোচনীয় দেয়াল দাঁড়িয়ে থাকতো মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে তার এক অসাধারণ উপস্থাপন আছে এই গল্পে। মধ্যবিত্ত নিয়ে তো বহু গল্পই লেখা হয়েছে, কিন্তু এমন একটি বিষয়ে আর কেউ লিখেছেন বলে আমার জানা নেই। আগেই বলেছি, মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন জীবনের হা-হুতাশ-হাহাকার-সুখদুঃখ নিয়ে যে বিপুল সংখ্যক গল্প দু-বাংলায়ই উৎপাদিত হয়, তিনি সে পথে হাঁটেননি বরং মধ্যবিত্তকে তিনি উপস্থাপন করতে চেয়েছেন ভিন্ন এক উপায়ে। তার চরিত্রগুলো অসহায়, বিপন্ন ও পরাজিত কিন্তু এর থেকে পরিত্রাণের জন্য চেষ্টা নেই তাদের, বরং আছে সুবিধাবাদী হবার চেষ্টা, পলায়নপরানতা, রুচিবিকৃতি অথবা শামুকের মতো খোলসে ঢুকে নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা। এবং এর জন্য যে কেবলমাত্র অর্থনৈতিক কারণটিই দায়ী তা তিনি বলতে চাননি, বরং এই সমাজ ও রাজনীতি, আদর্শ ও মূল্যবোধ যে মধ্যবিত্তকে কিভাবে পরিচালিত করে, আটকে দেয় এক অনতিক্রম্য বৃত্তে সেদিকেই ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে নিম্নবিত্তদের নিয়ে লেখা গল্পগুলোতে আর্থিক সংকটজনিত দুরবস্থার চিত্র আঁকতে অনেক বেশি সচেষ্ট ছিলেন তিনি। দরিদ্রদেরও মূল্যবোধ থাকে, থাকে নীতি আদর্শ ও ঔচিত্যবোধ, কিন্তু এসবকিছুর ছাপিয়ে ওঠে ক্ষুধা ও আর্থিক সংকটজনিত নানাবিধ দুর্যোগ। উদাহরণ হিসেবে দুধভাতে উৎপাত এবং কীটনাশকের কীর্তির কথা বলে যেতে পারে _দারিদ্রের বীভৎস রূপ দুটো গল্পেই চমৎকার কুশলতায় নির্মিত, কিন্তু পুরোপুরি প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও এসব গল্পের চরিত্রগুলো জয়ী হতে চায়, পরাজয় মেনে নেবার আগে এমনকি মেনে নেয় মৃতু্যকে। বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, মধ্যবিত্তদের নিয়ে লিখলে লেখক হওয়া যায় না, কিংবা গরীব মানুষদের নিয়ে না লিখলে লেখক হওয়া যায় না, এই ধারণার চক্রে পড়ে বহু লেখক দরিদ্রদের নিয়ে বানোয়াট গল্প লেখেন, যা শেষ পর্যন্ত দারিদ্র নিয়ে মশকরার পর্যায়ে পড়ে যায়। ইলিয়াস দেখিয়ে দিয়েছেন, এসব না করেও লেখক হওয়া যায়, তবে দেখার চোখটি হতে হয় ভিন্ন, দেখাবার ধরনটিও হতে হয় ব্যতিক্রম।

আরেকটি গল্পের কথা না বললে ইলিয়াস সম্বন্ধে বলাটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। গল্পটি নিরুদ্দেশ যাত্রা। এটি তাঁর প্রথম জীবনের রচনা। একটি অসাধারণ পংক্তি দিয়ে গল্পটি শুরু হয় _এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেকদিন পর আজ সুন্দর বৃষ্টি হলো। এটি কি কোনো গল্পের লাইন, নাকি কবিতার? মনোরম আর মনোটোনাস এই দুই আপাত বিরোধপূর্ণ শব্দের সহাবস্থান এই প্রশ্নের জন্ম দেয় বৈকি! কবিরা এমন লিখতে পারেন, লেখেনও, কবিতার অ্যালিগরি বলে একটা ব্যাপার আছে, কিন্তু কোনো গদ্যকার কি সচেতনভাবে এমনটি লিখবেন? লিখলে _ একটি শহর কীভাবে একইসঙ্গে মনোরম এবং মনোটোনাস হয় _ গল্পকারকে এমন প্রশ্নে জর্জরিত হতে হবে। গল্পকাররা নানাদিক থেকেই দুর্ভাগ্যবান _ পাঠকরা তাদের এতটুকু ত্রুটিও (!) ক্ষমা করে না। গদ্যের জন্য কাব্যিক ভাষাকে রীতিমতো নিন্দার চোখে দেখা হয় এদেশে, যেন গদ্যকে আবশ্যিকভাবে কাঠখোট্টা হতে হবে! কিন্তু ওই একই গল্পের আরো কয়েকটি লাইন পড়ে নিতে পারি আমরা _

রাত এগারোটা পার হয় হয়...আমার জানলায় রোদন-রূপসী বৃষ্টির মাতাল মিউজিক, পাতাবাহারের ভিজে গন্ধভরা সারি, বিষাদবর্ণ দেওয়াল; অনেকদিন পর আজ আমার ভারি ভালো লাগছে।...বৃষ্টি-বুনোট এইসব রাতে আমার ঘুম আসে না, বৃষ্টিকে ভারি অন্যরকম মনে হয়, বৃষ্টি একজন অচিন দীর্ঘশ্বাস। এইসব রাতে কিছু পড়তে পারি না আমি, সামনে বই খোলা থাকে, অক্ষরগুলো উদাস বয়ে যায়, যেনো অনন্তকাল কুমারী থাকবার জন্যে একজন রিক্ত রক্তাক্ত জন্মদান করলো এদের। চায়ের পেয়ালায় তিনটে ভাঙা পাতা ঘড়ির কাঁটা হয়ে সময়কে মন্থর কাঁপায়। ...আমার ঘুম আসে না, আলোর মধ্যে একলা জেগে রই।...

মনে কি হয় না যে, একটি কবিতা পড়ছি? মনে কি হয় না, যেন কোথাও থেকে বিষণ্নতা ঝরছে! মনে কি হয় না যেন এইমাত্র একটা কথাহীন অব্যাখ্যাত সুর শুনে উঠলাম! এই পঙক্তিগুলো পড়ে মনে কি হয় না যে, এই ইলিয়াসকে আমরা চিনি না? গল্পটি নিয়ে আরও এগিয়ে গেলে আমাদের সঙ্গে রঞ্জুর পরিচয় হয়, এক বিষণ্ন একাকী যুবক, খানিকটা অস্বাভাবিক, হয়তো ব্যাখ্যহীন কোনো অসুস্থতায় আক্রান্ত। আমরা এগিয়ে চলি, তার মতো আমরাও বিষণ্ন হতে থাকি, একা হতে থাকি, আর পড়া শেষ হয়ে গেলে মনে হয় _ একবার পড়ে এই গল্পটি বোঝা হয়ে উঠলো না। আবার পড়ার জন্য হাত বাড়াই, আবারও বিষণ্ন হই, কখনো হয়তো চোখের কোণ ভিজেও ওঠে, কিন্তু এবারও মনে হয় _ আবার পড়তে হবে এই গল্প। কোনো কোনো কবিতা মানুষ ফিরে ফিরে পড়ে, বহুবার পড়ে, হয়তো সাধ মেটে না বলেই পড়ে কিংবা সেটি তার সূক্ষ অনুভূতিকে আরও তীক্ষ্ন করে তোলে বলে পড়ে। কিন্তু গল্প? কোনো গল্প কি একই পাঠকের কাছে বহুবার পঠিত হবার সৌভাগ্য অর্জন করে? সাধারণত করে না। যেটি করে সেটি উজ্জ্বলভাবে ব্যতিক্রম _ নিরুদ্দেশ যাত্রা সেই ধরনের গল্প। কী হলো রঞ্জুর, কী হলো _ এই ভাবনায় আক্রান্ত হয়ে আমরা ইলিয়াস ঘাঁটি এবং বহুদিন পর তাকে পেয়ে যাই চিলেকোঠায়। সেই একইরকম _ বিষণ্ন ও একাকী। অসুস্থ ও চলমান জীবনে অংশগ্রহণহীন। অবশেষে তাকে হাড্ডিখিজিরের দেখানো পথে হারিয়ে যেতে দেখলে আমরা আবারও তার পরিণতি জানবার জন্য ইলিয়াস হাতরাই এবং দেখি তাঁর শেষ উপন্যাস খোয়াবনামায় এই রঞ্জুই তমিজের বাপ হয়ে উপস্থিত হয়েছে। দেখি, ইলিয়াস বারবার রঞ্জুর কাছে ফিরে এসেছেন। নিরুদ্দেশ যাত্রার রঞ্জু, চিলেকোঠার সেপাই-এর ওসমান আর খোয়াবনামার তমিজের বাপ _ এই তিনজন আসলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই চরিত্র, তিনজনই খানিকটা অস্বাভাবিক, অসুস্থই বলা চলে, তিনজনই ঘোরগ্রস্থ, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কহীন নিস্ক্রিয় মানুষ। তিনজনের পরিণতিও এক _ অস্বাভাবিক মৃতু্য। আমাদের চারপাশেই এমন কিছু মানুষ আছে যারা বাস্তবতার মধ্যে বাস করেনা, করে ফ্যান্টাসি বা কল্পনার জগতে, সমাজে থেকেও এই লোকগুলো জনজীবনের সঙ্গে সম্পর্কহীন, ইলিয়াস তাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি, এমনকি বিদ্রুপও করেননি তাদের নিয়ে, যেমন করেছেন মধ্যবিত্তদের, বরং তাদের প্রতি তাঁর এক গভীর সহানুভূতি টের পাওয়া যায়। যে রঞ্জুকে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন তাঁর প্রথম জীবনে, তাকেই ফিরিয়ে এনেছিলেন ওসমান এবং তমিজের বাপের মধ্যে, আমার কাছে মনে হয়েছে ওসমান ও আনোয়ার একই চরিত্রের এপিঠ-ওপিঠ, কিংবা তমিজ ও তমিজের বাপও একই চরিত্রের এপিঠ-ওপিঠ _ একজন নিঃসঙ্গ, অসহায়, নৈরাশ্যপীড়িত, বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ; আরেকজন সক্রিয়, আশাবাদী, সমকালের আয়োজন ও প্রয়োজনের সঙ্গে একাত্ন। একজন মানুষের মধ্যে একইসঙ্গে পরস্পরবিরোধী মানুষ বাস করে এইসব স্প্লিট পার্সোনালিটি নির্মাণ করে ইলিয়াস হয়তো সেটিই বলতে চেয়েছেন। br />
২.
আআব্দুল মান্নান সৈয়দ সমাজ বাস্তবতার ধারেকাছেও যাননি। তাঁর গল্প ধ্রুপদি মাত্রা পেয়েছে মানুষের অন্তর্লোক চিত্রায়ণের কুশলী সফলতায়। মানবমনের বহুবিচিত্র ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সূক্ষ্ন চিত্রণে তার তুলনা মেলা ভার। সমাজবাস্তবতার আবহমান ধারা থেকে কিছুটা সরে দাঁড়িয়ে তিনি প্রধানত মানুষকে তুলে এনেছেন তার অন্তর্লোকের পরিপ্রেক্ষিতে, তার সমস্ত আকুলতা-আকুতি, আবেগ-আবেশ, বিস্ময়-বিভিন্নতা, ভয়-ভাবনা আর এসবের অদ্ভুত-অসাধারণ ব্যাখ্যাসহ। এদিক থেকে দেখলে ইলিয়াসের বিপরীত মেরুতে তাঁর অবস্থান। বস্তুত ইলিয়াস ও মান্নান সৈয়দ গল্প সাহিত্যের দুটো শাখায় নেতৃত্ব দিয়েছেন আপন যোগ্যতায়। ইলিয়াসের মিলির হাতে স্টেনগান, উৎসব, নিরুদ্দেশ যাত্রা, যুগলবন্দী, কান্না প্রভৃতি গল্প যেমন, তেমনি মান্নান সৈয়দের চাবি, মাছ প্রভৃতি গল্প আরও বহুকাল বাংলা গল্পকে গৌরব দেবে।

তাঁর গল্পগুলোর দিকে তাকালে গল্পের ভাষা, আঙ্গিক ও বিষয়-ভাবনার বহুমুখিনতায় মুগ্ধ হতে হয়। দু-একটি উদাহরণ দেয়া যাক। মাতৃহননের নান্দিপাঠ গল্পের আতিকুল্লাহ _ যে দর্শনের একজন দারুণ ছাত্র, বুদ্ধিজীবীদের মতোই যার মুখ লম্বাটে, চোখ স্বপি্নল, যে চোখ অযুত গ্রন্থের চোরাবালি অতিক্রম করে জ্ঞান নামক বিদেহী সমুদ্রে ভাসছে সারাক্ষণ, কৃশ দীর্ঘর্ শরীর _ মায়ের স্নেহের আধিক্যে-অত্যাচারে অতিষ্ট। কারণ _

যেখানেই আমি যাই দু'টি নির্ণিমেষ চোখ পিছনে ছুটছে, পিছলে পড়ছেনা একবারো, সরে যাচ্ছেনা, এমনকি পলক ফেলছেনা কখনো, যেন মানুষের চোখ নয়। মানুষের অবশ্য, তবু মানবীয় নয়। দানবীয় এক যন্ত্রে পরিণত হয়েছে সে... আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে মৃতু্যর অভিমুখে, কবর পর্যন্ত আমাকে পৌঁছিয়ে না দিয়ে শান্তি নেই তার।... অবিচ্ছিন্ন এই যন্ত্রণা আমার গা বেয়ে উঠলো চূড়ান্ত পর্যায়ে, যখন দেখলাম আমার আর রিনার ভেজানো দরজায় অাঁকা আছে দু'টি ভয়াবহ রকমের শান্ত চোখ।... তাই মা-র ভালোবাসা আমার পক্ষে অমনই ভীষণ, অমনই নিঃস্বপ্ন যন্ত্র।

তার এই যন্ত্রণার পরিপ্রেক্ষিতে স্বান্ত্বনা পাওয়ার জন্য সে যুক্তিপূর্ণ একটি কারণ খোঁজে। নিজেকে বোঝায় _ সে যেহেতু মায়ের একমাত্র সন্তান এবং মাত্র আটাশ বছর বয়সে বিধবা হলেও তিনি আবার বিয়ে করেনননি কারণ এতে সন্তানের শারীরিক ও মানসিক উন্নতি আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে _ অতএব মায়ের এই আচরণ অস্বভাবিক কিছু নয়। এগুলো বোঝা সত্ত্বেও সে কিছুতেই মায়ের ওই 'নির্মম' মমতামিশ্রিত উৎকণ্ঠা মেনে নিতে পারে না, কারণ এতে তার ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানসিক শান্তি চূড়ান্তভাবে বিঘি্নত হচ্ছে। অতএব _ br /> আআমার একসময় মনে হলো, এমন হয়না যে ঐ শীতল মুখটার ভিতর থেকে লকলকে ছুরির মতো বেরিয়ে পড়ে জিভ, মার্বেলের মতো চোখের মনি দু'টি ঠিকরে বেরিয়ে আসে।

কতোটা বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়লে একজন যুবক তার মায়ের সম্বন্ধে এরকম ভাবতে পারে তা নিশ্চয়ই অনুমান করা যায়! আর তাই, অবশেষে সে মাতৃহত্যার সিদ্ধান্ত নিলে আমাদের বিস্মিত হওয়ার উপায় থাকে না। কিন্তু যেহেতু সে যুক্তিবাদি, তাই এই হত্যাকার্য সম্পাদন করার জন্য সে সত্যিকার অর্থেই একটি গভীর যুক্তি বা কারণ খুঁজে পেতে চায়, আর তাতে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। সে মায়ের ঘরে একটি লোককে বসে থাকতে দেখলে আর এতে মা বিব্রত ও আরক্তিম হয়ে উঠলে তার মনে পড়ে এর আগেও সে এ ঘরে আধপোড়া সিগারেটের টুকরো দেখেছিলো। তার মানে লোকটি নিয়মিতই এখানে আসে! ঘটনাটি তার মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। অথচ বিষয়টি নিয়ে নিজের মুখোমুখি দাঁড়ালে মায়ের এই আচরণকে সে যুক্তিহীন কিংবা অস্বাভাবিক বলে ভাবতে পারে না, বরং মায়ের দীর্ঘকালিন অবদমিত কামনা কোনো না কোনো সময় যে জেগে ওঠাটাই স্বাভাবিক এই সত্য অনুভব করে সে আরো বেশি মুষড়ে পড়ে। সে বুঝতে পারে মায়ের এই আচরণ তার ভেতরে জন্ম দিয়েছে ঘৃণা, বেদনা ও আক্রোশ যা তার নিজেরই মতে যুক্তিহীন ও কারণহীন বিদ্বেষপ্রসূত। অতএব এই কারণটি মাতৃহত্যার মতো জটিল একটি বিষয়কে তরান্বিত করতে পারে না। এইখানে এসে তার মানসিক দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত পর্যায়ে পেঁৗছায়। এবার সে অনুভব করে, মায়ের ভালোবাসায় সে অত্যাচারিত বোধ করলেও তাঁর মনোযোগে অন্য কারো অংশীদারিত্বও তার সহ্য হচ্ছে না। সে নিজেকেই বলে _

আসলে তুমি এমন প্রকৃতির লাক, যে মাকে কষ্ট দিয়ে চিরকাল আনন্দ পাবার চেষ্টা করে। কে তাহলে শয়তান ? হয়তো তোমার মনোভাব আরো গর্হিত; মা-র মুখ্য মূলধন আবেগ, নানা আকারে তোমার কাছেই পেঁৗছে যেতে থাক সারাজীবন _ এই তোমার ইচ্ছা অথচ বদলে তুমি দিয়ে যাবে শুধু উপেক্ষা।

গল্পের শেষের দিকে আতিকুল্লাহ মাতৃহননের যৌক্তিক কারণটি খুঁজে পায়, যা তার দ্বন্দ্ববিক্ষুব্ধ অন্তর্লোকের অতিবিচিত্র চিন্তাভাবনার একটি ধ্রুপদি চিত্র হিসেবে পাঠককে নাড়া দিয়ে যায়। আমরা দেখতে পাই দ্বন্দ্বমুখর এই যুবকটি _ যে সমস্ত কিছুর একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে পেতে চায়, যে প্রতিটি বিষয়েই নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকেই প্রশ্নবানে ক্ষতবিক্ষত করে, রক্তাক্ত করে তোলে নিজের হৃদয়কেই _ নিজেকেই বলছে _

নিজেকে তুমি কিছুতেই আর-দশজনের সঙ্গে মেলাতে পারো না, কি ক'রে লোকে এত সামান্য কারণে হাসতে পারে, ছোটো বিষয় নিয়ে মেতে ওঠে হিংসার প্রতিযোগিতায় তুমি তা ভেবে পাওনা _ এ নিয়ে মনে হেসেছোও যেমন তেমনি দুঃখ আছে তোমার: কেন তুমি আর দশজনের মতো হ'লে না, বেলেল্লা হল্লায় মেতে থাকতে পারলে না আজীবন।

মাকে হত্যা করার কারণটি আমরা এই জটিল যুবকের বুকচেরা দীর্ঘশ্বাস থেকে জানতে পারি এভাবে _

অন্তরে-অন্তরে যেহেতু নিশ্চয়ই আমি জানি, আমি একজন অস্বাভাবিক প্রকৃতির মানুষ _ নির্জনতা সর্বনাশ করেছে আমাকে _ আর কেউ গুঢ়তর ব্যাপারটা যেন না জানে, তাই স্বাভাবিক, বাস্তব, সাধারণ হবার জন্য ভিতরে ভিতরে আমার কি করুণ দ্বন্দ্ববহুল প্রয়াস আমিই তা জানি।

একজন অস্বাভাবিক যুবকের এই দ্বন্দ্বমুখর মানসলোকের সফল ও অসাধারণ চিত্রায়ণ মান্নান সৈয়দের মানব-মনোজগত বিশ্লেষণের তুঙ্গস্পর্শী ক্ষমতারই প্রমাণ দেয়।

মাছ গল্পের অধ্যাপক সাহেব সবসময় একটি এ্যাকুরিয়াম সঙ্গে নিয়ে চলাফেরা করেন _ যেন সীমাবদ্ধ মানব জীবনের প্রতীকী প্রমাণ ওই এ্যাকুরিয়াম। সামাজিকভাবে ভয়ংকর বিচ্ছিন্ন তিনি, সহকর্মী-বন্ধু-আত্নীয়-স্বজন কারো সঙ্গেই কোনোরকম সম্পর্ক নেই তার। দৃষ্টিকটুভাবে তার এই এ্যাকুরিয়াম বহন সবার চোখে কৌতূহলকর কিংবা কৌতুককর দৃশ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কলেজের অধ্যক্ষ, বন্ধু হাসান, তার চাচা তাকে এ নিয়ে ভৎর্সনাও করেন। কিন্তু তার কোনো ভাবান্তর লক্ষ্য করা যায় না। একদা সামাজিক-স্বাভাবিক এই অধ্যাপক নানা রকম পোড় খেতে খেতে হয়ে উঠেছেন তীব্রভাবে একাকী আর তার পৃথিবী হয়ে উঠেছে এ্যাকুরিয়ামকেন্দ্রিক। তার দিনরাত কাটে এখন ওটা ঘিরেই _

এই একটা পৃথিবী।...রাত্রিবেলা যখন সারা ঘর অন্ধকার করে এ্যাকুরিয়ামটা আলোকিত করে রাখি তখন সমস্ত দুনিয়াও অন্ধকার হয়ে যায়। কেবল জেগে থাকে ওই এ্যাকুরিয়াম।...আমি ইজি চেয়ারে বসে ঐ আলো জ্বলা এ্যাকুরিয়ামের দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকি।...তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি একটি মোটেলের একা ঘরে শুয়ে থাকি। জিনিষটা সামান্য নয়। সামান্য হলেও অসামান্য। একটা সবুজ মাছের মধ্যে বিশ্বচরাচর।...এমনিভাবে দিন কেটে যায়। আমার আর কাজ কি? এ্যাকুরিয়ামের পানি বদলে দেই মাঝে মাঝে। নিউ মার্কেট থেকে মাছের খাবার এনে দেই ওদের। রাত্রিবেলা আলো জ্বেলে মাছের খেলা দেখতে দেখতে ভোর হয়ে যায়। দিনের বেলা যেখানে যাই ঐ এ্যাকুরিয়াম আমার সঙ্গী।

নাগরিক জীবনের সুগভীর বিচ্ছিন্নতা, অনিবার্য বিপন্নতা, সীমাবদ্ধতা, পৌনঃপুনিকতা, গণ্ডীবদ্ধ জীবনযাপন, আর হাজারো কোলাহলের মধ্যে দিগন্তব্যাপি নিঃসঙ্গতার এমন চোখ-ভিজে-ওঠা চমৎকার প্রতীকী চিত্রায়ণ আর কি হতে পারে? গল্পের শেষের দিকে অধ্যাপক একজন অদ্ভুত লোকের সঙ্গে পরিচিত হন, লোকে যাকে সাঁইজি বলে ডাকে। সাঁইজি অধ্যাপককে _ 'আপনি তো বাবা বাউল' _ বলে চমকে দেন, আর শোনান বাউলদের সেই ঘরছাড়া পৃথিবীর অদ্ভুত তত্ত্ব। লোকটির কথা তাঁকে খুব গভীরে স্পর্শ করে যায়, যেন হঠাৎ করেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন তাঁর আত্নপরিচয়। গল্পের শেষে _

তারপর একদিন কোথাও কিছু না _ হঠাৎ একটা লোকের সঙ্গে ধাক্কা লেগে এ্যাকুরিয়ামটা ভেঙে যায়। কাঁচগুলো খান খান।...একহাজার লোক আসছে যাচ্ছে, তাদের সামনে ফুটপাতে প'ড়ে পাঁচটি মাছ সাঁতরাতে থাকে এদিক-ওদিক। আমি হতবাক। শূন্য চোখে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। হতবাক, স্তব্ধ আমাকে পেছনে ফেলে মাছগুলো এগিয়ে যায় অনেক অনেক দূরে।

এই পরিস্থিাত কি অধ্যাপকের তুমুল মুক্তিকেই নির্দেশ করে না? এবং আমরা দেখি, তাঁর এই মুক্তি এসেছে তখনই যখন তিনি নিজেকে চিনতে পেরেছেন, যখন নিজের ভেতরে এক বাউলের সন্ধান পেয়েছেন। তবে কি আমরা _ এই নাগরিক মানুষেরা _ সবাই ভেতরে ভেতরে একেকজন বাউল? কেবল সচেতনভাবে তা টের পাই না, আর তাই আমরা বন্দি হয়ে থাকি গণ্ডীবদ্ধতার ভেতরে, পৌণপুনিক এক যান্ত্রিকতার ভেতরে !

চাবি গল্পটিতে মানুষ, মানবজীবন, পৃথিবী এবং শিল্পদর্শন সম্বন্ধে একটি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন মান্নান সৈয়দ। তাঁর গল্পের অধিকাংশ চরিত্রের মতো এই গল্পের প্রধান চরিত্রও _ চিত্রকলার তরুণ অধ্যাপক _ বিচ্ছিন্ন ও বিযুক্ত, নিঃসঙ্গ ও বিষণ্ন। কিন্তু একটি অদভুত ঘটনা তাঁকে প্রতিবেশিদের কাছে যেতে বাধ্য করে এবং নানারকম অভিজ্ঞতা উপহার দেয়। একদিন তিনি বাইরে থেকে ফিরে নিজের দরজায় দাঁড়িয়ে পকেটে হাত দিয়ে দেখেন, চাবি নেই। কোথায় রেখেছেন সেটা কোনোভাবেই মনে করতে না পেরে একে একে প্রতিবেশিদের দরজায় হানা দেন। পাশের ফ্ল্যাটে তিনি পান সৌজন্যবোধজনিত আতিথেয়তা, কিন্তু চাবি সেখানে নেই। এরপর নিচতলার প্রথম ফ্ল্যাটে পান শীতল উপেক্ষা, তারপরের ফ্ল্যাটে তারচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা _ চাাবির কথা বলতেই গৃহকত্রীর রুদ্ররূপ _ br /> ববলেন কি, আমাদের বাড়ির ছেলেমেয়েকে আপনি চোর ভাবেন, কখনো নয়, ককখনো নয়, ককখনো ওরা নিতে পারে না। দেখুন অন্য কোথাও। কী- যে ভাবেন আপনারা!

তারপরের ফ্ল্যাটে উঁকি দিতেই একজন এসে ধমকাতে লাগলো, তার গলায় রাগ _

আমাদের উপরের তেরো নম্বর ফ্ল্যাটে থাকেন আপনি? অসম্ভব, আপনাকে কোনোদিন এ অঞ্চলেই দেখিনি। আপনি মশাই চালাকি পেয়েছেন _ আসুন বাজি রাখুন দশটাকা। বললাম : আপনি এ বাড়ির কোনো ঘরেই থাকেন না।, এ বাড়ির লোকদের চেহারা অন্যরকম হয়, জানেন? চাবি খুঁজছেন, হঁ্যা, চাবির কি হাত হয়েছে? ..যান যান এ অঞ্চল ছেড়েই চলে যান, বেশি গোলমাল করলে পুলিশে দেবো। br /> এএর পরেরর অভিজ্ঞতা আবার বিপরীত ধরনের _ মন ভালো করে দেবার মতো।

তারপরের ঘরটিতে এক ঝাঁক ছেলেমেয়ে কলালাপ করছিলো, নক্ষত্রের মতো চলাফেরা করছিলো, আমাকে দেখেই সন্ধেবেলার পাখিদের মতো চ্যাঁচামেচি করতে করতে বেরিয়ে এলো, বললো সবাই মিলে, 'না তো, আপনার চাবি আমরা দেখিনি তো, চাবিঅলার কাছে যান না, আরেকটা বানিয়ে নিন। আর সামনের রাস্তায় চাবি বাজাতে বাজাতে যদি কোনো চাবিঅলা যায়, তো নির্ঘাৎ আপনার কাছে তাকে ডেকে দেবো। কিংবা চাবিঅলার কাছে যেতে হবে কেন, আপনি যদি বলেন তাহলে আমরা এক্ষুনি গিয়ে আপনার ঘরের দরজা ভেঙে দিচ্ছি। কী যে আপনি বলেন, এটা কোনো সমস্যা নাকি? br /> ততারপরের অভিজ্ঞতা আবার অন্যরকম _ একজন বুড়ো মতন লোক বলে উঠলেন,

চালাকি পেয়েছো ছোকরা? চাবির নাম করে ঘরে এস বসবে, খাবে, গল্প করবে, তারপর আমার মেয়ের সঙ্গে প্রেম করবে, ওসব চালাকি বুঝি আমি। যাও যাও...

আর এভাবেই এক চমকপ্রদ বর্ণনায় লেখক নাগরিক জীবনকে তুলির এক আঁচড়ে এঁকে ফেলেন। নাগরিক জীবনের মধ্যে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা, সম্পর্কহীনতা, অন্যের প্রতি মনোযোগহীনতা, নিস্পৃহতা, জটিল মনোবৃত্তি, নিষ্ঠুরতা, সন্দেহ, অবিশ্বাস সবই উঠে আসে তাঁর এই চাবি খোঁজার উছিলায়। কিন্তু যে ঘরে ঢোকার জন্য এত চেষ্টা ও আয়োজন, কী এমন আছে ওই ঘরে, কী এমন গুরুত্ব তার? br /> ককী আছে ঐ ঘরে? আছে আমার সর্বস্ব, আমার সারা জীবনের সাধনা; কতো সমাপ্ত অসমাপ্ত ছবি, কতো ভাবনা আর স্মৃতি, কতো গুঞ্জরণ। ছেলেবেলা থেকে আমার সাধ ছিলো, আমার নিজের একটি ঘর হবে, সেখানে আমি আমার ভাবনা নিয়ে স্বপ্ন নিয়ে, অসম্ভব নিয়ে কাটাতে পারবো। আর বড়ো হয়ে যখন দেখলাম; আমরা কেউই ঠিক পরস্পরের নই, যখন আরো-একলা গহন-একলা হয়ে উঠলাম, তখন তো ওই ঘরই হয়ে উঠলো প্রিয়তম। তাইতো ঐ ঘরকে ফিরে পেতে চাই।

বলাবাহুল্য ওই স্বপ্নঘরের চাবিটি এই বর্ণনার পর আর আক্ষরিক চাবি হয়ে থাকে না, পরিণত হয় মোহন প্রতীকে, আর ওই ঘরের প্রবেশের চেষ্টাটিও আর আক্ষরিক অর্থে ঘরে ঢোকার ব্যাপার হয়ে থাকে না বরং তার চিরকালীর স্বপ্নের কাছে, প্রত্যাশার কাছে, আশ্রয়-ভালোবাসা ও নির্ভরতার কাছে, প্রবল নিঃসঙ্গতায় একটুখানি স্বস্তি পাবার মতো বিষয়ের কাছে পেঁৗছবার চেষ্টায় পরিণত হয়। অধ্যাপক সাহেব কারো কাছেই চাবিটি খুঁজে পান না, বরং মুখোমুখি হন নানাবিধ বিরূপ অভিজ্ঞতার _ তবে কি কেউ-ই সন্ধান দিতে পারে না সেই মোহন চাবির যা দিয়ে আমরা আমাদের স্বপ্নলোকে প্রবেশ করতে পারবো? তবে কি এই খুঁজে বেড়াবার বাঁকে বাঁকে দাঁড়িয়ে থাকবে কেবলই সন্দেহ অবিশ্বাস, জটিলতা, কূটিলতা? গল্পের শেষে আমরা দেখি অধ্যাপক অবশেষে এসে পেঁৗছেছেন পতিতাদের ঘরে, বলাবাহুল্য চাবি এখানেও নেই, তবে এই মেয়েরা গল্পটিকে একটি নতুন মাত্রা এনে দেয়। তারা তার মনোরঞ্জনের চেষ্টা করছিলো, কিন্তু তার আগ্রহ ছিলো না বলে তিনি যখন ফেরার পথ ধরলেন, তখন _

মেয়েরা বললো, যাচ্ছেন তাহলে? আমি উত্তর দেবার আগেই আরেকটি মেয়ে বললো, উনি তো চাবি খুঁজতে এসেছিলেন, যান, আপনার যখন চাবি নেই, তখন এখানে থেকে কি করবেন? চাবি পেলে আসবেন, এখানে কয়েকটি দরজা-বন্ধ-করা ঘর আছে। আমরাও যে চাবি খুঁজছি গো...ওরা হাসছিলো, আমি ওদের জন্য মনে মনে কাঁদছিলাম। ওরা খিলখিল করে হাসছিলো, চাবি খুঁজছিগো মহারাজ। আমি মনে মনে হু হু করে কাঁদছিলাম চাবি খুঁজছি গো মহারাজ।

সারা গল্প জুড়ে কোনো চরিত্রই অধ্যাপকের চাবি খোঁজার মর্মার্থ ধরতে পারেনি, পেরেছে এই মেয়েগুলো, এবং বিষয়টিকে তারা আরো তীব্রভাবে ব্যঞ্জনাময় করে তুলেছে, কারণ তাদেরও রয়েছে কয়েকটি দরজা-বন্ধ-করা ঘর এবং তারাও খুঁজছে সেই মোহন চাবি। তারা জানে স্বপ্নলোকের সন্ধান তারা পায়নি, আমরা তা-ও জানি না। চাবি খুঁজছি গো মহারাজ এই তীব্র আকুলতা ও হাহাকার তাই মানুষের সমস্ত না পাওয়াকে মূর্ত করে তোলে।



৩.
এএ সময়েরই আরেকজন জাতশিল্পী মাহমুদুল হক। তাঁর খ্যাতি ও সাফল্য উপন্যাসের পথ বেয়ে এলেও, তাঁর দুটিমাত্র গল্পগ্রন্থ প্রতিদিন একটি রুমাল ও নির্বাচিত গল্প এবং আরও কিছু অগ্রন্থিত গল্প পাঠকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। মাহমুদুল হক হচ্ছেন সেই রহস্যময় লেখকদের একজন যাঁর প্রতিটি রচনা পাঠককে আলোড়িত করে, যাঁর গ্রন্থপ্রকাশ মনস্ক পাঠকদের কাছে একটি সুসংবাদ বয়ে আনে। খুব বেশি গল্প লেখেননি তিনি, তবু তাঁকে ছাড়া আমাদের গল্পের আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

মাহমুদুল হক তাঁর গল্পে খুব বেশি কথা বলেন না কখনো, বরং তাঁকে বলা যায় সংযমী, আবেগের রাশ টেনে ধরা লেখক। অন্যান্য লেখকরা যে দৃশ্যপটের বিসতৃত বর্ণনার লোভ সামলাতে পারেন না, সেরকম দৃশ্যের বর্ণনায়ও তিনি থাকেন নিরাসক্ত; এবং পছন্দ করেন ইঙ্গিত দিতে _ কখনো কখনো একেকটি ইঙ্গিতই তাঁর গল্প হয়ে ওঠে, কখনো একটি মাত্র বাক্য গল্পের পরিণতি নির্ধারণ করে, কখনো বা একটি মাত্র দৃশ্যকল্প গল্পের প্রেক্ষাপট পাল্টে দেয়।

তাঁর প্রতিদিন একটি রুমাল_এর কথাই ধরা যাক। আপাত নিরীহ জীবনযাপনের মধ্যেও যাদের ঝুলিতে অনবরত জমে উঠছে গ্লানি, কিছুতেই তা থেকে মুক্তি পাওয়া যাচ্ছে না, কিছুতেই ধুয়ে মুছে ফেলা যাচ্ছে না অনিবার্যভাবে জমে ওঠা ওই গ্লানির পাহাড়, এই গল্পের 'নায়ক' _ সবুজ _ তাদেরই প্রতিনিধি, অবিরাম গ্লানি সঞ্চয়ই যার একমাত্র নিয়তি। গ্রামের এক কলেজে পড়ায় সে; ম্লান, ম্রিয়মান, সম্ভাবনাহীন, অনুজ্জ্বল এক জীবন তার। অথচ তার ফেলে আসা শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য এমন ছিলো না; তার বন্ধু আলতাফের ভাষায়_ br /> সস্কুল লাইফে তুই ছিলি আমাদের মধ্যে আদর্শ চৌকস ছেলে। চমৎকার ক্রিকেট খেলতিস, ডিবেটে কচুকাটা করতিস বড় বড় চাঁইদের, ছবি আঁকতিস, কবিতা লিখতিস। স্ট্রাইক হয়ে যেতো দুদ্দাড় তুই ডাক দিলে, আর এখন?

আর এখন ? এখন সে এক গ্রামের কলেজের 'মাস্টার' আর _

ছেলেমেয়ে আগলে ঢাকায় পড়ে থাকে রেখা (তার স্ত্রী )। সব দায়ভাগই তার। সবুজ শুধু মাসের মধ্যে দু'চারবার ঘুরে যায়, মাস পয়লা পয়সা দিয়ে যায়। ইছাপুরায় পড়ে থাকতে তার নিজেরও খুব একটা ভালো লাগে তা নয়; কিন্তু নিরুপায়। ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে। টেনেটুনে চালাচ্ছিলো সে এতোদিন কোনমতো, এখন আর একেবারেই ভালো লাগছে না। সংসার চলার অন্য উপায় থাকলে নির্ঘাৎ ছেড়ে দিতো কলেজের চাকরি, আর পেরে উঠছে না সে।

তো, গল্প এখানে নয়। গল্পটা হচ্ছে, আলতাফ - যে উচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত, জীবনের আনন্দকে উপভোগ করতে চায় তাড়িয়ে তাড়িয়ে _ সবুজকে জোর করে নিয়ে বাইরে বেরোয় বেড়াতে। বেরিয়ে সে নানারকম কাণ্ড করে _ জোরসে গাড়ি হাঁকায়, রাস্তায় অন্য সব গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দেয়, হৈ-হল্লায় মেতে থাকে _ এসব তার চরিত্রের সঙ্গে মানিয়েও যায়, কারণ (সে বলে) _ আমি সারাদিন, সারা জীবনভর ভীষণ উত্তেজনার ভেতর থাকতে চাই, উত্তেজনাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায়! কিন্তু সবুজের চরিত্রের সঙ্গে এসব একেবারেই বেমানান। সে এসব দুদ্দাড় কর্মকাণ্ডে রীতিমতো পীড়িত বোধ করে। তারা একবার শহরের বাইরে বনভূমির কাছে গিয়ে বসে _ সেখানেও আলতাফ জীবনের পক্ষে, আনন্দের পক্ষে সোচ্চার, আর সবুজ যথারীতি ভেঙ্গে পড়া মানুষ _

আমি আর পারছি না। একবার ঢাকা, একবার ইছাপুরা, এ আর ভালো লাগছে না। ওখানে যা পাচ্ছি এ বাজারে তা এমন হাস্যকর! জীবন চলে না।

ফেরার পথে আলতাফ এক রিকশারোহী বিষণ্ন তরুণীকে তাড়া করে, পাত্তা না পেয়ে তার রিকশাটাকেই ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়; এবং সবুজকে বাসায় পেঁৗছে দিয়ে ঘটনাটার ব্যাখ্যা দেয় এভাবে _

দোষগুণ যাই বলিস না কেন আমার ধরনটাই এখন এই। আমার যা প্রয়োজন আমি তা জোর করে আদায় করে নেই, কারো মুখ চেয়ে বসে থাকি না হা-পিত্যেশ করে। যেখানে তা সম্ভব নয় সেখানে গায়ের জোর খাটাই, প্রয়োজন হলে উড়িয়ে দেই, নিজের অস্তিত্বের জন্য এইসব করতে হয় আমাকে। বুঝতে পারছি খুব খারাপ লাগছে তোর, আমি দুঃখিত। মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা কর, ভুলে যা সবকিছু, দেখবি সবকিছু আবার কেমন ফর্সা হয়ে গেছে। দুনিয়াটাই এভাবে চলছে বন্ধু, ভুলে যাবার ক্ষমতা পর্বতপ্রমাণ হওয়া চাই ! br /> ককিন্তু সবুজ কি ভুলতে পারে সবকিছু? তার স্বভাব তো আলতাফের সম্পূর্ণ বিপরীত, আলতাফ যা সহজেই পারে সবুজের পক্ষে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। নইলে তো আর ঢাকায় কোনো একটা কর্মসংস্থানের জন্য তাকে আলতাফের মুখের দিকে চেয়ে হা-পিত্যেশ বসে থাকতে হতো না, নিজের জীবনকে এমন দুর্দশাপূর্ণ করে তুলতে হতো না! গল্প শেষ হয়ে যায় এখানেই। কোনো কোনো পাঠক হয়তো ভাববেন _ এ গল্পের মানে কি? কেবল জনৈক আলতাফের তারুণ্যের উচ্ছ্বাসমাখা কর্মকাণ্ডের বিবরণ ছাড়া এ গল্পের মধ্যে আছেটা কি? কিন্তু যারা একটু মনোযোগী পাঠক, তারা এ প্রশ্ন নিশ্চয়ই তুলবেন যে, সবুজ আলতাফের কথামতো আদৌ সবকিছু ভুলে যেতে পেরেছিলো কী না। গল্পের কোথাও এ সম্বন্ধে কিছু বলা নেই। কিন্তু আলতাফের _

ভীষণ ঘেমে গেছিস, মুখ মুছে নে _ বলার প্রেক্ষিতে _ সবুজ পকেট হাতড়ালো। রুমাল খুঁজে পেল না। বাঁশবনের তলায় রুমাল পেতে বসেছিলো, মনে পড়লো ফেলে এসেছে। প্রায়ই ফেলে আসে, রেখা বলে এতো রুমাল হারাও কি করে!

অংশটি পড়ে গল্প সম্বন্ধে নতুন করে ভাবতে হয়। আমরা তো প্রতিদিনই আমাদের দেহে জমে থাকা ঘাম-ধুলো-ময়লা মুছে ফেলি রুমাল দিয়ে _ সেই রুমাল যদি হারিয়ে যায় তাহলে কি উপায় হবে? সমস্ত ঘামধুলোবালিময়লাআবর্জনা জমা কি হবে না শরীরে? এই গল্পের রুমালটি তো কেবল নিছক একটি রুমালই নয় বরং এ যেন এক উজ্জ্বল প্রতীক _ যা দিয়ে জীবনযাপনের গ্লানিগুলো মুছে ফেলা যায়। কিন্তু প্রতিদিন একটি করে রুমাল হারিয়ে গেলে মোছা আর হয়ে ওঠে না, কেবল জমা হতে থাকে গ্লানিগুলো _ জমা হতে হতে গ্লানির পাহাড় জমে ওঠে, জীবনটাই হয়ে ওঠে বিপুল গ্লানিময়। রুমালের আদলে ব্যবহৃত এই প্রতীকটির কারণেই গল্পটি হয়ে ওঠে অনন্যসাধারন। শুধু মাহমুদুল হকের গল্পগুলোর মধ্যেই নয় _ সমগ্র বাংলা সাহিত্যেই এমন গল্পের উদাহরণ বিরল। এত অল্প কথায়, এত সংযম, এত উজ্জ্বল ইঙ্গিতময়তায় মানবজীবনের এক রূঢ় সত্যের এই অসামান্য রূপায়ন খুব বেশি ঘটেনি আমাদের সাহিত্যে। br /> মমাহমুদুল হকের চরিত্রগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই _ সবুজের মতো _ জীবন যাপনে ম্লান-ম্রিয়মান-ব্যর্থ ও নিঃস্ব। তাদের আচার-আচরণ, কথাবার্তা, হাবভাব স্পষ্টতই বলে দেয় _ তাদের জীবনে কোনো একটা অঘটন গেছে কিংবা প্রতিনিয়ত অঘটন ঘটেই চলেছে। এই চরিত্রগুলো বিষণ্ন্ন ও নিঃসঙ্গ, জীবনের প্রাত্যাহিকতায় বেমানান ও বেখাপ্পা _ অনুজ্জ্বল ও সম্ভাবনাহীন তাদের জীবনযাপন। ফলে দেখা যায়, দৈনন্দিন ব্যর্থতা ও দুঃখবোধ ঢাকতে তারা আশ্রয় নেয় তাদের ফেলে আসা সোনার শৈশবে। কখনো কখনো হয়তো শৈশবটিও স্বর্নালী নয়, তবু তারা ফিরতে চায় সেখানেই _ কারণ ওখানে আশ্রয় আছে, অবোধ আনন্দ আছে, দুঃখবোধের বিপরীতে সুখের বিশাল আকাশ আছে।

হৈরব ও ভৈরব গল্পের হৈরবও স্মৃতিভারাক্রান্ত মানুষ। ব্যর্থ, ম্রিয়মান, নুইয়ে পড়া, জীবনের কাছে পরাজিত এক মানুষ সে। বংশানুক্রমে ঢাকী সে; ঢাকঢোল তার জীবন ও জীবীকা। একসময় তাদের জীবনে ঔজ্জ্বল্য ছিলো _ অন্তত সে তাই-ই মনে করে; তখন 'বাবু'রা ছিলেন, নানান পালাপার্বনে তাদের বাড়িতে হৈরবদের মতো আরও অনেক ঢাকীদের ডাক পড়তো_

কয়কীর্তনের ঢাকীদের কি দাপটটাই না ছিলো একসময়, পালাপার্বনের আগে সারাদেশ থেকে বায়না করতে আসতো মানুষজন। বনেদি বাবুদের বাড়ি না হলে তারা বায়না ফিরিয়ে দিয়েছে কতোবার, সেই তারাই এখন ঋষিদাশদের সঙ্গে বাঁশ আর বেতের ঝুড়ি বুনে কোনোমতে নিজেদের পেট চালায়, চুরি ডাকাতি করে বেড়ায়। সময়ে কি না হয়; মাটিতে পড়া ডুমুর , তার আবার গোমর কিসের। br /> এএখন আর সেই দিন নেই, বাবুরা দেশ গাঁ ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছে ওই পাড়ে, সবকিছু ছেয়ে গেছে অভাব, দারিদ্র আর বেলেল্লাপনায় _ এখন নবমীর রাতে পূজাকমিটির ছেলেছোকরারা 'খানকি' নাচাতে চায়। হৈরব তাই 'পা বিছিয়ে' কাঁদে, একা একা। স্মৃৃতির জাবর কাটে, কষ্ট সইতে না পেরে কখনো কখনো নিজের মৃতু্য কামনা করে _

'ঈশ্বর, ঈশ্বর আমারে তুইলা নাও _' হৈরব নিজের কাছে কাঁদবে বলে পা বিছিয়ে বসে। কতো কথা মনে পড়ে, মনে পড়ে সিরাজদিখাঁর সেই পাতক্ষীরের কথা, জিভে স্বাদ লেগে আছে এখনো। মনে পড়ে রামপালের কলামুলোর কথা, গাদি ঘাটের কুমড়ো, আড়িয়লবিলের কই মাছ, কতো কিছু। আতরপাড়ার সেই দই, আহারে সব গেল কোথায়। গোটাগ্রাম জুড়ে ছিল কদমের বন, বর্ষার নদী ধীরে মন্থর গতিতে ফেঁপে ফেঁপে উঠে শেষে কদমের বনে গিয়ে ইচ্ছে করে পথ হারিয়ে 'এ আমার কি হল গো' ভান ধরে ছেলেমানুষিতে মেতে উঠতো। এখন গ্রাম কি গ্রাম উজার; দেশলাইয়ের কারখানা গিলে ফেলেছে সবকিছু। কদমের সে বনও নেই, নদীর সেই ছেলেমানুষিও নেই.....। সবকিছু দেখে, সব কথা ভেবে হৈরব এ সিদ্ধান্তেই পৌঁছায়, অনেক কিছু তার দেখা হয়ে গেছে, অনেক , অনেক, আর দরকার নেই তার দেখার, 'চক্ষু তো দুইখান, আর কতো দেখাইবা, ঈশ্বর আমারে তুইল্লা নাও _'

এই যখন জীবন _ অভাব, দারিদ্রই যখন সার, অন্যের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর ভরসা করে বেঁচে থাকা, চারদিকে কেবল ভাঙনের সুর, অতীতের সুখস্মৃৃতিচারণ ছাড়া আর কিছু নেই _ তখন গনি মিয়ার কাছ থেকে ধার করা টাকা হৈরব শোধ করে কিভাবে? গনি মিয়া এসে টাকার জন্য চোটপাট করে, ভিটেবাড়ি বিক্রি করতে বলে, তার বিধবা বোনের 'দয়া'র দিকে কুনজর ফেলে _ যেন সবকিছু গিলে ফেলতে এসেছে। অবশেষে 'দয়া'র রংঢংয়ের কাছে হেরে গিয়ে 'বাজনা' শুনতে চায়। হৈরবের ছেলে ভৈরব এবার বাপের মতো করেই ঢাকে আওয়াজ তোলে _

যহন মনিষ্যি আছিলো না, তহন বাজনা আছিলো, পর্বত বাইজা উঠছে, জল বাইজা উঠছে, মাটি বাইজা উঠছে, ধরিত্রি বাইজা উঠছে, বাইজা উঠছে আকাশ বাইজা উঠছে মনুষ্যজন্ম, বাইজা উঠছে মনুষ্যধর্ম, বাইজা উঠছে মানবজীবন, ...বাবু হুনতাছেন? ঢাকে কেমনে কথা কইতাছে হুইনা দ্যাহেন। দশখুশি বাবু, চৌদ্দমাত্রা, মানবজীবন কথা কইতাছে বাবু! দশখুশি বাবু, চৌদ্দমাত্রা, মনুষ্যধর্ম বোল তুলতাছে, আখিজলে আখিজলে, টলমল টলমল, ধরাতল ধরাতল, রসাতল, হা

ঢাকের বাজনা নিছক বাজনা তো নয় ঢাকীদের কাছে, তাদের হাতে মানবজীবন বেজে ওঠে, বেজে ওঠে মনুষ্যধর্ম। পাহাড় বাজে, ধরিত্রি বাজে, জল-মাটি-আকাশ বাজে। ভৈরবের এমনতর বাজনাতে গনি মিয়া ভয় পেয়ে যায়, কারণ ভৈরব যেন এখন আর ঢাক বাজাচ্ছে না, বাজাচ্ছে অন্য কিছু _ ফিরান দিয়া বহেন,..দশখুশি বাজাই দ্যাহেন ক্যামনে, মাইনষের চামড়ার ছানিতে দ্যাহেন কেমুন বাজে... যেন স্বয়ং মানুষকেই বাজিয়ে চলেছে সে তার সমস্ত আক্রোশ মিটিয়ে। কিন্তু একসময়_

গনি মিয়ার পিঠ নয়, পরিশ্রান্ত ভৈরব একসময় অবাক বিস্ময়ে দেখে এতোক্ষণ সে তার নিজের ঢাকের গায়েই সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত হেনেছে; চামড়ার দেয়াল আর ছানি ফেঁসে গেছে, চুরচুর হয়ে ছিটকে পড়েছে টনটনে আমকাঠ, বেঘোরে নিজের ঢাকটাকেই চুরমার করেছে এতোক্ষণ।

গল্পের গতিমুখ ঘুরে যায় আবার। নিপীড়িত হৈরব বা ভৈরবদের হাতে গনি মিয়াদের পিঠের চামড়ার দুরবস্থা দেখে যখন একটু খুশি হওয়ার কথা ভাববেন পাঠক তখনই লেখক দেখিয়ে দেন _ গনি মিয়ার পিঠ নয়, ভৈরব নিজের ঢাকটারই বারোটা বাজিয়েছে এতোক্ষণ। ইচ্ছে করলেই তো নিপীড়কদের পিঠের চামড়া তুলে নেওয়া সম্ভব নয়, ওটা স্লোগানে সম্ভব, কিংবা সম্ভব তথাকথিত বিপ্লবী লেকখদের ইচ্ছেপূরণের গল্পে। মাহমুদুল হক স্লোগানে বিশ্বাসী নন, বিপ্লবীও নন, তিনি কেবল মানুষের প্রকৃত রূপটি আবিষ্কার করতে চান, এবং তা করতে গিয়ে তাদের ব্যর্থতা, হাহাকার আর বেদনারই আবিষ্কার ঘটে যায় তাঁর শক্তিশালী কলমে।

এই গল্পটি থেকে দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে একটি বিশেষ কারণে। মাহমুদুল হক তাঁর গল্প-উপন্যাসে আমাদের চারপাশে যে ভাষাহীন বিপুল জগৎ রয়েছে তাদেরকে দিয়ে কথা বলিয়েছেন। তাঁর রচনায় পাখি কথা বলে, কথা বলে বৃক্ষ ও নদী, ফুল ও পাতা, এমনকি জড়জগৎকেও তিনি করে তোলেন অনুভূতিসম্পন্ন। এইসব ক্ষেত্রে তিনি জগদীশ চন্দ্র বসুর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন বলে মনে হয়। বর্ষার নদী ধীরে মন্থর গতিতে ফেঁপে ফেঁপে উঠে শেষে কদমের বনে গিয়ে ইচ্ছে করে পথ হারিয়ে 'এ আমার কি হল গো' ভান ধরে ছেলেমানুষিতে মেতে উঠতো _ বাক্যটি পড়ে কি মনে হয় না, এই নদীরও প্রাণ আছে, আছে তীব্র অনুভূতি! এরকম অসংখ্য উদাহরণ তাঁর গল্প উপন্যাস থেকে দেয়া যাবে, এই আলোচনায় সে চেষ্টা থেকে বিরত থাকা গেলো। আবার _ যহন মনিষ্যি আছিলো না, তহন বাজনা আছিলো, পর্বত বাইজা উঠছে, জল বাইজা উঠছে, মাটি বাইজা উঠছে, ধরিত্রি বাইজা উঠছে, বাইজা উঠছে আকাশ বাইজা উঠছে মনুষ্যজন্ম, বাইজা উঠছে মনুষ্যধর্ম, বাইজা উঠছে মানবজীবন _ অংশটিতেও তাঁর ওপর জগদীশচন্দ্রের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। জগদীশ যে তত্ত্ব বিজ্ঞানের ভাষা ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মাহমুদুল হক একই কাজ করেছেন সাহিত্যের ভাষা ব্যবহার করে _ সেটা হলো আমাদের চারপাশের এই বিপুল সৃষ্টিজগতের কোনোকিছুই ভাষাহীন নয়, সবকিছুরই ভাষা আছে _ আমরা কেবল তা বুঝতে পারি না। একজন লেখকের ওপর তাঁর পূর্ববর্তী এক বা একাধিক লেখকের প্রভাব থাকতে পারে একথা সর্বজনবিদিত, কিন্তু কোনো লেখক একজন বিজ্ঞানীর তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন এমন কোনো উদাহরণ আমি অন্তত দেখিনি।

মুক্তিযুদ্ধ মাহমুদুল হকের গল্প-উপন্যাসে বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। এই শ্রেনীভুক্ত গল্পগুলোর মধ্যে বুলু ও চড়ুই গল্পটি ভিন্নমাত্রিক ঔজ্জ্বল্যে ভাস্বর। ছোট্ট্ব একটি গল্প। পুরো গল্প জুড়ে 'আনু' নামের এক সদ্য তরুণের কৈশোরিক হৈ-হল্লা জ্জ সে তার বোন বুলুকে নানাভাবে ডেকে চলেছে, 'বুলু-অ্যাই বুলু-বুলটি-বুলিয়া-বুলুপা-বুলুমনি-বুলবুলি-আপামনি'জ্জ ইত্যাদি ইত্যাদি; আর এই ডাকের পরিপ্রেক্ষিতে বুলুর নানান ধরণের ভাবনা। আনুটা সারাজীবনই এমন। হৈ-চৈ-হল্লা-চিল্লা করতে পছন্দ করে, একমুহূর্ত সুস্থির থাকতে পারেনা। তার নানান কাণ্ডকারখানা এই পরিবারটিকে বহুভােেব ভুগিয়েছে, এমনকি তারই জন্য তার বাবাকে সরকারী চাকরিটি হারাতে হয়েছে। তো, এই আনু যুদ্ধে গিয়েছিলো। ব্যাপারটি চেপে রাখা সম্ভব হয়নি। ঘটনা প্রকাশিত হয়ে পড়লে পাকিস্তান আর্মিরা তার বাবা আর বুলুকে ধরে নিয়ে যায়। br /> যুদ্ধ শেষ।
সবাই ফিরে এসেছে।
কিন্তু সর্বনাশ যা হবার তা হয়ে গেছে। যুদ্ধ এক ভয়াবহ সর্বনাশের চিহ্ন রেখে গেছে তাদের পরিবারে যার শিকার বুলু।
ববুলু এখন একা একা ঘরে শুয়ে রাজ্যের কথা ভাবে; সময়কে চলে যেতে দেখে। পুরো গল্পেই আমরা বুলুকে এভাবে একটি ঘরে শুয়ে আনুর ওই ডাকাডাকির প্রেক্ষিতে এসব ভাবতে দেখি। কিন্তু এতো ডাকাডাকি করে আনু তাকে কি বলতে চায় ? গল্পের শেষে আমরা দেখি, আনু বুলুর ঘরে ঢুকে তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে _

'এই দেখো' _ মেঝের ওপর পড়ে থাকা খড়কুটো আর চড়ুইপাখির একটি শাবকের দিকে সে আঙুল তুলে দেখায়। _ 'বাসা থেকে বাচ্চাটি পড়ে গিয়েছিলো, কি জানি কি করে। যতোবার তুলে দিই ততোবারই ওরা ঠুকরে ঠুকরে ওকে নিচে ফেলে দিচ্ছে,অবাক কাণ্ড না?' br /> বুলু বললে, 'ওরা তো তোদের মতো মানুষ নয়!'
তার মানে? তোর কথার মাথা মুন্ডু বুঝি না' _
'মানুষ বড় ভালো,' বুলু বললে, তার চোখ তখন ভেজা ভেজা। বললে, 'মানুষ বড় সুন্দর'।
এই তো গল্প। অথচ কী অসামান্য মহিমায় ভাস্বর ! যে বুলু নির্যাতিত, যে বুলুর স্বপ্নের মৃতু্য ঘটেছে বীভৎসভাবে_ ওই মানুষের মতো দেখতে পশুদের দ্বারাই; বুলু সেই মানুষকেই বলছে ভালো, সুন্দর! কারণ সে তবু বেঁচে আছে মানুষেরই স্নেহছায়ায়, মমতায় ও যত্নে।
যতো কিছুই ঘটুক _ মানুষ খুব ভালো, মানুষ খুব সুন্দর _ এই হচ্ছে পাঠকের কাছে মাহমুদুল হকের মেসেজ। সমস্ত গল্পের মধ্যে দিয়ে তিনি তাঁর পাঠকদের কাছে প্রধাণত এই কথাটিই বলতে চান _ সব কিছুর পরও মানুষ ইতিবাচক প্রাণী; মানবতার পক্ষে, মানুষের পক্ষে, মানবজীবনের পক্ষে মাহমুদুল হকের এই দৃঢ় অবস্থানই তাঁর গল্পের প্রাণ।

৪.
হহাসান আজিজুল হক বাংলাদেশের সাহিত্য রুচির প্রেক্ষাপটে এক বিস্ময়কর চরিত্র। তিনি শুধুই গল্পকার, উপন্যাসের ধারে কাছে খুব একটা যাননি (যা এদেশের কথাশিল্পীদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য যে, সবাই একই সঙ্গে গল্পকার ও ঔপন্যাসিক _ এই কিছুদিন আগে কেবল তিনি তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস লিখলেন), শুধুমাত্র গল্পচর্চা করেও যে দেশের অন্যতম প্রধান লেখকে পরিণত হওয়া যায় তিনি তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। হাসানের গল্পের বিষয়বস্তুও অন্য সবার থেকে আলাদা। যে শ্রেণীতে তাঁর বেড়ে ওঠা _ তাকে তিনি বিষয়বস্তু করেননি; সমাজের ক্ষয়ে যাওয়া, নিসপ্রভ, সম্ভাবনাহীন, পরাজিত মানুষ তার গল্প-ভুবনের প্রধান অনুষঙ্গ। শ্রেণী-বৈষম্যের এই সমাজে তার গল্পের প্রাসঙ্গিকতা তাই অনস্বীকার্য। আর শুধু শ্রেণী-সচেতনতার কথাই বা বলি কেন, তিনি তাঁর গল্পে কতোভাবে ভেঙেচুরে যে জীবন ও পৃথিবীকে দেখিয়েছেন, কতগুলো কোণ থেকে যে জীবনের ওপর আলো ফেলেছেন তার কোনো হিসেব-নিকেশ নেই। তাঁর গল্পে সমাজ ও জীবন সম্বন্ধে কোনো ভাববিলাস নেই, যা দেখেন তা ঠিক তেমন করেই তুলে আনতে প্রয়াসী হন, এতোটুকু আবেগ নেই কোথাও, স্বপ্ন আছে বটে, নেই স্বপ্ন নিয়ে মোহগ্রস্থতা। এবং তাঁর ভাষা_ এ এমন এক সম্পদ যে তাঁর গল্প পাঠের সময় কবিতা পাঠের আনন্দ হয়, গদ্যভাষাকে তিনি এমনই এক উঁচু পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। বাঙালির জীবনে অনেক কবিতা যেমন স্মৃতির অন্তর্গত হয়ে গেছে, তেমনি গেছে হাসানের কয়েকটি গল্পও। এমন কোনো গল্প-পাঠক নেই যিনি আত্নজা ও একটি করবী গাছ গল্পটি অসংখ্যবার পড়েননি, কারণে-অকারণে গল্পটির কথা তার মনে পড়েনি। পৃথিবীর সকল সফল লেখকই আসলে স্মরণযোগ্য লেখক, উদ্ধৃতযোগ্য লেখক। কোনো কোনো লেখককে যে জীবনের নানা পর্যায়ে, নানা প্রয়োজনে আমরা উদ্ধৃত করি, তার কারণ _ আমার মতে _ তাঁদের লেখাগুলো আমাদের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছে, আমাদের জীবনকে কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত করেছে। হাসানও তেমন লেখক। ওই গল্পটি ছাড়াও আরো অনেক গল্পের কথাই এক নিঃশ্বাসে বলে যাওয়া যায়, যেগুলো, ধারণা করি _ বাংলা কথাসাহিত্যে ইতিমধ্যেই স্থায়ী আসন গেড়ে নিয়েছে। যেমন _ শকুন, তৃষ্ণা, মন তার শঙ্খিনী, আত্নজা ও একটি করবী গাছ, আমৃতু্য আজীবন, শোনিত সেতু, খাঁচা, জীবন ঘষে আগুন, নামহীন গোত্রহীন, সাক্ষাৎকার, পাবলিক সার্ভেন্ট, মা-মেয়ের সংসার ইত্যাদি।

হাসানের সবচেয়ে বিখ্যাত গল্প আত্নজা ও একটি করবী গাছ কেন এমন বিপুল গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে সেটি একবার বিচার করে দেখলেই তাঁর শক্তিমত্তার জায়গাটিকে শনাক্ত করা সম্ভব বলে মনে করি। এখন নির্দয় শীতকাল, ঠাণ্ডা নামছে হিম, চাঁদ ফুটে আছে নারকেল গাছের মাথায় _এই বাক্য দিয়ে গল্প শুরু হয়ে প্রায় এক প্যারা জুড়ে চলে পরিবেশ বর্ণনা। তৃতীয় প্যারায় একটি চরিত্র, ইনামের, দেখা মেলে। একটু পর আরো দুজন মিলে রওয়ানা হয়, হেঁটে চলে, তাদের চারপাশের পরিবেশ-প্রতিবেশের অনুপুঙ্খ বর্ণনা সহ গল্পও এগিয়ে চলে, কিন্তু তাদের গন্তব্য থাকে অস্পষ্ট। শুধু ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে তাদের ক্লিষ্ট, ব্যর্থ, হতাশ জীবন-যাপনের ম্রিয়মান চিত্র। গল্পের শেষে আমরা দেখি তারা একটি বাড়িতে উপস্থিত হয়েছে _ বোঝা যায় এটইি তাদের গন্তব্য ছিলো _ এবং তাদের দুজন বাড়ির বুড়োটার হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে তার মেয়েকে শয্যাগত করতে গেছে, আর ইনাম বসে বসে বুড়োর গল্প শুনছে। এই তো গল্প! এই সাদামাটা গল্পটি কেন এতো দীর্ঘকাল ধরে পাঠককে আপ্লুত করে যাচ্ছে? গল্পের বুড়ো, দেশভাগের ফলে নিজ বাসভূম থেকে ছিটকে পড়া মানুষ _ আর, যে দেশ ছেড়েছে তার ভেতর বাইরে নেই, সব এক হয়ে গেছে _ এবং এখানে সে পরিবার-পরিজন নিয়ে না খেয়েই মরে যেতো যদি ওরা না আসতো। বুড়ো তো মরতে চায় না, চায় বেঁচে থাকতে, কিন্তু এই বেঁচে থাকাটা কী ভয়াবহ গ্লানিকর! স্বদেশ ত্যাগের বেদনা বেশ ভালোভাবেই টের পাওয়া যায়, কিন্তু তারচেয়ে তীব্র এই গ্লানিবোধ, তারও চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তার বেঁচে থাকা। জীবনের হলাহল সে প্রতিমূহূর্তেই পান করছে, বিষ দিয়ে সে এই জীবনের ইতি টানতে চায়, পারে না, পারবে বলে মনেও হয় না, যতো গ্লানিময়ই হোক মৃতু্যর চেয়ে তার কাছে জীবনই বড়, নইলে কী আর জীবন ধারণের জন্য টাকার বিনিময়ে নিজ কন্যাকে অন্যের শয্যাসঙ্গী হতে দেয় কেউ? এই গল্পের শেষে একটি অসাধারণ প্যারা আছে _

বুড়ো গল্প করছে...আমি যখন এখানে এলাম, হাঁপাতে হাঁপতে, কাঁপতে কাঁপতে সে বলছে, বুঝলে যখন এখানে এলাম _ আমি প্রথম একটা করবী গাছ লাগাই... তখন হু হু করে কে কেঁদে উঠল, চুড়ির শব্দ এলো, এলোমেলো শাড়ির শব্দ আর ইনামের অনুভবে ফুটে উঠলো নিটোল সোনারঙের দেহ_ সুহাস হাসছে হি হি হি _ আমি একটা করবী গাছ লাগাই বুঝলে? বলে থামলো বুড়ো, কান্না শুনল, হাসি শুনল, ফুলের জন্য নয়, বুড়ো বলল, বিচির জন্যে, বুঝেছ, করবী ফুলের বিচির জন্যে। চমৎকার বিষ হয় করবী ফুলের বিচিতে। আবার হু হু ফোঁপানি এলো _ প্রথমে একটা করবী গাছ লাগাই বুঝেছ আর ইনাম তেতো তেতো _ এ্যাহন তুমি কাঁদতিছ? এ্যাহন তুমি কাঁদতিছ? এ্যাহন কাঁদতিছ তুমি?

এই অংশটিই গল্পটির মূল শক্তি। দেশভাগের ফলে শেকড়চু্যত মানুষের তীব্র যন্ত্রণা আর বেঁচে থাকবার তীব্র আকুলতা ধরা পড়েছে এই অংশটুকুতে এক অসামান্য ইঙ্গিতময়তায়। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আমাদের উপহার দিয়েছিলো দেশভাগের মতো এমন এক বিমূঢ় অভিজ্ঞতা যে, বাস্তুচু্যত একজন মানুষ অভিবাসী হয়ে 'এখানে' এসে প্রথমেই লাগিয়েছিলো একটি করবী গাছ _ ফুলের জন্য নয় ... বিচির জন্যে... করবী ফুলের বিচির জন্যে। চমৎকার বিষ হয় করবী ফুলের বিচিতে। দেশত্যাগের সমান্তরালে বিষপানের এই চিত্র দেখে শিউরে উঠি আমরা আর গল্পের একদম শেষে এসে যখন বুড়োকে কাঁদতে দেখি _ এ্যাহন তুমি কাঁদতিছ? এ্যাহন তুমি কাঁদতিছ? এ্যাহন কাঁদতিছ তুমি? _ তখন আমরা নিজেরাই কেঁদে উঠি। দেশভাগের বিপর্যয়জনিত বাঙালির কান্নাকে এক অসাধারণ কুশলতায় ধরেছেন হাসান এই গল্পে, এবং একটি গল্পে যখন একটি জাতির কান্না মূর্ত হয়ে ওঠে তখন যে সেটি এই জাতির স্মৃতির অন্তর্গত হয়ে যাবে তাতে আর সন্দেহ কি? হাসান হচ্ছেন সেই অসামান্য গল্পশিল্পী যিনি তাঁর গল্পে এই জাতির কান্নাকে মূর্ত করে তুলতে পেরেছেন। br /> আআগেই বলেছি সমাজের ক্ষয়ে যাওয়া, নিসপ্রভ, সম্ভাবনাহীন, পরাজিত মানুষ তার গল্প-ভুবনের প্রধান অনুষঙ্গ। আমার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে (ভোরের কাগজ সাময়িকী, ২৫ ডিসেম্বর ১৯৯৮) তিনি বলেছিলেন _

আমি সাধারণত আশা-আশ্বাসের গল্প লিখতে পারি না বরং আমার গল্পের জগৎটি এমন যেন সেখানে ফুল ফোটে না, পাখি গায় না, শিশুরা হাসে না, মানুষ সংসারজীবন যাপন করে না...আমি সব মানুষের জন্য মুক্ত জীবন চাই, সেই কারণেই বর্তমানের প্রচণ্ড ধ্বংসের ছবি আঁকি।

(তাঁর এই চাওয়া তাঁর গল্প পড়েও টের পাওয়া যায় _ আর কিছু না হোক কেবল বেঁচে থাকা, কেবলই বেঁচে থাকার সাধ-স্বপ্ন-সংগ্রাম তাঁর গল্পে বারবার ঘুরেফিরে আসে।) পাঠক, তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে পড়ে দেখুন ১৯৭৯ সালে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের অন্য ঘরে অন্য স্বর-এর ওপর লেখা তাঁর আলোচনার এই অংশটি _

এই বইয়ের গদ্য শুকনো খটখটে, প্রায় সবটাই ডাঙা; ডাঙার উপর কচি নরম সবুজ গাছপালা জন্মেছে এমনও মনে হয় না। কোথাও একটু দয়া নেই, জল দাঁড়ায় না _বাস্তব ঠিক যেমনটি, তেমনি আঁকা... ইলিয়াসের খোলা চোখের দৃষ্টি সমকালের মূলটুকু দেখে নেয়... আর ঠিক সেটুকুই তিনি লিখতে বসে যান। এইজন্যেই তাঁর লেখায় হাবাগঙ্গারামদের প্রেম নেই। দাম্পত্য, প্রেম, প্রীতি, পিতৃভক্তি, বাৎসল্য ইত্যাদির উপর তিনি যেন বাজ ফেলেছেন। জীবন এইরকম নাকি? এত কুৎসিত? দুপুরের ন্যাড়া মাঠে পোড়া মাটির মতো? আমি তা বিশ্বাস করতে চাই না। চোখের একেবারে ভিতরের দিকে একটু কোমলতা থাকা ভালো।

মনে কি হয় না _ ইলিয়াস সম্বন্ধে বলতে গিয়ে তিনি আসলে নিজেকেই ব্যাখ্যা করেছেন? যে জীবনে ফুল ফোটে না, পাখি গায় না, শিশুরা হাসে না, মানুষ সংসারজীবন যাপন করে না সেই জীবনও কি কুৎসিত নয়? হাসানের গল্প পড়ে তাঁর মতো আমরাও প্রশ্ন তুলতে পারি _ জীবন এইরকম নাকি? এত কুৎসিত? এবং তাঁর মতো করেই বলতে পারি _ চোখের একেবারে ভিতরের দিকে একটু কোমলতা থাকা ভালো।

একটি প্রসঙ্গ এখানে তোলা দরকার। বাংলাদেশের শিবির বিভক্ত সাহিত্য সমাজে হাসানের গল্পের যতোটা রাজনৈতিক বিচার হয়েছে, ততোটা সাহিত্যিক বিশ্লেষণ হয়নি। হলে, তাঁকে কিছুটা বুঝে ওঠা যেতো। এই ক্ষুদ্র মানুষের দেশে তিনি যে কতো বড় মহিরুহ সেটা সাহিত্যের প্রয়োজনেই বিশ্লেষণ করে দেখা প্রয়োজন ছিলো।

এ প্রসঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকার গল্পটির কথা বলা যায়। এটি এমনই এক গল্প যা হাসানের 'সমাজ-সচেতন' শ্রেণী-সচেতন' 'রাজনীতি-সচেতন' ইমেজের সঙ্গে যায় না। যে 'লোকটা গত শতাব্দীর কায়দামাফিক সূর্যাস্ত দেখছিল' আর 'তার চোখে ফুটে উঠেছিল তন্ময় কল্পনা' তাকে ধরে নিয়ে যায় কতিপয় অচেনা লোক, তাকে 'রহমান সাহেব' সম্বোধনে শুরু হয় জেরা, যদিও তার নাম রহমান নয়, হুমায়ুন কাদির। তারা ঠিক কি জানতে চায় পুরো গল্পে তা পরিষ্কার হয় না, বোঝা যায় তারা তার কাছ থেকে একটি স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করছে, কিন্তু কিসের স্বীকারোক্তি তা-ও বোঝা যায় না, বরং তাদের মুখে শোনা যায় _

বুঝতে পারছি আপনি কিছুই স্বীকার করতে চান না। তাতে কিছুই এসে যায় না অবিশ্যি। কারণ আমরা সবই জানি কাজেই আর কিছু জানার নেই। কারণ আমরা কিছুই জানি না অতএব আর কিছুই জানার নেই।

এরকম পরস্পরবিরোধী কথাবার্তা আর রহস্যময় আচার আচরণ পাঠককে বিমূঢ় করে তোলে। মনে হয় যেন কোনো অ্যাবসার্ড নাটকের মহড়া চলছে (গল্পটি লেখাও হয়েছে অ্যাবসার্ড নাটকের ফর্মে)। পারম্পর্যহীন কথাবার্তার আরেকটি উদাহরণ তুলে দেওয়া যাক _ br /> আআমরা নিজেরা নিজেরা একতা আইন-শৃঙ্খলা, দাঁড়িয়ে বসে বা মাটিতে শুয়ে যদি তা কোনোদিন দেখিয়ে দিতে পারি একসঙ্গে একসঙ্গে যে যেখানে আছে ঠিকঠাক পরিকল্পনা ঘাসে ভিটামিন জনকল্যাণ বন্যা পস্নাবন মহামারী বাঁধ দাও লবণ ঠেকাও যতোরকম চালবাজি রকবাজি ঠকবাজি নিলামবাজি জোতদারি মুনাফাখোরি খুন জখম রাহাজানি ভাবনাচিন্তা জাতীয় প্রেস দুই আর দুইয়ে চার আর সাতে ষোলো যার ফলে ছেষট্টি মোট নিশো তেত্রিশ কোটি দেশী বিদেশী চাল গম আটা সব মিলিয়ে সব।

হুমায়ুন কাদির এসব কথাবার্তা-জিজ্ঞাসাবাদ-আচার-আচরণ কোনোকিছুরই অর্থ উদ্ধার করতে পারে না, পারি না আমরাও। অবশেষে অজানা অপরাধে হুমায়ুন কাদিরের মৃতু্যদণ্ড হয়, এবং দণ্ড কার্যকর করার আগে তাকে দুমিনিট ভাববার সুযোগ দিলে সে ভাবে _ br /> অঅনেককাল আগে একবার সবুজ ঘাসের মধ্যে শুইয়া আকাশের দিকে চাহিয়াছিলাম। উহার এক প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্ত দেখা গিয়াছিলো, উহা হালকা নীল ছিলো। পরে উহা চুম্বনের দাগের মতো মিলাইয়া যায়। ইহার পর মানুষের জগতে ফিরিয়া আসি _ তাহাতে নোনা টক গন্ধ আছে এবং আক্রোশ ও ঘৃণা রহিয়াছে এবং ভালোবাসা ও মমতা রহিয়াছে। মানুষের জীবনে কোথায় অন্ধকার তাহার সন্ধান করিতে গিয়া আমি ঘন নীল একটি ট্যাবলেটের সন্ধান পাই _ মানুষ যে সামাজিক, সে নিজের ইতিহাস জানিতে চাহিয়াছে, তাহাতে সর্বদাই অন্ধকার নর্তনকুর্দন করিতেছে। তবু আমি মানুষেরই কাছে প্রার্থনা জানাইব _ কারণ মানুষেই মানুষের গা ঘেঁসিয়া বসিয়া থাকে _ যদিও ওই দাগ দখা যায় না। অসংখ্যবার সঙ্গম করিয়াও যেমন আমি নারীতে ঐ দাগ কখনো দেখি নাই। কোথাও কিছু পাই না বলিয়াই বাধ্য হইয়া আমি শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেই প্রার্থনা ও আবেদন জানাইব। ইতিমধ্যে সব কিছু চমৎকার ঘটিয়াছে। অবশ্য অনেক কিছুই বাকিও রহিয়া গেল কারণ কিছুই শেষ হইবার নহে।

এই গল্পটি, আগেই বলেছি, হাসানের ইমেজের সঙ্গে যায় না। বিষয়বস্তু বা নির্মাণ কৌশলেও গল্পটি তাঁর অন্যান্য সব গল্প থেকে আলাদা। আমরা যে অ্যাবসার্ডিটির ভেতরে বাস করি, বিনা কারণে অজানা অপরাধে আমাদের মৃতু্যদণ্ড হয়ে যায়, আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয় কিন্তু আমরা বুঝেই উঠতে পারি না যে, আমাদের কাছে আসলে কী জানতে চাওয়া হচ্ছে _ তার একটি প্রতীকি উপস্থাপন রয়েছে এই গল্পে। মৃতু্যমুহূর্তেও আমরা কোথাও কিছু পাইনি বলে মানুষের কাছেই প্রার্থনা ও আবেদন জানাই, কারণ মানুষেই মানুষের গা ঘেঁসিয়া বসিয়া থাকে। এই গল্পে ব্যক্তিমানুষের সংকট, তার সমাজ-রাষ্ট্র ও ইতিহাস, মানবজীবন, জীবনের অর্থ কিংবা অর্থহীনতা কিংবা জীবন অর্থহীন জেনেও অর্থ আরোপের চেষ্টা ইত্যাদি নানা বিষয় এক গভীর ইঙ্গিতময়তায় ধরা আছে। যে হাসান চাষীদেরকে জিতিয়ে দিয়ে পুবাকাশে লাল সূর্য উঠিয়ে পাঠকদের নিশ্চিন্ত ঘুমের ব্যবস্থা করেন (শোনিত সেতু), বা গল্পের চরিত্রের মুখ দিয়ে বলিয়েও স্বস্তি না পেয়ে মানুষ যে বেঁচে থাকতে ভালোবাসে সেকথা নিজেই বলেন (তৃষ্ণা), বা চরিত্রের মুখে বসিয়ে দেন বিপ্লবের বুলি _ তুমি মধ্যবিত্ত, তুমি পাতি-বুর্জোয়া, বিপ্লব তোমার শত্রু নয়, কিন্তু তোমার দেরি সইবে, বিপ্লব আসতে দেরি হলে তুমি অপেক্ষা করতে পারো, কিন্তু ওর, এই ক্ষেত মজুরের একমুহূর্ত বিলম্ব সইবে, বিপ্লব তার এক্ষুণি দরকার, এক্ষুণি। এক্ষুণি বিপ্লব হলে সে বাঁচে, বিপ্লব হতে দুদিন দেরি হলে সে দুদিন আগে মরে যায়। তাকে এই কথাটা বুঝিয়ে দাও, সে সঙ্গে সঙ্গে বিপ্লবের পক্ষে লড়ুয়ে হয়ে যাবে (যাবে বৈকি, বাস্তবে না হলেও অন্তত বইয়ের পাতায় তো হবেই, লেখক যেহেতু তাই চাইছেন, চরিত্রের সাধ্য কি স্রষ্টার ইচ্ছের বিরুদ্ধে যায়!) _ এই গল্পে তাঁরই অসম্ভব সংযম আর ইঙ্গিতময়তা আমাদের মুগ্ধ করে! তাঁর এইসব গল্প নিয়ে আলোচনা হয়নি, হয়নি আরও অনেক গল্প নিয়েই যেগুলো নিছক মাঝারি মানের ওপরে ওঠেনি (যেমন _ অন্তর্গত নিষাদ, মারী, উটপাখি, সুখের সন্ধানে, বিমর্ষ রাত্রি, কোথায় ছোবল ইত্যাদি)। হাসান ব্যক্তিগতভাবে আমার অত্যন্ত প্রিয় লেখকদের একজন, তাঁকে আমি ডাকি গল্পরাজ্যের রাজকুমার বলে, কিন্তু তাঁকে নিয়ে অতি-উচ্ছ্বাস তাঁর সনিষ্ঠ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করেছে বলে মনে করি আমি। এই অন্ধ-মুগ্ধতার অবসান হোক, আমাদের গল্পের রাজকুমারকে আমরা না হয় আরেকটু যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ করি। br />
৫.১
ষাটের দশকের যে তরুণ লেখকেরা লিটল ম্যাগাজিনকে কেন্দ্র করে একত্রিত হয়েছিলেন, ভিন্ন কণ্ঠস্বর নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছিলেন, নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাংলাদেশের গল্পে এনেছিলেন নতুনত্বের স্বাদ রাহাত খান তাঁদের সঙ্গে ছিলেন না। এই ধারার বাইরে থেকেই রাহাত খান তাঁর নিজের জন্য একটি স্বতন্ত্র্য স্থান নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। তিনি ষাটের অন্যান্য লেখক থেকে আলাদা, সম্ভবত তাঁর বিকাশের জন্য সত্তরই প্রযোজ্য ছিলো, কিন্তু এ সময়ে এসে দেখা গেলো _ কী বিষয়ে কী প্রকরণে বা ভাষায় তাঁকে যেমন ষাটের চরিত্রের সঙ্গে মেলানো যাচ্ছে না, যাচ্ছে না সত্তরের সঙ্গেও _ যেন এক নিঃসঙ্গ চিত্রকর নির্জনে এঁকে চলেছেন তাঁর পরিপাশ্বর্ের চিত্র। এক অসামান্য নিরাসক্ত দৃষ্টি নিয়ে রাহাত খান তাঁর গল্পে তুলে এনেছেন তাঁর সমকাল ও পরিপাশ্বর্ের চিত্র এর সমস্ত আলো-অন্ধকারসহ, সংকট-সম্ভাবনাসহ আর এর মধ্যে জীবনযাপন করা মানুষগুলো উঠে এসেছে তাদের সকল আশা-আকাঙ্খা-কষ্ট-ক্লান্তি-ভালোবাসা-মমতা-নিস্পৃহতা-বিচ্ছিন্নতাসহ। তারুণ্যের হতাশা, পরাজয়, প্রেম ও আকাঙ্খা, মুক্তিযুদ্ধের প্রাপ্তি ও হারানোর চিত্র নিপুণ কুশলতায় তুলে আনেন তিনি। তাঁর গল্প সমান দক্ষতায় গ্রাম ও নগরজীবনকে ধারণ করতে পারে। নাগরিক ঔদাসিন্য ও নিরাসক্তি যেমন, তেমনি গ্রামীন জীবনের আবহমান ক্ষুধার হাহাকার তিনি সমান মুন্সিয়ানায় তুলে আনেন। চুড়ি, ভালো মন্দের টাকা বা আমাদের বিষবৃক্ষ কিংবা ইমান আলীর মৃতু্যর মতো গল্প খুব শক্তিশালী লেখক না হলে লেখা সম্ভব নয়।

৫.২
বাংলা গল্প তার জন্মের পর থেকেই প্রধানত আখ্যানপ্রধান। গল্পকাররা তাঁদের গল্পে যা কিছু বলতে চান তা বলেন একটি 'গল্প'কে কেন্দ্র করে। অর্থাৎ গল্পে একটি 'গল্প' বা আখ্যান থাকবে এটাই বাংলা গল্পের জনপ্রিয় এবং সর্বাধিক প্রচলিত রীতি। কিন্তু এই রীতির বাইরেও কিছু গল্প লেখা হয়েছে বাংলাদেশে যেগুলোতে আখ্যানকে প্রধান করে তোলা হয়নি, বরং প্রাধান্য দেয়া হয়েছে অনুভূতিকে। এই গল্পগুলোকে আমি অনুভূতি-প্রধান গল্প হিসেবে অভিহিত করতে চাই। ইলিয়াসের নিরুদ্দেশ যাত্রা সেই ধরনের গল্প। এই গল্পে তেমন কোনো সুসংহত 'গল্প' নেই, কিন্তু রয়েছে এমন কিছু যে পড়লে পাঠকের হৃদয় এক কোমল গভীর অনুভূতিতে আক্রান্ত হয়, বারবার গল্পটি পাঠ করতে ইচ্ছে করে, পাঠ করলে এক ধরনের ঘোর-ও তৈরি হয়। মাহমুদুল হকের হৈরব ও ভৈরব গল্পটির ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটে। এই গল্পে একটি 'গল্প' থাকা সত্ত্বেও প্রধান হয়ে ওঠে অনুভূতি। তবে এগুলো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ _ অনুভূতিপ্রধান গল্প লেখা ইলিয়াস কিংবা মাহমুদুল হকের মূল প্রবণতা নয়। এই ধারায় বরং অনেক বেশি কাজ করেছেন জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত। বলা যায়, এই ধারার গল্প রচনার ক্ষেত্রে তিনি দুই বাংলার প্রেক্ষাপটেই এক অনন্যসাধারণ গল্পশিল্পী। আখ্যানের দিকে যে তাঁর খুব একটা মনোযোগ বা আগ্রহ নেই, গল্পগুলোর আয়তন দেখলেই সেই ইঙ্গিত পাওয়া যায় _ তাঁর অধিকাংশ গল্পই ছোটমাপের। কিন্তু এই ধরনের গল্পের একটা অসুবিধা হলো লেখকের অন্বিষ্ট অনুভূতিটা পাঠকের কাছে পেঁৗছে দিতে না পারলে গল্পটি শেষ পর্যন্ত তার গুরুত্ব হারায়, অন্যদিকে অনুভূতিটি যথার্থভাবে সঞ্চার করতে পারলে তা দীর্ঘদিনের জন্য পাঠকের মনে গেঁথে যায় _ এক্ষেত্রে লেখককে ওই পাঠক সময়ে-অসময়ে কারণে-অকারণে নিজেই স্মরণ করেন, উদ্ধৃত করেন _ আর আগেই বলেছি পৃথিবীর সকল সফল লেখকই আসলে স্মরণযোগ্য লেখক, উদ্ধৃতযোগ্য লেখক। এই ধরনের গল্প লেখার আরেকটা বিপত্তি হলো, এগুলো সমালোচকদের মনোযোগ দাবি করতে ব্যর্থ হয়। সমালোচকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই, কারণ একটি অনুভূতিপ্রধান গল্প নিয়ে তারা কী-ই বা বলতে পারেন? অনুভূতিকে ব্যাখ্যা করার উপায় কি? আখ্যানকে ব্যাখ্যা করা যায়, চরিত্রগুলোর আচার-আচরণকেও আখ্যানের প্রেক্ষিতে ফেলে ব্যাখ্যা করা সম্ভব, কিন্তু অনুভূতিকে? একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে। জ্যোতিপ্রকাশের চেয়ে ইলিয়াস অনেক বেশি পঠিত হয়েছেন, ব্যাখ্যাত হয়েছেন _ বিশেষত তাঁর মৃতু্যর পর। কিন্তু নিরুদ্দেশ যাত্রা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা চোখে পড়েনি আমাদের, তাঁর আলোচকরা গল্পটিকে কোনো এক অজানা কারণে এড়িয়ে যান, কারণটি হয়তো অজানা নয় _ তাঁরা আসলে গল্পটিকে ব্যাখ্যা করার ঝুঁকি নিতে চান না। তাঁর মৃতু্যর পর শুধুমাত্র এই গল্পটিকে নিয়ে বাংলাবাজার পত্রিকা'র সাহিত্য সাময়িকীতে দেড়পৃষ্টা ব্যাপি আলোচনা করেছিলেন ফরহাদ মজহার _ কিন্তু একটি গল্প নিয়ে এতো দীর্ঘ আলোচনা করেও শেষ পর্যন্ত এমন কোনো সিদ্ধান্তে পেঁৗছাতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন যে, গল্পটি আসলে কী বোঝাতে চায়! হাসান আজিজুল হকও গল্পটি সম্বন্ধে বিরূপ মন্তব্য করেছেন _ গল্পের চরিত্রের সংকীর্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করার যে মূল প্রবণতা আছে ইলিয়াসের লেখায়, এই গল্পে তা দেখা দিয়েছে চরমভাবে...গল্পটি ধাঁধার গা ঘেঁসে গেছে। বলতে দ্বিধা নেই, এমন আত্নকরুণায় ভরপুর লেখার মধ্যে যে দুর্বোধ্য ও কঠিন আবরণ আছে পাঠকদের পক্ষে তা ভেদ করা শক্ত। জ্যোতিপ্রকাশের ক্ষেত্রেও তেমনটিই ঘটেছে। তাঁর অধিকাংশ গল্প অনুভূতিপ্রধান হওয়ায় এবং গল্পগুলোর নির্মাণ-কৌশলে অ্যাবস্ট্রাকশনের আধিক্য থাকায় সমালোচকরা তাঁর ধারেকাছে যাবার ঝুঁকি নেননি। অনুভূতিকে ব্যাখ্যা করার সাহস রাখেন এমন কোনো সমালোচক তাঁর গল্পগুলোকে নিয়ে আলোচনা করলে আমাদের গল্পসাহিত্যের এই ম্রিয়মান ধারাটি সম্বন্ধে আমরা একটি ধারণা পেতে পারি _ আমি ব্যক্তিগতভাবে সেই সাহস রাখি না, বিনয়ের সঙ্গে সেটা স্বীকার করে নিচ্ছে। অবশ্য জ্যোতিপ্রকাশ যে কেবল ওই ধরনের গল্পই রচনা করেছেন তা নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকেও অবহেলা করেননি তিনি _ রংরাজ ফেরে না গল্পটি সেই প্রমাণ দেয়। এবং এই গল্পটির বিপুল গ্রহণযোগ্যতা এ-ও বুঝিয়ে দেয়, রিয়েলিস্টিক ও আখ্যানপ্রধান গল্পেও তিনি সমান পারঙ্গম।

৫.৩
ষষাট দশকে একসঙ্গে কয়েকজন নারী লেখকের আগমন ঘটেছিলো _ সেলিনা হোসেন তাঁদের অন্যতম। গ্রামীন জীবনের খুঁটিনাটি তাঁর গল্পে আশ্চর্য দক্ষতায় উঠে আসে কিন্তু নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনও তিনি খুব ভালো করে চেনেন _ একথা তাঁর গল্পই বলে দেয়। তাঁর তৃতীয় গল্পগ্রন্থ খোল করতাল-এ তিনি যে প্রতিভার সাক্ষর রেখেছিলেন অজ্ঞাত কারণে এর আগে-পরে তিনি আর ও পথে হাঁটেননি। সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন _ ওটি তাঁর পথ নয়, যদিও আমার মনে হয়েছে ওই পথেই তিনি গন্তব্যে পেঁৗছতে পারতেন। গ্রামীণ জনপদে ব্যবহৃত অসংখ্য অপরিচিত আটপৌরে শব্দ তুলে আনার জন্য হলেও তাঁর এই গ্রন্থটি ভবিষ্যতেও বিশেষ মর্যাদা পাবে বলে ধারণা করি। গ্রাম-জীবনের সঙ্গে খুব গভীর পরিচয় না থাকলে এরকম একটি কাজ কোনোভাবেই করা সম্ভব নয়, তিনি কীভাবে সেটি করেছিলেন ভাবলে এখনও বিস্ময় জাগে।

সাযযাদ কাদির তাঁর গল্পে শরীরছোঁয়া বর্ণনার যে দুঃসাহসিক নিরীক্ষা করেছিলেন_ আজ পর্যন্ত তার তুলনা খুব সুলভ নয়। সমকাম নিয়ে, ভাইবোনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া পারস্পরিক যৌন-অনুভূতির বর্ণনা সমৃদ্ধ যে গল্পগুলো তিনি লিখেছিলেন, আমার ধারণা _ আজকের তরুণেরাও সেইরকম গল্প লেখার সাহস করে উঠতে পারবেন না। মানুষের অন্তর্লোক আবিষ্কারে তিনি দেখিয়েছেন কুশলী সাফল্য। সম্ভবত কবি-পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি গল্প মাধ্যমটিকে অবহেলা করেছেন, যেমনটি করেছিলেন সাইয়িদ আতীকুল্লাহ। নইলে তিনিও তাঁর সময়ের একজন অন্যতম প্রধান গল্পকার হিসেবে গন্য হতেন।

রশীদ হায়দারও মনোজগতকেই প্রাধান্য দেন, যদিও সমাজ ও রাজনীতি তাঁর গল্পে অনায়াসসাধ্য দক্ষতায় রূপায়িত হয়। br /> সুব্রত বড়ুয়াও এই একই ধারায় সাফল্যবিহারী _ তাঁর গল্পের শরীরে এক কোমল-হৃদয়গ্রাহী অনুভূতি জড়িয়ে থাকে।

৬.১
ষষাটের লেখকরা এমন কিছু বিষয় সাহিত্যে নিয়ে এসেছিলেন যা এর আগে বাংলাদেশের সাহিত্যে দেখা যায়নি। আমার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে (ভোরের কাগজ, ২৭ নভেম্বর ১৯৯৮) মান্নান সৈয়দ বলেছিলেন _ সম্ভবত বাংলাদেশের সাহিত্যে আমাদের লেখায়ই প্রথম যৌনতা এসেছিলো, শরীরী বর্ণনা এলো।...যতো সহজে আপনারা এখন এসব লিখতে পারছেন, তখন বিষয়টা এতো সহজ ছিলো না। কিন্তু এর বাইরে ব্যক্তিমানুষের সংকটকে রূপায়ন করবার যে চেষ্টা তাঁরা করেছিলেন সেটিকেও আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে হয়। সেই ব্যক্তি আবার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন, বিযুক্ত সময় থেকে, ফলে বিপন্ন ও অসহায়। ওই সময়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সম্পাদনায় সামপ্রতিক ধারার গল্প শিরোনামে যে সংকলনটি বেরিয়েছিলো সেটার সূচীপত্রের দিকে তাকালেই এর সত্যতা মিলবে। জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের কেষ্টযাত্রা, মান্নান সৈয়দের মাতৃহননের নান্দিপাঠ, ইলিয়াসের স্বগতমৃতু্যর পটভূমি, শহীদুর রহমানের বিড়াল, হাসান আজিজুল হকের বৃত্তায়ন _ ওই সংকলনেই প্রথমবারের মতো গ্রন্থিত হয়। এর সবগুলো গল্পেই ব্যক্তির বিপন্নতা ও অসহায়ত্ব, বিচ্ছিন্নতা, নিঃসঙ্গতা ও অস্তিত্বের সংকটকে ধারণ করার চেষ্টা রয়েছে। পরবর্তীকালে মান্নান সৈয়দ ছাড়া আর সবাই এই ধারার গল্প রচনা থেকে সরে আসেন। এমনকি হাসান বহুদিন পর্যন্ত বৃত্তায়নকে স্বীকারই করেননি, তাঁর কোনো গ্রন্থে গল্পটি দেনওনি _ সামপ্রতিক ধারার গল্প সংকলনে এটি অন্তভূক্ত করতেও তাঁর আপত্তি ছিলো বলে তিনি নিজেই জানিয়েছেন। অবশেষে ১৯৬০ সালে রচিত গল্পটি উপন্যাস আকারে বেরোয় ১৯৯১ সালে! গল্পটি অস্বীকার করা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য _ সেই সদ্য গোঁপ-ওঠা বয়সে একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম...মাথা ক্রমে ঠাণ্ডা হয়ে এলো। স্থির ধারণা হলো যে লেখক হিসেবে সদ্য পথ ধরেছি। বৃত্তায়ন পরিত্যাগ করা দরকার। ব্যস, চলে গেল বইটি বিস্মৃতি ও বিরাগের তলায়।

ইলিয়াসের গল্পগ্রন্থ আলোচনা করতে গিয়েও তিনি এই ধরনের গদ্যচর্চা সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন _

ছয়ের দশকের প্রথম দিকে ধাঁধা রচনার মতো গদ্যের একটা ধরন চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাতে আমাদের গল্পের উপকার হয়েছে এমন কথা আজ আর কেউ বলে না।...বলতে কি তাঁর প্রথম গল্প 'নিরুদ্দেশ যাত্রা' 'স্বগতমৃতু্যর পটভূমি'র উত্তরাধিকার বহন করছে। গল্পের চরিত্রের সংকীর্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করার যে মূল প্রবণতা আছে ইলিয়াসের লেখায়, এই গল্পে তা দেখা দিয়েছে চরমভাবে.. ষাটের দশকের প্রথমদিকের গল্পের মতোই এই গল্পটি ধাঁধার গা ঘেঁসে গেছে। বলতে দ্বিধা নেই, এমন আত্নকরুণায় ভরপুর লেখার মধ্যে যে দুর্বোধ্য ও কঠিন আবরণ আছে পাঠকদের পক্ষে তা ভেদ করা শক্ত। ব্যক্তির আবেগ, ইচ্ছা, ভালোবাসা, ঘৃণা ইত্যাদির মধ্যে যে অদভুত নিজস্ব ন্যায় আছে তা পরিস্ফুট করে তোলার মতো স্বচ্ছ প্রকাশক্ষমতা আমাদের এখানে লেখকদের মধ্যে ক্বচিৎ দেখা গেছে। এর একটি কারণ, সমাজের যে জটিল সংগঠন থেকে এমন লেখা তৈরি হতে পারে, তেমন জটিলতা এখনো দেখা দেয়নি।... 'নিরুদ্দেশ যাত্রা'র ভাষা ধোঁয়াটে, পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে ব্যর্থ; মনের উপর দিয়ে ভেসে চলে যায়। অথচ এটাও বোঝা যায়, লেখক গল্পটির নায়কের সঙ্গে মিশে গেছেন, অন্তত যে সময়ে গল্পটি লিখেছিলেন, সে সময়ে রঞ্জুর অভিমান, যন্ত্রণা, অবোধ করুণ অনুভূতিগুলি তাঁর কাছে খুবই গুরুত্ব পেয়েছিলো।

ব্যক্তিমানুষের সংকট, তাদের নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা, ও বিপন্নতা নিয়ে লেখা গল্পগুলো নিয়ে এখনও পর্যন্ত এরকম মতই প্রচলিত, হাসানের মতো আমার অনেক সহযাত্রী লেখক বন্ধুও মনে করেন _ এই ধরনের সংকট আমাদের সমাজে অনুপস্থিত এবং এটি ইউরোপ থেকে আমদানী করা। এই মতামতগুলোকে আমার একপেশে বলে মনে হয়। আমাদের 'সমাজ-সচেতন' গল্পকাররা কখনো ব্যক্তিমানুষের দিকে তাকিয়ে দেখেন না, তাঁদের গল্পে যে মানুষ উপস্থিত হয় সে ব্যক্তিমানুষ নয়, সামাজিক মানুষ, ফলে অবয়বহীন এবং গড়পরতা। ষাটের দশকের গল্পকাররা যে এই ধরনের গল্পচর্চা শুরু করেছিলেন সেটা অকারণে নয়। তাঁদের বেড়ে ওঠার সময়টি ছিলো সামরিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট। সামরিক শাসনকে অমানবিক বললেও কম বলা হয়, এটি এক ধরনের জান্তব শাসন। এরকম একটি সময়ে যে তরুণেরা বেড়ে ওঠেন তাদের স্বাভাবিক বিকাশ হয় না। লেখকরা তো সমাজের সবচেয়ে স্পর্শকাতর মানুষ, তাঁরা যখন দেখেন তাঁদের সমাজটি তলিয়ে যাচ্ছে আলোর ইশারাবিহীন অতল অন্ধকারে তখন তাঁরা নিজেরাও ক্রমশ গুটিয়ে যেতে থাকেন, তৈরি হয় সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং ফলত হয়ে পড়েন নিঃসঙ্গ ও বিপন্ন _ যদি না একটি কার্যকর প্রতিরোধ তাঁদের পক্ষে গড়ে তোলা সম্ভব হয়। ষাটের লেখকরা ওই সময়ের সামরিক শাসন বিরোধী জাতিয়তাবাদী আন্দোলনে প্রকাশ্যে সাড়া দিয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না, বরং গুটিয়ে নিয়েছিলেন নিজেদেরকে এসবকিছু থেকে। এর একটি প্রমাণ পাওয়া যায় আবদুলস্নাহ আবু সায়ীদের একটি স্মৃতিকথা থেকে। ভালোবাসার সাম্পান-এ তিনি জানাচ্ছেন _ ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে _ ঢাকায় তখন গেরিলা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে _ তিনি আর আবদুল মান্নান সৈয়দ ঘরে বসে ঘোরমত্ত হয়ে 'কুমারসম্ভব' পড়ছিলেন। দেশ-জাতি-সমাজ ও জনজীবনের সঙ্গে কী পরিমান বিচ্ছিন্নতা তৈরি হলে এটি সম্ভব হতে পারে, পাঠকদের তা বিবেচনা করে দেখতে অনুরোধ করি। এবং এরকম কোনো লেখক যদি বৃত্তায়ন বা নিরুদ্দেশ যাত্রা লেখেন আমরা তা অস্বীকার করবো কেন, কেন বলবো এগুলো আমদানী করা অনুভূতি? হাসান যে নিরুদ্দেশ যাত্রা সম্বন্ধে বলেছেন _ বোঝা যায়, লেখক গল্পটির নায়কের সঙ্গে মিশে গেছেন _ সেটা কীভাবে সম্ভব হলো যদি লেখক নিজেই ওই অনুভূতিতে আক্রান্ত না হন? br />
৬.২
তবে ষাটের অধিকাংশ লেখকই ওই ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন _ বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভু্যত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ তাদেরকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করেছিলো বলে বিশ্বাস করি আমি। ষাট দশকের আন্দোলন-সংগ্রাম ও গণঅভু্যত্থানের প্রভাবে হাসান সাড়া দিয়েছিলেন শোনিত সেতু লিখে। স্বাধীনতার পর ইলিয়াস যখন দীর্ঘ-বিরতি শেষে আবার গল্পে ফিরলেন তখন তাঁর পরিবর্তনও খুব তীব্রভাবেই চোখে পড়লো। কায়েস আহমেদের প্রথমদিকের গল্প যেভাবে ব্যক্তিমানুষের দিকে মনোযোগী ছিলো, পরবর্তীকালে তা আর রইলো না, তিনিও হয়ে উঠলেন সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জনজীবনের প্রতি দায়বদ্ধ লেখক। মাহমুদুল হক অবশ্য বরাবরই এই দুটো দিককে সমন্বয় করে চলেছেন, ফলে তাঁকে আর নতুন করে বদলাতে হয়নি। শুধু ষাটের লেখকরাই নন, মুক্তিযুদ্ধের অভিঘাত পড়েছিলো পঞ্চাশের লেখকদের ওপরেও। সৈয়দ শামসুল হক তাঁর মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী লেখাগুলোতে যে পরিমান রাজনীতি ও সমাজ মনস্কতার পরিচয় দিয়েছেন, আগের লেখাগুলোতে তার কণামাত্রও নেই। অন্যদিকে যাঁরা এই পরিবর্তনে সাড়া দেননি তাঁরা আর লিখতেও পারেননি _ মান্নান সৈয়দের প্রধান গল্পগুলো ষাটের দশকেই লেখা, পরবর্তীকালে তাঁকে গল্প তেমন একটা মনোযোগী দেখা যায়নি, যা লিখেছেন তা-ও তেমন উত্তীর্ণ হয়নি। 'বিড়াল' মিথের জনক শহীদুর রহমানও আর লেখেননি।

৬.৩
ষষাটের লেখকেরা আরেকটি কারণে কথাশিল্পীদের কাছে অগ্রগন্য হয়ে থাকবেন _ সেটি হলো তাঁদের গদ্যভাষা। বাংলাদেশের সাহিত্যের জন্য একটি নিজস্ব গদ্যভাষা নির্মাণের যে কাজটি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ শুরু করেছিলেন সেটিই সৈয়দ হকের হাত ঘুরে ষাটের লেখকদের হাতে পরিণতি পেয়েছে। বিশেষ করে হাসান, মাহমুদুল হক, মান্নান ও ইলিয়াসের গদ্য যেন যাদুময়তায় ভরা _ যেন এক মোহনীয় রূপসী তরুণী, যার আকর্ষণ উপেক্ষা করা অসম্ভব।

উপসংহারের পরিবর্তে

বাংলাদেশের সাহিত্যে ষাটের লেখকেরা পালন করেছেন পথিকৃতের ভূমিকা। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত তাঁরাই আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় এবং প্রভাবশালী হয়ে আছেন। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, তাঁদের সক্রিয়তা ও সৃজনশীলতা আমাদের সাহিত্যের গতিমুখ ঠিক করে দিয়েছিলো, তবে এই প্রভাবের পেছনের কারণটি যে শুধু তাঁদের সৃজনশীলতা এবং বিরামহীন সাহিত্যচর্চা _ তা নয়, ষাটের লেখকরা অবিরাম নিজেদের সময় এবং সহযাত্রী লেখকদের সম্বন্ধে বলে গেছেন, এখনও বলে যাচ্ছেন। যুথবদ্ধ হয়ে তাঁরা শুরু করেছিলেন এবং এখন পর্যন্ত যুথবদ্ধই আছেন _ নিজেদের কথা নিজেরা বলার ক্ষেত্রে ষাটের জুড়ি নেই, এবং বলতে বলতেই নিজেদের সময় সম্বন্ধে এমন একটা ইমেজ তাঁরা দাঁড় করিয়েছেন যে, মনে হয় _ তাঁদের প্রতিভাকে অতিক্রম করার যোগ্যতা আর কারও নেই! এমনকি কখনো কখনো এটাও মনে হয়, তাঁরাই বুঝি বাংলাদেশের সাহিত্যের জনয়িতা-রূপকার। কথাটি অবশ্য সত্যি নয়। তাঁদের আগেই চলি্লশ ও পঞ্চাশের লেখকেরা বাংলাদেশের সাহিত্যের জন্য পালন করেছিলেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। প্রকৃতপক্ষে, আজকের যে বাংলাদেশের সাহিত্য, তার যাত্রা শুরু হয়েছিলো চলি্লশের দশকেই। বাঙালি, বিশেষ করে পূর্ববাংলার বাঙালিরা যখন অতিক্রম করছিলো এক অভূতপূর্ব ক্রান্তিকাল, তখন দ্বিজাতি-তত্ত্বের আফিম খেয়ে ভুল স্বপ্নে মেতে ওঠা এই বিভ্রান্ত জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন-কল্পনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংস্কার, মূল্যবোধ ও জীবনাচরণের সচিত্র সচল উপস্থাপনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র সাহিত্যকর্মী। কবিতা ও কথাশিল্পে এই প্রথম বেশ কয়েকজন মেধাবী তরুণ পাওয়া গেলো এই অঞ্চলে, এর আগে এখানে একসঙ্গে এতো লেখক আর কখনো দেখা যায়নি। এঁরা যদিও বহমান বাংলাসাহিত্যের উত্তরাধিকার ছিলেন, তবু অস্বীকার করা যাবে না _ তাঁদের সামনে খুব গভীর একটি সমস্যাও ছিলো। একটি নতুন রাষ্ট্র আর তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা স্বপ্ন, মানুষের জীবনাচরণে নব্য রাষ্ট্রের নতুন ধরনের খবরদারী ভূমিকায় সৃষ্ট দ্বন্দ্ব ও সংঘাত এতো সহজে রূপায়ন করা সম্ভব ছিলো না। তাছাড়া, এ অঞ্চলের মানুষ, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান, এতোদিন পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে মোটামুটিভাবে উপেক্ষিতই ছিলো, ফলে এক্ষেত্রে কোনো ঐতিহ্যের ভাগীদার তাঁরা হতে পারেননি। এতোসব সংকট সত্ত্বেও, এটা স্বীকার করতেই হবে, তাঁদের আন্তরিক চেষ্টা এবং আমৃতু্য সাহিত্যের প্রতি তাঁদের কমিটমেন্ট আমাদের সাহিত্যর একটি ভিত রচনা করে দিয়েছিলো। পঞ্চাশের দশকটিও ছিলো নানা দিক থেকেই বিহ্বলতার। তেতালি্লশের দুর্ভিক্ষ, ছেচলি্লশের সামপ্রদায়িক দাঙ্গার স্মৃতি, আর দেশবিভাগজনিত আবেগ-বিহ্বলতা ও হাহাকার; দু-বাংলার শেকড়হীন মানুষ _ উদ্বাস্তু, অসহায় _ নতুন দেশে বসবাসের জন্য তাদের চোখ, স্বপ্নে নয়, বেদনায় ম্লান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যাপি দীর্ঘদিনের লালিত মূল্যবোধের পতন; হতাশা, অবক্ষয় _ মানুষ যেন হঠাৎই উপস্থিত হয়েছে তার চূড়ান্ত পরিণতির সামনে _এরকম একটি অদ্ভুত সময়ে পঞ্চাশের লেখকরা লিখতে শুরু করেছিলেন। নতুন রাষ্ট্রপ্রাপ্তির আফিম মার্কা মোহ ইতিমধ্যেই কাটতে শুরু করেছে, পূর্ব বাংলার মানুষ জারিত হচ্ছে তাদের প্রকৃত জাতিসত্ত্বার অহংকারে, প্রস্তুত হচ্ছে ভাষা আন্দোলনের মতো অনন্য ইতিহাস নির্মাণ করার জন্য। এই সময়ে যারা এলেন তাঁরা অনেকটা নীরবেই একটি যুদ্ধ করে গেছেন _ রাষ্ট্রের যাবতীয় ষড়যন্ত্র ও কূটকৌশল উপেক্ষা করে নিজ ভাষাকে টিকিয়ে রাখার, নিজের ভাষায় সাহিত্য রচনার এবং এর একটি মানসম্মত রূপদান করার যুদ্ধ। তাঁদের এই অবদানকে অস্বীকার করে আমাদের সাহিত্যের ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয়। কিন্তু ষাটের লেখকদের কাছ থেকে তাঁদের পূর্বসুরীদের ব্যাপারে তেমন কোনো ইতিবাচক মূল্যায়ন আমরা জানতে পারিনি। নিজেদের নিয়ে তাঁরা এতোটাই ব্যস্ত ছিলেন যে, ওসব বিষয়ে মনোযোগ দেননি। উল্টো, নিেেজদের সময়ের কম শক্তিমান লেখকেরও প্রশংসা করেছেন এমন ভাষায় যে, মনে হয়েছে এঁরা সবাই প্রবল পরাক্রমশালী লেখক। আর এভাবেই ষাট দশকের নানা বিষয় _ কবি ও কবিতা, গল্প ও গল্পকার, পত্রিকা ও সম্পাদক _ নিয়ে তৈরি হয়েছে মিথ। এই মিথের কারণেই আমাদের সাহিত্যজগতে ষাট দশক নিয়ে খানিকটা অতি-উচ্ছ্বাস আছে; তাঁদেরকে নিয়ে, যাকে বলে ক্রিটিক্যাল অ্যানালিসিস, হয়নি বললেই চলে। আমাদের বোধহয় সেই কাজটি করে দেখবার সময় হয়েছে। এবং কাজটি করা গেলে আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে যে, সব মিলিয়ে ষাটের গল্পকারদের অর্জন গভীর ও মহান _ এই দশকেই নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশের গল্পের বহুমাত্রিক গতিমুখ যা উত্তরকালের গল্পশিল্পীদের দ্বিধাহীন গল্পচর্চায় প্রেরণা যুগিয়েছে।