একজন লেখক কেন লেখেন, আমরা সবসময়ই সেটি জানার আগ্রহ প্রকাশ করি,
কিন্তু একজন পাঠক কেন পড়েন তা জানতে চাই না কখনো। লেখকদের তো
বাঁচিয়ে রাখেন পাঠকরাই। যে লেখক পঠিত নন, তিনি জীবিতও নন। এমনকি
বিশ্বের দূরূহতম লেখক যাঁরা, যাঁদের লেখা বুঝতে হলে কঠোর কায়িক
পরিশ্রমের চেয়েও বেশি পরিশ্রম করতে হয়, তাঁদেরকেও তো বাঁচিয়ে রাখেন
তাঁদের হাতে গোনা গুটিকয় পাঠকই। সেই পাঠকরা কেন পড়েন, সেটা তো খুব
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়ার কথা! কেন পড়েন তারা, পড়ে কী লাভ হয়
তাদের, না পড়লেই বা কী ক্ষতি হয়! জগতে তো বিনোদন উপকরণের অভাব নেই,
সহজলভ্য বিনোদনও এখন ঘরে ঘরে বিদ্যমান, তবু সেসব বাদ দিয়ে বই পড়ার
মতো একটা কষ্টসাধ্য কাজ কেন করেন তারা? আমরা অবশ্য প্রশ্নটিকে
শুধুমাত্র সাহিত্যের পাঠকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্পের
অন্যান্য শাখার ভোক্তাদের কাছেও নিয়ে যেতে পারি। যেমন
সংগীতপ্রিয়দের কাছে জিজ্ঞেস করতে পারি, কেন গান শোনেন তারা?
চিত্রকলার সমঝদার লোকটির কাছে জানতে চাইতে পারি, এরকম বিমূর্ত
শিল্পের কাছে তিনি কি পান? চলচ্চিত্র ও নাটকের দর্শকদের প্রশ্ন
করতে পারি-
কেন তারা এসব দেখেন? কিন্তু এসব প্রশ্ন পাঠক-শ্রোতা-দর্শকদেরকে করা
হয় না। তার কারণ সম্ভবত এই যে, এটাকে কেউ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বলে
মনেই করেন না। অথবা এটা একটা স্বতসিদ্ধ ব্যাপার বলে ধরে নেয়া হয়
যে, পাঠকরা তো পড়বেই, শ্রোতারা তো শুনবেই, দর্শকরা তো দেখবেই; এটাই
তো তাদের কাজ, এ নিয়ে প্রশ্ন করার কি আছে! অথচ তাদের কাছে
প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হলে এবং প্রাপ্ত উত্তরগুলোর একটা বিশ্লেষণ
দাঁড় করালে যে ফলাফল পাওয়া যাবে, হয়তো সেখানেই লুকিয়ে আছে শিল্প ও
শিল্পীর দায়দায়িত্ব, শক্তিসামর্থ্য এবং শিল্পসাহিত্যের প্রায়োগিক
কার্যকারিতা সম্বন্ধে কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর।
২.
সাহিত্যের পাঠকদের দিয়েই শুরু করা যাক। ওপরের প্রশ্নগুলো করলে
পাঠকদের কাছ থেকে সম্ভাব্য কি কি উত্তর পাওয়া যেতে পারে? এটা
নিশ্চিত যে, কেউ কেউ বলবেন-
তারা সময় কাটনোর জন্য বা আনন্দ পাওয়ার জন্য বা বিনোদনের জন্য পড়েন।
জানি, এই উত্তর শুনলে 'সিরিয়াস' লেখকগণ অতিশয় আহত হবেন, তাদের
সর্বদা কুঁচকে থাকা ভ্রু আরো কুঞ্চিত হয়ে গেরো পড়ে যাবে। ভাববেন-
আমার লেখা কেবল বিনোদনের জন্য পড়েন; আমার এত শ্রমের ফসল কেবল আপনার
'স্থুল' আনন্দ লাভের উপকরণ! সেক্ষেত্রে না পড়াই তো ভালো! এমনিতেই
লেখকরা পাঠকদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে আনন্দ পান, তার ওপর এই 'বিনোদন'
'আনন্দ' ইত্যাদি শব্দগুলোতে তাদের নিঃশ্বাস এমনই তপ্ত হয়ে উঠতে
পারে যে, পাঠকরা হয়তো পুড়ে ভস্মই হয়ে যাবেন! বিষয়টি তাই আলোচনার
অবকাশ রাখে। আমি নিজে মনে করি, সব শিল্পের রসাস্বাদন শেষ পর্যন্ত
বিনোদনই। তবে এই বিনোদনের মাত্রাটি একটু ভিন্ন। ব্যাপারটা বোঝার
জন্য দুজন 'শিক্ষিত' (প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্থে) লোকের কথা
বিবেচনা করা যেতে পারে, যাদের একজন সাহিত্য পাঠ করেন, আরেকজন করেন
না। এই দুজন মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্ম হয়তো একই ধরনের, কিন্তু
তাদের মানস-কাঠামো, জীবন-যাপনের ধরন, বা চিন্তাভাবনার প্যাটার্ন
কখনোই এক নয়! নিয়মিত পাঠে অভ্যস্ত একজন মানুষ মানসিক সূক্ষতার এমন
এক স্তরে ওঠেন যে, অপড়ুয়া লোকেরা যেসব বিষয়ে বিনোদন লাভ করেন-
যেমন সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে যোগ দেয়া, টিভিতে সস্তা সেন্টিমেন্টের
নাটক-সিনেমা-হিন্দি সিরিয়াল দেখা ইত্যাদি-
তিনি সেগুলো আদৌ উপভোগ করেন না। অথচ জীবনে বিনোদন প্রয়োজন,
অন্যান্য মৌলিক চাহিদার মতো বিনোদনও মানুষের এক মৌলিক চাহিদা।
তিনি যেহেতু প্রচলিত ও সহজলভ্য উপকরণগুলোতে বিনোদন পান না, তাকে
তাই যেতে হয় এমন এক বা একাধিক মাধ্যমের কাছে যা তার মানসিক
সূক্ষতাকে সমর্থন দেবে। সেই অর্থে এটি তার কাছে বিনোদনই বটে, তবে
উচ্চস্তরের বিনোদন। যে-কোনো ধরনের বিনোদনের সঙ্গে এটাকে মেলানো
যাবে না। শুধু বিনোদনই নয়, এটি ওই পাঠকের জন্য এক ধরনের আশ্রয়
হিসেবেও কাজ করে। শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যম যে মানুষকে আশ্রয় দেয়
সেটিই শিল্পের দ্বিতীয় প্রায়োগিক দিক। মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই ভীষণ
অসহায় প্রাণী। জীবন-যাপন করতে গিয়ে নানা ধরনের দুর্যোগ তো আসেই,
কিন্তু অসহায়ত্বের কারণ শুধু এসব দুর্যোগই নয়। বরং জীবনের
অর্থ-অনুসন্ধান করেন যারা, যারা মানুষ-পৃথিবী-মহাবিশ্ব সৃষ্টির
কারণ খোঁজেন, তাদের সামনে নানাবিধ প্রশ্ন এসে হাজির হয়। যতো প্রশ্ন
আসে, ততো উত্তর মেলে না। অসহায়ত্বের সেটিও একটি কারণ। আর তাই,
মানুষের আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়। সহজ-সামাজিক মানুষ যেসব আশ্রয় খুঁজে
পান পারিবারিক-সামাজিক সম্পর্ক ও বন্ধনের মধ্যে, প্রচলিত বিশ্বাস ও
সংস্কারের মধ্যে, এমনকি ধর্মের মধ্যেও; অনেক মানুষই এসবকিছুতে
যথার্থ আশ্রয় খুঁজে পান না। এই দলের লোকেরা আশ্রয়ের জন্য শিল্পের
দ্বারস্থ হন। শিল্পের ভোক্তামাত্রই এই আশ্রয়, প্রশান্তি ও
নির্ভরতার ব্যাপারটি অনুভব করেন।
একথা সত্যি যে, সব শিল্প সমান নির্ভরতা ও প্রশান্তির আশ্রয় দেয় না।
এই ক্ষেত্রে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে সংগীত ও কবিতা। এমন
মানুষের সংখ্যা খুবই কম যিনি সংগীত ভালোবাসেন না। আর যদি কেউ থেকেও
থাকেন তিনি সম্ভবত ঠিক সুস্থ মানুষ নন। ব্যক্তিগতভাবে আমি এমন
দু-চারজনের দেখা পেয়েছি, যারা গান শোনেন না। ধর্মীয় বিধিনিষেধের
কারণে শোনেন না, তা নয়; আসলে তারা শোনার আগ্রহই বোধ করেন না, বা
সুর তাদের প্রাণে বিন্দুমাত্র সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হয়। এবং অদ্ভুত
শোনালেও সত্যি যে, এরা সবাই অসম্ভব নির্মম হৃদয়ের মানুষ, কোনো
ঘটনাই তাদের মনে করুণার জন্ম দেয় না! কয়েকজন মাত্র মানুষকে দেখে
এরকম কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া উচিত হবে না যে, যারা গান শোনেন
না তাদের হৃদয় পাথর দিয়ে তৈরি। কিন্তু একথা নিশ্চয়ই বলা যায়-
যারা শোনেন আর যারা শোনেন না তাদের মানসগঠন একইরকমের নয়! আবার এই
শ্রোতাদের মধ্যেও শ্রেণীভেদ আছে, আছে প্রকারভেদ। কেউ কেউ কেবল
শোনার জন্যই শোনেন, আর কেউ কেউ গানের প্রতি প্রেম অনুভব করেন। কেউ
বা গান বলতে লিরিক-সুর-গায়কি সমৃদ্ধ গানের কথা বোঝেন, কারো-কারো
কাছে গান বলতে শুধু লিরিক সমৃদ্ধ গান নয়, কেবলমাত্র সুরও তাদের
কাছে উপভোগের বস্তু হয়ে ধরা দেয়! চৌরাশিয়ার বা বারী সিদ্দিকীর
বাঁশি, বিসমিল্লাহ খাঁ'র সানাই, আমাদের সুনীলচন্দ্রের বেহালা বা
হাল আমলের ভেনিসিয়া মাই-এর বেহালা, শাস্ত্রীয়-সংগীত বা
রবীন্দ্র-সংগীত, লালনের গান বা নজরুলের গান, অথবা আধুনিক গান-
সবকিছুই ভালোবাসেন এরা। এই যে বিভিন্ন ধরনের শ্রোতা, এদের মধ্যে
কেউ কেউ এমনও আছেন যাদের গান ছাড়া দিনই চলেই না! মনে হয়, দৈনন্দিন
খাদ্যগ্রহণ ছাড়া যেমন মানুষ বাঁচে না, তেমনি এরা যেন গান ছাড়া
বাঁচবেনই না! এই মানুষগুলো গানের কাছে কী পান? আশ্রয় পান, সন্দেহ
নেই! পান বিনোদনও। আর কিছু?
হ্যাঁ,
হয়তো আরো কিছু পান। সুরের বিমূর্ত শক্তি তাদের হৃদয়ে জ্বেলে দেয় এক
আশ্চর্য হীরন্ময় প্রদীপ!
আশ্রয় দেয়ার এই কাজটি কবিতাও খুব পারঙ্গমতার সঙ্গে করতে সক্ষম হয়।
কবিতার যারা পাঠক, তারা কোনো-কোনো কবিতা পড়তে পড়তে মুখস্থ করে
ফেলেন। কোনো বৈষয়িক প্রয়োজন ছাড়া একটি কবিতাকে মুখস্থ করার জন্য যে
বিপুল ভালোবাসার প্রয়োজন হয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেকে
আবার মুখস্থ না করলেও কোনো-কোনো কবিতা হাজারবার পড়ে ফেলেন। কেন
এমনটি করেন তারা? একজন পাঠক কেন এক বা একাধিক কবিতার কাছে বারবার
ফিরে যান? কী পান তারা কবিতার মধ্যে? কবিতার মতো প্রায় বিমূর্ত
একটি শিল্পমাধ্যমের কাছে বৈষয়িক কোনো লাভের জন্য নিশ্চয়ই কেউ যান
না, এমনকি দৈনন্দিন জীবনের নানা উটকো ঝামেলা বা সংকট থেকে উত্তরণের
কোনো পথও দেখাতে পারে না কবিতা। যদি বলি বিনোদনের জন্যই কবিতা পড়েন
পাঠকরা, তবু প্রশ্ন উঠবে একজন কবিতা-পাঠক তার চারপাশে বিনোদনের
নানাবিধ রঙিন উপকরণ বাদ দিয়ে কবিতার কাছে যান কেন? যান, কারণ তার
মানসগঠন আলাদা, অ-পাঠকরা যা কিছুতে আনন্দ-বিনোদন পান, তিনি/তারা
তাতে পান না। তাকে আশ্রয় ও আনন্দ, বিনোদন কিংবা শান্তি দিতে পারে
উচ্চতর কিছু। হয়তো কবিতাই সেই উচ্চতর মাধ্যম।
সংগীত এবং কবিতা এমন বিমূর্ত শিল্পমাধ্যম যে এগুলোকে উপভোগ করতে
হলে শ্রোতা/পাঠককে প্রস্তুত হতে হয়। এই প্রস্তুতি আবার এমনিতে হয়
না, শ্রবণ এবং পাঠই তাকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করে তোলে। তার মানসিক
কাঠামোকে সূক্ষতার উচ্চস্তরে নিয়ে যায়, মনকে করে তোলে সংবেদনশীল।
এইসব শিল্পমাধ্যম এভাবেই শ্রোতা-পাঠকের মনকে গড়ে দেয়। কবিতার পাঠক
যারা তাদের মনের গড়ন, তাই, যারা পড়েন না তাদের থেকে আলাদা।
সংগীতভোক্তাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
অবশ্য এগুলো কবিতা ও সঙ্গীতের উচ্চতর ব্যবহারিক প্রয়োগ। এ দুটোরই
কিছু তাৎক্ষণিক প্রয়োগ আছে। দেখা গেছে, আন্দোলন-সংগ্রাম-যুদ্ধ
ইত্যাদিতে এই দুটো শিল্পমাধ্যমই খুব ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে
প্রচারিত গানগুলো অবশ্যই যোদ্ধাদের উদ্দীপ্ত করেছে। শুধু
মুক্তিযুদ্ধই নয়, ইতিহাসের নানা পর্বে, যেখানে
প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-বিদ্রোহ হয়েছে সেখানেই গণসংগীত বিদ্রোহীদের
উদ্দীপ্ত করে তুলেছে। গত শতকের আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী
আন্দোলনে কবিতাও খুব উচ্চকিত ভূমিকা পালন করেছে। যদিও এমন একটি
অভিযোগ শোনা যায় যে, ওই উচ্চকিত কবিতা শেষ পর্যন্ত আর কবিতা হয়ে
ওঠেনি, হয়েছে শ্লোগান। এই অভিযোগ মেনে নিলেও কবিতার এই তাৎক্ষণিক
প্রায়োগিক দিকটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এ-ও সত্য যে, এসবই
নিতান্তই তাৎক্ষণিক ব্যাপার। কবিতা ও সংগীতের শক্তি অন্য জায়গায়।
মানুষের একান্ত মুহূর্তের সঙ্গী এরা, নিঃসঙ্গতা ও নির্জনতার সঙ্গী,
নৈঃশব্দ্য ও নীরবতার সঙ্গী। গভীর উপলব্ধি ও প্রেমময়তার সঙ্গে
এদেরকে গ্রহণ করতে হয় এবং করা হয়ে থাকে। আর তাই দেখা যায়, দিনের
বেলায় ব্যান্ড-সংগীতের কনসার্টে উদ্দাম শ্রোতাটিও গভীর রাতে বাসায়
ফিরে ওই গান আর শোনেন না, শোনেন বাণীপ্রধান-সুরপ্রধান মেলোডিয়াস
গান। একইভাবে, কবিতাও ঠিক আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়। যদিও নানা ধরনের
অনুষ্ঠানে কবিতা পড়া হয়ে থাকে, আবৃত্তিকাররা খুব মমতা দিয়ে একটি
কবিতাকে দর্শক-শ্রোতাদের সামনে হাজির করেন, তবু এ যেন অনুষ্ঠানের
চেয়ে পাঠকের একান্ত নির্জন মুহূর্তের সঙ্গী হিসেবেই অধিকতর বেশি ও
কার্যকরীভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বহু মানুষের ভিড়ে বোধহয় কবিতা তার
অবর্ণনীয় রূপটি নিয়ে ধরা দেয় না!
স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়লো- জাতীয় কবিতা
উৎসবের প্রাঙ্গণে বসেই পটুয়া কামরুল হাসান তাঁর জীবনের শেষ ছবিটি
এঁকেছিলেন। তৎকালীন শাসকের ছবি এঁকে নাম দিয়েছিলেন বিশ্ববেহায়া! এই
'বিশ্ববেহায়া' শিরোনাম সম্বলিত ছবিটি তখন সারাদেশে দাবানলের মতো
ছড়িয়ে পড়েছিলো। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সময় আঁকা কামরুল হাসানের
আরেকটি ছবির কথাও মনে পড়বে আমাদের। ইয়াহিয়া খানের ছবি এঁকে ক্যাপশন
দিয়েছিলেন- এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে! একটি স্বয়ংক্রিয়
মেশিনগানের চেয়ে এই ছবির প্রভাব কম মারাত্নক ছিলো না! এ কথা মানতেই
হয়, চিত্রকলার তেমন কোনো প্রায়োগিক দিক নেই, অধিকাংশ মানুষই
চিত্রকলার ব্যাপারটা বোঝেন না, এ যেন কেবল সৌন্দর্য বর্ধনের জন্যই
সংগ্রহ করেন ভোক্তারা। কিন্তু এসব উদাহরণ মনে করিয়ে দেয়,
চিত্রকলারও আছে প্রতিরোধের শক্তি! তবে, এ-ও মনে রাখতে হয়- এসবই
ব্যতিক্রমী উদাহরণ। প্রকৃতপক্ষে চিত্রকলা প্রধানত বিমূর্ত
শিল্পমাধ্যম, দৈনন্দিন জীবনে এর কোনো বৈষয়িক প্রভাব নেই। আছে কেবল
রঙ ও রেখার সমন্বয়ে গড়ে তোলা এক আশ্চর্য সুন্দরের সামনে দাঁড়ানোর
অনির্বচনীয় অনুভূতি। সেজন্যই কি বৈষয়িক লাভালাভের সম্ভাবনা না থাকা
সত্ত্বেও, এমনকি গান বা কবিতা উপভোগের মতো আনন্দ পাওয়ার সম্ভাবনা
না থাকা সত্ত্বেও কিছু মানুষ এর জন্য জীবনপাত করেন? এ প্রশ্নের
উত্তর পাওয়া কঠিন। আর কঠিন হবেই বা না কেন, কাউকে তো কোনোদিন এই
কথাটি জিজ্ঞেসই করা হয়নি!
৩.
সংগীত-চিত্রকলা বা কবিতার মতো গল্প-উপন্যাস ততোটা বিমূর্ত
শিল্পমাধ্যম নয়। একটি কবিতার রসাস্বাদন করতে হলে অনুভূতির যে
সূক্ষতা এবং চেতনাজগতের যে তীব্র সংবেদনশীলতার প্রয়োজন হয়, উপন্যাস
বা গল্পের ক্ষেত্রে তার প্রয়োজন হয় না। উপন্যাসের কথাই ধরা যাক। এ
পর্যন্ত যতোগুলো ফর্মে উপন্যাস লেখা হয়েছে তাতে দেখা যায়, সাধারণত
একটি ঘটনাপ্রবাহের ভেতর দিয়ে ঔপন্যাসিক তার পাঠককে এগিয়ে নিয়ে যান।
চরিত্রগুলোর সক্রিয়তা, ভাবনাজগৎ, পাস্পরিক সম্পর্ক, সম্পর্কের
ধরনধারণ-উত্থানপতন এসবই পাঠককে প্রস্তুত করে তোলে আখ্যানের চলমানতা
ও জটিলতার মধ্যে দিয়ে জীবনসত্যের উন্মোচনের জন্য।
একটি ভালো উপন্যাস পাঠের অভিজ্ঞতা একজন মানুষকে আমূল বদলে দিতে
পারে। উপন্যাস, এমনকি উপন্যাসের একটি বাক্য কিভাবে মানুষকে পাল্টে
দেয়, তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার
নিয়েছিলেন কবি জয় গোস্বামী। তো শুরুতেই সন্দীপনের একটি উপন্যাসের
ভূমিকা কয়েকটি লাইন পড়ে শুনিয়েছিলেন তিনি, তারপর অদ্ভুত একটি
মন্তব্য করেছিলেন। পাঠকদের সুবিধার্থে অংশটুকু তুলে দিচ্ছি :
'আমার সব রচনাই আত্নজৈবনিক। শুধু এই একটি ছাড়া। মৃত মানুষদের নিয়ে
লিখতে গিয়ে এই প্রথম আমাকে একটি কাল্পনিক উপন্যাস লিখতে হল। কেননা,
আমি দেখলাম, মৃতের গল্প কোনো জীবিত মানুষের পক্ষে লেখা সম্ভব নয়।
তা যদি হত, তাহলে জীবিতের ত্বক মৃতের চামড়া গ্রহণ করত। কিন্তু, না,
জীবিতের শোক মৃত গ্রহণ করে না। আমরা এদিক থেকে বড় পরাধীনভাবে বেঁচে
আছি। তাই, এই প্রথম আমার একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক উপন্যাস, যার সব
চরিত্রই কল্পনাপ্রসূত।'... এইটুক উল্লেখ করে জয় বলছেন : 'ধরুন,
আমরা এদিক থেকে বড় পরাধীনভাবে বেঁচে আছি বা এই যে জীবিতের শোক মৃত
গ্রহণ করে না এই ধরনের একটা বাক্য পড়বার পরে ভেতরটা একদম- মানে-
বাক্যটা পড়বার আগ পর্যন্ত- যে ভাবে বেঁচে ছিলাম, সেই বেঁচে থাকাটা
যেন পাল্টে যায়।'
উপন্যাসের 'ভূমিকা'র একটি বাক্য একজন কবিরও বেঁচে থাকাটা পাল্টে
দেয়! হ্যাঁ, দেয়। উপন্যাসের আসল শক্তিটা ওখানেই। ব্যক্তিগতভাবে
আমার নিজের ক্ষেত্রেও এরকম ঘটনা ঘটেছিলো। সেই সুদূর কৈশোরে কোনো এক
অজানা কারণে 'পথের পাঁচালি' পড়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিলাম আমি।
অজানা কারণে বলছি এই জন্যে যে, তখন পর্যন্ত আমার বই পড়ার দৌড়
রূপকথা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিলো; বড়োজোর স্কুলের পাঠ্যবইতে দু-একটা
গল্প পড়ে থাকবো। কেউ আমাকে 'পথের পাঁচালি'র কথা তখন পর্যন্ত
বলেওনি। তবু এরকম তীব্র ইচ্ছা জাগার কারণ হলো স্কুলের পাশে একটা
বইয়ের দোকানে ওই বইটি ডিসপ্লে করা থাকতো। সাদাকালো প্রচ্ছদে
পেপারব্যাক সংস্করণে বেশ মোটাসোটা একটা বই; প্রচ্ছদে গ্রামের পথে
একজোড়া কিশোর-কিশোরী। হয়তো ওই সাদামাটা প্রচ্ছদটিই আমাকে আকৃষ্ট
করে থাকবে। নিজের ফেলে আসার গ্রাম, গ্রামের মেঠোপথ, ভাইবোনের
স্মৃতি ইত্যাদির কল্পনা হয়তো জেগে উঠতো প্রচ্ছদটি দেখে। বহু কষ্ট
করে, টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে একদিন ওই বইটি কিনেও ফেললাম, আর
গ্রোগ্রাসে গিলে ফেললাম কয়েকদিনের মধ্যেই। আমার সেই বয়সটি মোটেই
'পথের পাঁচালি' পড়ার বয়স ছিলো না (ক্লাস সেভেনে পড়ি কেবল), তবু কী
এক অমোঘ আকর্ষণে বইয়ের প্রতিটি পাতা আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল পরের
পাতায়। বইটি পড়ে উঠবার পর টের পেলাম- আমার আর রূপকথা পড়তে ভালো
লাগছে না, 'ছোটদের বই'ও ভালো লাগছে না। ইচ্ছে করছে 'পথের পাঁচালি'র
মতো বই পড়তে। ওই একটি বই আমার জীবনটিকেই ভিন্ন এক খাতে বইয়ে দেয়।
বইয়ের জগৎ হয়ে ওঠে আমার অতিপ্রিয় স্বপ্নের জগৎ। কিশোরদের স্বাভাবিক
কাজকর্মগুলোর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলি আমি, হয়ে পড়ি ঘরবন্দি। শুধু
ওই কৈশোরেই নয়, এরপরও আরো বহুবার আমি টের পেয়েছি- একটি উপন্যাস
পড়ার আগে আমি যেমন মানুষ ছিলাম, পড়ার পর আর তেমনটি থাকি না। মানুষ
হিসেবেই বদলে যাই আমি। একটি ভালো উপন্যাস এই কাজটি খুব পারঙ্গমতার
সঙ্গে করতে পারে। মনের গড়ন ঠিক করে দেয় একটি উপন্যাস। একই কথা হয়তো
অন্যান্য শিল্পের ক্ষেত্রেও খাটে। একটি কবিতা পড়ার আগের মানুষটি,
কবিতাটি পড়ার পর আর আগের আগের মানুষ থাকেন না। একটা গানও তেমন
প্রভাব ফেলতে পারে। তবে, উপন্যাসই এই ক্ষেত্রে সবেচেয়ে বেশি
প্রভাবশালী। একটি আখ্যান-বর্ণনার মধ্যে দিয়ে এগোয় বলে, উপন্যাসের
চরিত্রগুলোকে পাঠকের কাছে চেনা মনে হয় বলে একটি উপন্যাস পাঠককে তার
নিজের সঙ্গে অনেক বেশি সংলগ্ন করে ফেলে। নিজের অজান্তেই পাঠক ওই
উপন্যাসের অংশ হয়ে যায়, চরিত্রগুলোর ভাবনাজগৎ বুঝতে গিয়ে সে-ও
একইরকমভাবে ভাবতে শুরু করে; আর তাই, পাঠশেষে সে আবিষ্কার করে- সে
আর আগের মানুষটি নেই, অন্যরকম হয়ে গেছে!
৪.
সংগীত, সাহিত্য বা চিত্রকলার মতো চলচ্চিত্র বা নাটক বিমূর্ত
শিল্পমাধ্যম নয়। পূর্বোক্ত শিল্পগুলো উপভোগের জন্য হৃদয় ও
মস্তিস্কের যতোখানি সক্রিয়তা প্রয়োজন, চলচ্চিত্র বা নাটক উপভোগের
জন্য ততোখানি প্রয়োজন হয় না। বরং এগুলোতে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে
দেয়ার একটা ব্যাপার থাকে। মঞ্চনাটক তো রীতিমতো জীবন্ত শিল্পমাধ্যম।
দর্শকদের সামনেই সেগুলো অভিনীত হয়, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও পাওয়া
যায়। মঞ্চনাটক এতখানি জীবন্ত বলেই এটিকে সবসময় সমসাময়িক থাকতে হয়;
সমকালের দর্শকদের জন্য উপযোগী করে নাট্যভাষ্যও তৈরি করে নিতে হয়।
এদিক থেকে দেখতে গেলে সমকালের প্রয়োজন মেটানোর জন্য সবচেয়ে
উল্লেখযোগ্য এবং কার্যকরী শিল্পমাধ্যম আসলে মঞ্চনাটকই। তবে এর কিছু
অসুবিধাজনক দিকও আছে। যেমন, কোনো একটি নাটকের প্রদর্শনী কোনো কারণে
বন্ধ হয়ে গেলে ওই নাটক নিয়ে কথার জন্য স্মৃতির ওপর নির্ভর করা ছাড়া
দর্শকের আর কিছুই করার থাকে না। এমনকি একই নাটকের পরপর দুটো
প্রদর্শনীও একইরকম না-ও হতে পারে। মঞ্চনাটক সেই অর্থে সবচেয়ে
বৈচিত্র্যময় এবং পরিবর্তনশীল শিল্পমাধ্যম। এবং একই সঙ্গে
ক্ষণস্থায়ীও। কারণ এর কোনো স্থায়ী রূপ নেই, একে ধরে রাখবারও কোনো
ব্যবস্থা নেই। সেদিক থেকে চলচ্চিত্র খানিকটা এগিয়ে আছে। অনেক আগের
দেখা কোনো একটি চলচ্চিত্র হয়তো আপনার মনে দাগ কেটেছিল, মন চাইলে
অনেকদিন পর আবার সেটিকে ফিরে দেখতে পারেন আপনি। প্রযুক্তির অভাবনীয়
উন্নতি চলচ্চিত্রশিল্পের এই উপকারটুকু করেছে যে, দীর্ঘকাল পরেও
একটি ছবি দর্শকরা দেখে নিতে পারে। এই দুই শিল্পমাধ্যমই মূর্ত হয়ে
দর্শকদের সামনে হাজির হয় বলে সংগীত ও সাহিত্যের মতো এর প্রভাব
তুলনামূলকভাবে কম দীর্ঘস্থায়ী। এবং খেয়াল করলে দেখা যাবে- শিল্প
যতো বেশি মূর্ত ততো বেশি ভোক্তা, বিমূর্ত শিল্পের ভোক্তা কম, এবং
খানিকটা জনবিচ্ছিন্নও বলা যায়! চলচ্চিত্র-নাটক ইত্যাদির ভোক্তা এই
কারণেই সবচেয়ে বেশি, কারণ এগুলো সরাসরি মূর্ত শিল্পমাধ্যম, ভিজুয়াল
মিডিয়া। বিমূর্ত চলচ্চিত্রও হতে পারে ('দেখে কিছুই বোঝা গেল না'
ধরনের), তবে তা কখনো 'জনপ্রিয়' হয় না। কবিতা-গল্পের চেয়ে উপন্যাসের
পাঠক বেশি। কারণ ওই একটাই। উপন্যাস যেভাবে ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এগোয়
সেটা পাঠকের সামনে কাহিনীকে মূর্ত করে তুলতে সহায়তা করে এবং
ভোক্তার মনের ওপর চাপ কম পড়ে, কবিতা তা করে না। গল্প করে, তবে কম
মাত্রায়। চিত্রকলার ভোক্তা আরো কম। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে বাণী-সুর
সমৃদ্ধ গানগুলো ধ্রুপদী সঙ্গীতের চেয়ে জনপ্রিয় হয়ে থাকে। কিন্তু
ভোক্তা কম হলেও বা তুলনামূলকভাবে কম জনপ্রিয় হলেও বিমূর্ত শিল্পের
প্রভাব দীর্ঘকাল ধরে টিকে থাকে, অন্যদিকে মূর্ত শিল্পের স্থায়ী
প্রভাব খুব স্বল্পস্থায়ী।
শিল্পের এই যে গ্রহণযোগ্যতা এবং উপভোগ্যতা, তার ফলাফল কি?
তাৎক্ষণিক কোনো ফল কি দেখতে পাওয়া যায়? ধরা যাক, একটি গল্পে বা
উপন্যাসে একজন লেখক নানাবিধ কাহিনী রচনা করে শেষে এসে একটি
রাষ্ট্রবিপ্লব ঘটিয়ে দিলেন। তাহলে কি ওই গল্প বা উপন্যাসের পাঠকরা
বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়বেন? মনে হয় না। অন্তত আজ পর্যন্ত তেমন কোনো
উদাহরণ আমরা দেখিনি। বরং ঘটে উল্টোটাই। পাঠকরা বইয়ের পাতায় বিপ্লব
ঘটে যেতে দেখে সুখ বোধ করেন, কারণ এ ব্যাপারে তার আর কোনো
দায়দায়িত্ব রইলো না। যা করার তা লেখক তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো দিয়েই
করিয়ে নিয়েছেন। একইভাবে একটি বিপ্লবী কবিতা বা গান পড়ে বা শুনে
একজন পাঠক বা শ্রোতা বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত হবেন, এটা ভাবা
বোকামি। তেমন কিছু ঘটতে দেখা যায় না কখনো। তবে
বিপ্লব-বিদ্রোহ-সংগ্রাম-আন্দোলনে এসব গান-কবিতার বিশেষ ভূমিকা
থাকে- সেকথা আগেই বলেছি। বিপ্লবীদের উজ্জীবিত করতে এগুলোর জুড়ি
নেই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন গান-কবিতা তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ।
কিন্তু এগুলো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ। কোনো জাতি বা কোনো মানুষ সারাজীবন
ধরেই বিপ্লব-বিদ্রোহের মধ্যে দিয়ে যায় না। তার বা তাদের জীবনে
স্থির সময় আসে, অবসর আসে, নৈঃশব্দ্য ও নিঃসঙ্গতা আসে। এই
মুহূর্তগুলোতে নিশ্চয়ই কেউ বসে বসে বিপ্লবের গান শোনে না বা
বিপ্লবী কবিতা-গল্প পড়েন না। বরং এইসব মুহূর্তে তাকে আশ্রয়, আনন্দ
ও নির্ভরতা দিতে পারে যে শিল্প, তাকেই আমি শুদ্ধশিল্প বলে মনে করি।
৫.
শিল্পীদের সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে অনেক কথা বলা হয়! শিল্পীরা
'শিল্পের জন্য শিল্প' করবেন নাকি 'জীবনে জন্য শিল্প' করবেন এ নিয়ে
বিতর্ক বহু পুরনো। কূটতর্ক, বলাইবাহুল্য। সব শিল্পই জীবনের জন্য,
আবার সব শিল্প শিল্পের জন্যও বটে। শিল্প যদি জীবনের জন্য না-ই হবে
তাহলে সেটি কার জন্য? মরণের জন্য? নাকি মানুষ ব্যতিত অন্য কোনো
প্রাণীর জন্য, যাদের জীবনকে আমরা 'জীবন' বলেই মনে করিনা? অন্য কোনো
প্রাণী মানুষের সৃষ্ট শিল্প উপভোগ করে বলে তো মনে হয় না! নাকি ভিন
গ্রহের কারো জন্য? এই ধরনের ফালতু কথা বলার কোনো মানেই নেই আসলে।
শিল্পকে সবার আগে শিল্প হয়ে উঠতে হবে, শিল্পীর দায় হলো শিল্পকে আগে
শিল্প করে তোলা- সেটা 'জীবনের' জন্যই হোক, আর 'শিল্পের' জন্যই হোক।
এই দুটো ধারার সৃষ্টি হয়েছে আসলে দুটো চরমপন্থী চিন্তাবিদ দলের
দ্বারা। একদল মনে করেন, শিল্পকে হতে হবে মানুষের জন্য। এর মাধ্যমে
তাঁরা বোঝাতে চান যে, একজন শিল্পীর কাছে শিল্পের প্রয়োজনের চেয়ে
মানুষের প্রয়োজনই বড়ো হওয়া উচিত, মানুষের যে বৈষয়িক
সমস্যা-সংকট-বিপর্যয় আছে সেগুলোই শিল্পের বিষয়বস্তু হওয়া উচিত। এই
চিন্তার এঙ্ট্রিম ফর্ম হলো- শিল্পকে বিপ্লবের উপাদান হয়ে উঠতে হবে।
এই ধরনের এঙ্ট্রিম চিন্তার প্রতিক্রিয়া হলো- 'শিল্পের জন্য শিল্প'
মতবাদ। এই মতবাদীরা বলতে চাইলেন, শিল্পীর আর কোনোদিকে তাকানোর
দরকার নেই, কেবল শিল্প নিয়ে থাকলেই চলে। এই দুটোকেই চরমপন্থী মতবাদ
বলে মনে করি আমি। শিল্পী কোনো সমাজ-বিচ্ছিন্ন জীব নন, যে, তিনি
কেবল শিল্প নিয়েই থাকবেন; মানুষ-সাজ-রাষ্ট্র এসবের প্রতি তাঁর কোনো
দায় থাকবে না। আবার শিল্পী কোনো বিপ্লবীও নন। তাঁর কাছ থেকে
বিপ্লবী কর্মকাণ্ড বা সৃষ্টিকর্ম আশা করাও ঠিক নয়। শিল্প শেষ
পর্যন্ত বিপ্লব করতে পারে না, এটা এখন প্রমাণিত সত্য। কোনো
তাৎক্ষণিক অভিঘাত সৃষ্টি করাও শিল্পের পক্ষে সম্ভব নয়। শিল্প যা
পারে, তা হলো- খুব ধীরে, হয়তো শত বছর ধরে- একটি জনগোষ্ঠীর মনে একটু
একটু করে পরিবর্তন আনতে পারে। শিল্প মানুষকে আশ্রয় দেয়, প্রেরণা
দেয়, উচ্চস্তরের বিনোদন দেয়, মানুষের মনের আকার দেয়; কিন্তু এই
প্রক্রিয়াটি ধীর গতিতে ঘটে। চটকদার ভঙ্গিতে কথা বলে বিপ্লবী
ভাবমূর্তি নির্মাণের চেষ্টা কেউ কেউ করে থাকেন বটে, আবার কেউ কেউ
বালির মধ্যে মুখ গুঁজে ঝড়ের দাপট এড়াতে চান বটে- এই দুই ধরনের
শিল্পীই শেষ পর্যন্ত শিল্পের জন্য ক্ষতিকর।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শিল্পের দার্শনিক গুরুত্বও অপরিমেয়।
শিল্প যখন সফল হয়ে ওঠে, তা সে যে ধরনের শিল্পই হোক না কেন, তার
মধ্যে আপনি একটি দর্শন খুঁজে পাবেন। একটি সফল কবিতা বা গল্প বা
উপন্যাস বা নাটক বা চলচ্চিত্র বা চিত্রকলা বা সংগীত ভোক্তার মনে এক
দার্শনিক উপলব্ধির জন্ম দেয়। সেই অর্থে শিল্প নিজেই দর্শনকে ধারণ
করে রাখে। শিল্পীরা ভিন্ন ভিন্ন শিল্পমাধ্যম বেছে নেন কেন সেটাও
একটা প্রশ্ন হতে পারে, এ প্রসঙ্গে। এটা বোধহয় স্বাচ্ছন্দ্যবোধের
ব্যাপার। কেউ সাহিত্যে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, কেউ বা চলচ্চিত্রে,
কেউ সংগীতে করেন তো কেউ চিত্রকলায়। তবে, মূল বিষয়টি হচ্ছে- এই
শিল্পীরা তাঁদের কাজের মাধ্যমগুলো দিয়ে কারো না কারো সঙ্গে
কমিউনিকেট করতে চান, এবং তার দর্শনটি ভোক্তার কাছে পেঁৗছে দিতে
চান। মাধ্যমগুলো আসলে তাঁদের যোগাযোগের ভাষা। আমরা কবিতার ভাষা
নিয়ে কথা বলি, কথাসাহিত্যের ভাষা নিয়ে কথা বলি, চলচ্চিত্রের ভাষা
নিয়ে কথা বলি, কিন্তু একটি বিশেষ ব্যাপার ভুলে যাই যে, এই
মাধ্যমগুলো প্রত্যেকটিই একেকটি ভাষা হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ কবিতা
নিজেই একটি ভাষা, কবি সেটিকে ব্যবহার করেন তাঁর পাঠককে কমিউনিকেট
করার জন্য। চলচ্চিত্র বা চিত্রকলাও তাই। সংগীত অনেক বেশি বিমূর্ত
মাধ্যম হলেও এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা। আর সেজন্যই, যে ভাষায়ই
রচিত হোক না কেন, সংগীতের সুর যে-কোনো দেশে যে-কোনো কালে যে-কোনো
মানুষকে স্পর্শ করে। সেই অর্থে সংগীতই সবচেয়ে বেশি দেশকাল-নিরপেক্ষ
শিল্পমাধ্যম হয়ে উঠতে পেরেছে। শিল্পীর দায় হলো এমন এক শিল্পের জন্ম
দেয়া যা দেশকাল-নিরপেক্ষ হয়ে উঠবে।
সত্যি কথা বলতে কি, দায়বোধ ছাড়া শিল্পীই হওয়া যায় না। শিল্পী
মাত্রই মানুষকেন্দ্রিক-সমাজকেন্দ্রিক-সময়কেন্দ্রিক ব্যক্তি। কেউ
তার নানাবিধ সক্রিয়তার মধ্যে দিয়ে এসবের প্রত্যক্ষ প্রকাশ ঘটান,
কেউ ঘটান না- পার্থক্য এটুকুই। যিনি প্রকাশ করেন না, এটা তার
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, এ জন্য তাকে দায়ী করা যাবে না। ঘটান না বলে
যে তিনি সঙ্গে থাকেন না, তা তো নয়! এত যে নির্জন কবি জীবনানন্দ
দাশ, তাঁর কবিতায়ও কি সময়ের চিহ্ন ধরা নেই, দেশ-সমাজ-মানুষ নেই,
ইতিহাস ও ঐতিহ্যচেতনা নেই?
অবশ্য বাংলাদেশের মতো পোড়া দেশে শিল্পীর আরো কিছু দায় আছে। সেগুলো
হলো- মানুষের সঙ্গে থাকা, সময়ের সঙ্গে থাকা, প্রয়োজনে জনমানুষের
ডাকে সাড়া দেয়া। এসবকিছুর সমন্বয় যারা ঘটাতে পারেন, তারাই বড়ো
শিল্পী, মহান শিল্পী। তবে কেউ যদি এগুলো না করে, কেবল শুদ্ধশিল্প
রচনার দায়িত্বে মগ্ন থাকেন, তবু তাকে এতটুকু ছোট ভাববার উপায় নেই।
তিনি তার কাজটিই করে যাচ্ছেন। মহাকাল একমাত্র শিল্পকেই বাঁচিয়ে
রাখে, শিল্পসৃষ্টিই মহত্তম কাজ। তাৎক্ষণিক কাজে না লাগুক, বহুদূরে,
বহুকাল পরের পাঠক-দর্শক-শ্রোতা অর্থাৎ শিল্পভোক্তারা তাদের জীবনের
গড়ন দেবেন এসব শিল্প দিয়ে! কাজটি কি কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ?
শিল্পীর মূল দায়, তাই, শিল্পকে শিল্প করে তোলা, তার আর কোনো কাজ
নেই। শিল্প তাৎক্ষণিকভাবে সমাজ পরিবর্তন করতে পারে না, এটা
প্রমাণিত সত্য। যা করতে পারে তা হলো- প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের
কিছু মানুষের মনের গড়ন দিতে; মানুষকে করে তুলতে পারে সংবেদনশীল।
একজন শিশু-কিশোরের মন কাদামাটির মতো নরম এবং আকারবিহীন থাকে। ধীরে
ধীরে নানা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অভিজ্ঞতা সেই মনের আকার দেয়।
শুদ্ধশিল্পের ভোক্তা যদি হয়ে ওঠে সে, তাহলে তার মনটি সেভাবেই আকার
পাবে। আর শৈল্পিক মনের এই সংবেদনশীল মানুষগুলোই সমাজে পরিবর্তন
আনে। সুতরাং, শিল্প সমাজ পরিবর্তন করে বটে, তবে, পরোক্ষভাবে,
দীর্ঘসময় ধরে; প্রত্যক্ষভাবে নয়, তাৎক্ষণিকভাবে তো নয়ই! আজকের যে
পৃথিবী তা শিল্পেরই পৃথিবী! যদি শিল্পের জন্ম না হতো পৃথিবীতে,
তাহলে মানবজাতি তার আদিম অবস্থা থেকে বেরুতেই পারতো না। তবে
শিল্পের এই ভুবনবিস্তারি কাজটি সাধিত হয়েছে খুব ধীরলয়ে, দীর্ঘসময়
ধরে। এতটাই ধীরে যে আমরা সবসময় তা অনুভবও করে উঠতে পারি না।
সেপ্টেম্বর- ২০০৯
|
| |
 |
|