সামপ্রদায়িকতা এমন একটি বিষয় যেটি ব্যাখ্যা
করার জন্য একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি-ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং
আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পটভূমি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন হয়।
কাজটি কঠিন, কিন্তু সেটি করে ওঠা সম্ভব হলেও ওই জনগোষ্ঠীর মনোজগতের
ধরনটি বুঝে নেয়ার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়ে যায়।
বলাবাহুল্য, এই বিষয়গুলো একে অপরের সঙ্গে পরিপূরকভাবে সম্পর্কিত।
অর্থাৎ একটি জনগোষ্ঠীর মন বুঝতে হলে তার সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে যেমন
ভালোভাবে বুঝে নেয়া দরকার তেমনি ওই জাতির সংস্কৃতি ও ইতিহাস বুঝতে
হলে কিংবা ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনায় জনগণের অংশগ্রহণ বা প্রতিক্রিয়ার
ধরনটি বুঝতে হলে তাদের মানসিক কাঠামোটিও বিশ্লেষণ করে নিতে হবে, আর
সেটা করতে পারলেই কেবল ইতিহাসের গতিপ্রকৃতির মর্মার্থ উপলব্ধি করা
সম্ভব। কিন্তু মনের বিষয়টি বিমূর্ত বলে তাকে বুঝে ওঠা সহজ নয়।
কোনটা আগে প্রশ্ন করলে বলতে হবে _ ইতিহাস ও সংস্কৃতিই আগে বুঝতে
হবে, কারণ মন বুঝতে হলে পারিপাশ্বর্িকতার সহযোগিতা দরকার। মুশকিল
হলো, লিখিত ইতিহাসে জনগণ থাকে বরাবরই উপেক্ষিত, ইতিহাস মানেই যেন
রাজ-রাজড়াদের ব্যাপার, জনগণের যেন কোনো ভূমিকাই ছিলো না ইতিহাসের
কোনো পর্বে, কোনো ঘটনায়। তাহলে এই ইতিহাস থেকে আমরা জনগণের মন
বুঝবো কিভাবে? অন্যদিকে বাংলাদেশের মানুষের কাছে সংস্কৃতি শব্দটি
প্রায় বিমূর্ত রূপ ধারণ করেছে। শব্দটি বাংলা ভাষায় গৃহীত হবার পর
থেকে আজ পর্যন্ত যত বিভ্রান্তি ও তর্ক-বিতর্ক তৈরি করেছে, অন্য
কোনো শব্দ তা করেছে বলে আমার জানা নেই। সংস্কৃতি বিষয়টি বোঝার জন্য
যাদেরকে নিয়ে কথা বলা দরকার _ অর্থাৎ দেশের জনগণ _ তারা এখন
পর্যন্ত জানতেই পারলো না, বুঝতেও পারলো না যে, ওই বস্তুটি কী!
দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষাবঞ্চিত নিরক্ষর লোকজন তো বটেই, এমনকি বহু
'শিক্ষিত' লোককেও বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তিতে ভুগতে দেখেছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী এবং উচ্চতর পেশাগত মর্যাদায়
অভিষিক্ত অনেক লোকও সংস্কৃতি বলতে কেবল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকেই
বুঝে থাকেন। অর্থাৎ নাচ-গান-নাটক-চলচ্চিত্র-শিল্প-সাহিত্য
ইত্যাদিকেই সংস্কৃতি বলে মনে করেন। বলাবাহুল্য এগুলো সংস্কৃতিরই
অংশ, সংস্কৃতির পুরোটা নয়। 'সাংস্কৃতিক' শব্দটির সঙ্গে সংস্কৃতির
মিল থাকায় এই বিপত্তি। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ বিষয়টি নিয়ে
মাথাই ঘামায় না, আর শিক্ষিত লোকদের ধারণা এই রকম। অনেকে আবার
বিষয়টিকে ধর্মবিরোধী বলেও মনে করেন (যেহেতু নাচ গান ইত্যাদি
ধর্মসম্মত নয়)। ধর্মও যে সংস্কৃতিরই অঙ্গ এ কথা শুনলে সম্ভবত তাদের
মাথায় বাজ পড়বে। বাংলাদেশে এই হলো সংস্কৃতি সম্বন্ধে প্রচলিত
ধারণা।
তা সংস্কৃতি-চেতনার এই করুণ হাল কেন? একটা কারণ হতে পারে _ শব্দটি
জনগণের পছন্দ হয় নি, কিংবা গ্রহণযোগ্য মনে হয় নি, কিংবা বোধগম্য হয়
নি। শব্দটি চালু করার জন্য রবীন্দ্রনাথ যে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন
তাতে প্রাথমিকভাবে জয়ী হলেও শেষ বিচারে তাঁর এই বিজয়কে নিস্ফলই
বলতে হচ্ছে। অবশ্য সংস্কৃতির এই ধরনের ইন্টারপ্রিটেশনের জন্য স্বয়ং
রবীন্দ্রনাথকেও দায়ী করা চলে। কালচারের প্রতিশব্দ হিসেবে তিনি
কৃষ্টিকে পছন্দ তো করেন-ই নি, বরং তীব্র বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন
[সূত্র : কৃষ্টি কালচার সংস্কৃতি, নীহাররঞ্জন রায়]। কৃষ্টি যেহেতু
কর্ষন বা কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পর্কিত, তিনি তাই এটাকে পছন্দ করেন
নি, তিনি সংস্কার অর্থে সংস্কৃতিকে নিয়েছেন। অর্থাৎ মনের কর্ষন নয়,
সংস্কারই তার পছন্দ ছিলো! এ থেকে তাঁর মনোজগতের কাঠামোটিও খানিকটা
বুঝে নেয়া যায়। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অনুষঙ্গ-উপকরণ আর
প্রয়োজনকে তিনি সংস্কৃতির মর্যাদা দিতে চান নি _ হয়তো এগুলোকে তিনি
স্থূল হিসেবেই বিবেচনা করতেন; বরং শিল্পসাহিত্যের মতো সূক্ষতম
অনুভূতির চর্চাকে তিনি সংস্কৃতির মর্যাদা দিয়েছেন। বাংলাদেশে
সংস্কৃতি সম্বন্ধে যে ধারণাটি প্রচলিত আছে তা আসলে রবীন্দ্র
কনসেপ্টেরই সমপ্রসারণ। কিন্তু আমরা আমাদের আলোচনায়
রবীন্দ্র-ভাবনাবিশ্ব থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। বাঙালির সংস্কৃতিকে
বুঝে নেয়ার জন্য তার জীবনাচরণের প্রতিটি অনুষঙ্গ বিচার বিশ্লেষণ
করে দেখা প্রয়োজন। অর্থাৎ বাঙালির খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-আশাক,
আচার-আচরণ, সংস্কার, বিশ্বাস, ধর্ম, ধর্ম বিশ্বাসের ধরন,
ধর্মাচরণের ধরন, পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক, শিল্প-সাহিত্য এসবই
আলাদাভাবে বিচার-বিবেচনার দাবি রাখে। তার আগে, সংস্কৃতি বলতে আমরা
আসলে কী বুঝবো সেটা বলে নেয়া দরকার। অবশ্য সংস্কৃতি সম্বন্ধে যা-ই
বলি না কেন, তা খুব একটা নতুন শোনাবে না। বহু পণ্ডিত ব্যক্তি এ
সম্বন্ধে বিজ্ঞোজনোচিত মতামত রেখেছেন, সংস্কৃতির সংজ্ঞা দিতে গেলে
কমবেশি তাদের কথাই ধার করতে হবে। তাহলে সংজ্ঞা দেয়ার দরকারটা কি?
দরকার এজন্য যে, _ আগেই বলেছি _ সংস্কৃতি বিষয়টি, এমনকি শব্দটিও,
বরাবর বিভ্রান্তি তৈরি করে এসেছে; এ সম্বন্ধে নিজের অবস্থানটি
পরিষ্কার করার জন্যই একেকজন একেকটি সংজ্ঞাকে প্রমিত হিসেবে ধরে
নেন। আমিও একই কারণে সংস্কৃতি সম্বন্ধে প্রচলিত অন্তত কয়েকশ' মতের
মধ্যে দুটোকে আমার মতের কাছাকাছি বলে গ্রহণ করছি। একটি _
"culture
is the man made part of the environment"
(হারস্কোভিটস)। অধ্যাপক পবিত্র সরকার এটিকে ব্যখ্যা করেছেন এভাবে :
'মানুষ আসার আগে পৃথিবী যে অবস্থায় ছিলো আর মানুষ আসার পর পৃথিবীর
যে অবস্থা দাঁড়ালো এই দুইয়ের তফাত হলো সংস্কৃতির তফাত। পৃথিবীর
জীবন প্রতিবেশে মানুষের সৃষ্ট যা কিছু সে সবই সংস্কৃতি বাকিটা
প্রকৃতি।' এরকম আরেকটি সংজ্ঞাও নেয়া যায় _"Historically
created designs for living, explicit and implicit, rational,
irrational and nonrational which exist at any time as potential
guides for the behaviour of men"
(ক্লাইড ক্লাকহোন ও উইলিয়াম কেলি)। মানে দাঁড়ালো _ ঐতিহাসিকভাবে
সৃষ্টি হওয়া জীবনযাপনের নানা ছক (ডিজাইন), যা কখনো প্রকাশ্য কখনো
গোপন, কখনো যুক্তিসম্মত, কখনো অযৌক্তিক, কখনো যুক্তি নিরপেক্ষ
(অর্থাৎ যেখানে যুক্তি-অযুক্তির প্রশ্ন তোলাই অবান্তর) এবং যা
যে-কোনো সময়ে একটি জনগোষ্ঠীর আচরণকে পরিচালিত করে তাই-ই হচ্ছে
সংস্কৃতি। পবিত্র সরকার যুক্তিসম্মত উপকরণের উদাহরণ হিসেবে খাদ্য,
পোশাক ইত্যাদির উল্লেখ করেছেন, অযৌক্তিক উপাদান হলো ধর্ম বা
সংস্কার-কুসংস্কার (যেহেতু এগুলো মূলত বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে,
যুক্তির ওপরে নয়), আর ভাষা হচ্ছে যুক্তিনিরপেক্ষ উপাদান [সূত্র :
লোকভাষা লোকসংস্কৃতি, পবিত্র সরকার]। যা হোক, এ সম্বন্ধে আমার
নিজের মতটি হলো _ সংস্কৃতি বলতে একটি জাতির প্রতিটি অনুষঙ্গকেই
বুঝবো আমরা _ পোশাক-আশাক, খাদ্যাভ্যাস, ঘর-বাড়ির প্যাটার্ন থেকে
শুরু করে তার বিশ্বাস-অবিশ্বাস-সংস্কার-কুসংস্কার ইত্যাদি সবই
সংস্কৃতির অঙ্গ।
বাঙালির সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনার জন্য আমরা এর দু-একটি অনুষঙ্গ নিয়ে
প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারি। যেমন, প্রশ্ন করা যায় খাদ্যাভ্যাস নিয়ে।
বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাত-মাছ কেন? (সবাই ভাত-মাছ পাচ্ছে কী না
সেটা ভিন্ন প্রশ্ন, পাক আর না পাক তাদের প্রধান এবং প্রিয় খাদ্য যে
ভাত-মাছ সেটা তো আর অস্বীকার করা যাবে না!) কেন ভাত-মাংস নয়? অথবা
রুটি-মাংস নয়? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন নয়। কৃষিপ্রধান একটি
দেশে _ ধান যেখানে প্রধান শস্য _ সেখানে ভাত যে প্রধান খাদ্য হবে
তা আর অস্বাভাবিক কি? আর যে দেশের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে আছে
নদী-নালা-খাল-বিল-হাওড়-পুকুর-দীঘি এবং যেখানে প্রাকৃতিকভাবেই
প্রচুর মাছের জন্ম হয় _ সেখানে মাছও যে প্রধান খাদ্যতালিকায় স্থান
করে নেবে সে-ও তো বিস্ময়কর নয়। তার মানে দাঁড়াচ্ছে এই যে, একটি
জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সেই দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা ও
ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্টাবলী অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। এ দেশের ভূ-প্রকৃতি
যদি পানি প্রধান না হতো, তাহলে মাছ নিশ্চয়ই প্রধান খাবার হতো না!
কোনো মরুপ্রধান অঞ্চলে মাছ প্রধান খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয় বলে
আমার জানা নেই। এরকম প্রশ্ন তোলা যায় পোশাক-আশাক নিয়েও। বাংলাদেশের
মানুষ রুশদের মতো ফারকোট পড়ে না কেন, কিংবা আরবদের মতো আপাদমস্তক
সাদা কাপড়ে ঢেকে চলাফেরা করে না কেন? কারণ _ বাংলাদেশের জলবায়ু বা
আবহাওয়া ওই ধরনের পোশাককে অনুমোদন করে না, কিংবা এই আবহাওয়ায় ওই
ধরনের পোশাক পড়ার দরকার নেই। রুশরা প্রবল শীত থেকে বাঁচার জন্যই
ওরকম পোশাক পড়ে, অন্যদিকে মরুভূমির লু হাওয়া এবং প্রচণ্ড গরম
আবহাওয়া থেকে বাঁচার জন্য আরবদের তাপ প্রতিরোধক সাদা পোশাক পড়তে
হয়। শুধু জলবায়ু বা আবহাওয়াই নয়, প্রকৃতির
রূপ-সৌন্দর্য-বৈশিষ্ট্যও মানুষের স্বভাব-চরিত্র এবং তার
সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে। মরুভূমির রুক্ষতাও সুন্দর, যেমন সুন্দর
আগ্নেয়গীরির অগ্নু্যৎপাত কিন্তু দুটোই আগ্রাসী সুন্দর বা
অ্যাগ্রেসিভ বিউটি। যেসব দেশে এগুলো আছে সেখানকার মানুষ যে একটু
রুক্ষ হবে, কিংবা তারা যে আগ্রেসিভ বিউটি পছন্দ করবে তা আর
অস্বাভাবিক কি? অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কোমল ও
মায়াময়, এ দেশের মাটি নরম ও উর্বর। এই রুক্ষ ঢাকা শহরেও প্রায়
অবহেলায় যে পরিমাণ গাছ জন্মায় তা পৃথিবীর আর ক-টি শহরে জন্মায় সে
বিষয়ে সন্দেহ আছে। এ দেশের যে দিকেই তাকাবেন, দেখবেন সবুজ, দেখবেন
শান্ত-রূপময়ী নদী। এমন কোমল, মায়াময় প্রকৃতির মধ্যে দিয়ে বেড়ে ওঠা
মানুষগুলো যে একটু আবেগপ্রবণ হবে সে তো বলাই বাহুল্য, পছন্দের
বেলায় অ্যাগ্রেসিভ বিউটির চেয়ে তারা যে সফট বিউটিকেই বেশি গুরুত্ব
দেবে সেটাই তো স্বাভাবিক। নদীমাতৃক এই দেশের নদীনালা-হাওর-বিল যে
শুধু মানুষের খাদ্যাভ্যাস তৈরিতেই ভূমিকা রেখেছে তা নয়, মানুষের
স্বভাব-চরিত্র নির্মাণেও ভূমিকা রেখেছে। নদীতীরবর্তী বা পানিপ্রধান
অঞ্চলের মানুষ সাধারণত অবৈষয়িক, উদাসীন এবং ভাববাদী ধরনের হয়।
এদেশের বাউল সমপ্রদায়ের উৎপত্তি ও বিকাশের দিকে নজর দিলেও বিষয়টির
সত্যতা উপলব্ধি করা যাবে। আমাদের বাউলরা প্রায় সকলেই পানিপ্রধান
অঞ্চলের মানুষ। সম্ভবত নদীর মধ্যে ঘর-ছাড়ার একটা ইঙ্গিত আছে, আছে
ভাববাদিতা। এ দেশেরই পাহাড়ি অঞ্চলে কিন্তু বাউল জন্ম নেয় না _ এই
বিষয়টিও ভেবে দেখবার মতো!
২.
সংস্কৃতি সম্বন্ধে এভাবে অনেক কথাই বলা যায়, বাঙালি সংস্কৃতির ওপর
আমাদের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যাবলীর প্রভাব নিয়েই রচিত হতে পারে
আলাদা একটি প্রবন্ধ। কিন্তু এই রচনায় আমি বিশেষভাবে কথা বলতে চাই
সংস্কৃতি ও সামপ্রদায়িকতা নিয়ে। বিশেষ করে আমাদের মনোজগতে
সামপ্রদায়িকতার বিষয়টি কী রূপে অবস্থান করে আছে, তার একটু
সুলুক-সন্ধান করে দেখতে চাই।
বাংলাদেশকে বলা হয় সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির দেশ। কিন্তু সত্যি কি
এদেশের মানুষ অসামপ্রদায়িক, নাকি ওটা তাদের ওপরের প্রলেপ, ভেতরে
ভেতরে তারা ঠিকই বহন করে চলেছে সামপ্রদায়িকতার বিষবাস্প? এই প্রশ্ন
ক্রমেই ঘনিয়ে উঠছে সবার মনে; নিজ দেশের জনগণের স্বভাব-চরিত্র নিয়ে,
তাদের মনোজগতের কার্যকলাপ নিয়ে সন্দেহ জাগছে; মনে হচ্ছে _ এদেরকে
যেভাবে আমরা চিনি, এরা কি সত্যি এরকম? বাংলাদেশের মানুষ যদি সত্যি
সত্যি অসামপ্রদায়িক হয়ে থাকে, তাহলে কিভাবে এদেশের প্রায়
প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল ধর্মকে ব্যবহার করে জনগণকে উত্তেজিত করে
তুলতে সক্ষম হচ্ছে? ভোটের রাজনীতিতে সাফল্য পাবার জন্য কেন ধর্মই
হয়ে উঠছে প্রধান হাতিয়ার? ধর্ম-কর্মের লেশমাত্র নেই এমন সব
রাজনীতিকদেরকেও কেন পড়তে হচ্ছে ধর্মের লেবাস?
বলার অপেক্ষা রাখে না _ আমদের জনগণ সাধারণভাবে অসামপ্রদায়িক।
জনগণের মধ্যে যে সামপ্রদায়িক সম্প্রীতি রয়েছে তা-ও অন্য যে-কোনো
দেশের তুলনায় যথেষ্ট পরিমাণে উজ্জ্বল। তারপরও মাঝে মাঝে এদেশে
দুর্ঘটনা ঘটে কেন? কেন কিছু মানুষ এমন ভয়ংকর সামপ্রদায়িক আচরণ করে?
মানুষ আসলেই অসামপ্রদায়িক কী না, নাকি ওটা তাদের ওপরের প্রলেপ, এ
প্রশ্ন করলে নতুন প্রশ্ন জন্ম নেবে _ একজন সামপ্রদায়িক মানুষের
পক্ষে কতদিনই বা প্রলেপ মেখে চলা সম্ভব? মানুষ (শুধু বাংলাদেশের
নয়, সারা পৃথিবীর মানুষ) যেহেতু জন্মগতভাবে (জেনেটিক্যালি)
সামপ্রদায়িক (কথাটা শুনে চমকে উঠবেন না, পাঠক, আমরা এই এখনই বিষয়টি
নিয়ে আলোচনা করবো), আমাদের সমস্যাটাও কি তাহলে জেনেটিক? এসব
প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কারভাবে আমাদের কাছে আছে বলে মনে হয় না, আর
আমরা এই উত্তরগুলোই খুঁজে দেখতে চাই। বিষয়টি সম্বন্ধে আমি জেনেটিক
তত্ত্ব ও ইয়ুং কথিত মনস্তত্ত্বের ধারণার সাহায্য নিয়ে আলোচনা করবো।
জন্ম থেকেই মানুষ কোনো-না-কোনো সামপ্রদায়িকতার বীজ বহন করে নিয়ে
আসে। এই কথাটি বিপদজনক এবং এ কথার পিঠেই একটি প্রশ্ন দাঁড়িয়ে থাকে
_ যদি তাই হয়, তাহলে তো সারা পৃথিবী জুড়েই অহরহ সামপ্রদায়িক দাঙ্গা
লেগে থাকার কথা, তা ঘটছে না কেন? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য
ব্যাপক পরিসর দরকার। এই লেখায় অতি সংক্ষেপে আমি বিষয়টি কেবল
উত্থাপন করছি, এবং এ জন্য আলোচনায় আনতে হচ্ছে জিন, জেনেটিক
গুণাবলী, সামপ্রদায়িকতার স্বরূপ ও প্রকারভেদের বিষয়গুলোও। সে
আলোচনায় প্রবেশের আগেই একবাক্যে ওপরে উত্থাপিত প্রশ্নটির উত্তর
দেয়ার চেষ্টা করা যাক _ অন্যান্য জেনেটিক গুণাবলীর মতোই
সামপ্রদায়িকতাও মানুষের জিন মানচিত্রে একটি উপাদান হিসেবে আছে,
কিন্তু সব মানুষের মধ্যে সেটা প্রধান বা প্রভাব বিস্তারকারী
(prominent/dominating)
হয়ে ওঠে না বলে পৃথিবীর সব মানুষ সামপ্রদায়িক নয়।
আবার সামপ্রদায়িকতার একটি ইতিবাচক রূপও আছে যেটাকে আসলে আমরা
সামপ্রদায়িকতা বলে মনেই করি না। ইতিবাচক বা নেতিবাচক যে রূপেই হোক
ব্যাপারটা মানুষের মধ্যে থাকবেই। বিষয়টি নিয়ে আমরা একটু পরেই
বিস্তৃতভাবে আলোচনা করবো।
জিন ও জেনেটিক গুণাবলী
যে প্রসঙ্গটি আমরা উত্থাপন করেছি সেটি আলোচনার জন্য 'জিন' বিষয়টি
একটু জানা দরকার। প্রিয় পাঠক, এ জন্য আমাকে কয়েকটি টেকনিক্যাল
টার্ম ব্যবহার করতে হবে, তবে আমি বিষয়টিকে যথাসম্ভব সহজভাবে বলার
চেষ্টা করবো। আমরা জানি, সব ধরনের জীবের শরীর গঠিত হয় নানা ধরনের
কোষ
(pan>cell)
দিয়ে।
DNA হলো (পুরো নাম : ডি-অক্সিরাইবো নিউক্লিয়িক এসিড _
Deoxyribonucleic acid)
এই কোষেরই এমন একটি উপাদান যা কোষের
সমস্ত কার্যকলাপ, আচার-আচরণ, চারিত্র-বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে।
এনসাইক্লোপেডিয়া অব সায়েন্সে (এর পরের সংজ্ঞাগুলোও সেখান থেকেই
নেয়া) ডিএনএ\'র সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এভাবে _
DNA controls everything a cell does, from how long it lives to
which reactions occur inside it. জিন হলো এই ডিএনএ-এর একটি
উপাদান _
A small section of the DNA found in the nucleus of each cell of
a living organism. Genes carry instructions for the organisms’
cell to make particular proteins, which in turn determine the
organisms’ development and characteristics. অন্যত্র
Genes carry the information that helps to determine and to
control of an organisms’ characteristics and it is seen that one
gene may control several characteristics.
সহজভাবে বলা যায় _ প্রত্যেকটি কোষের কেন্দ্রে থাকে এই জিন এবং এরা
এমন কিছু তথ্য ও নির্দেশ বহন করে যা একটি জীবের যাবতীয়
চারিত্র_বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। অর্থাৎ একজন
মানুষ (বা যে কোনো জীব) দেখতে কেমন হবে, তার আচার ব্যবহার আচরণ
ইত্যাদি কেমন হবে তা-ও নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করে জিন। মানুষ যে
জন্মগতভাবেই বা ঐতিহ্যগতভাবেই তার পূর্বপুরুষদের কিছু বৈশিষ্ট্য
পেয়ে যায়, তারও ব্যাখ্যা আছে জিনতত্ত্বে। বিজ্ঞানের ভাষায় ঐতিহ্য
বা
Heredity'র সংজ্ঞা হলো _
Heredity is the transmission of the characteristics from one
generation to the next.
ev Ñ
Heredity is the passing on of characteristics to a new
generation of organisms determined by the genetic material of
the parent or parents. (ঐতিহ্য হচ্ছে বংশানুক্রমে অর্থাৎ
পূর্ব-পুরুষ থেকে উত্তর-পুরুষের মধ্যে প্রবাহিত চারিত্র-বৈশিষ্ট্য,
যা বহন করে জিন।)
কিন্তু কথা হচ্ছে, মানুষের মধ্যে যে নানারকম দোষগুণ থাকে, তার সবই
যদি সে পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পেয়ে থাকে, তাহলে একজন মানুষ কীভাবে
অন্য সব মানুষ থেকে আলাদা হয়ে ওঠে? আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলি _ একই
পরিবারের দুজন মানুষ কখনো কখনো কেন ভিন্ন মেরুর মানুষ হয়? কিংবা
প্রশ্ন ওঠে _ মানব জাতির মধ্যে কীভাবে এমন 'ভালো' এবং 'খারাপ'
মানুষের আবির্ভাব হলো? কেন শুধু মাত্র ভালো মানুষ বা শুধুমাত্র
খারাপ মানুষ হলো না? এর উত্তর মেলে ওই জিনতত্ত্বেই _
In human, each cell usually contains two versions of every gene
– one inherited from each parent – and these alternative forms
are called alleles. Different alleles often have
different effects on the characteristics and when two variants
occur together in an organism, one may have a much stronger
influence than the other. In this case the most active allele is
described as Dominant
and least active allele as
Recessive.
অর্থাৎ মানুষ তার কোষে প্রত্যেকটি জিনের দুটো রূপ বা ভার্সন ধারণ
করে। এর একটি সে পায় তার মায়ের (এবং মায়ের পূর্বপুরুষের) কাছ থেকে,
অন্যটি পায় বাবার (এবং বাবার পূর্বপুরুষের) কাছ থেকে _ এই
প্রত্যেকটি ভার্সন সাধারণভাবে অষষবষব হিসেবে পরিচিত। ভিন্ন ভিন্ন
allele মানুষের চরিত্রের ওপর ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলে, এবং
কোনো মানুষের মধ্যে এই দুটো
allele যদি একইরূপে অবস্থান করে, তাহলে কোনো একটি বিশেষ
বৈশিষ্ট্য তার মধ্যে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। এই ধরনের প্রভাবশালী
allele-গুলোর সাধারণ নাম
Dominant
এবং প্রভাবহীন
allele-গুলোর নাম
Recessive.
মোট কথা, মানুষের মধ্যে যে বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশিত হতে দেখা যায়
সেগুলো আসলে ওই
dominant ভার্সনেরই প্রকাশ,
recessive-গুলো থাকে সুপ্ত অবস্থায়। মনে রাখা দরকার যে,
recessive-গুলো সুপ্ত অবস্থায় থাকে, হারিয়ে যায় না। তার
মানে, আমরা বলতে পারি _ একজন মানুষের প্রকাশিত চরিত্রই তার একমাত্র
চরিত্র নয়, সুপ্ত একটি চরিত্রও আছে।
একটি সহজ উদাহরণ দেয়া যাক। মানুষ গায়ের রঙ পায় তার পূর্বপুরুষের
কাছ থেকে। কিভাবে? ধরা যাক মা-বাবা দুজনের গায়ের রঙই কালো। তাহলে
তাদের সন্তানের রঙ-সংক্রান্ত তথ্যবাহী
allele-গুলোর রূপ হবে অভিন্ন (দুটোই কালো রঙের তথ্য বহন
করবে) এবং তার রঙও হবে কালো। কিন্তু যদি মায়ের রঙ ফর্সা আর বাবার
রঙ কালো হয় (কিংবা উল্টোটা) তাহলে
allele-গুলোর রূপ হবে ভিন্ন, অর্থাৎ দুরকম, এবং দুটোর মধ্যে
যেটি
dominant হয়ে উঠবে সন্তানের রঙ হবে সেরকম। অর্থাৎ মায়ের কাছ
থেকে পাওয়া ভার্সনটি ফড়সরহধহঃ হয়ে উঠলে সন্তানের রঙ হবে ফর্সা,
উল্টোটা হলে কালো। কিন্তু একটি ভার্সন যদি
dominant হয়ে ওঠে তাহলে আরেকটি ভার্সন কোথায় যাবে? সেটা
থাকবে সুপ্ত অবস্থায়। অর্থাৎ সেটি
recessive allele হয়ে যাবে। এখন ধরা যাক সন্তানটি একটি ছেলে
এবং তার রঙ কালো; বড় হয়ে সে একটি কালো মেয়ের সঙ্গে মিলিত হয়ে একটি
সন্তানের জন্ম দিলো। প্রশ্ন হচ্ছে এই নতুন শিশুটির রঙ কি হবে?
এক্ষেত্রে মা বাবা দুজনই কালো, এই শিশুটির রঙ যে কালোই হবে, সেটা
কি নিশ্চিতভাবে বলা যায়? না যায় না। কারণ এই শিশুটির বাবার (এবং
হয়তো মায়েরও) জিনের মধ্যে একটি ফর্সা রঙের তথ্যবাহী
allele সুপ্ত অবস্থায় রয়ে গেছে যা সে পেয়েছিলো তার মায়ের
(অর্থাৎ শিশুটির দাদির) কাছ থেকে। অতএব এই নতুন শিশুটির মধ্যে তার
বাবার মধ্যে থেকে ওই
recessive alleleটি চলে আসতে পারে, হয়ে উঠতে পারে
dominant
ও _ সেক্ষেত্রে শিশুটির রঙ হবে ফর্সা এবং আমরা তখন বলবো _ বাচ্চাটা
দেখতে ওর দাদির মতো হয়েছে! কিন্তু বাবার কাছ থেকে ওটা পাওয়া
সত্ত্বেও যদি সেটা
dominant না হয় তাহলে তার রঙ কালোই হবে। কিন্তু মনে রাখা
দরকার, এই শিশুটির মধ্যেও ওই সুপ্ত
allele-টি সুপ্ত অবস্থায়ই রয়ে গেছে, যা আবার তার সন্তানদের
মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হয়ে পড়তে পারে! এভাবে পূর্বপুরুষের কোনো একটি
বৈশিষ্ট্য দু/তিন/চার প্রজন্ম ধরে সুপ্ত অবস্থায় থাকলেও পরবর্তী
কোনো এক প্রজন্মে তা প্রকাশিত হয়ে পড়তে পারে।
জিনতত্ত্ব মতে মানুষ তার বৈশিষ্ট্যসমূহ পায় তার পূর্ববর্তী
প্রজন্মসমূহ থেকে। অর্থাৎ একটি শিশু তার জন্মমুহূর্তেই ধারণ করে
থাকে এতসব অতীতকালের তথ্য যে, তাকে শুধুমাত্র এই সময়ের মানুষ বললে
ভুল হয়, সে আসলে তার পূর্ববর্তী সকল মানুষের ইতিহাসের যোগফল।
জিনতত্ত্বের এই জায়গাটি মনস্তত্ত্ববিদ কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং-এর
কালেকটিভ আনকনশাসনেস বা যৌথ-অবচেতনার ধারণার সঙ্গে মিলে যায়।
ফ্রয়েডের পরে ইয়ুং-ই সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রভাবশালী মনোবিজ্ঞানী,
এবং তাঁর যৌথ-অবচেতনার ধারণাটি মনোবিজ্ঞানে এক নতুন ও যুগান্তকারী
দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ইয়ুং -এর মতে মানুষের মনের স্তর দুটো নয়,
তিনটি। অর্থাৎ সচেতন মন এবং ব্যক্তিগত অবচেতন মন ছাড়াও রয়েছে তৃতীয়
আরেকটি স্তর _ যার নাম তিনি দিয়েছেন যৌথ-অবচেতনা বা কালেকটিভ
আনকনশাসনেস। প্রথমোক্ত দুটো স্তর সম্বন্ধে সবাই কম বেশি জানেন, তবু
সংক্ষেপে দু-একটা কথা বলা যাক। মনের সচেতন স্তর _ এটাকে সবচেয়ে
উপরিতলের স্তর বলা যায় _ সম্পূর্ণভাবে বর্তমানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
অর্থাৎ এটা হচ্ছে সেই স্তর যার মাধ্যমে আমরা বর্তমান ঘটনা ও
পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নানাবিধ
প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করি। মোট কথা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের
আচার-আচরণ, সম্পর্ক, প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি নিয়ন্ত্রিত হয় এই স্তর
দিয়েই। মনের এই স্তরটির ওপর ব্যক্তিমানুষের নিয়ন্ত্রণ আছে। একজন
মানুষ রুচি, শিক্ষা, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির সাহায্য নিয়ে সিদ্ধান্ত
নিতে পারে _ কোনো একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সে কী ধরনের আচরণ
প্রদর্শন করবে। অন্যদিকে অবচেতন মনের ওপর বলতে গেলে মানুষের
নিয়ন্ত্রণ নেই-ই, যদিও মনের এই দ্বিতীয় স্তরটিও মানুষের ব্যক্তিগত
অভিজ্ঞতা ও প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। এই স্তরে এমন সব উপাদান
থাকে যা কোনো একসময় ঐ ব্যক্তির সচেতন মনেই ছিলো কিন্তু কালক্রমে _
প্রকাশিত হতে না পেরে _ দ্বিতীয় স্তরে চলে গেছে। সচেতন ও অবচেতন
মনের মধ্যে থাকে একটি অদৃশ্য অথচ দৃঢ়বদ্ধ দেয়াল। মানুষের চূড়ান্ত
আবেগপ্রবণ মুহূর্তে কখনো কখনো এই স্তর থেকে প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত
হয়। যেমন, মানুষ যখন খুব রেগে যায় তখন সে এমন কিছু কথা বলে ফেলে যা
হয়তো তার পরিচিত চরিত্রের সঙ্গে মানানসই নয় _ প্রকৃতপক্ষে এই
কথাগুলো কোনো এক সময়ে তার সচেতন মনেই ছিলো, কিন্তু ওই সময়
পারিপাশ্বর্িক নানা কারণে প্রকাশ করতে পারে নি বলে তা অবচেতন মনে
চলে গেছে। কিন্তু যেহেতু আবেগপ্রবণ মুহূর্তে সচেতন ও অবচেতন মনের
মধ্যেকার অদৃশ্য দেয়ালটি খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়ে, তাই সে এটার
প্রকাশে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে নি। মনের এই দুটো স্তর
ব্যক্তিমানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও যৌথ-অবচেতনার
স্তরটির সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিজীবনের কোনো সম্পর্ক নেই। এই স্তরটি
ব্যক্তির নিজস্ব ভাবনা-চিন্তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে না এবং ব্যক্তি তা
ব্যক্তিগতভাবে অর্জনও করতে পারে না। মানুষ এই স্তরটিকে
বংশানুক্রমিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে বহন করে। মনের এই তৃতীয় স্তরটি কখনই
সচেতন মনের গণ্ডির মধ্যে ছিলো না, অবচেতন হিসেবেই এর জন্ম। এই
স্তরে মানুষ তার জন্ম থেকেই সেইসব তথ্য ও অভিজ্ঞতা বহন করে নিয়ে
আসে যা তার পূর্বপুরুষেরা সঞ্চয় করেছিলো। গুস্তাভ ইয়ুং বলেছেন
(যৌথ অবচেতনা সম্বন্ধে কথাগুলো তাঁরই, আমি কেবল আমার মতো করে
বলেছি) _ মানুষের মনের সবচেয়ে গভীর স্তরটি হচ্ছে যৌথ অবচেতনা আর
এর ওপরে ভিত্তি করেই তার ব্যক্তিগত সচেতনতা ও অবচেতনা গড়ে ওঠে; আর
যেহেতু আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি আমাদের যুক্তিপূর্ণ সচেতন মনের
বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এবং এই প্রবৃত্তি মানুষের আচরণকে
বহুলভাবে প্রভাবিত করে _ অতএব আমাদের কল্পনা, ধারণা এবং চিন্তা
মনের সচেতন গণ্ডির বাইরে কিছু সহজাত, সার্বজনীন আদি মানসিক উপাদান
দ্বারা প্রভাবিত। ইয়ুং-এর মতে যৌথ অবচেতনার ধারণাটি কোনো কাল্পনিক
ব্যাপার নয়, একটি সম্পূর্ণ পরিক্ষিত এবং অভিজ্ঞতালব্ধ একটি ধারণা।
তিনি এর সপক্ষে অনেকগুলো প্রমাণও উপস্থাপন করেছেন। [সূত্র : এ
বিষয়ে গুস্তাভ ইয়ুং- এর একটি বক্তৃতার অনুবাদ করেছেন কথাশিল্পী
শাহাদুজ্জামান, যা সংকলিত হয়েছে তাঁর ভাবনা ভাষান্তর গ্রন্থে।]
যাহোক, জিনতত্ত্বের কথাই বলি আর যৌথ-অবচেতনার কথাই বলি _ একজন
মানুষ বংশানুক্রমে যা কিছু পায় তার সবকিছুর প্রকাশ কিন্তু সব সময়
দেখা যায় না। মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশিত হবার জন্য
সামাজিক পরিবেশ পরিস্থিতির ভূমিকা সামান্য হলেও চারিত্রিক
বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রকাশের জন্য এর ভূমিকা ব্যাপক। একজন মানুষ কেমন
হবে তা অনেকখানি নির্ধারণ করে দেয় তার আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক
পরিবেশ ও পরিস্থিতি। ফলে একজন মানুষের মধ্যে 'মন্দ' জিনগুলো
প্রভাবশালী হলেও একে নিছক নিয়তি বলে মেনে নেয়াটা বোকামি। একটি
সুস্থ সমাজ হয়তো তার 'খারাপ' বৈশিষ্ট্যগুলোর স্বাভাবিক প্রকাশে
বাধা হয়ে উঠতে পারে।
সামপ্রদায়িকতা : উৎপত্তি, প্রকারভেদ
সামপ্রদায়িকতা/সামপ্রদায়িক বা পড়সসঁহধষ শব্দটি এসেছে সমপ্রদায় বা
পড়সসঁহরঃু থেকে। মানবজাতির ইতিহাসের খুব পেছনে তাকালে দেখা যাবে _
ইতিহাসের কোনো এক পর্যায়ে তারা সমপ্রদায়ে বিভক্ত হতে শুরু করেছিলো।
প্রশ্ন হচ্ছে _ ঘটনাটি ঘটেছিলো কেন? অর্থাৎ মানুষ কেন সমপ্রদায়ে
বিভক্ত হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেছিলো? এই প্রশ্নের নিশ্চিত কোনো
উত্তর দেয়া সম্ভব নয়, তবে সম্ভাব্য কারণটি হচ্ছে _ কিছু মানুষ কোনো
এক সময় আবিষ্কার করেছিলো যে, তাদের
স্বভাব-চরিত্র-আচার-আচরণ-চিন্তা-ভাবনা-অভ্যাস-বিশ্বাস-সংস্কার
ইত্যাদি কিছু মানুষের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, অন্যদের সঙ্গে মিলছে না।
সম্ভবত এই মিল থাকা মানুষগুলো মিলে একেকটি সমপ্রদায় গঠন করেছিলো,
এবং একইভাবে _ স্বাভাবিক নিয়মেই _ বিপরীত ধরনের সমপ্রদায়ও গঠিত
হয়েছিলো। ধীরে ধীরে এইসব সমপ্রদায়ের নিজ নিজ শক্তি বাড়তে থাকে,
বাড়তে থাকে ভিন্ন ভিন্ন সমপ্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক দূরত্বও। নিজ
সমপ্রদায়কে অন্য সমপ্রদায়ের চেয়ে উন্নত ও শ্রেষ্ঠ প্রমাণের জন্য
নানারকম কৌশল, ছল-চাতুরি, যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদিরও আবির্ভাব ঘটতে
থাকে। মানব ইতিহাসের 'আধুনিক' কালে এই সামপ্রদায়িক চেতনা ও
দৃষ্টিভঙ্গিই আশ্রয় খুঁজে পায় ধর্ম, বর্ণ, জাতীয়তা ইত্যাদির মধ্যে।
অর্থাৎ ধর্মীয় সামপ্রদায়িকতা _ সামপ্রদায়িকতার একটি রূপ, একমাত্র
নয়। বর্ণবাদও একধরনের সামপ্রদায়িকতা _ যা ধর্মীয় সামপ্রদায়িকতার
চেয়েও ভয়ংকর ও বীভৎস। ধর্মীয় সামপ্রদায়িকতায় ধর্মকে ব্যবহার করা হয়
এর উপাদান ও চেতনা হিসেবে, বর্ণবাদে বর্ণকেই ব্যবহার করা হয় উপাদান
হিসেবে। অর্থাৎ আপনার চামড়া কালো না সাদা সেটিই মূল বিবেচ্য বিষয় _
ধর্ম, জাতীয়তা ইত্যাদি এখানে কোনো বিষয়ই নয়। সেই অর্থে জাতীয়তাবাদও
একধরনের সামপ্রদায়িকতা। একটি জাতি নিজের উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য,
কিংবা নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার জন্য, কিংবা নিজেকে অন্য একটি
জাতির আক্রমণ থেকে রক্ষা করার নামে _ ভিন্ন একটি জাতিকে ধ্বংস
করতেও পিছপা হয় না।
মনে রাখা দরকার _ সামপ্রদায়িকতা সব সময়ই যে খুব খারাপ জিনিস তা নয়,
আমরা যে সামপ্রদায়িকতার সমালোচনা করি তা হচ্ছে সামপ্রদায়িকতার
নেতিবাচক রূপ। কিন্তু সামপ্রদায়িকতা কখনো কখনো ইতিবাচকও হতে পারে।
যেমন হয়েছিলো '৭১ -এ, জাতীয়তাবাদের তীব্র উন্মেষই আমাদেরকে অমন
একটি মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিলো। আমি
জাতীয়তাবাদকে এক ধরনের সামপ্রদায়িকতা বলেই মনে করি। অথচ সেটিই
আমাদের জন্য রেখেছিলো ইতিবাচক ভূমিকা, জাতীয়তাবাদের অসামান্য জোয়ার
ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে আমাদের জয়লাভ করা ছিলো প্রায় অসম্ভব। যে
জাতীয়তাবাদ একটি জনগোষ্ঠীকে একটি স্বাধীন দেশ এনে দিতে পারে তাকে
কেউ সামপ্রদায়িকতা বলে মানতে চাইবেন না জানি _ চাইবেন না কারণ
ইতিবাচক সামপ্রদায়িকতাকে কেউ সামপ্রদায়িকতা বলে মনেই করেন না। অথচ
জাতীয়তাবাদ যে সত্যিই একটি সামপ্রদায়িক ধারণা সেটার প্রমাণ পাওয়া
যায় _ স্বাধীনতার পর আদিবাসীদের উদ্দেশ্যে বলা বাঙালি জাতীয়তাবাদের
মহান প্রবক্তা আমাদের স্বাধীনতার প্রধান স্থপতি শেখ মুজিবের _ 'এ
দেশে সবাই বাঙালি, কোনো আদিবাসী নেই' _ এই 'বাণী' থেকে। অর্থাৎ
এদেশে থাকতে হলে আদিবাসীদেরকে বাঙালি হতে হবে, নইলে চলবে না,
নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি সব ভুলে যেতে হবে _ এর চেয়ে
নিকৃষ্টতর সামপ্রদায়িকতা আর কী হতে পারে? ইতিবাচক সামপ্রদায়িকতার অন্য একটি উদাহরণও দেয়া যায় এ প্রসঙ্গে।
ফিলিস্তিনিদের প্রতি যে বিশ্ব মুসলিমের নিঃশর্ত সমর্থন আমরা সেটার
সমালোচনা করি না, কারণ নিজ সমপ্রদায়ের প্রতি মমতা ও ভালোবাসা বোধ
করাকে আমরা কোনো অপরাধ হিসেবে দেখি না _ দেখি প্রশংসার চোখে। সারা
বিশ্বের মুসলমানরা ফিলিস্তিনের জনগণকে দেখে নিজ সমপ্রদায়ের অংশ
হিসেবে _ ফলে তাদের দুর্দশায় ব্যথিত হওয়া, তাদের দাবির প্রতি
নিঃশর্ত সমর্থন জানানো খুবই স্বাভাবিক বিষয়। একজন মানুষের পক্ষে
পুরোপুরি অসামপ্রদায়িক হওয়া প্রায় অসম্ভব _ ইতিবাচকই হোক আর
নেতিবাচকই হোক, কিছু পরিমাণে হলেও সেটা তার মধ্যে থাকবে। একজন
মুসলমান যদি পুরোপুরি অসামপ্রদায়িক হন তাহলে ইসরাইল-ফিলিস্তিন
সমস্যাকে তিনি কি চোখে দেখবেন? তার কাছে মনে হতে পারে _ ইসরাইলিদের
দাবিও তো অসঙ্গত নয়! একটি জাতির কোনো দেশ নেই, তারা যদি তাদের আদি
বাসভূমির একটি অংশকে (যে ভূমি থেকে তাদেরকে একসময় বিতাড়ন করা
হয়েছিলো) নিজের দেশ বলে দাবি করে _ তাহলে অন্যায়টা কোথায়? ধর্ম
কোনো জাতীয়তার ভিত্তি হতে পারে না, বা ইসরাইলিরা মাতৃভূমি
প্রতিষ্ঠার নামে ফিলিস্তিনের জনগণের ওপর যে ভয়ংকর
অত্যাচার-নিপীড়ন-নির্যাতন চালাচ্ছে তাকে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায়
না_ এইসব বিবেচনায় কেউ যদি ইসরাইলের বিরোধিতা করেন, তাহলে তার
যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু কজন মানুষ এইসব ভেবে ইসরাইলের
বিরোধিতা বা ফিলিস্তিনকে সমর্থন করছেন? শুধুমাত্র মুসলমান বলে
ফিলিস্তিনিদের প্রতি যে সমর্থন ও সহানুভূতি তাকে কি আমরা
সামপ্রদায়িক বলবো? বলা উচিত, তবে এটা ক্ষতিকর বা নেতিবাচক
সামপ্রদায়িকতা নয়, বরং তা পরিশেষে একটি নিপীড়িত, নির্যাতিত
জনগোষ্ঠীর পক্ষেই যায়।
সামপ্রদায়িকতা : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত
বাংলাদেশের সামপ্রদায়িকতার রূপটি যেহেতু ধর্মীয়, এবং ইসলাম
ধর্মাবলম্বী লোকজনের কাঁধেই এর দায়দায়িত্ব্ বর্তায় তাই এর স্বরূপ
এবং কারণ, কিংবা এই সমস্যা কতটা জটিল রূপ ধারণ করতে পারে, বা এটা
আমাদের জন্য কতটা বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে সেটা সঠিকভাবে বুঝে নেয়াটা
আমাদের জন্য খুবই জরুরী। আর বিষয়টি বুঝতে হলে বৈজ্ঞানিক বা
মনস্তাত্তি্বক বিষয়াদি ছাড়াও সাংস্কৃতিক পটভূমিটিও বিবেচনা করা
প্রয়োজন, বিশেষ করে প্রয়োজন এ অঞ্চলে ইসলামের ইতিহাস নিয়ে কথা
বলার। আমি যে ইতিহাসের কথা বলছি সেটা রাজা বাদশাহদের ইতিহাস নয় _
জনগণের ইতিহাস। মুশকিল হলো জনগণের ইতিহাস সবসময় অলিখিতই থেকে যায় _
ফলে আমাদেরকে অকেখানিই কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়। বিষয়টি অল্প কথায়
সারা অসম্ভব, এর জন্য ব্যাপক আলোচনার প্রয়োজন। কিন্তু এখানে সে
সুযোগ নেই বলে খুবই সংক্ষেপে দু-একটি তথ্য উল্লেখ করবো। প্রথমেই যা
বলা দরকার তা হলো _ বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে ইসলাম গ্রহণযোগ্যতা
পেয়েছে মূলত সুফি-সাধক ধর্মপ্রচারকদের কারণে, শাসক শ্রেণীর জন্য
নয়। শাসকদের ধর্ম দেখে যারা ধর্ম পরিবর্তন করে তারা আর যাই হোক
সাধারণ জনগণ নয়, উচ্চশ্রেণীর সুবিধাবাদী লোকজন। শাসকদের কাছ থেকে
সুদৃষ্টি পাওয়ার আশায় কেউ কেউ ধর্ম পরিবর্তন করলেও বৃহত্তর
জনগোষ্ঠীর এতে কিছুই যায় আসে না। শাসকদের ধর্ম কি, তা নিয়ে জনগণের
কোনো কৌতূহল থাকার কথা নয়। এ অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মানুষ যে ইসলাম
গ্রহণ করেছিলো তার অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্তত তিনটি কারণকে
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় : ১.
ব্রাক্ষ্রণ্যবাদীদের বর্ণভিত্তিক বিভেদনীতি, অত্যাচার-নিপীড়ন, চাপে
ও তাপে সাধারণ জনগণ অতিষ্ঠ ছিলো, ২. ঠিক সেই রকম একটি ক্রান্তিকালে
সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ও শান্তির বাণী নিয়ে ইসলাম ধর্ম এদেশে প্রবেশ
করেছিলো, এবং ৩. এ বাণী যারা বহন করে নিয়ে এসেছিলেন তাঁরা ছিলেন
সুফি সাধক _ অনাড়ম্বর জীবনযাপন, মানুষের মন বুঝে কাজ করা ও কথা
বলার ক্ষমতা, জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান দার্শনিক হওয়া সত্ত্বেও
নিরহংকারী সন্তের মতো সাধারণ মানুষদের দুঃখ-দুর্দশা-সংকট-সমস্যার
সঙ্গী হতে পারার সহজাত প্রবণতা যাঁদেরকে এ অঞ্চলের মানুষের কাছে
ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিলো। এ অঞ্চলের মানুষ যে ইসলাম
আগমনেরও বহু আগে থেকেই শান্তিপ্রিয় ছিলো সেটা বৌদ্ধধর্মের
জনপ্রিয়তা দেখেও বোঝা যায় _ ইসলামের আগে বৌদ্ধধর্মেও শান্তি ও
সমপ্রীতির কথা বলা হয়েছিলো। বৌদ্ধদেরকে হটিয়ে দিয়ে
ব্রাক্ষ্রণ্যবাদীদের পুনরুত্থান এবং তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য এ
অঞ্চলের শান্তিপ্রিয় মানুষ মন থেকে মেনে নিয়েছিলো এবং বৌদ্ধধর্মের
প্রভাব সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়েছিলো _ এমনটি মনে করার কোনো কারণই
নেই। কিন্তু রাজশক্তি-সামাজিক শক্তির বিরুদ্ধে তাদের কিছু করারও
ছিলো না। শান্তির বাণী নিয়ে আগত ইসলামকে তারা দেখেছিলো নতুন আশ্রয়
হিসেবে। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে _ সুফিরা যে ইসলাম নিয়ে এসেছিলেন তা
আরবে উদ্ভাবিত মূল ইসলাম নয়, বরং দার্শনিকভাবে অনেকখানি পরিবর্তিত
ও আচারসর্বস্বতা-বর্জিত ইসলাম। সুফিবাদের জন্ম মূলত পারস্যে, মূল
ইসলাম ওখানে গিয়ে অনেকখানি পরিবর্তিত হয়ে যায়; আবার এই সুফিরা যখন
ভারতবর্ষে এলেন সেই সুফিবাদেরও খানিকটা পরিবর্তন সাধন করতে হলো।
কোনো দর্শনই যে দেশকালের পরিপ্রেক্ষিতে তার অবিকৃত রূপ ধরে রাখতে
পারে না _ এই প্রগতিশীল ধারণাটি সুফিদের মধ্যে ছিলো; তাই তাঁরা
ভারতবর্ষে এসে এই জনগোষ্ঠীর মন বুঝতে চেষ্টা করলেন। এবং আবিষ্কার
করলেন _ এই জনগোষ্ঠীর কাছে ইসলামকে গ্রহণযোগ্য করতে হলে প্রেমের
কথা বলতে হবে, ভক্তির কথা বলতে হবে _ কারণ এ অঞ্চলে দুটোরই
জয়জয়াকার। অতএব সুফিবাদ নিজেকে খানিকটা বদলে নিলো _ মানুষের কাছে
তারা বলতে লাগলেন প্রেমের কথা, বোঝাতে লাগলেন স্রষ্টার সঙ্গে
সৃষ্টির সম্পর্ক দ্বন্দ্বের নয়, প্রেমের। একমাত্র প্রেমের মাধ্যমেই
পাওয়া যাবে স্রষ্টাকে _ অন্য কোনোভাবে নয়। প্রেম ও ভক্তির এই
কথাগুলো এ অঞ্চলের মানুষের কাছে আগে থেকেই পরিচিত ছিলো _ তার সঙ্গে
যুক্ত হলো মানুষে-মানুষে সমতার কথা, ভ্রাতৃত্বের কথা, সমান
অধিকারের কথা, শান্তি ও সমপ্রীতির কথা। তরবারী দিয়ে নয়, কঠোর
ধর্মীয় আচারসর্বস্বতা দিয়ে নয়, ভয়-ভীতি-হুংকার দিয়েও নয় _ স্রেফ
শান্তি-সমপ্রীতি-মানবতা-সাম্য-প্রেম-ভক্তি-ভ্রাতৃত্ব ইত্যাদির কথা
বলে সুফিরা জয় করে ফেললেন একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে। এমনকি
রাজশক্তি-সামাজিক শক্তি বা অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে কোনোরকম
দ্বন্দ্বে লিপ্ত না হয়েই তাঁরা সেটা করতে সক্ষম হয়েছিলেন তাঁদের
দার্শনিক প্রজ্ঞার কারণে। এ অঞ্চলে ইসলামের জয়ের ইতিহাস বলতে
বখতিয়ার খিলজির বঙ্গবিজয়ের কাহিনী বোঝায় না, বোঝায় এই দার্শনিক
বিজয়ের ইতিহাস। আর এই ইতিহাস না জানলে বাঙালি মুসলমানের মনোজগৎ
বোঝা সম্ভব নয়। এই রচনায় বিষয়টি নিয়ে বিসতৃত আলোচনার অবকাশ নেই,
মোদ্দা কথা হলো _ এ দেশের মানুষের মনোজগতে আছে
শান্তি-সমপ্রীতি-ভ্রাতৃত্ব-মানবতা ও সাম্যের প্রতি প্রেম। কোনো
মৌলবাদী কঠোর কঠিন তত্ত্ব দিয়ে তাদেরকে জয় করা যায় নি _ ভবিষ্যতেও
যাবে না।
যাহোক, আমরা আমাদের মূল আলোচনায় ফিরে আসি। সামপ্রদায়িকতাকে জেনেটিক
সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করার একটি বিপদ হলো _ একে অনিবার্য নিয়তি
হিসেবে মেনে নেয়ার মানসিকতা জন্ম নিতে পারে। অর্থাৎ কেউ কেউ মনে
করতে পারেন যে, বিষয়টি যেহেতু আমরা জন্মগতভাবে উত্তরাধিকারসূত্রে
পেয়েছি _ অতএব এর প্রকাশ ঘটবেই। এর বিরুদ্ধে আমাদের কিছুই করার
নেই। স্পষ্টভাবে বলা দরকার, এরকম মনে করার কোনো কারণই নেই। দুটো
বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আমাদের মনে রাখা দরকার। প্রথমত:
বাংলাদেশের জনগণ সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির মধ্যে বাস করতে পছন্দ করে _
এই ্ল প্রবণতা প্রমাণ করে যে, তাদের মধ্যে নেতিবাচক সামপ্রদায়িকতার
ব্যাপারটি ফড়সরহধহঃ নয়, বরং ৎবপবংংরাব বা সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে।
কিন্তু আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের
পক্ষে কেন সামপ্রদায়িক হয়ে ওঠা সম্ভব নয় তার ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে
এই দিকটি বিবেচনা করলে। জীববিজ্ঞানের জিনতত্ত্ব বা মনস্তত্ত্বের
কালেকটিভ আনকনশাসনেস অথবা সাংস্কৃতিক পটভূমি _ যেটিই আমরা বিবেচনা
করি না কেন, বাংলাদেশের মানুষের ক্ষেত্রে ফলাফলটি হবে অদ্ভুত ও
অভূতপূর্ব। দুটো তত্ত্বেই বলা হয়েছে যে, মানুষ তার পূর্বপুরুষের
ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কার, বিশ্বাস, অভ্যাস, সর্বোপরি সংস্কৃতির
তথ্যসমূহ নিয়েই জন্মায়। এই পূর্বপুরুষ মানে শুধু তার বাবা-মা,
দাদা-দাদি, নানা-নানি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার সকল
পূর্বপুরুষকেই বোঝানো হচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে যখন একটি মুসলিম
শিশু জন্মায়, সে কোন তথ্য নিয়ে আসে? কোন সমপ্রদায়কে সে নিজের
সমপ্রদায় হিসেবে মনে করে? যেহেতু সে একটি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ
করেছে, অতএব সে যে এই ধর্মীয় সমপ্রদায়ের মানুষ সেই তথ্য তার মধ্যে
থাকে _ সন্দেহ নেই, কিন্তু এদেশের অধিকাংশ মুসলমানইতো কনভার্টেড
মুসলিম অর্থাৎ ধর্মান্তরিত _ কোনো-না-কোনো এক সময় তাদের ধর্ম
অন্যকিছু ছিলো _ ইসলাম নয়, অতএব তার মধ্যে এই তথ্যও সঞ্চিত থাকে।
অর্থাৎ একটি মুসলমান শিশু দুটো সমপ্রদায়কেই তার নিজের সমপ্রদায় বলে
মনে করে। শুধু তাই নয়, সে-ও শান্তি-সমপ্রীতি-ভ্রাতৃত্ব-মানবতা ও
সাম্যের প্রতি প্রেম নিয়েই জন্মায় যেহেতু তার পূর্বপুরুষরা এসবের
চর্চা করেছে, এসবকে সম্মান করেছে। ফলে তার পক্ষে কোনো একটি
সমপ্রদায়ের বিপক্ষে তীব্রভাবে বিদ্বেষপরায়ন হয়ে ওঠা সম্ভব হয় না।
আর এজন্যই বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে, বৈজ্ঞানিক, মনস্তাত্তি্বক ও
সাংস্কৃতিক কারণেই, তীব্রভাবে সামপ্রদায়িক হওয়া সম্ভব নয়। যেসব
রাজনৈতিক দল বাংলাদেশকে একটি প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী রাষ্ট্রে
পরিণত করার দিবাস্বপ্নে বিভোর তাদের জন্য এই তথ্যটি একটি দুঃসংবাদই
বটে, সুসংবাদ তাদের জন্য যারা এই দেশটিকে একটি প্রগতিশীল,
অসামপ্রদায়িক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চান। প্রশ্ন হচ্ছে
আমার এই ব্যাখ্যা যদি সত্যি হয় (আমি অবশ্যই কোনো গাঁজাখুড়ি গালগল্প
করছি না, বৈজ্ঞানিক, মনস্তাত্তি্বক ও সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা দেবার
চেষ্টা করছি মাত্র, তবু কারো কারো মধ্যে একটু অবিশ্বাসের জন্ম নিতে
পারে। কারণ আমরা সবচেয়ে কম যা বিশ্বাস করি তা হচ্ছে বিজ্ঞান, আর
আমাদের যাবতীয় আলোচনায় সবচেয়ে কম গুরুত্ব পায় মনস্তত্ত্ব), তাহলে
কেন মাঝে মাঝে এমন সামপ্রদায়িক দুর্ঘটনা ঘটে? কেন কিছু মানুষ এমন
পশুর মতো আচরণ করে? এর কারণ রাজনৈতিক। আগেই বলেছি মানুষের
স্বভাব-চরিত্রের ওপর তার অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবেশের
প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশে যে কয়েকটি সামপ্রদায়িক দুর্ঘটনা ঘটেছে তার
সব ক-টিতেই কোনো-না-কোনো রাজনৈতিক দলের উস্কানি ছিলো।
স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনগণ এসব ঘটনা ঘটায় নি _ এবং খোঁজ করলে দেখা যাবে
এসব ঘটনার পেছনে ছিলো জমি দখলের ধান্ধা, রাজনৈতিক হিংসা চরিতার্থ
করার চেষ্টা ইত্যাদি। লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে রাজনীতিতে
সামপ্রদায়িক শক্তিগুলোর আপাত সাফল্য পরিলক্ষিত হলেও এদেশের মানুষকে
সম্পূর্ণভাবে সামপ্রদায়িক করে তোলা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
প্রকৃতপক্ষে এদেশের মানুষ এইসব অন্ধ মৌলবাদীদের কথায় আদৌ আস্থা
রাখে না। ভোটের রাজনীতির ফলাফল মানুষের মনকে রিপ্রেজেন্ট করে না।
কোনো বিকল্প না পেয়ে হয়তো তারা এদেরকে ভোট দিয়েছে, তার মানে এই নয়
যে, জনগণ দার্শনিকভাবে এদেরকে গ্রহণ করেছে। যদিও জাতীয় রাজনীতিতে
মধ্যপন্থীদের সঙ্গে জোট বেঁধে ধর্মপন্থী-মৌলবাদী দলগুলো যে সাফল্য
পেয়েছে তাতে আমাদের অনেক প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদেরও আতংকিত হতে দেখা
যায়। এটা হলো ভোটের রাজনীতির ধরন-ধারণ না বোঝার ফল। গ্রামাঞ্চলে
মানুষ শুধু দল দেখেই ভোট দেয় না, প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজও সেখানে
একটি বড় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু তারচেয়েও বড় ভূমিকা রাখেন স্থানীয়
প্রভাবশালী লোকেরা। এই লোকগুলোর কোনো রাজনৈতিক দর্শন নেই, কোনো
আদর্শিক অবস্থান থেকে এরা কোনো প্রার্থীকে সমর্থন করেন _ বিষয়টি
মোটেই তেমন নয়, তারা যখন যার কাছ থেকে বেশি সুবিধা পান তাদের জন্যই
কাজ করেন এবং ভোটারদেরকে প্রভাবিত করেন। স্থানীয়
সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক কারণে এই ভোটাররা যেহেতু ওইসব
প্রভাবশালীদের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল এবং দায়বদ্ধ, তারাও তাই ভোট
দিতে বাধ্য হয়। এখনও এই দেশে এমন অবস্থা তৈরি হয় নি যে, ভোটাররা
কৌশলগত কারণে একজনকে প্রতিশ্রুতি দেবেন কিন্তু ভোটকেন্দ্রে গিয়ে
পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন _ তারা প্রতিশ্রুতিকে একটা পবিত্র
ব্যাপার বলে মনে করেন, কাউকে প্রতিশ্রুতি দিলে সেটা তাই রাখার
আপ্রাণ চেষ্টা করেন। আরেকটি বিষয়ে দু-একটা কথা বলে আমরা মূল
প্রসঙ্গে ফিরে যাবো। এদেশের সুবিধাবাদী মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো
তো বটেই এমনকি শিক্ষিত-প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা পর্যন্ত বলে থাকেন
যে, আমাদের জনগণ 'ধর্মপ্রাণ' কিংবা 'ধর্মভীরু' কিন্তু 'ধর্মান্ধ'
নয়। কেন এই কথাটি বলা হয় _ আমি আজ পর্যন্ত তা বুঝে উঠতে পারি নি।
আমার তো মনে হয় _ আমাদের জনগণ ধর্মান্ধ তো নয়ই, এমন কি ধর্মপ্রাণ
বা ধর্মভীরুও নয়। এদেশের মানুষ বড়জোর বিশ্বাস করে যে একজন
আল্লাহ/ঈশ্বর আছেন, বিপদে পড়লে তাঁকে ডাকাডাকিও করে, কিংবা বিভিন্ন
সামাজিক কর্মকাণ্ডে _ যেমন জন্ম, মৃতু্য, বিয়ে ইত্যাদি _ ধর্মীয়
রীতি মেনে চলে, অথবা ঈদ-শবেবরাত-পুজা ইত্যাদি পালন করে কিন্তু
তাদের প্রাত্যহিক জীবনাচরণে ধর্মের প্রভাব সামান্যই। এদেশের প্রায়
৮০ ভাগ শ্রমজীবী মানুষ ধর্ম-কর্মের ধারে-কাছেও যায় না, এ নিয়ে
তাদের কোনো মাথাব্যথাও আছে বলে মনে হয় না। ধর্মকে ভয় পেলে বা
ধর্ম-অন্ত-প্রাণ হলে তো এমনটি হবার কথা নয়! ধর্ম নিয়ে আসলে
মাথাব্যথা আমাদের _ এই শিক্ষিত সুবিধাবাদী মধ্যবিত্তদের। নিজের
শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমরা এখন শেকড়ের সন্ধানে ধর্মের পিছে
ছুটছি।
যাহোক, প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ধরা যাক, কিছু মানুষের মধ্যে
জেনেটিক্যালিই এই প্রবণতা আছে, সেক্ষেত্রে আমরা কি হতাশ হয়ে সব
কিছু ছেড়ে দেব _ এই ভয়ংকর প্রবৃত্তিকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়ে
তাদেরকে যা ইচ্ছে তা-ই করতে দেব? না, তা দেব না। মানুষ এক অসীম
সম্ভাবনাময় প্রাণী। একমাত্র মানুষই প্রকৃতিকে জয় করতে চেয়েছে ও
পেরেছে। প্রকৃতির যেসব খামখেয়ালিপনা, ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে মানুষ
অকল্যাণকর বলে মনে করেছে _ মানুষ তাকেই জয় করতে চেয়েছে এবং করেছে।
ভবিষ্যতেও করবে। মানব-ইতিহাসের সেই গুহা আর পাথর-ঘষা যুগ থেকে
মানুষ আজ কোথায় এসে পেঁৗছেছে ভাবলে হতবাক হয়ে যেতে হয়। এসবই তো
মানুষের চেষ্টা আর স্বপ্নের ফল। সেই তুলনায় যে কোনো নেতিবাচক
প্রবৃত্তি ও প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণে আনা অনেক সহজ। একটি উদাহরণ দেয়া
যাক। একজন মানুষ যখন খুন করে তখন জেনেটিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে পারি
_ তার মধ্যে হত্যা-প্রবণতা আছে। হয়তো তার মা বাবা এমন ছিলেন না,
এমনকি তার দাদা-দাদি, নানা-নানিও হয়তো ভালোমানুষই ছিলেন, তাহলে তার
মধ্যে এই প্রবণতা এলো কোত্থেকে? এই প্রশ্নের উত্তর আগেই দেয়া
হয়েছে। আমরা দেখেছি যে, কোনো প্রবণতা কয়েক প্রজন্ম ধরে সুপ্ত
অবস্থায় থেকে যে কোনো এক প্রজন্মে এসে প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে।
কিংবা এই খুনী লোকটির মধ্যেও হয়তো তা সুপ্ত অবস্থায়ই ছিলো _
পরিস্থিতি তাকে খুন করতে বাধ্য করেছে। কেউ তো আর শখ করে খুন করে
না! তার চেয়ে বড় কথা _ তার পূর্বপুরুষের মধ্যেও এই প্রবণতা ছিলো _
তারা তো কেউ খুন করেন নি! অর্থাৎ একটি মন্দ প্রবণতা কারো মধ্যে
থাকলেই যে সে ওই রকম আচরণ করবে তা না-ও হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে
প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই হত্যাপ্রবণতা আছে _ কারণ সবারই কোনো না
কোনো পূর্বপুরুষ হত্যাকারী ছিলো _ তাই বলে আমরা সবাই তো আর খুনী
হয়ে উঠি নি! আমাদের সবার মধ্যে লোভ আছে, কিন্তু সবাই লোভীর মতো
আচরণ করি না; ঈর্ষা-হিংসা আছে, কিন্তু সবাই হিংসুক নই;
দয়া-মায়া-ভালোবাসাও আছে কিন্তু সবার মধ্যে তা প্রকাশিত হতে দেখা
যায় না। আমরা নানাভাবে _ শিক্ষা-দীক্ষা, রুচি-আদর্শ,
নৈতিকতা-মূল্যবোধ দিয়ে ওই নেতিবাচক দিকগুলোকে প্রতিহত করতে চাই। আর
যদি তা একান্তই সম্ভব না হয় তাহলে কঠোর আইন তৈরি করে হলেও প্রতিরোধ
করতে চাই। অতএব সামপ্রদায়িকতা একটি জেনেটিক সমস্যা হলেও আমাদের
জন্য তা তেমন ভয়ংকর হয়ে উঠবে না বলেই বিশ্বাস করা যায়। যেহেতু
জেনেটিক্যালি এদেশের মানুষ সব সমপ্রদায়কেই নিজের সমপ্রদায় মনে করে
এবং অসামপ্রদায়িকতাকেই পছন্দ করে, অতএব সামপ্রদায়িকতার
সামাজিক-রাজনৈতিক কারণগুলোকে দূর করতে পারলে বা অন্তত কমিয়ে আনতে
পারলে আমরা সহজেই একটি অসামপ্রদায়িক সমাজ পেতে পারি।
শেষ করার আগে আরেকটি বিষয়ের প্রতি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।
বাংলাদেশে সামপ্রদায়িক নির্যাতনের স্বীকার জনগোষ্ঠী (এবং যারা
বিষয়টি বিচার বিশ্লেষণ করেন তারাও) মনে করেন _ তারা নির্যাতনের
স্বীকার হচ্ছেন, কারণ তারা সংখ্যালঘু। কথাটি সর্বাংশে সত্যি নয়।
শুধু সংখ্যালঘুই নয় সংখ্যাগুরুরাও কখনো কখনো নির্যাতিত হন। উদাহরণ
দিচ্ছি : পৃথিবীতে ইহুদিরা হচ্ছে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সমপ্রদায় _ তারা
কি নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে? না, বরং তারাই নির্যাতন করে যাচ্ছে।
এর কারণ কি? কারণ হচ্ছে _ বিশ্ব-পুঁজির এক বিপুল অংশ তারা
নিয়ন্ত্রণ করে। 'প্রভুরাষ্ট্র' আমেরিকা যে তাদেরকে নিঃশর্ত সমর্থন
দিয়ে যাচ্ছে সেটা কোনো নৈতিক অবস্থান থেকে নয় _ মূল কারণটি হচ্ছে
আমেরিকার অর্থনীতি, রাজনীতি এমনকি প্রশাসন পর্যন্ত চলে ইহুদিদের
টাকায়। এমন উদাহরণ আরও দেয়া যায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় তো শ্বেতাঙ্গরা
সংখ্যালঘু, কালোরা সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও কেন তাদেরকে যুগ যুগ
ধরে নির্যাতিত হতে হয়েছে? কিংবা পাকিস্তান আমলে বাঙালিরা
সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও কিভাবে পাকিস্তানিরা তাদেরকে নির্যাতন
করেছে? সব ক্ষেত্রে উত্তর একই _ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাটি
ছিলো তাদের হাতে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বাংলাদেশে সব
ধরনের ক্ষমতা কেন্দ্রিভূত হয়ে আছে 'সংখ্যাগুরু' সমপ্রদায়টির হাতে।
ক্ষমতার নূন্যতম ভারসাম্যটি পর্যন্ত নেই _ অথচ সামপ্রদায়িকতার যে
সমস্যাটুকু আছে তা দূর করতে হলে এই ভারসাম্য আনাটা খুবই জরুরী।
কীভাবে তা সম্ভব _ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতা-কর্মী ও
বুদ্ধিজীবীদের সেটা ভেবে বের করার সময় এসেছে।
ফেব্রুয়ারি, ২০০৪ _ জুলাই, ২০০৪। |
| |
 |
|