প্রাককথন
দেশবিভাগের পর ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার শুরুতে হাতে গোনা
কয়েকজন অগ্রজ সাহিত্যকমর্ীর সঙ্গে যে কজন প্রতিভাবান যুবকের
আবির্ভাব ঘটেছিল সৈয়দ শামসুল হক তাঁদের অন্যতম। তাঁদের আগমনের
সময়টি ছিল বিপন্নতার ও অস্থিরতার। স্মৃতিতে তখনও উজ্জ্বল হয়ে আছে
তেতালি্লশের দুর্ভিক্ষ, ছেচলি্লশের সামপ্রদায়িক দাঙ্গা, আর
দেশবিভাগজনিত আবেগ-বিহ্বলতা ও হাহাকার। দু-বাংলার শেকড়হীন মানুষ _
উদ্বাস্তু, অসহায় _ নতুন দেশে বসবাসের জন্য যাদের চোখ _ স্বপ্নে নয়
_ বেদনায় ম্লান। মানুষ কীভাবে তার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিবাহী
জন্মভূমি, নদী, আকাশ আর প্রান্তর ছেড়ে ভালো থাকবে? এরই মধ্যে ঘটে
গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, বিশ্বব্যাপি দীর্ঘদিনের লালিত মূল্যবোধ
ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে; হতাশা, অবক্ষয় বাড়ছে _ মানুষ যেন হঠাৎই উপস্থিত
হয়েছে তার চূড়ান্ত পরিণতির সামনে। সামাজিক-রাজনৈতিক-বৈশ্বিক
পরিস্থিতি বোধহয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে একজন লেখকের মধ্যেই। যে
অদ্ভুত সময়ে পঞ্চাশের লেখকরা লিখতে শুরু করেছিলেন, সহজ ছিলো না
সময়টিকে সাহিত্যে ধারণ করার _ অন্তর্গত রক্তক্ষরণ যতই হোক না কেন!
তাঁদের দায়িত্বও ছিলো অনেক। বাংলাসাহিত্যের ঐতিহ্যবাহী ধারার সঙ্গে
খাপ খাইয়ে নেওয়ার এবং পাকিস্তান নামক অতি-অদ্ভুত একটি রাষ্ট্রের
উদ্ভব হওয়ায় তথাকথিত ইসলামি জাতীয়তাবাদের কবল থেকে নিজস্ব সঠিক
পরিচয়টা উদ্ধার ও রক্ষা করার সুকঠিন দায়িত্ব। এক বিস্ময়কর বিপন্নতা
ঘিরে ছিল তাঁদের, কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র এবং তাৎক্ষণিক মূল্যবোধগুলো
ছিল এসবের বিরুদ্ধে। নতুন রাষ্ট্রপ্রাপ্তির আফিম মার্কা মোহ অবশ্য
ততোদিনে কাটতে শুরু করেছে, পূর্ব বাংলার মানুষ জারিত হচ্ছে তাদের
প্রকৃত জাতিসত্ত্বার অহংকারে, প্রস্তুত হচ্ছে ভাষা আন্দোলনের মতো
অনন্য ইতিহাস নির্মাণ করার জন্য। পাকিস্তান সৃষ্টির অল্প কিছুদিনের
মধ্যেই ভাষা আন্দোলনের সূচনা এ অঞ্চলের মানুষের প্রকৃত
জাতিসত্ত্বাকেই মূর্ত করে তুলেছিলো, আর এই জাতির বিকাশ ও মনন
চর্চায় অবদান রাখার জন্য অনিবার্যভাবে মেধাবী সাহিত্যশিল্পীদের
আগমনও ঘটেছিলো। এই সময়ে যারা এলেন তাঁরা অনেকটা নীরবেই একটি যুদ্ধ
করে গেছেন _ রাষ্ট্রের যাবতীয় ষড়যন্ত্র ও কূটকৌশল উপেক্ষা করে নিজ
ভাষাকে টিকিয়ে রাখার, নিজের ভাষায় সাহিত্য রচনার এবং এর একটি
মানসম্মত রূপদান করার যুদ্ধ। সৈয়দ হক সেই যুদ্ধের অন্যতম সৈনিক।
পঞ্চাশের সবাই পারেননি, অনেকেই স্তব্ধ হয়ে গেছেন, কিন্তু সৈয়দ
সামসুল হক তাঁর অসাধারণ মেধা, প্রজ্ঞা ও প্রতিভায় আজও নিজেকে
রেখেছেন বিপুলভাবে সক্রিয়। এটা বললে নিশ্চয়ই অতিশোয়োক্তি হবে না
যে, পঞ্চাশের সবচেয়ে প্রতিভাদীপ্ত গল্পকার সৈয়দ শামসুল হক। বাঙালি
মুসলমান জনগোষ্ঠী তখন নানামাত্রিক নতুন, অভিনব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি
_ সৃষ্টি হচ্ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণী, গড়ে উঠছে নগর। সৈয়দ হকই
প্রথমবারের মতো সেই নাগরিক মধ্যবিত্তের সংকট-সম্ভাবনা,
হতাশা-আকাঙ্ক্ষাকে সফলভাবে তাঁর গল্পের উপজীব্য করলেন। তাঁর ছিলো
সুক্ষ্ন দৃষ্টি; শীতবিকেল, ফিরে আসে, রক্ত গোলাপ প্রভৃতি গল্প তাঁর
মতো শিল্পীর পক্ষেই লেখা সম্ভব। তিনি অবশ্য কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে
আবদ্ধ হয়ে থাকেননি। ছুটে বেড়িয়েছেন জীবনের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার
সন্ধানে, ক্রমাগত নিজেকে ভেঙেচুরে নিজেকেই অতিক্রম করে গেছেন
ঈর্ষনীয়ভাবে। মানব-জীবন, মানব-স্বভাব, সমাজ-জীবন প্রভৃতির প্রতিটি
চেনা-অচেনা কোণে উজ্জ্বল আলো ফেলে দেখিয়েছেন সেগুলোর অনর্্তগত
চারিত্র-বৈশিষ্ট্য। তাঁর হাতেই নির্মিত হয়েছে প্রাচীন বংশের নিঃস্ব
সন্তান, আরও একজন প্রভৃতি রাজনৈতিক চেতনা সম্পন্ন প্রতীকী গল্প;
ফিরে আসে, গাধা জোৎস্নার পূর্বাপর প্রভৃতির মতো প্রেমের গল্প। এই
রকম আরও অনেক রচনা দিয়ে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন বাংলাদেশের গল্পের
ভূবন।
যদিও গল্প দিয়েই যাত্রা শুরু করেছিলেন সৈয়দ শামসুল হক কিন্তু থেমে
থাকেননি সেখানেই। একে একে তিনি বিচরণ করেছেন সাহিত্যের প্রায় সমস্ত
শাখায়_কবিতায়, উপন্যাসে, নাটকে। যেখানেই হাত দিয়েছেন, সফল হয়েছেন
তিনি। তাঁর সাহিত্যকর্ম_সে গল্প বা উপন্যাসই হোক অথবা কবিতা বা
নাটকই হোক_তুমুলভাবে আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে সময়ে সময়ে। তাঁর যে
কর্মের জগৎ, আমরা দেখি, কোনোদিক দিয়েই নির্দিষ্ট কোথাও নিজেকে
সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর যেমন স্বছন্দ
বিচরণ তেমনি প্রতিটি শাখায় তাঁর বিষয়ের বহুমাত্রিকতাও চোখে পড়ার
মতো। বিষয়, উপস্থাপন-কৌশল, ভাষার বিভিন্নতা ইত্যাদি নানাবিধ কারণে
তাঁর রচনাকর্ম বহুমাত্রিক জীবনবোধের জন্ম দেয়।
তাঁর অসংখ্য রচনাকর্মের মধ্যে যেগুলো বহুলভাবে আলোচিত-সমালোচিত
হয়েছে সেগুলো হচ্ছে_ উপন্যাস: খেলারাম খেলে যা, নিষিদ্ধ লোবান,
দূরত্ব, এক যুবকের ছায়াপথ, ইহা মানুষ, স্তব্ধতার অনুবাদ,
স্মৃতিমেধ, দ্বিতীয় দিনের কাহিনী, ত্রাহি, বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ;
কাব্যগ্রন্থ: বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা, পরানের গহিন ভিতর,
বুনোবৃষ্টির গান; কাব্যনাটক: পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নূরলদীনের
সারাজীবন, গণনায়ক, ঈর্ষা, প্রভৃতি।
এসবের মধ্যে অনেকগুলোই প্রচুর প্রশংসা লাভ করেছে, কিন্তু ভুলভাবে
সমালোচিতও হয়েছে প্রচুর। এসব সম্বন্ধে বিসতৃত আলোচনার সুযোগ এখানে
নেই। শুধু একটি কথা তাঁর সমন্বন্ধে নিঃসংকোচে বলা যেতে পারে_আমাদের
সাহিত্যজগৎ সমৃদ্ধ করার কৃতিত্ব যাঁরা দাবি করতে পারেন, তাঁদের
মধ্যে সৈয়দ শামসুল হক প্রথম সারির একজন।
গল্পপ্রসঙ্গ
সৈয়দ হকের বিচরণক্ষেত্র যে সীমাবদ্ধ নয় বরং ক্রমাগত নিজেকে বদলে
ফেলেছেন তিনি, অতিক্রম করে গেছেন নিজেকেই সেটি, তাঁর সমগ্র
সাহিত্যকর্ম পড়া না থাকলেও, শুধুমাত্র গল্প পড়েই উপলব্ধি করা
সম্ভব। তাঁর গল্পে চিত্রিত হয় সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের সমগ্র
জীবনচিত্র _ একদিকে মানুষের প্রেম, কাম, আবেগ, আকাঙ্খা, অন্যদিকে
তার বেঁচে থাকার সংগ্রাম, বিদ্রোহ, রাজনৈতিক চেতনা, তার ভালোবাসা,
মমতা ও মহত্ত্ব। বহু ধরনের গল্প লিখেছেন সৈয়দ শামসুল হক, বিষয় আর
প্রকরণের বৈচিত্র্যে ভরা এসব গল্প থেকে কয়েকটি গল্প বিবেচনা করে
আমরা বিষয়টি বিচার করে দেখতে পারি।
তাঁর সাহিত্যকর্মের একটি প্রধান অংশ জুড়ে আছে মানুষের রাজনৈতিক
বিশ্বাস, তার বিপ্লব-বিদ্রোহ ও বেঁচে থাকার যুদ্ধ। প্রচুর লিখেছেন
তিনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। কিন্তু গল্পের স্বল্প-পরিসরে বোধহয় তিনি
এসব নিয়ে বিসতৃত কাজ করতে চাননি। তাঁর গল্পগুলোতে মুক্তিযুদ্ধকে
তেমন তীব্রভাবে চিত্রিত হতে দেখা যায় না_ স্মৃতিচারণ আছে, অংশগ্রহণ
নেই, মূলত এই তাঁর এ-ধরনের গল্পগুলোর বৈশিষ্ট্য। তবু একধরনের
প্রতীকী আবহে গল্পগুলোতে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস, চেতনা ও বক্তব্যের
সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়।
প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান গল্পে পাঠকের সঙ্গে দেওয়ান ইদ্রিস খাঁ
নামক এক সম্ভ্রান্ত বংশীয় ব্যক্তির পরিচয় ঘটে, যদিও এখন আর তাঁর
কিছুই অবশিষ্ট নেই, ক্ষয়ে যাবার অনিবার্য নিয়মে তাঁর সবকিছু লুপ্ত
হয়ে গেছে, দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ করাল গ্রাসে সমস্ত কিছু বিক্রি করতে
হয়েছে অথবা বন্ধক দিতে হয়েছে। একমাত্র স্মৃতি হিসেবে তিনি
বংশগতভাবে প্রবহমান ঐতিহ্যের চিহ্ন একটি গ্লাস রেখে দিয়েছেন এবং
লেখকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে ওই গ্লাসটিকে কেন্দ্র করেই। গল্পটির
উপস্থাপনা-কৌশল ভিন্নমাত্রিক ব্যঞ্জনার দাবিদার। লেখক এখানে
পরোক্ষ নন, প্রত্যক্ষভাবেই বলছেন_ 'এ কাহিনী এর আগে যারা শুনেছে
তারা অবিশ্বাস করেছে, এ কাহিনী ভবিষ্যতে যারা শুনবে অবিশ্বাস করবে
তারাও'_ বাক্যটি দিয়ে তিনি পাঠককে আরো বেশি আগ্রহী করে তোলেন
গল্পটি সম্বন্ধে। লেখক ওই দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চলে গিয়ে যখন তৃষ্ণায়
কাতর হয়ে প্রায় মুর্ছাগত, ওই সময় অলৌকিক পুরুষের মতো_ 'রুপার
রেকাবিতে রাখা রুপার গেলাশ, গেলাশের ওপর একখণ্ড মসলিনের টুকরো'_
নিয়ে দেওয়ান উদ্রিস খাঁর আগমন ঘটে। এরপর আমরা লেখকের সঙ্গে তাঁর
অদ্ভুত কথোপকথনের চিত্র দেখতে পাই। ইদ্রিস খাঁ জানান যে তিনি আহার
জোটাতে একমাত্র গ্লাসটি ছাড়া সর্বস্ব, এমনকি নিজেকে পর্যন্ত বিক্রি
করে দিয়েছেন। চমকে দেবার মতো তথ্য বটে। নিজেকে বিক্রি, যেমন বিক্রি
হতো মানুষ, বহুকাল আগে, ক্রীতদাস হিসেবে! ক্রেতা, মহাজন চণ্ডিবাবু,
তাকে গাড়ির গাড়োয়ান হিসেবে নিয়োগ করলেও দুদিন পরই তিনি পালিয়ে
আসেন। কারণ 'পেটে দুইটা ভাত পড়ার পর আমার মনে হয়, হায়রে এই ভাতের
জন্য পরাধীন? এই ভাতের জন্য নিজে বিক্রি, তা-ও ওই জানোয়ারের কাছে'?
কিন্তু তাঁর রেহাই নেই মহাজনের কাছ থেকে, তাঁকে সে ঠিকই খুঁজে বের
করে। এই শৃঙ্খল থেকে, পরাধীনতা থেকে মুক্তির উপায় বাতলে দেন 'ভোলা
মাস্টার'। মাস্টার তাঁকে 'চুরি' করেন এবং এই বলে সমাধান দেন যে
মহাজন এজন্য থানায় এজাহার দিতে পারবে না যে 'আমার মানুষ' চুরি গেছে
কারণ মানুষ কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ইদ্রিস খাঁ সাময়িকভাবে
মুক্তি পান। কারণ 'এই মুক্তি দুদিনের। অন্য কোনো কায়দায় সেই হাজার
টাকার দাবি চণ্ডিবাবু করবেই করবে। তখন? তখন?' এই পরিস্থিতিতে লেখক
'আশেপাশে ভোলা মাস্টার, যাকে আমি আগে পরে কখনো দেখেনি, তার
অনুপস্থিতিতে আমি বড় অসহায় বোধ করি।' গল্পে এই ভোলা মাস্টারের
চরিত্রটি বিসতৃত নয়, স্পষ্টতই বোঝা যায় এটি একটি প্রতীকী চরিত্র
মাত্র _ যিনি মুক্তির দূত, যিনি মানুষকে পরাধীনতা থেকে, শৃঙ্খল
থেকে মুক্তির পথনির্দেশ দিতে পারেন। গল্পটিকে একটু গভীরভাবে বিচার
করলে ওই 'রুপার রেকাবিতে রুপার গেলাশ, গেলাশের ওপর একটুকরো মসলিনের
টুকরো' যেন আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্যের প্রতীক হয়ে ওঠে।
আমাদের সমস্ত ঐশ্বর্য আর সম্ভ্রম অন্তর্হিত হয়ে গেছে, আমাদের বেঁচে
থাকার যাবতীয় উপকরণ বিক্রি হয়ে গেছে উপনিবেশবাদ আর সাম্রাজ্যবাদের
কাছে, এখন এদেশের একজন শিশু বিপুল ঋণ মাথায় নিয়ে জন্মগ্রহণ করে যেন
জন্ম থেকেই বিক্রি হয়ে আছি আমরা_দেশের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সঙ্গে
ইদ্রিস খাঁর পরিস্থিতির একটি মিল যেন আমরা খুঁজে পাই। আর ওই যে,
'ভোলা মাস্টারে'র অনুপস্থিতি যিনি মুক্তির দূত, তা যেন আমাদের
নেতৃত্বের গভীর সংকটকেই নির্দেশ করে। সেই নেতা কোথায় যিনি আমাদেরকে
যাবতীয় পরাধীনতা থেকে মুক্তি দিতে পারবেন? প্রতীকী আবহে এই তীব্র
প্রশ্নটি রেখে সৈয়দ হক পাঠকের চেতনাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়ে যান।
ভালো করে কিছুই দেখা যাচ্ছে না বলে গল্পে আমরা মানুষের কাছে নতুন
এক মুক্তিযুদ্ধের আগমনী বার্তা পেঁৗছে দিতে দেখি। দেখি, মানুষ
স্মৃতিচারণ করছে _ মুক্তিযুদ্ধের সময় দুজন মুক্তিযোদ্ধা এসে একটি
মসজিদ থেকে পাঁচজন রাজাকারকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, আর বহু বছর পর সেই
একই মসজিদে দুজন অস্ত্রসজ্জিত যুবকের আগমন ঘটে। তাদের পরিচয় স্পষ্ট
হয় না, তারা কোনো কথাও বলে না। ইমাম সাহেব যখন বলেন, 'কন, বাহে,
শুনি হামরা। মুক্তিযুদ্ধ কি ফির শুরু হয়া গেইছে?' প্রশ্নেই শেষ হয়ে
যায় গল্প, উত্তর আর পাওয়া যায় না (যেন সবকিছুই অস্পষ্ট, ধোঁয়াটে
রহস্যময়তায় আচ্ছন্ন) কিন্তু অনুভূত হয়, আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের
প্রয়োজনীয়তা সব মানুষই খুব তীব্রভাবে অনুভব করছে। কিন্তু মানুষের
কাছে শত্রু-মিত্র বা সার্বিক পরিস্থিতি কিছুই স্পষ্ট হয়ে উঠছে না
বলে যুদ্ধটি শুরু করা যাচ্ছে না।
জমিরউদ্দিনের মৃতু্যবিবরণ গল্পের জমিরুদ্দিন প্রায় মহামানব
পর্যায়ের একজন ব্যক্তি। বংশানুক্রমে তাঁদের ছিল বিশাল দাপট, প্রচুর
সম্পত্তি, কিন্তু এগুলো কিছুই তিনি গ্রহণ করেন না, সবকিছু ছেড়ে
অনেকটা সন্তের জীবন বেছে নেন তিনি, মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন
এবং পরিণত হন মুক্তির প্রতীকে। হাটে-বাজারে গিয়ে তিনি কবুতরের
খাঁচা কিনতেন তারপর_ 'নিজ হাতে একেকটা খাঁচা খুলে জমিরুদ্দিন
কবুতরগুলো একে একে আকাশে উড়িয়ে দিতেন। রাত পর্যন্ত কাছারির মাঠে,
কাছারির বারান্দায় তাঁর মতো ধনী মানুষ দীনহীনের মতো বসে থাকতেন,
শুধু এইজন্যে বসে থাকেন, কেউ যেন কবুতরগুলো আবার না ধরে, আবার না
খাঁচায় পোরে, আবার না আহারে সেই কচি পাখিদের মাংসের প্রাণে
জলেশ্বরীর রাত ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে।' সেই জমিরুদ্দিনের
মৃতু্যক্ষণ উপস্থিত। সবাই একরকম প্রতীক্ষায় থাকে এবং একটি বিস্ময়কর
কথা শুনতে পায় _ জমিরুদ্দিন বলছেন, 'এক মহাপাপ আছে, সেই পাপের
ক্ষমা না পেলে আল্লাহর সম্মুখে তিনি দাঁড়াবেন কোন ভরসায়, নবিজির
শাফায়াত প্রার্থনা করবেন তিনি কোন মুখে, বিবি ফাতেমা সবার জন্যে
চোখের পানি ফেলবেন, সেই পানি জমিরুদ্দিনকে দেখে পাথর হয়ে যাবে।'
এমন যিনি মহৎপ্রাণ ব্যক্তি, কী তাঁর সেই মহাপাপ? গল্পে তা স্পষ্ট
হয় না। কিন্তু গল্পের শেষে আমরা দেখি অনেকটা অপ্রাসঙ্গিকভাবেই
উল্লেখিত হয়েছে_ 'আবার' সামরিক শাসন জারি হয়েছে এবং 'জমিরুদ্দিন
বসুনিয়া আর কখনো হাটে যাবেন না কলাগাছের বাকলে তৈরি খাঁচা খুলে
কবুতরগুলো উড়িয়ে দিতে।' এই পরিণতি গল্পটিকে শেষপর্যন্ত আর সাধারণ
রাখে না বরং ভিন্নমাত্রিক ব্যঞ্জনায় উজ্জ্বল করে আমাদেরকে গভীরভাবে
ভেবে দেখতে উদ্বুদ্ধ করে। 'আবার সামরিক শাসন' আর পরক্ষণেই
জমিরুদ্দিনের কবুতর ওড়ানোর প্রতীক_ এ দুয়ের সমন্বয়ে জমিরুদ্দিন আর
তখন শুধুমাত্র জলেশ্বরীর জমিরুদ্দিন থাকেন না, হয়ে ওঠেন পুরো
বাংলাদেশের মুক্তির দূত, (তিনি কি আমাদের সেই নেতা যাঁর 'মহাপাপ'
ঘাতকদের ক্ষমা করা?) যাঁর মৃতু্য সামরিক শাসন ডেকে আনে, যাঁর
মহাপাপ দেশের জন্য দীর্ঘস্থায়ী সংশয় ও হুমকি ডেকে আনে, যাঁর
অনুপস্থিতি মুক্তির বিষয়টিকে প্রলম্বিত করে তোলে।
সৈয়দ হকের গল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি গল্প আরো
একজন। এই গল্পে আমরা দেখি_নিতান্ত 'সাধারণ এক মানুষ, বেনামাজি,
গাঁজার অভ্যাস আছে, বেশ্যাবাড়ি যায়' কসিমদ্দি একধরনের প্রতিবাদ গড়ে
তুলছে, বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর হিসেবে গড়ে উঠছে ভ্রান্ত ফতোয়া ও
ধর্মব্যবসায়ী ফতোয়াবাজদের বিরুদ্ধে_ 'জলেশ্বরীতে হজরত শাহ সৈয়দ
কুতুবুদ্দিনের মাজারের বর্তমান খাদেম সৈয়দ আবদুস সুলতান নাকি
সমপ্রতি ফতোয়া জারি করেছেন, একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে যাওয়া
হিন্দুর পূজা করার সামিল, অতএব যারা সেখানে যাবে তারা ছরাছর
দোজখবাসী হবে, সত্তর হাজার সাপ তাদের দংশাবে, আর যখন পিপাসায় কাতর
হবে তখন নাছারাদের বিষাক্ত ঘায়ের পুঁজ তাদেরকে পান করতে দেয়া হবে।'
এই কথা শুনে কসিমদ্দি... 'এর প্রতিবাদ করে এবং বলে যে, এই যে
হুজুর-পাক, আর আপনারা এখানে, বাবা কুতুবুদ্দিনের মাজারে এসে
মানুষেরা কেউ কেউ সেজদা করে, কই তখন তো সেটা পূজা হয় না? কই তখন তো
আপনি তাদের শাসন করে বলেন না, যে, মিয়ারা দোজখে তোমাদের সত্তর
হাজার সাপে দংশাবে। বরং আপনি তো দেখি তাদের নজর নজরানা টাকাপয়সা
বড়ই লম্বা হাত বাড়িয়ে গ্রহণ করেন, বলেন 'বাবা ফির আসিস, এই বাবা
ছাড়া দুনিয়ার পার করার কাঁহও নাই। ...তখন তো আপনি...আমাদের এই
জলেশ্বরীর পাক হুজুরের কথা এমনভাবে কন যেন তাঁর ওপরে জগতে আর কেউ
নাই।' এ কথার জবাবে...'খাদেম সৈয়দ আবদুস সুলতান বলেন, তুই কাফের।
তার উত্তরে সবাইকে অবাক করে দিয়ে কসিমদ্দি বলে, আমি মানুষ। অতঃপর
কিছুক্ষণ 'তুই কাফের' এবং 'আমি মানুষ' এই দুই সংলাপের বিনিময় চলে
এবং ধাপে ধাপে স্বর ওঠে দুজনেরই। শেষে কসিমদ্দি লাফ দিয়ে উঠে
দাঁড়িয়ে বলে, এইবার মুঁই ঢাকা যামো, আর একুশে ফেব্রুয়ারি দেখিমো,
শহীদ মিনারে গিয়া ফুল দেমো, পত্রিকায় মুঁই দেখিছোঁ ফুলে ফুলে ভরি
গেইছে শহীদ মিনার, য্যান বেহেশতের একখান টুকরা হয়া আছে গো। মুঁই
সেই শহীদ মিনারে যায়া হামার দ্যাশের যাবত শহীদের নামে সেলাম করিমো,
তা হামাক দোজখে সইত্তর হাজার সর্পে ঢংশায় হামার কোনো দুষ্ক নাই
বাহে।' কসিমদ্দি বেরিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সৈয়দ আবদুস সুলতান বলেন
_'কুষ্ঠ হবে, তোমরা দেখে নিও সকলে, ইয়ার যদি কুষ্ঠ না হয়, চন্দ্র
সূর্য, আসমান হতে গিরি পইড়বে।' এরপর ঢাকায় শহীদ মিনারে ফুল দেবার
পর পুত্রের মুখে ভীতি লক্ষ্য করে কসিমদ্দি বলে_'ডরাইস ক্যানে বাপো
মোর? দোজখে সাপ যদি ঢংশাইতে ফণা তোলে, শুনি রাখ্, ঐ যে শহীদ মিনারে
ফুল দেখলু, ফুলের পাহাড়, একো এক ফুলের একো এক পাঁপড়ি ঢাল হয়া
সর্পের ফণা রোধ করিবে।'... ছোটো এই গল্পটিতে আমরা লক্ষ্য করি, লেখক
একদিকে ধর্মের লেবাসধারী ভণ্ড ফতোয়াবাজদের স্বরূপ উদঘাটন করেছেন,
অন্যদিকে একজন সাধারণ আলুপটলের দোকানদারের_ যে হতে পারে এদেশের
কোটি কোটি সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি_ মাধ্যমে একটি প্রতিবাদ গড়ে
তুলেছেন ভণ্ডদের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে তিনি কসিমদ্দিনের মাধ্যমে
এদেশের সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক চেতনা, তার জাতীয়তাবোধ ও
সাংস্কৃতিক চেতনাকে সূক্ষভাবে চিত্রায়িত করেছেন। এ গল্পের শেষে আরো
একটি চমক পাঠকের জন্য রেখে দিয়েছেন লেখক। গল্পের শেষে কসিমদ্দি
মারা যায়। সে জাদুঘর দেখতে গিয়েছিল এবং সেখানে সে তারই বংশের একটি
গৌরবচিহ্ন আবিষ্কার করে যেটি কিছুদিন আগে তার গ্রাম থেকে লুট
হয়েছিল_ 'এবং সে প্রাণ দিয়েছে যে কারণে, আমরা কি লক্ষ্য করব? ঢাকা
থেকে আগত, কালো চশমাপ্রিয়, সাফারি-সুট-পরা, শিক্ষিত দসু্যর হাতে
একটি বংশের চিহ্ন ডাকাতি হবার জন্য'_আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না এই
'কালো চশমাপ্রিয়, সাফারি-সু্যট-পরা শিক্ষিত দসু্য' কার প্রতিকৃতি।
এ-ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে _ ওই বংশের চিহ্ন আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য
সংস্কৃতি ও জাতীয়তার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে যা সেই 'শিক্ষিত
দসু্যর' আগমনের পর প্রথমবারের মতো প্রশ্নের সম্মুখীন হয়,
হুমকিগ্রস্থ হয়, বলতে গেলে একরকম ডাকাতিই হয়ে যায়।
সৈয়দ হকের অনেকগুলো গল্পের বিষয়বস্তু নাগরিক মানুষ ও তাদের জীবন।
নাগরিক মানুষ যেন আর স্বাভাবিক নেই। যে নিষ্পাপ সরলতা-সহজতা নিয়ে
মানুষের জন্ম হয়, নগরের সংস্পর্শে তা ক্ষয়ে যেতে থাকে।
যান্ত্রিকতা, জীবনের দুর্মর জটিলতা, অনিবার্য বিচ্ছিন্নতা_ এসবই
দখল করে নেয় মানুষের যাবতীয় শুভ সম্পর্ক, তার বিশ্বাস ও মানবিক
অনুভূতি সর্বোপরি তার সমস্ত আশ্রয়। মানুষ হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গ ও
বিচ্ছিন্ন; গতানুগতিকতা আর পৌনপুনিকতায় আক্রান্ত এক আনন্দহীন ও
যন্ত্রণাদগ্ধ জীবন লাভ বরে সে। সৈয়দ হকের এ ধরনের গল্পগুলোতে
এসবেরই প্রতীকী চিত্রায়ন দেখতে পাই।
আনন্দের মৃতু্য গল্পে আমরা দুটি নাগরিক চরিত্রের দেখা পাই যাদের
নির্দিষ্ট কোনো নাম-পরিচয় নেই, যেন তারা যে-কোনো নাগরিক মানুষেরই
প্রতিনিধি। চরিত্রদুটো পরস্পর 'বন্ধু' নামক প্রশ্নবোধক সম্পর্কে
আবদ্ধ, যদিও তেমন কোনো নিদর্শন তাদের মধ্যে দেখা যায় না, কারণ তারা
পৃথিবীর কোনো বিষয়েই একমত হতে পারে না শুধুমাত্র_'জীবনে আর কোনো
স্ফূর্তি নেই'_ এই একটি বিষয় ছাড়া। যেন এটাই তাদের জীবনের একমাত্র
সত্য, আর সবকিছুই দ্বিধাদ্বন্দ্বে আক্রান্ত, প্রশ্ন ও সন্দেহের
মুখোমুখি। তাদের জীবনে কোনো আনন্দ নেই, বৈচিত্র্য নেই, পরিবর্তন
নেই। তীব্র গতানুগতিকতা ও পৌনপুনিকতায় আক্রান্ত এই জীবনে কিছুটা
আনন্দ আনার জন্য তারা প্রতিদিন সন্ধ্যায় বার-এ এসে বসে, খানিকটা
নেশায় ঘোরগ্রস্ত হয়, নিজেদের প্রাত্যহিক জীবনযাপন কিছুক্ষণের জন্য
হলেও ভুলে থাকে। সেখানে তারা নিতান্ত সাধারণ একটি দৃশ্যে অতি আমোদ
খুঁজে পায়। দৃশ্যটি হচ্ছে_ একটি লোক মদ খেয়ে উঠে দাঁড়ালে প্রথমে
একটি টাল খায়, তারপর সোজা হেঁটে যায়। তারা একরকম দৃশ্যটির প্রেমে
পড়ে যায়। নিয়মিতভাবে শুধুমাত্র দৃশ্যটি দেখার উন্মুখ প্রত্যাশায়
তারা বার-এ আসতে থাকে। গল্পটি আমাদেরকে অ্যাবসার্ড নাট্যকার আর্থার
অ্যাডামোভের বহুল আলোচিত একটি নাটক 'পিং পং'-এর কথা মনে করিয়ে দেয়,
যেখানে এরকমই দুটো চরিত্র একদিন পিংপং মেশিনে খেলতে এসে ওটির
প্রেমে পড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত দেখা যায় ওই একটি মেশিনকে কেন্দ্র
করেই তাদের পুরো জীবন কেটে গেছে। বাইরের জীবন ও পৃথিবী থেকে তারা
বিচ্ছিন্ন থেকেছে, কোনো স্বপ্ন বা কল্পনা তাদের প্রলুব্ধ করেনি।
বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতায় আক্রান্ত, স্বপ্ন ও প্রত্যাশাবিহীন
বিপন্ন মানবজীবনের এক অসাধারণ প্রতীক চিত্রায়ন ছিল ওটি। আনন্দের
মৃতু্য গল্পেও আমরা দুর্বহ পৌনপুনিকতা আর সুগভীর বিচ্ছিন্নতার
প্রতীকচিত্র দেখতে পাই। এই পরিস্থিতি আসলে নাগরিক মানুষের ফাঁপা
অদ্ভুত সম্পর্কের আভাস দেয়, পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতাবোধকেই তীব্রভাবে
মূর্ত করে তোলে। গল্পের শেষে আমরা দেখি যে-দৃশ্যটি গতানুগতিকতা
সত্ত্বেও তাদের ভেতরে গভীর আনন্দের সৃষ্টি করত, তার মৃতু্য ঘটছে।
জীবনে কিছুই আর থাকে না আনন্দিত হবার মতো কিংবা বেঁচে থাকবার আনন্দ
হিসেবে, থাকে শুধুই গভীর ক্লান্তি, বেদনা আর যন্ত্রণা।
মানুষ গল্পে আমরা_ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসবোধ লুপ্ত হয়ে
যাচ্ছে_ এই সত্যের প্রতিভাস দেখতে পাই। গল্পের দুটি চরিত্রের সঙ্গে
আমাদের পরিচয় ঘটে, পূর্বোক্ত গল্পের মতো এদেরও কোনো নাম-পরিচয় নেই,
যাদের একজন আরেকজনকে এরকম শত্রুতা করে জেলে ঢুকিয়েছিল। জেল-ফেরত
ব্যক্তিটি একদিন চলার পথে ভয়াবহ ঝড়ের মধ্যে পড়ে যায়_
এক প্রচণ্ড ঘূর্ণি বাতাস... দু-চোখ অন্ধ করে দিয়ে ধুলোর একটা ফাঁপা
দেয়াল গড়ে ভেঙে ছিটিয়ে গড়িয়ে চলে যেতে লাগল হু হু করে।... আমি
দৌড়ুতে লাগলাম।... রাস্তার সবাই দৌড়ুচ্ছে, কেউ আর দাঁড়িয়ে থাকতে
পারছে না;... আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি সেখানে যেন তুষের আগুন। পুরু
মেঘে যে-আকাশটা ঢাকা, সে-আকাশ লাল হয়ে উঠছে।... সেবার এ-শহরের ওপর
দিয়ে সাইক্লোন হয়ে গেল, একটা জাহাজকে উড়িয়ে নিয়ে ডাঙায় তুলে রাখল,
বিষাক্ত সাপ আর মানুষ বন্যার মুখে পাশাপাশি আশ্রয় নিল, কিন্তু সাপ
কাটলনা মানুষকে। বোধহয় সেবারের চেয়ে কম হবে না আজকের ঝড়।
এমন একটি ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে সে এসে একটি অচেনা বাড়ির বারান্দায়
আশ্রয় নেয়, ঘটনাক্রমে সেই একই জায়গায় তার শত্রু লোকটি এসে পড়ে,
পরস্পরকে দেখে চমকে ওঠে। কিন্তু একসময় লোকটির মধ্যে প্রবল
প্রতিশোধস্পৃহা থাকলেও এই দুঃসময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে তার
শত্রুকে ক্ষমা করে দেয়, কিন্তু শত্রুটি তা বুঝতে পারে না। ঝড়ের
মধ্যেই সে যাবতীয় অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়ে দৌড় দেয়। গল্পের শেষে
জেল-ফেরত লোকটির দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়_ 'আমি তো মানুষ, তাই সে আমাকে
বিশ্বাস করতে পারল না।' যে ঝড়ের মুখে মানুষ আর বিষাক্ত সাপও
পরস্পরকে বিশ্বাস করতে পারছে, সেখানে মানুষ পারছে না, কারণ
বিশ্বাসবোধ লুপ্ত হয়ে গেছে, এখন পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা অপরিসীম এবং
নিঃসঙ্গতা আর বিশ্বাসহীনতার চাপে পড়ে হাঁসফাঁস করছে মানবিক জীবন।
পূর্ণিমায় বেচাকেনা গল্পটি এ-ধরনের গল্পগুলোর মধ্যে বিশেষ
উল্লেখযোগ্যতার দাবি রাখে। গল্পে একটি চরিত্রের সঙ্গে পাঠকের পরিচয়
ঘটে যার সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকাটাই হুমকির সম্মুখীন, স্বপ্নপ্রাপ্ত
অর্শরোগের ওষুধ বিক্রির একটি দোকান খুলে বসেছে সে কিন্তু কোনো
ক্রেতা নেই। তার দুরবস্থা দিনদিন জটিল আকার ধারণ করে, তার পক্ষে
আহার জোটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু এই অবস্থায় আরেকজন লোক
একটি যন্ত্র তার কাছে বিক্রি করতে আনলে সে একরকম যন্ত্রটির প্রেমেই
পড়ে যায়। এভাবে এই রহস্যময় লোকটি বারবার বিভিন্ন যন্ত্র নিয়ে আসতে
থাকে, যার সবগুলোই তার কাছে অচেনা বা অপ্রয়োজনীয়, আর সে তার যাবতীয়
অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা অগ্রাহ্য করে সেসব কিনে রাখতে থাকে। এদিকে
তার জীবন-যাপন আরো জটিল হতে থাকে, উনুনে আর হাঁড়ি ওঠেনা, ক্ষুধায়
আহার জোটে না; অথচ লোকটি যখন যন্ত্র নিয়ে আসে সে ব্যাকুল হয়ে পড়ে,
যেভাবেই হোক, যা-কিছুর বিনিময়েই হোক সে সেগুলো কিনে রাখতে চায়। বলা
বাহুল্য এই গল্পটিও প্রতীকী তাৎপর্যপূর্ণ। এক্ষেত্রে যন্ত্রের জন্য
লোকটির ওই উদ্বেলতা কি আমাদেরই চারিত্র্য-বৈশিষ্ট্য নয় যে আমরা
পুরোপুরি আধুনিক নাগরিক জীবন-যাপনের লক্ষ্যে নিজেদেরকে প্রায়
যন্ত্রে পরিণত করি এবং বুঝতেই পারি না যে আমাদের মানবিক জীবন তাতে
বিক্রি হয়ে যাচ্ছে যন্ত্রের কাছে, যেমন গেছে ওই লোকটির! গল্পের
শেষে আমরা দেখি রহস্যময় লোকটি এবার আর কোনো যন্ত্র নয়, একজন নারীকে
নিয়ে এসেছে। লোকটির কথায় বোঝা যায় নারীটি তার 'ঘরের জিনিস'। তাহলে
কি এটাই সত্য যে নাগরিক জীবনে যন্ত্রের কাছে, যান্ত্রিকতার কাছে
শুধু মানুষের সুস্থ বেঁচে থাকাই নয়, মানুষও স্বয়ং বিক্রি হয়ে যায়
ওই যন্ত্রের মতো 'জিনিস' হিসেবে। মানুষ সে যেমনই হোক, 'মানুষ'
হিসেবে বেঁচে থাকাটা আর সহজসাধ্য নয় এই নগরে; যে-কোনোভাবেই হোক,
মানুষের জীবন হরণ হয়ে যাবে, অমানবিক, যান্ত্রিক হয়ে যাবে_ নগরের এই
এক অনিবার্য নিয়ম।
আমাদের এখানে মধ্যবিত্তদের নিয়ে প্রচুর মনগড়া কাহিনী লেখা হয়। খুব
সম্ভবত বর্তমান বাংলাসাহিত্যের লেখকদের সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র
মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্তকে দিয়ে যা-ইচ্ছে করানো যায়, কারণ তার
নির্দিষ্ট কোনো চরিত্র নেই, সুনির্দিষ্ট কোনো রূপ নেই। একথা
অনস্বীকার্য যে মধ্যবিত্তরাই আবহমান মূল্যবোধগুলোকে তীব্রভাবে ধারণ
করে, নানারকম বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয় অথবা অংশগ্রহণ করে; কিন্তু এ-ও
সত্য যে তারাই সবচেয়ে আগে আপোস করে। এই দ্বৈতচরিত্রসম্পন্ন
মধ্যবিত্তকে খুব বেশি তুলে আনা হয়নি আমাদের সাহিত্যে। সৈয়দ হকও এই
শ্রেণীর চরিত্রচিত্রণে দ্বৈতরূপটি আনেননি। আবার তাঁর এ ধরনের
গল্পগুলোকে ঠিক গতানুগতিকও বলা যাবে না। তাঁর গল্পে মধ্যবিত্তের
আবেগ-অনুভূতি, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি আর জীবনজোড়া হাহুতাশের চিত্র
নেই। তাঁর চরিত্রগুলো দাঁড়িয়ে আছে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, তারা যতটা না
তাদের ঘরের বেদনাক্লিষ্ট জীবনযাপনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত, তারচেয়ে
বেশি বহির্জগৎ ও জীবনের প্রেক্ষাপটে। যে কয়েকটি গল্পে তিনি
মধ্যবিত্তকে তার প্রাত্যহিক আবেগের প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করেছেন তার
মধ্যে শীতবিকেল গল্পটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যতার দাবি রাখে। এই
গল্পটিতে মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন কিশোরের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা তার
পরিপাশর্্ব বর্ণিত হযেছে উত্তমপুরুষে। একজন কিশোর তার নিষ্পাপ,
নির্মল, সরল হৃদয় নিয়ে তার পরিবারের উত্থান-পতন দেখছে,
আনন্দ-বেদনা, গৌরব ও লজ্জা দেখছে। তাদের মূল্যবোধগুলোকে
পর্যবেক্ষণ করছে, তাদের অহংকার ও ভয় দেখছে। সবকিছুতেই তার অংশগ্রহণ
আন্তরিক এবং গভীর। যেটুকু সে অনুভব করে সেটুকুকে একজন কিশোর বলেই
এড়িয়ে যাওয়া বা তুচ্ছ করা তার পক্ষে অসম্ভব। এসব দেখে-দেখে তার
ভেতরে সৃষ্টি হয় অজস্র-অসংখ্য অনুভূতির_ যে অনুভূতি নিয়ে সে বেড়ে
উঠবে, যে আনন্দ-বেদনার স্মৃতি নিয়ে তার সারাটি জীবন কাটবে, যে
মূল্যবোধগুলো দিয়ে সে পরিচালিত হবে। আমাদের সাহিত্যে কিশোরের
দৃষ্টিকোণ থেকে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের এমন অসাধারণ বর্ণনাময় গল্প
খুব সুলভ নয়। এই ভিন্নধরনের গল্পপাঠে পাঠক অভিভূত হয়, অনিবার্যভাবে
একবারের জন্য হলেও ফিরে তাকাতে বাধ্য হয় তার কৈশোরের স্বপ্নময়
দিনগুলোর দিকে, তার ওই বয়সের আবেগ-অনুভূতি আর স্মৃতির দিকে।
আবার স্বপ্নের ভেতর বসবাস গল্পে এক মফস্বলী যুবকের সঙ্গে পরিচিতি
হবার সুযোগ মেলে যে নানারকম বঞ্চনা ও অবহেলায় হতাশ ও বিবর্ণ।
প্রত্যাখ্যাত হতে হতে সে একসময় নিজের অজান্তে উচ্চারণ করে ফেলে,
'আমি যাচ্ছি'। এ মূলত তার অন্তর্গত উচ্চারণ, এইসব বঞ্চনা ও অবহেলা
থেকে, নৈরাশ্য ও বেদনা থেকে সে দূরে কোথাও চলে যেতে চায়, কোথায় সে
জানে না, এ তারই উচ্চারণ। কিন্তু সেই উচ্চারণটিই সবাই লুফে নেয়। সে
তখন মিথ্যে করে বলতে বাধ্য হয় যে সে মধ্যপ্রাচ্য যাচ্ছে। এই তথ্য
দেবার পর তার প্রতি সবার আচরণ পাল্টে যায়, বন্ধুরা ঈর্ষার চোখে
দ্যাখে, পারিবারিক সদস্যদের মমতা ও ভালোবাসা দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে
বেড়ে যায়; যেসব তরুণী তাকে দেখে তাচ্ছিল্যভরে চোখ ফিরিয়ে নিত, তারা
আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকে, চিরকুট পাঠায়। তার পৃথিবী স্বপি্নল হয়ে
যায়। যদিও সে জানে কোথাও যাওয়া হবে না তার তবু তার চোখজুড়ে থাকে
স্বপ্ন, হৃদয়জুড়ে থাকে স্বপ্ন, স্বপ্নঘোরগ্রস্ত অবস্থায় তার জীবন
প্রবাহিত হতে থাকে। এ-ও এক ফ্যান্টাসি বটে। যা সে নয়, যা সে হতেই
পারে না, সেই কল্পনায় ও স্বপ্নে তার দিন কাটে। এই কল্পনা, এই
স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত তার দীনতা, তার অসহায়ত্ব ও দুর্দশা, তার
নৈরাশ্য ও বেদনাকেই তীব্রভাবে মূর্ত করে তোলে, তার বিপন্ন জীবনকে
তীব্রভাবে বিদ্রূপাত্মক করে তোলে যা পাঠকহৃদয়ে গভীর মমতা ও
ভালোবাসার সৃষ্টি করে এবং গল্পের ভিন্নমাত্রিক ব্যঞ্জনায় পাঠক
তৃপ্তি লাভ করে।
সৈয়দ শামসুল হকের অন্যান্য গল্পের মতোই প্রেমের গল্পগুলোও পাঠকের
কাছে ভিন্নমাত্রা নিয়ে হাজির হয়। গতানুগতিক পুতুপুতু-মার্কা কোনো
প্রেম নেই এসব গল্পে, যে প্রেম আছে তা এতটা অগভীর নয় যে সহজেই তার
সবটুকু পড়ে ফেলা যাবে, আবেগ আছে কিন্তু সেই আবেগেরও রাশ টেনে ধরে
রাখেন তিনি, তীব্র অনুভূতি আছে কিন্তু তা শুধু ওই প্রেমকে কেন্দ্র
করেই ঘুরপাক খায় না, সমগ্র জীবনটাই চলে আসে সেখানে; সংলাপগুলোতেও
তিনি দার্শনিক উপলব্ধির এবং গভীর জীবনবোধের প্রমান রাখেন।
ফিরে আসে গল্পের কথাই ধরা যাক। এই গল্পে আমরা পঞ্চাশ দশকের সৈয়দ
শামসুল হককে খুঁজে পাই, ফজলে লোহানীকে (গল্পে যে আব্দুল্লাহ) মনে
পড়ে। প্রেম এখানে গভীর। কামনা তীব্র কিন্তু তারচেয়ে বেশি তীব্র
বোধহয় একজন লেখকের লিখতে না-পারার বেদনা, একজন শিল্পীর ছবি অাঁকতে
না-পারার কষ্ট। ওই সময়টির কথা যদি আমরা মনে রাখি, বুঝতে পারি,
ব্যক্তিগত জীবন-যাপন ততটা জটিল না হলেও একজন লেখক কেন লিখতে পারেন
না, একজন শিল্পী কেন ছবি অাঁকতে পারেন না_
এখন আমি কিছুই লিখতে পারব না। এখন তায়মুর কোনো ছবিই অাঁকতে পারবে
না, এখন একজন আবদুল্লাহ লিখতে না-পেরে বিদেশে চলে যাবে। কারণ
আমাদের কিছুই নেই পেছনে, কিছুই নেই সামনে। আমরা কিছুই বিশ্বাস করি
না। আমাদের পায়ের নিচে সিঁড়ি নেই। এ হচ্ছে এমন এক সময়, আমরা কিছুই
করতে পারব না, আমরা বয়ে যেতে পারব। আমাদের ভঙ্গি থাকবে, চাল থাকবে,
মুখোশ থাকবে কিন্তু হাত থাকবে না স্রষ্টার।
পঞ্চাশের সেই বিপন্ন ও আত্মপরিচয় খুঁজে-ফেরা সময়ের এর চেয়ে চমৎকার
সংজ্ঞা আর কী হতে পারে? আর এই কথাগুলো কি আজকের যে-কোনো শিল্পীর
জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য নয়? সৈয়দ হকের প্রেমের গল্পের সার্থকতা
এখানেই, মানব-হৃদয়ের অলি-গলি চিহ্নিত করার সঙ্গে সঙ্গে সময়কেও অতি
চমৎকারভাবে ধরে রাখেন তিনি, এবং এই অবলোকনের মধ্যে খাকে এমন এক
দৃষ্টিভঙ্গি যে অর্ধশতক পরও তাকে সমসাময়িক মনে হয়।
রুটি ও গোলাপ গল্পের চরিত্রগুলো একই। বিসতৃত আলোচনায় না গিয়ে গল্প
থেকে কিছু অসাধারণ দার্শনিক পঙক্তি উদ্ধৃত করা যাক। মেয়েটির সংলাপ_
জীবনের সৌধ গড়ে কী হবে? মৃতু্য চায় তার বিরাট ক্ষুধা আমাকে তোমাকে
সবাইকে দিয়ে মেটাতে। একদিন মনে করতাম জীবনের মতো কিছু হয় না। আজ
মনে হয়, মৃতু্যই মানুষের ঈশ্বর। তাকে তুষ্ট করবার জন্য জীবনকে বড়,
মহৎ, কীর্তিময় করে তুলি। জীবন যত বড়, যত ভালো হবে, মৃতু্য তত বেশি
করে বাজবে। মৃতু্যকে বড় করবার জন্য আমরা জীবনকে বড় করি।
অথবা ছেলেটির ভাবনা_
মানুষ বেঁচে থাকে কেন? জানি না। জানি না। কোনো কারণ নেই, কোনো
উদ্দেশ্য নেই। মানুষ বেঁচে থাকে কেন না নিয়ম তাকে জন্ম দিয়েছে,
বিবর্তন তাকে চেতনা দিয়েছে, সভ্যতা তাকে বুদ্ধি দিয়েছে। যদি আমি
মানুষ না হয়ে একটা গাছ হতাম তো কী হত? যদি আমি মানুষ না হয়ে
হিমালয়ের একটুকরো বরফ হতাম তো কী হত?
অথবা
একটা গাছ হেলে পড়েছে, তার নিচে ছায়া, সেই ছায়ায় শুয়ে আমার কারণহীন
কান্না কারো জন্য নয়_ না আমার জন্য, না আমি ছাড়া পৃথিবীর আর কারো
জন্য। কান্না পেল কারণ এই আকাশটা অনেক বড়, এই মাটিতে অনেক দুঃখ, এই
পৃথিবীটা দুঃখী মায়ের মতো। ঐ দূর ওপার থেকে মানুষ আসছে যাচ্ছে ...
পৃথিবী জেগে উঠেছে, গাছ দাঁড়িয়ে আছে, বাতাস বইছে, শস্য বড় হচ্ছে,
নৌকোয় গতির ঘোর লেগেছে_ সবকিছু মিলে একটা প্রচণ্ড বেদনা। বেদনা
কেননা তা বুঝতে পারি না।
গল্পের শেষে আমরা দেখি, ছেলেটি জীবনের সংশয় আর মৃতু্যর সম্ভাবনা
থাকা সত্ত্বেও মিথ্যার সঙ্গে আর আপোস করছে না। সত্য ও সুন্দরের জয়
পরিশেষে জীবনকেই বড় করে তোলে, জীবনকেই মাহিমান্বিত, সুন্দর ও
গৌরবজনক করে তোলে। সৈয়দ হকের প্রেমের গল্প বলে পরিচিত গল্পগুলো
এভাবেই দার্শনিকবোধসম্পন্ন জীবনধমর্ী গল্প হয়ে যায়।
উপসংহারের পরিবর্তে
যে-কথাটি এই রচনার শুরুতেই বলা হয়েছিল এখানে সেটির পুনরাবৃত্তি
করতে চাই। সৈয়দ শামসুল হকের যে বিপুল কর্মের জগৎ, লক্ষ্য করলে দেখা
যাবে, তিনি নির্দিষ্ট কোথাও নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। ভাষা, বিষয়,
উপস্থাপনা প্রভৃতি নানা দিক থেকে তিনি নিজেকে বদলে ফেলেছেন। ধীরে
ধীরে তৈরি করেছেন নিজস্ব লেখা একটি ভঙ্গী_ কী ভাষায়, কি প্রকরণে_
তাঁর লেখাটি যে সৈয়দ হকেরই লেখা সেটি চিহ্নিত করতে পাঠককে কোনোরকম
কষ্টই করতে হয় না।
তাঁর গল্পগুলোতে রচনাকাল দেয়া নেই কিন্তু গল্প থেকেই অনেক ক্ষেত্রে
সময়কে নির্ণয় করা সম্ভব এবং পাঠক লক্ষ্য না করে পারেন না যে, তাঁর
প্রথমদিককার গল্পগুলোর চেয়ে সামপ্রতিককালের গল্পগুলোর ভাষা ও
আঙ্গিক কী অসাধারণ কুশলতায় বদলে গেছে। ফিরে আসে বা রুটি ও গোলাপ
গল্পের যে ভাষা ও উপস্থাপনা গাধা জ্যোৎস্নার পূর্বাপর গল্পের ভাষাও
উপস্থাপনা তার থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। অন্যদিকে প্রথমদিকের গল্পগুলোতে
তিনি আখ্যান-বর্ণনার দিকে যতটা মনোযোগী ছিলেন, পরবর্তীকালে সেটিও
পাল্টে ফেলেছেন, বিশেষ করে আঙ্গিকে এমন এক পরিবর্তন এনেছেন যে, মনে
হয়, লেখক কেবল গল্পটিই বলছেন না, বরং পাঠকদের সঙ্গেও কথা বলছেন,
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করছেন, আখ্যানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে তোলার জন্য
পাঠককে সরাসরি সম্বোধন করছেন, যেন পাঠক নিজে কেবল দর্শকের অবস্থানে
না থেকে নিজেও অংশগ্রহণ করে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ধারার গল্পগুলোতে
তাঁর এই কৌশল বিশেষভাবে চোখে পড়ে। এসব গল্পকে অবশ্য তিনি নিজে
শুধুমাত্র 'গল্প' না বলে 'গল্পপ্রবন্ধ' নামে অভিহিত করে থাকেন,
কিন্তু এগুলো পাঠ করে একটি 'গল্প' পাঠেরই আনন্দ হয়। গল্পকে তিনি
স্রেফ ঘটনা-বর্ণনার দায় থেকে মুক্ত রেখেছেন বটে, কিন্তু
'গল্পহীনতা'র দায়ও নেননি, আবার একটি মেসেজ দিতে গিয়ে সেটিকে
শ্লোগানসর্বস্বও করে তোলেননি _ শিল্পমানের ব্যাপারে তাঁর এই
আপোসহীন অবস্থান তাঁর গল্পকে অধিকতর সুষমামণ্ডিত করে তুলেছে।
সৈয়দ হক তাঁর গদ্যভাষাকে একটি উচ্চ-মর্যাদাসম্পন্ন অবস্থানে নিয়ে
যেতে সক্ষম হয়েছেন। শব্দের ব্যবহার ও বাক্যের গঠনে তিনি এমন গভীর
সচেতনতার পরিচয় দেন যার তুলনা মেলা ভার। আবার কিছু গল্পে, বিশেষ
করে যেসব গল্পে উত্তরবঙ্গ উঠে এসেছে, তাঁর ডায়ালেক্টের ব্যবহার
ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। গল্পগুলোতে ঐ অঞ্চলের মানুষ ও তাদের
জীবনকে চিত্রিত করার জন্য তাদের মুখের ভাষা হুবহু তুলে এনে তিনি যে
বিশ্বাসযোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন তা বিস্ময়কর।
সৈয়দ হকের গল্পে প্রতীকের প্রবল প্রচুর ব্যবহার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
অনেক গল্পেই তিনি প্রতীক ব্যবহার করেন অতি কুশলতার সঙ্গে। যে-কথাটি
তিনি বলতে চান সেটি সরাসরি না বলে, সেক্ষেত্রে প্রতীক ব্যবহার করার
ফলে পাঠক কোনো-একটি চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তে আবদ্ধ না হয়ে
বহুমাত্রিক ভাবনায় আন্দোলিত হতে পারেন। মানুষ এবং তার জীবন ও
পরিপাশর্্ব, কর্ম ও ভাবনাকে কখনো একক সংজ্ঞা দিয়ে আবদ্ধ যায় না,
গল্পে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তাই পাঠককে দূরে ঠেলে দেয়।
সৈয়দ হক সেই সত্যটি জানেন, তাঁর প্রতীক ব্যবহার তাই এতটা কুশলী ও
মোহনীয় হয়ে ওঠে। এবং এই সবকিছু এবং আরো অনেককিছু নিয়েই তিনি হয়ে
উঠেছেন আমাদের প্রধান লেখকদের একজন।
|
| |
 |
|