Page loading ... Please wait.

অন্ধ যাদুকর
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
'এক দেশে ছিলো এক রাজা, আর ছিলো এক রানী।'- বাবা গল্প বলছে, আর আদিত্য চোখেমুখে রাজ্যের কৌতূহল নিয়ে বসে আছে। গল্পটা তার অনেকবার শোনা, সে জানে এরপর বাবা কি বলবে, তবু প্রতিবারই সে ভীষণ আগ্রহ নিয়ে গল্পটা শোনে। গল্পের প্রতিটি বাক্যে বাবার এক্সপ্রেশন যেভাবে বদলে যায়, সেটা দেখার জন্য হলেও বারবার গল্পটা শুনতে ইচ্ছে করে তার। কিন্তু এখন গল্প শুনতে শুনতে একইসঙ্গে সে ভাবে- সম্পর্ক নিয়ে আমি একটা উপন্যাস লিখতে চাই। সম্পর্ক নিয়ে? এ আর নতুন কি? পৃথিবীতে এমন কোন উপন্যাস আছে, যার মধ্যে দিয়ে নানারকম সম্পর্কের দৃশ্যকল্প তৈরি হয়নি! তাহলে আমি আর নতুন কি লিখবো? না, নতুন কিছু লিখতে পারবো কী না জানি না, কিন্তু এটা জানি- একজন মানুষ সারাজীবন ধরে যতরকম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, তা নিয়ে এক বিরাট উপন্যাস লেখা যায়। শুয়ে শুয়ে এসব ভাবতে ভাবতে কখন ঝিমুনি এসে গেছে বুঝতে পারেনি কায়সার আহমেদ ওরফে আদিত্য। তারপর হঠাৎ সে দ্যাখে, বাবা গল্প করছে। তখন কোনটা যে কল্পনা, কোনটা বাস্তব, আর কোনটা স্বপ্ন সেটা নির্ধারণ করা তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে! সবকিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে যায়। বাবা গল্প করে, সে একইসঙ্গে গল্প শোনে এবং সম্পর্ক নিয়ে উপন্যাস লেখার কথা ভাবে, এবং কোথায় যেন সূক্ষভাবে এই চিন্তাও কাজ করে যে, এত স্বপ্ন দেখলে ঘুমটা ভালো হবে না, আর সেক্ষেত্রে কালকে অফিসে যেতে অসুবিধে হবে। এতগুলো ঘটনা জট পাকিয়ে তাকে ধাঁধায় ফেলে দেয়। সে এখন কী অবস্থায় আছে বুঝে উঠতে পারে না। 'তো'- বাবা বলতে লাগলো- 'সেই রাজার মনটা ছিলো অনেক বড়ো, মানুষের কষ্ট দেখলে তার মনটাও কষ্টে ভরে উঠতো, আর একা একা কাঁদতো; কিন্তু কিছু করতে পারতো না। করবে কীভাবে, সে ভীষণ গরীব রাজা ছিলো যে! তার না ছিলো কোনো রাজ্য, না কোনো রাজপ্রাসাদ। একটা ছোট্ট ভাঙাচোরা ঘরে সে আর রানী থাকতো। সেই ঘরে অনেক দুঃখ ছিলো, কষ্ট ছিলো, অভাব ছিলো।'- বাবার মুখ এখন ভীষণ মলিন আর দুঃখী দেখাচ্ছে, যেন রাজার দুঃখে সে নিজেই কাতর। কিন্তু এ কেমন ধরনের রাজা, যার না আছে রাজ্য, না রাজপ্রাসাদ! প্রশ্নটা মনে এলেও কায়সার সেটা উত্থাপনের সুযোগ পায় না, কারণ, বাবা ইতোমধ্যেই গল্পের পরের বাক্যে চলে গেছে -'রাজাটা এত গরীব ছিলো যে, রানীকে ঠিকমতো শাড়ি-টাড়িও কিনে দিতে পারতো না; আর বৃষ্টি এলে তাদের সেই ভাঙা ঘরের চাল বেয়ে পানি চলে আসতো, তারা ভিজে যেত, কিন্তু কী আর করা, তারা তো খুব গরীব, তাই কিছু করতে পারতো না!'- এখনো বাবার মুখ বিষণ্ন। কিন্তু কায়সার জানে, এই বিষণ্নতা একটুক্ষণ পরই কেটে যাবে। 'তো, সেই ঘরে রানীর কোলে একদিন কোত্থেকে যেন ছোট্ট একটা রাজপুত্র এলো। সেই রাজপুত্রটা দেখতে কেমন ছিলো জানো?'- বাবার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, বলছে- 'সেই রাজপুত্রটা দেখতে ছিলো একেবারে টুনটুনি পাখির মতো ছোট্ট, টিয়ে পাখির মতো সুন্দর, আর ময়না পাখির মতো মিষ্টি! রাজপুত্রটা এলো আর তাদের সেই ঘরটা একেবারে আনন্দে ভরে গ্যালো, সুখ উপচে পড়লো, তাদের আর দুঃখ রইলো না, কষ্ট রইলো না। কেন জানো?' এই প্রশ্নের উত্তরে আবার প্রশ্ন করাটাই রীতি, কায়সারও তাই করলো- 'কেন বাবা?'- 'কারণ সেই রাজপুত্রটা ছিলো একটা হীরের টুকরো।' বাবা এবার রীতিমতো ঝলমল করছে- 'তাদের ভাঙা ঘরে বৃষ্টির বদলে এবার চাঁদের আলো ভেঙে পড়লো। কেন জানো? কারণ- সেই রাজপুত্রটা নিজেই ছিলো চাঁদের একটা টুকরো। কীভাবে যেন সে সেই ভাঙা ঘরে চলে এসেছিল! সেই রাজপুত্রটার নাম কি তুমি জানো? জানো?'- কায়সার জানে। বাবা যে এই মুহূর্তে এসে এই প্রশ্নটা করবে তা-ও জানে। কিন্তু উত্তরটা নিজে দেয়ার বদলে বাবার মুখে শোনাই ভালো, কারণ বাবা যে শুধু উত্তরটাই দেবে তা নয়, আদরে আদরে ভরে দেবে তাকে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই তার আরো তিন ভাইবোন- সূর্য, কাজল আর নিশি- কোত্থেকে যেন এসে হাজির হলে বাবা ভীষণ সমস্যায় পড়ে। কায়সার নিজের নামটা বাবার মুখে শুনতে না পারার দুঃখে আর বাবার অসহায় বিব্রত মুখটা দেখতে দেখতে জেগে উঠলে হঠাৎ করে বুঝে উঠতে পারে না, সে কোথায়! স্বপ্নের ঘোর তার কাটেনি, ফলে বাবার প্রশ্নের রেশটা রয়ে গেছে এখনো। সেই রাজপুত্রটার নাম তুমি জানো? জানো?- হঁ্যা, জানি তো, কিন্তু তোমার মুখেই যে শুনতে ইচ্ছে করছে বাবা! বাবা আর কথা বলে না, কায়সারের ঘোর কেটে যায়, এতক্ষণে বুঝতে পারে সে স্বপ্নই দেখছিল। কিন্তু উপন্যাসটা? ওটা কি লেখা হবে না? আর এই এতদিন পর সেই বাস্তব দৃশ্যটিই বা বেঁকেচুরে আবার স্বপ্নে হাজির হলো কেন? 
সেই ছোটবেলায়, যখন তার রূপকথা শোনার বয়স, তখন গল্প শুনতে চাইলে বাবা এই একটা গল্পই বলতো, বেশ মজা করে। হয়তো এই গল্পটাই শুধু বানাতে পেরেছিল বাবা, সেটাই একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার বলতো। গল্পের শেষে আবার সেই প্রশ্ন, প্রশ্ন করে আবার নিজেরই উত্তর- 'সেই রাজপুত্রটার নাম...সেই রাজপুত্রটার নাম হলো আদিত্য!' তারপর আদর। বড় হয়েও এই গল্প নিয়ে আগ্রহ ছিলো কায়সারের, কি করে বাবা নিজের পুত্রকে রাজপুত্র বানিয়ে ফেলতো, ভেবে তার অবাক লাগতো। পরে কায়সার মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করে জেনেছে- এই গল্প বাবা আসলে তার সব সন্তানকেই শুনিয়েছে, একটু-আধটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। যেমন, কাজল বা নিশিকে শোনানোর সময় রাজপুত্রের জায়গায় 'রাজকন্যা' বসতো- তাতে গল্পের তেমন কোনো হেরফের হতো না। হবেই বা কেন? রাজপুত্র-রাজকন্যাদের কোনো ভূমিকাই নেই এ গল্পে, এ তো আসলে সেই গরীব রাজার গল্প- যার মনটা ছিলো অনেক বড়, কিন্তু না ছিলো রাজ্য, না ছিলো রাজপ্রাসাদ! কেন বাবা সবাইকে এই একই গল্প শোনাতো? রাজপুত্র বা রাজকন্যা আসার পর তো সেই রাজার দুঃখ চলেই গেলো, তাহলে আরেকজনকে সেই একই দুঃখের গল্প শোনানো কেন? নাকি দুঃখ তাকে ছেড়ে যেত না কখনো? হয়তো একেকটা সন্তানের জন্ম তাকে প্রত্যাশার আলোতে উজ্জ্বল করে তুলতো, মনে হতো তার ভাঙা ঘরে রাজকন্যা-রাজপুত্রদের আগমন ঘটেছে, তা-ও যেমন তেমন নয়, তারা একেকজন একইসঙ্গে হীরের আর চাঁদের টুকরো যা একইসঙ্গে দারিদ্র আর অন্ধকার দূর করে দিতে পারে! কিন্তু পরবর্তীকালে আবিষ্কার করতে দেরি হতো না যে, এই রাজপুত্র-রাজকন্যারা তার জীবনে আর একটা বাড়তি বোঝা ছাড়া আর তেমন কোনো সম্ভাবনা নিয়ে আসেনি। বাবার জন্য কায়সারের নতুন করে দুঃখ হলো, একটা দীর্ঘশ্বাস পড়লো প্রায় নিজের অজান্তে। কিন্তু বাবার জন্য দীর্ঘশ্বাসটি ফুরোতে না ফুরোতে- 'ঘুমটা ভেঙে গ্যালো, আজকের রাতটাও এভাবেই কাটবে'- ভেবে নিজের জন্য দ্বিতীয় দীর্ঘশ্বাসটি পড়তেও দেরি হলো না। ইদানিং ঘুমের খুব সমস্যা হচ্ছে। বিছানায় দীর্ঘক্ষণ এপাশ-ওপাশ করেও ঘুম আসে না, এলেও সেটা এত হালকা যে, সামান্য শব্দেই ভেঙে যায়। আর যদি কোনোদিন মাঝরাতে জেগে ওঠে কোনো কারণে- সারারাত আর ঘুম হয় না। অথচ সে টের পায়, কী বিপুল অবসাদ আর ক্লান্তিই না জমেছে শরীরে ও মনে! মাঝে মাঝে মনে হয়, নিরবিচ্ছিন্ন দীর্ঘ একটা ঘুম হয়তো এই অবসাদ আর ক্লান্তি মুছে দেবে, অথচ কতদিন হয়ে গেলো, ঘুম তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেই যাচ্ছে। কিন্তু তারচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছে অন্য জায়গায়। সে এখন প্রায়ই স্বপ্ন-কল্পনা-বাস্তবতাকে আলাদা করতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাতে শোয়ার পর এই সমস্যা হচ্ছে। অনেকদিন সে লেখালেখির কথা ভুলে ছিলো। যে জীবনের মধ্যে সে প্রবেশ করেছে, বলা উচিত- যে জীবনের ফাঁদে সে ধরা পড়েছে, তাতে লেখালেখির কথা ভুলে থাকাই ভালো। কিন্তু ইদানিং কেন যেন মনে হচ্ছে- তার তো লেখক হবারই স্বপ্ন ছিলো, সে চেয়েছিল কেবল লেখক হতে, আর কিছু নয়। তাহলে বরং অন্তত একটা উপন্যাস লিখে যাওয়ার চেষ্টা করা যাক! দীর্ঘ সময় নিয়ে বেশ বড়োসড়ো একটা উপন্যাস! তাতে সময়টা কাটবে, আর কে জানে হয়তো আবার লেখালেখিতে ফিরে আসা হবে। একটু সময় পেলেই সে এসব নিয়ে ভাবতে বসে, তারপর ভাবতে ভাবতে একসময় ঘোর লেগে যায়। সমস্যা হয় তখনই, বুঝতে পারে না সে কী অবস্থায় আছে! ফলে টেবিলে আর বসা হয় না, গুছিয়ে রাখা কাগজের স্তুপে তার কাঙ্ক্ষিত উপন্যাসের একটা শব্দও এখন পর্যন্ত লেখা হয়নি। 
কায়সার একবার আড়মোড়া ভেঙে ঘড়ি দেখে নেয়। তিনটা বিশ। স্ট্রিট লাইটের আলোয় ঘরটা আবছা আলোকিত হয়ে আছে। সে তাই বাতি না জ্বালিয়েই বালিশের নিচ থেকে সিগারেট আর লাইটার নিয়ে উঠে পড়ে। দরজা খুলে বাইরে বেরুলে তার মন খানিকটা ভালো হয়ে যায়। এটা বাড়ির পেছন দিক, তাই স্ট্রিট লাইটের আলো এখানে আসেনি, তার বদলে চাঁদের মোহনীয় আলোয় মাখামাখি হয়ে আছে সবকিছু। এ শহরে জোৎস্নার প্রবেশ নিষেধ, নানারকম যান্ত্রিক আলো তাকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সৈন্য-সামন্তের মতো প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে- তবু একটু ফাঁক-ফোকর পেলেই নিজের রূপলাবণ্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে- দেখতে ভারি ভালো লাগে কায়সারের। এটা ঠিক ব্যালকনি নয়, ছাদও নয়। দোতলা এই বাড়িটা অসম্পূর্ণ। এখানে একটা বড়োসড়ো রুম হতে পারতো। যে-কোনো কারণেই হোক, বাড়িওয়ালা সেটা করেনি বা করতে পারেনি। অবশ্য এই খোলা জায়গাটুকুর জন্যই একটু বেশি ভাড়া সত্ত্বেও কায়সার বাড়িটা পছন্দ করেছিল। একটু খোলা জায়গা মানে তো ক্লান্তিতে হেলান দেয়ার মতো একটু আশ্রয়- অন্তত এই শহরে। তাছাড়া বাড়ির এই অসম্পূর্ণতার সঙ্গে কায়সার নিজের খানিকটা মিলও খুঁজে পায়। সে তো জানেই- জীবনে কিছু কিছু কাজ কখনো সম্পূর্ণ করা যায় না, সে নিজেই তার প্রমাণ। 
খোলা জায়গাটায় গোটা চারেক চেয়ার পাতা। কায়সার একটাতে গিয়ে বসে আরেকটাতে লম্বা করে পা তুলে দেয়। হঠাৎ করে ক্লান্তিটা নেমে আসে শরীরে, আবার। সে অবসন্ন বোধ করে। পশ্চিমে ঝুলে থাকা চাঁদের দিকে নজর পড়ে তার। চাঁদ দেখতে বরাবরই ভালোবাসে কায়সার। দীর্ঘসময় ধরে তাকিয়ে থাকলেও ক্লান্তি আসে না। কিন্তু এই শহরে চাঁদ দেখাটাই একটা ভাগ্যের ব্যাপার। অট্টালিকা ছাড়িয়ে, ঝলমলে বাতির যান্ত্রিক আলো এড়িয়ে এখানে আসতেই বেচারা হিমশিম খাচ্ছে- তাকে নিয়ে কি আর কাব্য করা চলে? এই এখন যেমন, সামনের আটতলা দালানের আড়ালে যাই যাই করছে সে। উঠেও আসে দশ-চৌদ্দ-চবি্বশতলা পেরিয়ে। আর আগে উঠতো বাঁশবাগানের ওপর- বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই ... 
হঠাৎ সন্তর্পণ একটা শব্দে তার ভাবনায় ছেদ পড়ে। ফিরে তাকিয়ে দেখে পাশের রুমের দরজা খুলে নিশি, তার বোন, বেরিয়ে এসেছে। এক মুহূর্ত থমকে- 'কে'- জিজ্ঞেস করেই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে- ও, ভাইয়া তুই! এখনো ঘুমাসনি? 
উঁহু। 
সারাদিন এত খেটেখুটে রাত জাগিস কেন? 
ঘুমটা ভেঙে গেছে। ইচ্ছে করে কি কেউ আর জেগে বসে থাকে? 
একটু চুপ থেকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে নিশি- তোর শরীরটা একদম ভেঙে গেছেরে ভাইয়া। 
কায়সার কিছু বলে না, এ কথার কোনো উত্তরও হয়না, বরং প্রসঙ্গ এড়ানোই ভালো- তুই ঘুমাসনি কেন? 
ঘুম আসছে না। 
কথা ঠিক জমে ওঠে না তাদের মধ্যে। কায়সারের অবশ্য কথা বলতেই ভালো লাগছে না। নিশি এসে তার একা একা বসে থাকাটা পণ্ড করে দিয়েছে বলে একটু বিরক্তই লাগছে। নিশিও এসেছিল একা একা পায়চারি করতে, ভাইকে দেখে থমকে গেছে। তারও কথা বলতে ভালো লাগছে না, কিন্তু এত রাতে এভাবে ভাইয়ের পাশে চুপ করে বসে থাকতেও ভালো লাগছে না, সে তাই আবার মুখ খোলে- অনেকদিন তুই কিছু লিখিস না ভাইয়া! 
কায়সার কিছু বলে না। 
তোকে এখন চেনাই যায় না। 
হুঁ। 
সংসারের দায়িত্ব নিয়ে তুই কেমন বদলে গেছিস, একদম অন্য মানুষ। 
কায়সার ম্লান হাসে। এভাবে আলাপ জমে না। নিশি তাই বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। আর পরে যখন আবার কথা বলতে ইচ্ছে করে, তখন 'ভাইয়া' বলে ডেকে একটা ধমক খেতে হয় তাকে। 
আহ নিশি! চুপ করে থাক তো! 
নিশি একটু চমকায়। ভাইয়া কি বিরক্ত হচ্ছে? কিন্তু ওকে এমন চুপচাপ দেখে কেমন দীনহীনের মতো মনে হচ্ছে, এই দৃশ্য মোটেই ভালো লাগার মতো নয়; সে তাই কথা চালিয়ে যেতে চায়- তাহলে তুই কথা বল! 
না। 
নইলে আমি বলবো। আমার এমন মুখ বেজার করে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না। 
তাহলে চলে যা। ঘুমিয়ে থাক। 
নিশি একটু দমে গিয়ে- 'আচ্ছা ঠিক আছে, চুপ করলাম'- বলে থেমে যায়। কিন্তু তা কিছুক্ষণের জন্য। একধরনের অজানা অস্থিরতায় ভুগছে সে- বোঝা যায়, নইলে একটুক্ষণ পর আবার ডাকবে কেন? 
ভাইয়া। 
নিশি! 
আহা দ্যাখ না, চাঁদটা কি ম্লান লাগছে, না! একদম পচা লাগছে। 
কায়সার মৃদু হাসে। 
উদাসপুরে কি সুন্দর চাঁদ উঠতো, না রে ভাইয়া! 
কায়সার আবারও ম্লান হাসে। উদাসপুরে সুন্দর চাঁদ উঠতো! হয়তো বা! যদিও চাঁদ সব জায়গাতে, সব সময়ই সুন্দর, উদাসপুরে তার আলাদা বা বাড়তি কোনো সৌন্দর্য থাকার কথা নয়। হয়তো উদাসপুরের পরিবেশ-প্রকৃতি তাকে আরো সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতো, ওই দৃশ্যটা স্মৃতিতে সবচেয়ে মোহনীয় হয়ে আছে আমাদের কাছে- কায়সার নিজেকেই বলে। উদাসপুর তো শুধুমাত্র একটা গ্রামের নাম নয় আমাদের কাছে- ওইখানে আমরা জন্মেছি, শৈশব-কৈশোরের একটা বড় অংশ ওখানে কাটিয়েছি। বাবার ছিলো বদলির চাকরি- কিন্তু বদলির সঙ্গে সঙ্গে সংসার বয়ে বেড়ানোর সামর্থ্য তার ছিলো না। ফলে আমাদেরকে থাকতে হতো গ্রামে। উদাসপুর, কী অদ্ভুত একটা নাম! ম্রিয়মান-মৃতপ্রায় ইছামতি, প্রমত্ত পদ্মা আর উদাসীন আকাশের সঙ্গে যার মিতালী ছিলো অদ্ভুত রকমের। বাবা যখন মানিকগঞ্জ বদলি হলো তখন সবাই একসঙ্গে থাকার সুযোগ হয়েছিল। চাকরির শেষ কয়েকটা বছর তার পোস্টিং ছিলো ঢাকায়, তখনো সবাই একসঙ্গে। অবশ্য ওই সময় সবাইকে না এনেও বাবার উপায় ছিলো না। কাজল তখন চাচার বাসায় থেকে কলেজে পড়ছে, কায়সারও স্কুল পাশ করে কলেজে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করছে। বড় ভাই অবশ্য অনেক আগেই গ্রাম ছেড়েছে, কলেজ পেরিয়ে ইউনিভার্সিটিতে ঢুকেছে কতদিন হয়ে গেলো! পড়ছে তো পড়ছেই, পাশ করে আর বেরুচ্ছে না। তখন পাশ করে বেরুতে অনেক সময় লাগতো- সেশন জট নামক একটা অদ্ভুত ব্যাপার ছিলো- মাসের পর মাস ইউনিভার্সিটি বন্ধ থাকতো, নিয়মিত ক্লাস বা পরীক্ষা কোনোটাই হতো না, তবে প্রতিবছর নতুন ছাত্র ঠিকই ভর্তি করা হতো। ফলে নিউ ফার্স্ট ইয়ার-ওল্ড ফার্স্ট ইয়ার, নিউ সেকেন্ড ইয়ার-ওল্ড সেকেন্ড ইয়ার- এইরকম অনেকগুলো ব্যাচ থাকতো। কায়সারেরও এই অভিজ্ঞতা কিছুটা হয়েছে। এখনো হয়তো সেশন জট আছে, তবে অতটা ভয়াবহভাবে নয়। তো, উদাসপুরে তারা ভালোই ছিলো। প্রতি ঋতুতে বদলে যেত উদাসপুরের রূপ। বর্ষার নতুন পানিতে, শীতের কুয়াশামাখা ভোরে, জোৎস্নাপ্লাবিত রাতে তাদের কী অসামান্য সময়ই না কেটেছে! মাঝে মাঝে বাবা অথবা বড় ভাই বাড়িতে এলে আনন্দমুখর সময়গুলোতে যুক্ত হতো নতুন মাত্রা। সেই সব দিন! তাদের সোনার শৈশব-কৈশোর জড়িয়ে আছে উদাসপুরের পথে প্রান্তরে, তার সবকিছু তো ভালো লাগারই কথা! তাছাড়া, জন্মভূমির সবকিছুই তো খুব অন্যরকম- কায়সার ভাবে। আমার গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটা- হোক তা ম্রিয়মান, মৃতপ্রায়- পৃথিবীর যে-কোনো নদীর চেয়ে সুন্দর। আমার গাঁয়ের মানুষগুলো পৃথিবীর সব মানুষের চেয়ে মায়াময়, ভালো। আমার গাঁয়ে যে চাঁদ ওঠে, বাতাস বয়ে যায়, তুমুল বৃষ্টিতে ভেসে যায় পথঘাট, প্রবল ঝড়ে ভেঙে পড়ে বড় বড় অথচ নরম গাছপালা, শীতের কুয়াশামাখা ভোরে খেজুর-রস কাঁধে হেঁটে যায় গাছি, ঘাসের ডগায় একবিন্দু শিশির, শর্ষে ফুলে ফড়িঙের ওড়াউড়ি, গরুগুলোর উদাস তাকিয়ে থাকা, নৌকাগুলোর বিষণ্ন সন্ধ্যায় পৃথিবীর সমস্ত উদাসীনতা মেখে বাড়িতে ফেরা, বউদের পরপুরুষ দেখে ঘোমটা টেনে দেয়া অথচ নদীতে গোসল করার সময় শত পুরুষের দৃষ্টি উপেক্ষা করে ধুয়ে নেয়া শরীরের মোহনীয় সব বাঁক- এসবের একটারও কোনো তুলনা হয় পৃথিবীর অন্য কোনোকিছুর সঙ্গে? হয় না। 

২. 
কোনো এক জোৎস্নাপ্লাবিত বৃষ্টিমুখর শীতের রাতে উদাসপুরের ওই মায়াময় বাড়িতে জন্ম হয়েছিল আমার। মায়ের মুখে সেই জন্ম-বর্ণনা, আহা, কী যে মধুর লাগে শুনতে- 
তোর জন্ম তো শীতের রাতে। বাইরে ফুটফুটে জোৎস্না, এমনকি জোৎস্নার দাপটে কুয়াশাও পালিয়েছে- দারিদ্রপীড়িত সংসারের মধ্যবিত্ত রূপটি ধরে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টায় রত আমার আটপৌরে মায়ের কণ্ঠে যেন কবিতা ঝরে পড়ে- 'ঘরে তখন দুদুর মা (আমার দাই মা) ছাড়া আর কেউ ছিলো না। আঁতুর ঘরে তখন আর কারো থাকার নিয়মও ছিলো না। হঠাৎ, কী কাণ্ড, শুনি, টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ! আমি বললাম, ও দুদুর মা, বাইরের সবকিছু মনে হয় ভিজে গ্যালো, দ্যাখো তো! বুঝিস না, মাটির চুলায় রান্না হতো, খড়ি-লাকড়ি সব বাইরেই রাখা। শীতের দিনে কেউ বৃষ্টির কথা চিন্তা করে ওসব ঘরে তুলে রাখে নাকি! এখন যদি সব ভিজে যায়, কালকে রান্না করতে অসুবিধা হবে। দুদুর মা বাইরে গ্যালো, কিন্তু সবকিছু গুছিয়ে-টুছিয়ে ফেরার আগেই তোর জন্ম হলো। বুঝলি, তোর জন্মের সময় ঘরে আর কেউ ছিলো না। যেন এই কাণ্ডটি ঘটানোর জন্যই শীতের রাতেই অমন খা খা জোৎস্নার মধ্যেও বৃষ্টি এসেছিল। 
কেন মা, শীতের রাতে বুঝি বৃষ্টি হয় না! 
হতে পারে, তবে সাধারণত হয় না। তাছাড়া ওই রাতে বৃষ্টির কোনো লক্ষণই ছিলো না। বললাম না, ফুটফুটে জোৎস্না ছিলো, মেঘের ছিটেফোঁটাও ছিলো না। আবার দ্যাখ, হঠাৎ যেমন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এসেছিল, তেমনি হঠাৎ করেই চলে গ্যালো। ওই কয়েক মিনিটের জন্য। 
মায়ের মুখে এই বর্ণনা কতবার যে শুনেছি তার হিসেব নেই। তবু বারবার শুনতে ইচ্ছে করে। মায়ের মুখে শোনা জন্ম-মুহূর্তের বর্ণনাই বোধহয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম কবিতা! 
উদাসপুরের কথা মনে পড়লে কায়সার এইরকম মগ্ন হয়ে থাকে। এই যে নিজের সবকিছুকে এমন ইউনিক মনে হওয়া- কায়সার জানে, এর নামই সম্পর্ক। সে লিখতে চায় এসব কথাই। কিন্তু কীভাবে শুরু করবে, কীভাবে শুরু করলে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে সেটা সবার কাছে? 

জীবনের অন্য নাম সম্পর্ক। কিংবা সম্পর্ক মানেই জীবন- বলা যায় এভাবেও। নানা ধরনের সম্পর্কের ভেতর দিয়ে জীবন কাটায় মানুষ। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক, আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী-সহমর্মী এবং এই ধরনের আরো অনেক মানবিক সম্পর্ক প্রায় নিয়তি-নির্ধারিত ভূমিকা পালন করে মানুষের জীবনে। শুধু কি তাই? সম্পর্ক স্থাপিত হয় জড় জগতের সঙ্গেও। যে প্রিয় কলমটি দিয়ে আমি লিখি তার সঙ্গেও কি একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি আমার? নইলে ওটা ছাড়া লিখতে আমি অস্বস্তি বোধ করি কেন? খাবার টেবিলে সবসময় কেন একটি নির্দিষ্ট চেয়ারেই বসি, অন্য সব চেয়ার খালি থাকলেও! এমন তো নয় যে, ওই চেয়ারটিই আমার জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছে কেউ! যে কাপটিতে আমি চা খাই, যে গ্লাসটিতে পানি, যে প্লেটে ভাত, ঘুমানোর সময় যে বালিশটি মাথায় দিই, যে ঘড়িটি হাতে পড়ি, যে দোকান থেকে সিগারেট কিনি- এসবকিছুর সঙ্গেই একটি সম্পর্ক দাঁড়িয়ে গেছে আমার। নাকি বলবো যে, এগুলোর সঙ্গে আমার এক ধরনের অভ্যস্ততা তৈরি হয়ে গেছে? আর সেজন্যই এর যে-কোনো কিছুর অনুপস্থিতি বা ব্যতিক্রম আমার মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করে! সম্পর্কের অন্য নাম কি তবে অভ্যাস? জীবন মানে সম্পর্ক আর সম্পর্ক মানে অভ্যাস! জীবন কি তাহলে নানারকম অভ্যাসেরই চর্চা? তা যদি হয়ও, তবু তার পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ থাকে। 
অফিসে আমার টেবিলের কাঁচটি ভাঙা। দীর্ঘদিন ধরেই ভাঙা। আমি বদলাই না। বললেই হয়ে যায়, ঐ সুসজ্জিত অফিসে ওই ভাঙা কাঁচটি বেশ বেমানান এবং দৃষ্টিকটুও বটে। তবু আমি সেটা বদলাই না কেন? বদলাই না, কারণ ঐ গর্জিয়াস প্রতিষ্ঠানে ভাঙা কাঁচটি যেমন বেমানান, ম্লান, মিসফিট- আমিও তেমনই ওখানে বেমানান, ম্লান, মিসফিট। যেন উভয়ে মিলে প্রতিষ্ঠানটির আভিজাত্যকে মুখ ব্যাদান করে উপহাস করে যাচ্ছি। 
ভাঙা কাঁচটির সঙ্গে নিজের মিল খুঁজে পাই আমি, ওটার জন্য মায়া জন্মে গেছে আমার- ওটাকে তাই বদলাতে পারি না। 
একবার খুব পুরনো একটা গ্লাস ভেঙে যাওয়ায় মাকে রীতিমতো কাঁদতে দেখেছিলাম আমি। ওই গ্লাসের দাম এমন কিছু বেশি ছিলো না, আর মা নিশ্চয়ই দামের কথা ভেবে কাঁদেওনি। নিশ্চয়ই ওটার সঙ্গে মায়ের অনেক স্মৃতি ছিলো। আর এই স্মৃতিই তৈরি করেছিল সম্পর্ক। 
বস্তুজগতের সঙ্গে এভাবেই হয়তো সম্পর্ক তৈরি হয় মানুষের। 

এভাবে কি শুরু করা যায়? নাহ। বিশ্রী লাগছে। প্রবন্ধ-প্রবন্ধ ভাব এসে গেছে। পছন্দ না হলেও কায়সার কাগজটাকে ফেললো না, যত্ন করে তুলে রেখে দিলো। অন্তত এতদিন পর গুছিয়ে কিছু একটা ভাবা তো হলো! 
লেখার কথা ভাবতে ভাবতে একদম মগ্ন হয়ে ছিলো কায়সার। হঠাৎ নিচু গুনগুন শব্দে সে কান পেতে শোনে নিশির কণ্ঠ- 

পুকুর ধারে নেবুর তলে 
থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে 
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না একলা জেগে রই 
মাগো, আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই? 

নিশির বিষণ্ন সুরেলা কণ্ঠ একটা নিরবিচ্ছিন্ন বেদনার সুর ছড়িয়ে দিচ্ছে চারপাশে। কায়সার তাকিয়ে দেখলো- নিশি কাঁদছে। একবার হাত বাড়িয়ে ওকে একটু আদর করে দেবার কথা ভাবলেও কায়সার চুপচাপই বসে থাকে। কাঁদছে কাঁদুক। বুকের ভারটা নেমে যাবে। ওদিকে নিশি যেন ঘোরগ্রস্থ- 

খাবার খেতে আসি যখন 
দিদি বলে ডাকি তখন 
ও ঘর থেকে কেন মা আর দিদি আসে নাকো 
আমি ডাকি তুমি কেন চুপটি করে থাকো 

এতক্ষণে কায়সারেরও মন খারাপ হয়ে যায়। নিঃশব্দে নিশির মাথায় হাত রাখে সে- কিছু বলে না। কি বলবে? কাজল তাদেরকে রেখে চলে গেছে চিরদিন কাঁদবার জন্য, কোনোদিন জানবে না- ওর ভাইবোনরা গভীর নিস্তব্ধ রাতে ওর কথা মনে করে নিঃশব্দে কাঁদে। জানবে না কেউ-ই। এ তাদের একান্ত নিজস্ব কান্না, কে এসবের খবর রাখে? 

৩. 
প্রতিদিন সকালে তাড়াহুড়া লাগে কায়সারের। এ তার সারা জীবনের সমস্যা। স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় সকালে কোনো ক্লাস থাকলে সেটাতে ঠিক সময়ে হাজির হতে রীতিমতো কষ্ট হতো তার। রাত জাগা তার অনেকদিনের অভ্যাস, শুতে দেরি হতো বলেই সকালে ঘুমিয়ে সেটা পুষিয়ে নিতো। আর এখন তো রাতে ঘুমই হয় না। সকালে তাই উঠতে দেরি হয়ে যায়, আর উঠেই ঝড়ের বেগে তৈরি হওয়া। এই সময়টা কাটেও খুব দ্রুত। তাড়ার সময় তো! সেভ করা, গোসল করা, নাস্তা করে সময় মতো অফিসে যাওয়া, কী যে কষ্টকর! এমনকি নাস্তাটা খাওয়ার সময় পর্যন্ত হয় না। ছোটবেলা থেকে কেউ না কেউ তাকে সকালে নাস্তাটা খাইয়ে দেয়। মা, কাজল, আর এখন ভাবী। 
আজ সকালে অবশ্য অতটা তাড়াহুড়া করতে হলো না কায়সারের। রাতে আর ঘুমানো হয়নি। ভোর পর্যন্ত কীভাবে সময় কেটে গেছে জানে না সে। তারপর গোসল সেরে খবরের কাগজ নিয়ে বসেছে। নাস্তা তৈরি হয়নি এখনো। কিছু ভাবতে ইচ্ছে করছে না, চোখ জ্বালা করছে, ঘুম ঘুম লাগছে। ঘুম তাড়াতেই হয়তো কায়সার হাঁক দেয়- 
নাস্তা হলো ভাবী! 
দিচ্ছি। 
নাস্তা করে রুটিন দায়িত্ব পালনের জন্য বাবার ঘরে এলো সে। দীর্ঘদিন ধরে বাবা শয্যাশায়ী, দেখলে কষ্ট হয়, দীর্ঘক্ষণের জন্য মন খারাপ হয়ে যায়, অফিসে বেশ কিছুক্ষণ কাজে মন বসাতে সমস্যা হয়। তবু শুধু একবার নয়, প্রতিদিন কয়েকবার করে এ ঘরে আসতে হয়, নইলে বাবা অস্থির হয়ে পড়ে। প্রতিদিনের মতো অনেকটা অভ্যাসবশত তার কপালে হাত রাখে কায়সার। কী শীতল! আর কী শীর্ণ হয়ে গেছে বাবা! যেন সিংহ পরিণত হয়েছে বিড়ালে। একসময় বাবা ছিলো সিংহের মতো- অন্তত বাড়িতে। তর্জন-গর্জন ছিলো, একইসঙ্গে ছিলো বুকভরা গভীর ভালোবাসা। নিজের সন্তানদের আগলে রাখতে চাইতো এসব কিছু দিয়েই; যেন হুংকার দিয়ে সমস্ত অশুভ শক্তিকে দূরে সরিয়ে রাখবে! শেষ পর্যন্ত অবশ্য তা পারেনি বাবা; প্রথম এবং শেষ ব্যর্থতাই তাকে চিরকালের মতো পঙ্গু করে দিয়েছে। 
কাজলকে বাবা রক্ষা করতে পারেনি। 
বাবার চেষ্টার হয়তো ত্রুটি ছিলো না। কিন্তু ত্রুটিহীন চেষ্টাও তো সবসময় যথেষ্ট নয়, আরো কিছুর প্রয়োজন পড়ে। সেই আরো কিছুটা যে কী, বাবা তা বুঝতে পারেনি। এ জন্য তাকে দোষ দেয়া যায় না। হয়তো সফল হতো না, একধরনের দূরত্ব থেকেই যেত, তবু সন্তানদের মন জয় করার জন্য বাবা কতকিছুই না করতো! তাদের বন্ধু ছিলো মা-ই। যাবতীয় আব্দার-আহ্লাদ-দুষ্টুমি সবই ছিলো মা'র সঙ্গে। সবসময় তার ছিলো বিরক্তির ভাব। যেন ছেলেমেয়েদের এইসব আব্দার মেটাতে গিয়ে তার জীবনটাই বরবাদ হয়ে গেলো। অথচ যে-কোনো দাবি, হোক তা তুচ্ছ বা অযৌক্তিক- সাধ্যের মধ্যে থাকলে মা তা পূরণ করতোই। আর দ্যাখো, সেই মা এখন কী অসম্ভব চুপচাপ আর অসহায়! সংসারের সবকিছু এখন পর্যন্ত মায়ের কাছেই, তবু যেন নিয়ন্ত্রণহীন, যেন মা'র কোনো অংশই নেই এখানে- স্রেফ বাধ্য হয়ে টেনে নিতে হচ্ছে এই সংসার। কায়সার বেতনের সিংহভাগ মা'র হাতে তুলে দেয় মাসের শুরুতেই। সেই পরিমাণ যে খুব কম তা-ও নয়, অন্তত মাকে আগের মতো টেনেটুনে সংসার চালাতে হয় না, ইচ্ছে করলে বাড়তি কিছু খরচও করতে পারে, কেউ কিছু চাইলে দিতে পারে। অথচ মা এগুলোর কিছুই করে না, যেন সবকিছুই শেষ হয়ে গেছে তার। কায়সার এখনো মাঝে মাঝে মাকে ব্যতিব্যস্ত রাখতে চায়- এ দাবি, ও আব্দার ইত্যাদি; কিন্তু মা'র সেই দুর্দান্ত পারফরমেন্স কোথায়? তার এখন কেবলই ম্লান হাসি- 'এসবকিছু তো তোদেরই, আমার কাছে চাচ্ছিস কেন?' - সবই আমাদের? কিছুই তোমার নয়, মা? এগুলো যদি তোমার না হয়, তবে কবে কোন জিনিসটি তোমার ছিলো? নাকি কোনোদিনই তোমার কিছু ছিলো না? আগে ছিলে বাবার সংসারের বিশ্বস্ত রক্ষক, এখন আমাদের! কায়সার দুঃখিত বোধ করে, কষ্ট পায়। সংসারের প্রাণবন্ত রূপটি ফিরিয়ে আনতে সে প্রাণান্ত চেষ্টা করে, কিন্তু কাজল বোধহয় চিরদিনের জন্য একটা সুতো ছিঁড়ে দিয়ে গেছে। সেই সুতো আর কোনোদিন জোড়া লাগবে না। কাজল, তোর চলে যাওয়া কী ভয়ংকর ভাঙচুর ঘটিয়ে দিয়ে গেছে, তুই যদি জানতি! 
প্রতিদিন-প্রতিনিয়ত বাবার এই অস্থিরতা-স্থবিরতা, মার ক্লান্তি-বিষণ্নতা দেখতে ভালো লাগে না, তবু রুটিনমাফিক কায়সার এ ঘরে আসে। বিছানায় শোয়া মানুষটির সঙ্গে বাবাকে মেলানোই যায় না। সে গিয়ে পাশে বসে, মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করে- 'তোমার জন্য কিছু আনবো বাবা? কিছু খেতে ইচ্ছে করে?' - বলতে বলতে পাল্টা একটা দৃশ্য ভেসে ওঠে তার চোখে। কৈশোরে সে শুয়ে আছে জ্বরঘোরে, বাবা এসে মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করছে- 'তোমার জন্য কি আনবো বাপকু সোনা? কি খেতে ইচ্ছে করে?'- কি হয় অমন একটা দৃশ্য আরেকবার ফিরে এলে? ফিরবে না। সময় বড়ো নিষ্ঠুর- যে দৃশ্য সে সঙ্গে করে নিয়ে যায় তা আর ফিরিয়ে দেয় না কোনোদিন। 
বাবার শরীরের একটা অংশ প্যারালাইজড। কায়সারের কথা শুনে কিছু বললো না, শুধু চোখ ভরে উঠলো জলে, কয়েকফোঁটা গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে। গভীর মমতায় কায়সার বাবার চোখ মুছিয়ে দিতে থাকে, কিছু বলতে ইচ্ছে করে বাবাকে- কিন্তু টের পায় তার গলার কাছে দলা পাঁকানো কান্না- সে তাই কিছু বলার রিস্ক নেয় না। আর কী-ই বা বলবে সে? কি সান্ত্বনা দেবে? বলবে যে, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে? আসলে কি ঠিক হয় কিছু, কোনোদিন? 
প্রতিদিন বাইরে বেরুবার সময় মা দরজায় এসে দাঁড়ায়, প্রায় অভ্যাসবশতই। আগে অবশ্য বেরুতে দিতে চাইতো না, বলতো- 'কী যে শুধু রোদের মধ্যে টই টই করে ঘুরে বেড়াস, ঘরে থাকতে পারিস না!' আর সে এইসব কথাকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে বেরিয়ে গেলে পেছন থেকে মা- 'তাড়াতাড়ি ফিরিস খোকা, তোর এইসব পাগলামী আর সহ্য হয় না'- বলে বিরক্তি প্রকাশ করার চেষ্টা করতো। তবে ব্যাপারটাকে কোনোদিন বিরক্তি বলে মনে হয়নি কায়সারের, নাম ধরে না ডেকে ওই 'খোকা' সম্বোধনটাই তাকে বুঝিয়ে দিতো- তার 'এইসব পাগলামী'তে মা'র সূক্ষ প্রশ্রয় আছে! 
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে পেছন ফিরে তাকালে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মাকে এক দুঃখের ভাস্কর্য বলে মনে হয় কায়সারের, যার উদাস চোখে রাজ্যের ক্লান্তি আর বেদনার ছায়া দেখে আরেক প্রস্থ মন খারাপ হয়ে যায় তার।

৪. 
খুব নরম মনের ছিলাম আমি, ছোটবেলায়। অল্পতেই কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিতাম। সেই 'অল্প' কিন্তু কোনো আব্দার বা আহ্লাদ নিয়ে নয়। হয়তো একটা ফড়িঙের জন্যই কাঁদতাম, কিংবা একটা প্রজাপতির জন্য। বিকেলে মাঠে খেলতে গেলে সমবয়সীরা খেলার অংশ হিসেবেই ফড়িঙ ধরতো, দুই নরম পাখা ধরে নিজেই দৌড়ে যেত বহুদূর ভোঁভোঁ শব্দ মুখে তুলে, বলতো- প্লেন চালাই! ফড়িঙের দিকে তখন নজর থাকতো না তাদের, আকৃতিটা উড়োজাহাজের মতো হওয়াটাই ছিলো তার অপরাধ, বালকদের হাতে ধরা পড়ে তাদের খেলার সঙ্গী হতে গিয়ে জীবন সাঙ্গ হতো তার। কোনো কোনো নিষ্ঠুর ছেলে হয়তো তার পাখা দুটো ছিঁড়ে দিতো, আহত ফড়িঙটা পাখা হারিয়ে নিশ্চল-নিশ্চুপ পড়ে থাকতো, হয়তো মাড়িয়েই চলে যেত সবাই, আর আমার মন খারাপ হয়ে যেত। সবাই চলে যাওয়ার পর ঘনায়মান সন্ধ্যায় আমি ওদের শুশ্রূষা করতে বসতাম। লাভ হতোনা কিছুই। পাখা হারিয়ে কি ফড়িঙ বাঁচে? একসময় মন খারাপ করে বাড়ি ফিরতাম, আর রাতে গোপনে গোপনে কেঁদে বুক ভাসাতাম। কিন্তু গোপনে কাঁদবার কী উপায় আছে? মা'র কাছে ধরা পড়তেই হতো। মা'র নরম কণ্ঠে জিজ্ঞাসাবাদের জবাবে কান্না বাড়তো বৈ কমতো না। আর আমার কান্নার কারণ শুনে মা যে কী গভীর মমতায় আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরতো! এখনো সেই কোমল-মমতাময়-উষ্ণ স্পর্শ গায়ে লেগে আছে। 
এখন আমার মনে হয়- 'দুরন্ত শিশুর হাতে ফড়িঙের ঘন শিহরণ মরণের সাথে লড়িয়াছে'- এই পঙক্তির অর্থ আমি বুঝতেই পারতাম না যদি ওই অভিজ্ঞতাগুলো আমার ঝুলিতে জমা না পড়তো! ফড়িঙের ওই ঘন শিহরণ কী মায়াময়, কী মন খারাপ করা! জীবনানন্দ ছাড়া আর কেই-বা এভাবে দেখতে পেরেছিলেন! 
তো, এইসব 'তুচ্ছ' ঘটনাকে মা কখনোই তুচ্ছ করে দেখতো না, বরং আমার স্পর্শকাতরতাকে লালন করতো গভীর মমতায়। 
একদিনের কথা খুব মনে পড়ে। সব খেলার সাথীদের মতোই আমারও একটা গুলতি ছিলো; আমরা অবশ্য 'গুলতি' বলতাম না, বলতাম 'কেটি'। থাকলে কী হবে, পাখি মারার মতো মন ছিলো না আমার! খেলার সাথীদের আছে, তাই আমারও আছে- এইরকম আর কী! কোনোদিন কোনো পাখির দিকে নিরিখ করে একটা গুলিও ছুঁড়তে পারিনি; হাত কাঁপতো, বুক কাঁপতো, মনে হতো- যদি সত্যিই লেগে যায়, যদি ব্যথা পায়, যদি ব্যথা পেয়ে মরে যায়! মারি আর না মারি, সঙ্গীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে না! তাই গুলতি আছে, প্রতিদিন সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে 'পাখি শিকারের অভিযানে' বেরুনোও আছে। কিন্তু সমস্যা হলো- গুলতি থাকলেও গুলি ছিলো না। আমরা পদ্মার পাড় থেকে এঁটেল মাটি এনে মার্বেল বানাতাম, তারপর মাটির চুলার মধ্যে রেখে দিতাম। সারারাত পুড়ে মার্বেলগুলো লাল আর শক্ত হয়ে উঠতো। সেটাই ছিলো আমাদের গুলতির গুলি। প্রতিদিন সকালে উঠেই চুলার থেকে সেই গুলি সংগ্রহ করাই ছিলো প্রথম কাজ। একদিন সেটা সংগ্রহ করার আগেই কাজের মেয়েটা চুলার ছাই পরিষ্কার করতে গিয়ে আমার মার্বেলগুলোও ফেলে দিয়ে আসে। আমি খুঁজতে গিয়ে দেখি চুলায় ছাই-ও নেই, গুলিও নেই। আমার কান্নাকাটি শুনে মা এগিয়ে এলো, ভাইবোনেরা এলো। শুনে সবাই তো হেসেই অস্থির। মাটির মার্বেলের জন্য কেউ এভাবে কাঁদে! কিন্তু মা ব্যাপারটাকে এত ছোট করে দেখলো না। কাজের মেয়েটাতো বটেই, ভাইবোনেরাও বেদম বকা খেলো; বললো- 'তোমরা যা নিয়ে হাসছো, ওর কাছে ওগুলো ছোট নয়, ওর কাছে ওইটাই পৃথিবী।' ইত্যাদি। 
হঁ্যা, মা বুঝতো ওটাই আমার কাছে পৃথিবী। শিশুদের পৃথিবী নিজস্ব, আলাদা। তুচ্ছ বলে কোনো জিনিস নেই সেখানে। বড়রা সেটা বুঝতে পারে না। মা পারতো। শিশুদের মতো একটা মন ছিলো মা'র। 
আমার ছোটবেলা ছিলো পাখিময়। টুনটুনি, চড়ুই, শালিখ, কবুতর, ঘুঘুর বসবাস ছিলো বাড়িতে। নারকেল গাছে কাঠ ঠোকরা আর টিয়ে বাসা বেঁধেছিল। বাবুইয়ের বাসা ঝুলতো তালগাছের ডগায়! দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাবুইয়ের ওই কারুকার্যময় বাসা বোনার কাণ্ড দেখতাম। বাড়িতে বিরাট একটা শিমুল গাছ ছিলো, ছোটবেলায় সেটাকে মনে হতো আকাশের সমান উঁচু, সেখানে বাসা বেঁধেছিল চিল, মাঝে মাঝেই হানা দিয়ে ছোঁ মেরে মুরগির বাচ্চা ধরে নিয়ে যেত। শকুনের দেখা মিলতো গরু মরে গেলে। রাত দুপুরে প্রহরজাগা পাখি ডাকতো। ওই পাখির নাম কখনো জানা হয়নি, গ্রামের মানুষ বলতো 'কোড়াল'। আসল নাম যে কী, কে জানে! ডাকটা ছিলো করুণ আর প্রলম্বিত, শুনলে ভারি মন খারাপ হয়ে যেত! মাকে কতবার জিজ্ঞেস করেছি ওই পাখির কথা। মা বলতো, রাতের তিন প্রহরে তিনবার ডেকে ওঠে ওই পাখি, তাই ওর নাম প্রহরজাগা পাখি। গাছের ডালে ঠিক মাঝরাতে ডেকে উঠতো পঁ্যাচা। ওই গুরুগম্ভীর ডাক শুনে অজানা কারণে ভয়ে গা হিম হয়ে যেত। তেমনই এক ভয় ধরানো পাখি ছিলো 'কুক পাখি'। এই পাখিটারও নাম জানা হয়নি কোনোদিন। সবাই বলতো- কুক পাখি অমঙ্গল বয়ে আনে! প্রায় সারারাত ধরে পাখিটা কোন অন্ধকারে বসে যে ডেকে চলতো! ডাকের ধরনটা ছিলো এইরকম : কুক... (বিরতি)... কুক... (বিরতি)...কুউক...(দীর্ঘ বিরতি)...কুক কুক কুক...। কোনোদিন দেখা হয়নি পাখিটাকে। আরেকটা পাখিও ছিলো অমঙ্গলের চিহ্নবাহী। মাটিতে ঠোঁট ডুবিয়ে বিচিত্র ঘররর ঘররর শব্দে ডাকতো ওটা। সবাই বলতো- এই পাখিটা সবসময়, সব জায়গায় ডাকে না; যে বাড়িতে মৃতু্য আসন্ন, সেই বাড়িতে ডাকে। মাটিতে মুখ ডুবিয়ে ডাকার মানে হলো- সময় হয়ে এসেছে, কবর খোঁড়ো। আমি জীবনে একবারই ওই পাখির ডাক শুনেছি। বাড়িতে সেদিন বাড়তি সতর্কতা। এবং কী আশ্চর্য, দুদিন পরই দাদু মারা গেলেন! পঁ্যাচা, কোড়াল, কুক, আর মাটিতে মুখ ডুবিয়ে ডাকা পাখি- এর সবগুলোই ছিলো রাতে ডাকা পাখি। পঁ্যাচা ছাড়া আর কোনোটাকে কোনোদিন দেখাই হয়নি। টুনটুনি, চড়ুই, শালিখ, কবুতর, ঘুঘু, বাবুই, টিয়ে, কাঠ-ঠোকরার মতো আনন্দময় পাখি যেমন ছিলো, তেমনই ছিলো ওই সব ভয় ধরানো রোমাঞ্চকর পাখি। 
নানা ধরনের ছোটখাটো জিনিসের প্রতি আমার আগ্রহ ছিলো মাত্রাতিরিক্ত। প্রজাপতির রঙ দেখে মুগ্ধ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যেতাম। টুনটুনি পাখি বরাবরই ভীষণ মন কাড়তো আমার। এই এতটুকুন পাখি, অথচ কী প্রাণবন্ত! সদা চঞ্চল, সর্বদা চলমান; কোথাও দুদণ্ড বসবার ফুরসত নেই। যদিও বা এক দণ্ড বসে, তখনো ব্যস্ততার শেষ নেই। চড়ুইও কাছাকাছি ধরনের চঞ্চল। মনে পড়ে- একবার ভাইয়া একটা চড়ুই ধরে দিয়েছিল। গভীর মমতায় আমি সেই চড়ুই বুকের মধ্যে চেপে ধরে সারা বিকেল আর সন্ধ্যা ঘুরে বেড়ালাম। রাতে খাবারটাও নিজ হাতে খেলাম না। মা বারবার বলতে লাগলো- ওটাকে ছেড়ে দে, মরে যাবে তো! এত আদর করে ধরে রেখেছি, মরে যাবে কেন, বুঝতে না পেরে মা'র কথা শোনা হলো না। কখন যে চড়ুইটাকে বুকে চেপেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, মনে নেই। ঘুম ভেঙে দেখি, হাতের মধ্যে চড়ুইটা মরে পড়ে আছে। সেই স্মৃতি এখনো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ঘটনাটি আমাকে এক ধাক্কায় অনেকখানি বড় করে তুলেছিল। সারা জীবন ধরে মনে হয়েছে- অতি কাঙ্ক্ষিত, অতি ভালোবাসার কোনো জিনিসকে এত গভীরভাবে চেপে ধরতে নেই। ধরলে, মরে যায়! 

৫. 
অফিসে আজকে আর কাজে মন বসছে না। 
সকালের দিকে আবিদ এসেছিল অফিসে, খুব তাড়া তার, এর মধ্যেই। বললো- তোর সঙ্গে আমার জরুরী কথা আছে। খুব জরুরী। আজকে তোর সময় হবে? 
কখন? 
সন্ধ্যায়। 
হঁ্যা হবে। 
তাহলে শাহবাগে চলে আসিস। 
কি এমন জরুরী কথা রে? 
এখন বলবো না। সন্ধ্যায় আয়, কথা হবে। 
অন্তত একটা ইঙ্গিত তো দিবি! 
না, তা-ও না। 
সারাদিন অস্বস্তিতে কাটবে। 
ইঙ্গিত দিলে সেটা আরো বাড়বে। 
আচ্ছা থাক তাহলে। 
তাহলে সন্ধ্যায়, আটটার মধ্যে। 
কিন্তু সন্ধ্যা হতে অনেক দেরি। কায়সার আজকে কিছুতেই কাজে মন বসাতে পারছে না। থেকে থেকে একটা বিষণ্ন হাওয়া যেন তার দৈনন্দিন কাগজপত্র এলোমেলো করে দিচ্ছে। 'উদাসী হাওয়ায় ভেসে ভেসে যায় আমার সারাটি দিন'- এরকম একটা ব্যর্থ কবিতার পংক্তি তার মাথায় উঁকি দিয়ে যাচ্ছে বারবার। তার বড়ো সাধ ছিলো কবি হওয়ার। পারেনি। কবিতা লেখার টেকনিকটা সে ধরতেই পারলো না। মাঝে মাঝে দু-একটা পংক্তি হয়তো বিদু্যৎ চমকের মতো এসে পড়তো, কিন্তু পুরো একটা কবিতা সে দাঁড় করাতে পারেনি কোনোদিন। অনেক চেষ্টা করেও একটা কবিতাও না লিখতে পেরে সে এই সিদ্ধান্তে পেঁৗছেছিল যে, কবিতা ব্যাপারটা প্রকৃতি প্রদত্ত, চাইলেই যে কেউ সেটা লিখতে পারবে না। প্রকাশ্যে অবশ্য সে তা স্বীকার করতো না। কাজল যখন বলতো- 'আর যাই হোক তোকে দিয়ে কোনোদিন কবিতা হবে না, এই সত্য তুই কেন উপলব্ধি করতে পারিস না?' - তখন সে খেপে যাওয়ার ভান করে বলতো- হবে না তো তোর জন্যই রে কাজলা, তোর যন্ত্রণায় আমার জীবনটাই ঝরঝরে হয়ে গ্যালো, আর কবিতা! 
দ্যাখ, আমাকে কাজলা বলবি না। আমি কি তোর কাজলা দিদি? মেরে ফেলতে চাস আমাকে? যেন মজা করে পড়তে পারিস- বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই, মাগো আমার শোলক বলার কাজলা দিদি কই! 
আহ কাজল! তোকে কেন ভুলে থাকা যাচ্ছে না! 
তার অস্থির লাগে। শরীরটাও ভালো লাগছে না। ঘুম হয়নি বলে মাথার ভেতরে একটা দীর্ঘস্থায়ী ঝিমঝিমে ভাব। চোখ জ্বালা করছে। কোনোকিছুতেই একনাগাড়ে অনেকক্ষণ মন বসানো যাচ্ছে না বলে পিওন ডেকে এক কাপ চা চায় কায়সার; তারপর আবার এলোমেলো ভাবনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। 

টুংটাং কাপের শব্দের পাশে লোকটা শুনশান একা চুকচুক চা খায় 
তার নত চোখে এখন শুধু ভ্রান্তির অসীম রেখা 
অথচ তারও একদিন ছিলো প্রহর কাটানো গল্প আর স্বপ্ন 
স্বপ্নের গায়ে স্বপ্ন জুড়ে গড়েছিল নিজস্ব আকাশ 
আর সে ভেসে বেড়াতো ইচ্ছের সবুজাভ ডানা দিয়ে 
আজ তার বিষণ্ন ঠোঁট ছুঁয়ে যায় একটা উড্ডীয়মান মাছি 
লোকটার একান্ত সঙ্গী বটে সে 
চুকচুক চা খাওয়া শেষ হলে পয়সা মিটায়ে হাঁটতে চায় 
কিন্তু কোথায় যাবে সে 
চারিদিকে ব্যারিকেড- শেষ সীমারেখা। 

কায়সার হঠাৎ করেই যেন কবিতাটিকে চলচ্চিত্রের মতো করে চিত্রায়িত হতে দেখে চোখের সামনে। তার বন্ধু কবীর লিখেছিল। আজ এতদিন পর কবিতাটার সঙ্গে নিজের জীবনের এক অদ্ভুত সাদৃশ্য খুঁজে পায় কায়সার। কোথাও কি কোনো ভুল হয়ে গেছে? নইলে কেন তার জীবনের চারপাশে ব্যারিকেড, শেষ সীমারেখা? কবীর এ কার কথা লিখেছিল? ও কি ভবিষ্যৎ দেখতে পেতো? কবিরা কি ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হয়? ও কি জানতো, ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধুটির শেষ পর্যন্ত এই পরিণতি হবে? জানতো না। জানার কথা নয়। কবীর যখন তুমুল লিখছে তখন জীবনটাতো খুব অন্যরকম ছিলো। তাদের দুজনের কাছেই তখন সবকিছুর চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল ওই লেখা। এমন কিছু ছাইভস্ম হতো না সেগুলো- সে তো বলাই বাহুল্য, কিন্তু মনে হতো- বাংলা সাহিত্যের সেরা লেখাটি এই মাত্র তাদের হাত দিয়েই রচিত হলো! এখন মনে পড়লে হাসি পায়। কী ছেলেমানুষী কার্যকলাপ ছিলো সেগুলো! কবীর অবশ্য সত্যিই খুব ভালো লিখতো। নিজের সম্বন্ধে কায়সারের সবসময় সংশয় থাকলেও কবীরের ব্যাপারে তা ছিলো না। ও যে খুব ভালো লিখছে এবং লিখবে এ ব্যাপারে তার কোনো সন্দেহই ছিলো না। তাদের এই বন্ধুত্ব এতই নিবিড় ছিলো যে, অনেকদিন পর্যন্ত সমকালের অন্যান্য লেখক বন্ধুদের সঙ্গে একটা নূ্যনতম সম্পর্কও গড়ে তোলার প্রয়োজন বোধ করেনি তারা। ফলে কবীর যখন দেশ ছেড়ে চলে যায়- ততদিনে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়েছে, অন্যান্য বন্ধুরা নানারকম কাজে জড়িয়ে পরস্পরের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে- কায়সার ভীষণ একা হয়ে পড়ে। অনেকটা বাধ্য হয়েই সে শাহবাগে যাওয়া-আসা শুরু করে- এখানেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা তরুণ লেখকরা আড্ডা জমায়- দু-চারজন করে বন্ধুও জুটে যায় তার, আর আবার নতুন করে তুমুল এক অস্থির জীবনে জড়িয়ে পড়ে। কবীরের অভাবটা সে সবসময়ই অনুভব করেছে- কবীর তার অনেকখানিই নিয়ে গেছে, কিন্তু কারো জন্যই জীবন থেমে থাকেনা এই সত্য জেনে ও মেনে সে নতুন জীবনে নিজেকে মানিয়ে নিতে চেয়েছে। এই সময়েই সে কয়েকটা চমৎকার গল্প লিখে ফেলে- যেমন সব গল্পকারই জীবনের কোনো-না-কোনো সময়ে ভালো কিছু লিখে ফেলে, এবং সেটা বয়সের ওপর নির্ভর করে না, আসলে যে কিসের ওপর নির্ভর করে তা কেউ বলতেও পারে না- সেগুলো প্রকাশের পর তরুণদের মধ্যে বেশ একটা হৈ চৈ পড়ে, নিজস্ব পরিমণ্ডলে সে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যায়। সেই হৈ চৈ সম্ভবত, কানে তুলো দিয়ে থাকা অগ্রজ লেখকদের রুদ্ধ কান পর্যন্তও পেঁৗছে যায়! তার প্রমাণ পাওয়া যায়, যখন দুজন অগ্রজ লেখক এক জাঁদরেল দৈনিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সম্ভাবনাময় তরুণ লেখকদের কথা বলতে গিয়ে তার কথা উল্লেখ করেন, আরেকজন অগ্রজ লেখক এক টিভি প্রোগ্রামে বাংলা গল্প কিভাবে পাশ ফিরছে সে কথা বলতে গিয়ে যখন তার গল্পের উদাহরণ টেনে আনেন, আর আরেকজন অগ্রজ লেখক তার গল্পের নাট্যরূপ দিয়ে টিভিতে প্রচার করেন। সে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যায়, গত একদশকের মিডিয়াকেন্দ্রিক সাহিত্য-প্রবণতার সুফলটুকু সে পুরোমাত্রায় ঘরে তোলে আর বন্ধুদের কাছে হয়ে ওঠে ঈর্ষার পাত্র। 
কিন্তু তারপর? 
এই দীর্ঘ বিরতিতে ওসব স্মৃতিতে মরচে পড়ে গেছে। কে আর তার মতো সামান্য, তুচ্ছ লেখককে মনে রেখেছে? কে তাকে চিনে রেখেছে? একটা ভালো গল্প লেখার জন্য একদা এক তরুণ তার সর্বস্ব উজার করে দিতে প্রস্তুত ছিলো, এই খবর কে-ই বা মনে রেখেছে? এ এমন এক জগৎ, যতদিন তুমি সচল আছো ততদিন তোমাকে সবাই মনে রাখবে, নইলে ভুলে যাবে, তোমার জায়গা দখল করে নেবে অন্য কেউ, কারণ এজন্য আরো অনেকেই অপেক্ষমান ছিলো। না লিখলেও মানুষ মনে রাখে শুধু বড় লেখকদের, যারা দীর্ঘদিন ধরে লিখে পাঠকদের মনে নিজের জন্য একটা জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন, অথবা মারা যাবার পর পাঠকদের কাছে নতুনভাবে আবিষকৃত হয়েছেন- তরুণ লেখকদের এই সুবিধাটুকু নেই, তাদের থেমে যাওয়া মানেই মৃতু্য। 
আমি তো মরেই গেছি- কায়সার ভাবলো। কাজল মরে গিয়ে আর কবীর চলে গিয়ে আসলে আমাকেই মেরে রেখে গেছে। কতদিন আমি আর লিখি না! কী এক ঘোরই না ছিলো আমার! অচেনা অজানা এক ঘোরে দিন কেটে যেত। জীবনের নিত্যনৈমত্তিক জটিলতা, অবহেলা, প্রত্যাশা ও প্রতীক্ষার অপ্রিয় পরিণতি, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দোলাচল- এসবের কোনোকিছুই আমাকে স্তব্ধ করতে পারেনি কোনোদিন। আসলে আমি কখনো ভাবিইনি ওসব বিষয় নিয়ে। আমার প্রতিটি ক্ষণ জুড়ে ছিলো একটা ভালো গল্প লেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন। গতানুগতিক ও নিত্যনৈমত্তিক কাজগুলোর মধ্যে অথবা অবসরে অথবা ক্লান্তিতে অথবা বেদনায় অথবা বিষণ্নতায় বিমূঢ় হয়ে আমি কেবল লেখার কথাই ভেবেছি। সেইসব ঘোরলাগা দিন কি আর ফিরে আসবে? আমি কি কোনোদিন লিখবো না আর? কোনোদিন না? 
নিঝুম হয়ে কায়সার এইসব ভাবছিল। দেয়াল ঘড়িতে পাঁচটার সংকেতও তার কানে ঢোকে না। 
সংসারের প্রয়োজন তাকে দিন দিন এক বেরসিকে পরিণত করেছে। বাড়তি সময়টুকুও তার ব্যয় হয় অর্থ উপার্জনের নানা চিন্তায়। যে বেতন পায় সে, তাতে যে চলে না তা নয়, কিন্তু সচ্ছলতার জন্য আরো কিছুর প্রয়োজন। সচ্ছল তারা কোনোদিনই ছিলো না। বাবারও ছিলো সীমিত আয়। ভাইয়া সচ্ছলতা এনেছিল কিছুদিনের জন্য। সে-ও চলে গেছে বছর পাঁচেক আগে। আসলে ভাইয়ার হঠাৎ মৃতু্য আর বাবার অসুস্থতাই কায়সারকে সংসারী করে তুলেছে। এ ছাড়া কিছু করারও ছিলো না। বাবা এমনিতেই অসুস্থ ছিলেন। সারাজীবন কষ্ট করে সংসার টেনেছেন, সাধ ও সাধ্যের সমন্বয় ঘটানোর মতো অবস্থা না থাকলেও সাধ্যমতো ছেলেমেয়েগুলোকে বড় করে তোলার চেষ্টা করেছেন। তারপর বুড়ো বয়সে, একটু আরামে বসে অবসর জীবন কাটানোর সাধ তার থাকতেই পারে। কিন্তু সেটা তার ভাগ্যে ছিলো না। পরপর দু-ছেলেমেয়ের অকাল মৃতু্যর পর কোন বাবা মা-ই বা আর ভালো থাকতে পারে! অথচ তাদের ভালো থাকার কথা ছিলো। এ পরিবারের সবাই ছোটখাটো আনন্দকেও বড় করে তুলতে পারতো, সব ভাইবোন মিলে মা বাবার সঙ্গে বন্ধুর মতো আড্ডা দিতেও শুরু করেছিল, ভাবীটাও জুটেছিল আড্ডাবাজ- তাদের চেয়ে একটু বেশিই আড্ডাবাজ, অল্প আনন্দে প্রাণ খুলে হেসে ওঠার মতো মন ছিলো তাদের। এর জন্য ভাইয়ার অবদান কম নয়। বাবার রিটায়ারমেন্টের পরে সে-ই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল। চাকরি ছাড়াও ছোটখাটো ব্যবসায় জড়াচ্ছিল নিজেকে, নিতান্তই সংসারে সচ্ছলতা আনার জন্য। অনেকখানি সেটা সম্ভবও হয়েছিল। এমনকি কায়সারের বাউণ্ডুলেপনাকেও খারাপ ভাবে না নিয়ে মাকে বোঝাতো- 'ও থাক না ওর মতো আর কিছুদিন। আরেকটু বয়স হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। মানুষ সব সময় একরকম থাকে নাকি? এই বয়সেই তো একটু আধটু পাগলামী করবে। তারপর দায়িত্ব কাঁধে নিলে ইচ্ছে করলেও এসব করতে পারবে না।' ভাইয়ার কষ্ট কায়সার বুঝতো। অল্প বয়সে সংসারের দায়িত্ব নিয়ে বেচারাকে কম ভুগতে হয়নি! কায়সারের মাঝে মাঝে অবাক লাগে। একটা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে হয়ে তার মধ্যে লেখক হবার সাধ ও জেদ জন্ম নিলো কীভাবে? তার তো হওয়ার কথা ছাপোষা চাকরিজীবি, বা ছোটখাটো ব্যবসায়ী বা ক্যারিয়ারিস্ট ধরনের ছেলে! আর তার পরিবারের সদস্যরাই বা কেন স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করলো ব্যাপারটাকে? সে তার বন্ধুদের অভিজ্ঞতার কথা জানতো। লেখালেখি করতে এসে তাদের প্রায় সবাইকেই পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কহীন হয়ে যেতে হয়েছে। অথচ তার পরিবারে সাপোর্ট ছিলো, প্রেরণাও ছিলো। যদিও তার বাউণ্ডুলেপনা মাকে প্রায়ই ভোগাতো, মা প্রায়ই এ নিয়ে দুঃখ করতো, বলতো- 'আমার এই ছেলেটা যে কেন এমন হলো, কী যে হবে ওর! ও খোকা তুই একটু ঘরমুখো হ বাবা'- তবু এর পেছনে যতটা না ক্ষোভ ছিলো তারচেয়ে বেশি ছিলো প্রশ্রয়। এরকম একটা পরিবারের সদস্য হয়ে এদের চরম সংকটের সময় দায়িত্ব না নিয়ে উপায় থাকে না। আর কারো পক্ষে সম্ভব কীনা কায়সার জানে না, কিন্তু তার পক্ষে এই দায়িত্বটা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিলো না। কাজলের মৃতু্য কিংবা বাবার অসুস্থতায় অন্তত কারো মধ্যে খেয়েপরে বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তা তৈরি হয়নি, কিন্তু ভাইয়ার মৃতু্যতে সেটাই হয়েছিল। বাবা, মা, নিশি, আর দুই বাচ্চাকে নিয়ে ভাবী- সবাই যেন মহাসাগরে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছিল; কেউ আশা করতে পারেনি কায়সারই দায়িত্ব তুলে নেবে কিংবা নিলেও সেটা পালন করতে পারবে। প্রথম দিকে কায়সারকে অমানুষিক কষ্ট করতে হয়েছে। বাবা বা ভাইয়ার সঞ্চয় বলতে তেমন কিছু ছিলো না, ফলে প্রথম থেকেই বাসা ভাড়া আর এতগুলো মানুষের খাওয়া-দাওয়া-কাপড়-চোপর, বাচ্চাদের পড়াশোনা সহ অন্যান্য সবকিছুর খরচ জোগাতে তাকে হিমশিম খেতে হয়েছে। সে কোনোদিনই টাকাপয়সা আয় করা বা এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা ইত্যাদির সঙ্গে পরিচিতই ছিলো না, অথচ ওই সময় তাকে কেবল এই একটা বিষয় নিয়েই অহরহ দুশ্চিন্তা করতে হয়েছে। জীবন যে কী কঠিন, সে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে- এতগুলো মুখ কেবল তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে এই চিন্তা তাকে পাগল করে তুলতো। এমনকি বাচ্চাগুলো পর্যন্ত কেমন শান্ত-নিরীহ হয়ে গিয়েছিল- যেন তাদের আর কিছু চাওয়ার নেই, যেন তাদের সবকিছুই পাওয়া হয়ে গেছে, কিংবা আর কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে, এখন যেটুকু পাচ্ছে তা নিতান্তই বোনাস- বাড়তি পাওয়া! ওদের মুখের দিকে তাকালে কায়সারের বুক ভেঙে যেত। কখনো যদি ওদের শখের কোনো কিছু নিয়ে বাসায় ফেরা যেত, ওরা যে কী খুশি হতো, এত খুশি ওদেরকে জীবনেও হতে দেখেনি সে। এমনিতেই এই বাচ্চাগুলোর সঙ্গে তার চমৎকার সম্পর্ক, সে ছিলো ওদের বরাবরের প্রিয় চাচা- ওদের কাছে আগেও যদি কেউ জিজ্ঞেস করতো ওদের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি কে, ওরা কায়সারের কথাই বলতো, ভাইয়ার মৃতু্যর পর ওরা যেন হয়ে উঠলো তারই সন্তান। এই সময়টিতেই সে লেখালেখির কথা ভুলে যেতে থাকে; সত্যি বলতে কি, লেখার কথা তার চিন্তার মধ্যেই আসতো না- জীবন তাকে এমনই আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছিল। 
এসব নিয়ে অবশ্য কায়সারের গভীর কোনো দুঃখবোধ নেই। জীবনের যে-কোনো সম্ভাবনাকেই তার কাছে বরাবর স্বাভাবিক বলে মনে হয়। যা কিছু ঘটে গেছে বা ঘটবে তাকে সহজভাবে গ্রহণ করার মানসিক শক্তি তার আছে। তাছাড়া- আমি এমন জীবন চাইনি- এই ধরনের কথাবার্তা সে ঘুণাক্ষরেও বলে না। কারণ, এর প্রেক্ষিতে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে বসে- তাহলে কেমন জীবন চেয়েছিলেন- সে তার উত্তর দিতে পারবে না, উত্তরটা তার জানাই নেই। জীবন ও পৃথিবীর কাছে তার আসলে চাওয়ার মতো বিশেষ কিছু ছিলো না, ছিলো না কোনো লক্ষ্য, কোনো উদ্দেশ্য বা গন্তব্য, ছিলো না অ্যাম্বিশন। সে শুধু চেয়েছিল লিখতে। যে জীবন এখন সে যাপন করছে, এর চেয়ে উন্নত কিছু সে আশা করেনি কোনোদিন, শুধু যদি লেখালেখিটা অব্যাহত থাকতো তাহলে আর কিছু চাইতো না সে। 
মাঝে মাঝে একটা তুমুল আড্ডার জন্য তৃষ্ণার্ত বোধ করে কায়সার। জীবন অর্থহীন, কিন্তু প্রয়োজনকে কে-ই বা অস্বীকার করে, কে-ই বা এতসব সংকট সত্ত্বেও মরে যেতে চায়? ওইসব আড্ডা তো তাকে নতুন করে বাঁচিয়ে তুলতো! সব আড্ডা একরকম ছিলো না। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় আড্ডাটা ছিলো মূলত ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক। লেখালেখি করা সত্ত্বেও আর ইউনিভার্সিটির এত কাছে হওয়া সত্ত্বেও সে প্রায় কখনোই আজিজ সুপার মার্কেটে বা পিজি হাসপাতালের মোড়ে বা এই এলাকায় আড্ডা দেয়নি। তার বন্ধুবান্ধবের অভাব ছিলো না। তাদের আবার একেকজনের একেক ধরন, সমিল বন্ধুরা মিলে গড়ে উঠতো একেকটা গ্রুপ, সে আর কবীর ছিলো প্রতিটি গ্রুপেরই কমন সদস্য। তারা খুব উপভোগ করতো এতসব ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার চিন্তা ও জীবনযাপনের বৈচিত্র্য। পাশ করে বেরুনোর পর পরই এই আড্ডাগুলো ভেঙে যেতে থাকে, বন্ধুদের অনেকে চলে যায় দেশের বাইরে, অনেকে চাকরি বাকরি নিয়ে ঢাকার বাইরে, সে-ই কেবল এখানে পড়ে থাকে। আরো যারা আছে, তাদের সঙ্গেও দেখাসাক্ষাৎ বন্ধ হয়ে যায়। সবাই খুব ব্যস্ত, অফুরন্ত সময় নেই কারো, কালেভদ্রে কারো কারো সঙ্গে দেখা হলেও বোঝা যায়- সুতো কেটে গেছে! সেটাই স্বাভাবিক অবশ্য। আগে আড্ডা দেয়ার জন্য অভিন্ন বিষয় ছিলো, এখন নেই। একসঙ্গে হলে যে যার চাকরির গল্প শুরু করে, যদিও একজনের চাকরির সঙ্গে অন্যজনের কোনো সম্পর্কই নেই, একটু আধটু স্মৃতিচারণ চলে, এর ওর খোঁজখবর নেয়া চলে, তারপরই কথা ফুরিয়ে যায়, কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে দুজনই বিদায় নেয়ার জন্য হাসফাঁস করে, অবশেষে বিদায় নিতে পেরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। এই তবে পরিণতি? একসঙ্গে সাত-আট বছর কাটানোর পর এই অবস্থা! এমন কেন হলো, কায়সার মাঝে মাঝে ভাবে। বুঝতে পারে- তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এবং টিকেছিল দৈনন্দিন বিষয়াদিকে কেন্দ্র করে, এখন আর কোনো অভিন্ন দৈনন্দিন বিষয় নেই। হয়তো তাদের সম্পর্কগুলো ছিলো ফাঁপা, ভেতরে সারবস্তু তেমন ছিলো না। বন্ধুদের অনেকেরই স্থায়ী ঠিকানা পর্যন্ত জানা নেই। যেমন জানা ছিলো না এই বন্ধুদের নিত্যদিনের সংকট-সমস্যার কথা। প্রতিদিন তাদের সঙ্গে দেখা হতো, একসঙ্গে দিনের অধিকাংশ সময় কেটে যেত, অনেক আলতুফালতু আলোচনায়, আড্ডাবাজিতে মুখর হয়ে উঠতো তাদের সময়, অথচ জানা হতো না কে কোত্থেকে এসেছে, কার কী সমস্যা আছে, কার কী কারণে হঠাৎ হঠাৎ মন খারাপ হয়ে যায়! পরস্পরের অতীত সম্বন্ধে প্রায় কিছুই না জেনে তাদের মধ্যে যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল, তার স্থায়ীত্ব তাই বেশিদিন থাকেনি। তাদের এই বিচ্ছিন্নতা হয়তো তাই স্বাভাবিক। 
ইউনিভার্সিটি ছাড়ার পর কবীর বাইরে চলে গেলে শাহবাগ পর্ব শুরু হয়! যাদের সঙ্গে মুখ চেনাচিনি ছিলো কিংবা যাদের নাম ও লেখার সঙ্গে পরিচয় থাকলেও প্রত্যক্ষ পরিচয় ছিলো না, তাদের সঙ্গে আস্তে-ধীরে পরিচয় গড়ে উঠতে থাকে। বন্ধুত্বও। এর জন্য খুব বেশি সময় লাগেনি। কারণ, ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকলেও তারা পরস্পরের লেখার সঙ্গে পরিচিত ছিলো, পরস্পরের কাছে একধরনের গ্রহণযোগ্যতাও ছিলো- আর তাছাড়া আলোচনার জন্য শিল্পসাহিত্য হচ্ছে এমন এক বিষয় যে, তা নিয়ে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেয়া যায়, তবু এর শেষ হয় না। তবে সে প্রথমটায় বুঝতে পারেনি যে, এইসব সম্পর্কের ভেতরেও কত ভয়াবহ জটিলতা আছে! একই সময়ে লিখতে আসা তরুণদের মধ্যে অনেকগুলো গ্রুপ- সেগুলো আদর্শভিত্তিক নয়, আসলে যে এর ভিত্তি কি তা-ই কেউ জানে না- এক গ্রুপ আবার অন্য গ্রুপকে সহ্য করতে পারে না! ওর তো কিছু হচ্ছে না, ওর কবিতা হয় না, ও আবার গল্পকার হলো কবে- এগুলো হচ্ছে সবচেয়ে সহজলভ্য আলোচনার বিষয়। সে যেহেতু ওদের কাছে নতুন, সে তাই সবার সঙ্গেই মিশতো আর অচিরেই আবিষ্কার করেছিল- এর ফলে তার গায়ে একেক গ্রুপের সিল পড়ে যাচ্ছে। এমনকি ওদের সঙ্গে মিশে সময় নষ্ট কর কেন- এমন কথাও প্রচুর শোনা যেত। ইউনিভার্সিটির বন্ধুদের সঙ্গে এদের এটাই হলো মৌলিক পার্থক্য। ওখানেও গ্রুপ ছিলো, কিন্তু কেউ কারো শত্রু ছিলো না। সবাই মিলে ছিলো একটা বড় গ্রুপ। এখন অবশ্য দু-চারজন ছাড়া প্রায় সব বন্ধুর ব্যাপারেই কায়সারের সন্দেহ হয়, সে ইউনিভার্সিটিরই হোক কি লেখকই হোক, যে, ওরা আসলেই তার বন্ধু ছিলো কী না! যদি হবেই, তাহলে এই এতদিন ধরে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে সব কিছু থেকে, কেউ তার খোঁজ নেয় না কেন? কারো কি একবারও মনে হয় না, এই ছেলেটা তার জীবনের অনেকখানি সময় কাটিয়ে দিয়েছে আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে, এখন আর আসেনা কেন? ওর হলোটা কি? এমন তো কঠিন কিছু নয় নূন্যতম খোঁজখবরটা নেয়া! 

৬. 
নিজেদের সম্পর্কগুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতে কায়সার এবার কলম তুলে নেয়। 

মানুষের অনেকগুলো সম্পর্ক নিয়তি-নির্ধারিত বা প্রকৃতি প্রদত্ত। মা-বাবা-ভাই-বোন-আত্নীয়স্বজন ছাড়াও যে দেশটিতে, যে সমাজে, যে সময়কালে সে জন্মগ্রহণ করে, এর কোনোকিছুই সে নিজে বেছে নেয় না। প্রকৃতি তাকে এই সম্পর্কগুলো উপহার দেয়। সে এগুলো মূল্যবান মনে করুক আর না করুক, এমনকি এগুলো তার কাছে বোঝা হয়ে উঠলেও তার কিছু করার নেই, কারণ প্রকৃতিপ্রদত্ত কোনোকিছুকে শেষ পর্যন্ত অস্বীকার করা যায় না। একজন মানুষ বড়জোর এগুলো থেকে পালিয়ে গিয়ে সাময়িকভাবে মুক্তি পেতে পারে- এসকেপিস্টরা সেটাই করে, কিন্তু একেবারে ছেড়ে দেয়া তার পক্ষে সম্ভব হয় না। কিংবা কে জানে, প্রকৃতিপ্রদত্ত বলে, সহজে পাওয়া গেছে বলে মানুষের কাছে এগুলোর মূল্য কম- মানুষের স্বভাবই হচ্ছে এই যে, সে কিছু না কিছু অর্জন করতে চায়, অর্জনে যে আনন্দ, সহজপ্রাপ্তিতে সেই আনন্দ নেই বলেই। আর তাই মানুষ এইসব সম্পর্কেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখে না। সারাজীবন ধরে সে নানারকম সম্পর্ক নির্মাণ করে যায়, এমনকি ঘটনাক্রমেও সে অনেক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। মানুষের উদ্ভাবিত শ্রেষ্ঠ দুটো সম্পর্কের নাম- প্রেম ও বন্ধুত্ব। অবশ্য প্রেম শব্দটি দিয়েই সব সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করা যায়। তা কাদের সঙ্গে প্রেম হয় অথবা বন্ধুত্ব? একজন মানুষ আরো হাজার মানুষ থাকতে কেন একজন নির্দিষ্ট মানুষের সঙ্গে এরকম সম্পর্ক গড়ে তোলে? আমার মনে হয়, মানুষ আসলে তার প্রেমেই পড়ে যার মধ্যে সে নিজেকে প্রকাশিত হতে দেখে। 
মাঝে মাঝে আমার এ-ও মনে হয়- সারাজীবন ধরে মানুষ অন্যের চোখে নিজেকে দেখে নিতে চায়। তার সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হয় এই একটি জিনিসকে কেন্দ্র করেই। একটি সুন্দর শার্ট আমি পড়ি কেন? পড়ি, আমাকে সুন্দর লাগবে বলে। কিন্তু সুন্দর না লাগলে অসুবিধা কোথায়? লাগলেই বা সুবিধাটি কি? কি যায় আসে এই সুন্দর লাগা না লাগায়? যায় আসে। আমি চাই, অন্যের চোখ থেকে আমার প্রশংসা ঝরে পড়ুক। আমি যে সুন্দর সেটা যদি জানাও থাকে আমার তা যেন যথেষ্ঠ নয়, অন্যের চোখেও নিজেকে দেখে নিতে চাই। অন্যের চোখ থেকে প্রশংসা ঝরে না পড়লে আমার সমস্ত সৌন্দর্যই ম্লান ও ব্যর্থ হয়ে যায়। একটি চায়ের কাপ কেনার সময় কেন সবচেয়ে সুন্দর সেটটিই কিনতে চাই আমি? কারণ যে অতিথিকে আমি সেই কাপে চা দেব, তার কাছ থেকে যেন আমি আমার রুচির প্রশংসা শুনতে পাই। মানুষ এমনই- নিজেই অজান্তেই সে নিজেকে কেন্দ্র করে ঘোরে। 
প্রেমও তাই। আমি তাকেই চাই, তারই প্রেমে পড়ি যার মধ্যে আমার পছন্দের বিষয়গুলো আছে, যার চোখে তাকালে আমি নিজেকে দেখতে পাই। 

লিখতে বসে কায়সার ভুলেই গিয়েছিল অফিস থেকে বেরুতে হবে। দেয়াল ঘড়ি আবার জানান দিতে সে চমকে ওঠে। অফিস-আওয়ার পেরিয়ে গেছে এক ঘন্টা আগেই- 'আমি বসে করছিটা কি? আজ আমার কি হলো?' - ভাবতে ভাবতে সে উঠে দাঁড়ায়। পিওনকে ডেকে সবকিছু গুছাতে বলে বাইরে বেরোয়। 



৭. 
শুধু পাখি নয়, নানা ধরনের প্রাণী ছিলো আমাদের বাড়িতে, গ্রামের বাড়ি যেমন হওয়ার কথা আর কি! যদিও আমাদের জমিতে চাষবাস করতো বর্গাদাররা, কিন্তু তা সত্ত্বেও চারটে গরু ছিলো; একটা ছাগল ছিলো আমার মালিকানায়; মোরগ-মুরগি ছিলো; কাজলের ছিলো হাঁস, বাবার ছিলো বিড়াল; বেওয়ারিশ কুকুর ছিলো, বাড়ির পাশে ঝোপঝাড়ে খাটাশ ছিলো, বেজি ছিলো, সম্ভবত শেয়ালও ছিলো। শেয়াল অবশ্য খুব একটা চোখে পড়তো না, কিন্তু রাতে শেয়ালের সম্মিলিত ডাকে উদাসপুরের নিস্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে যেত। বেজি আর খাটাশের অস্তিত্ব বোঝা যেত মুরগির দলে হামলা পড়লে। সবাই হইচই করে তাড়িয়ে দিলেও দু-একটা মুরগি খোয়া যেতই। গরু-ছাগল-বিড়াল-হাঁস-মুরগি এদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা ছিলো চমকপ্রদ। পরিবারের প্রায়-সদস্য হিসেবেই গণ্য করা হতো ওরা। 
বাবার বিড়ালটা ছিলো ভীষণ আহ্লাদী। বাবা অবশ্য বাড়িতে কমই থাকতো, আহ্লাদটা ছিলো মা'র সঙ্গেই, বাবা মাঝে মাঝে ছুটিছাটাতে বাড়িতে গেলে বিড়ালটার আর আহ্লাদের সীমা থাকতো না। খাওয়ার সময় বাবার সঙ্গে তার জন্যও একটা প্লেট দিতে হতো। বাবা যত্ন করে ভাত মেখে সেই প্লেটে দিতো, আর সে খুব আরাম করে খেয়ে নিতো। ওর প্রতি বাবার আদরটা ছিলো বাড়াবাড়ি রকমের বেশি। এমনিতে আমাদের সঙ্গে গুরুগম্ভীর আচরণ করলে কী হবে, বিড়ালের সঙ্গে নানান গল্প জুড়ে দিতো বাবা। এত আদর, অথচ মজার কাণ্ড হলো, খেতে বসার সময় বাবা পাটখড়ির তৈরি একটা ছোট্ট লাঠি নিয়ে বসতো। বিড়ালটা মাঝে মাঝে কাটা খাওয়ার জন্য জ্বালাতো বলে বাবা লাঠি দিয়ে ভয় দেখাতো। একবার সম্ভবত কোনো কারণে বাবা একটু বিরক্ত ছিলো, বিড়ালের যন্ত্রণা হয়তো সহ্য হয়নি, তাই একটু রেগে গিয়ে বেড়ালের মাথায় ছোট্ট করে একটা বাড়ি দিয়েছিল। বিড়ালটা রাগ করে সেই যে বাড়ি থেকে চলে গেলো, আর কোনোদিন ফিরলো না! বহুদিন বাবা বিড়ালটাকে খুঁজেছে, মনমরা হয়ে থাকতে দেখেছি অনেকদিন, এমনকি এখনো সেটার কথা বলতে গেলে তার চোখ ভিজে ওঠে! 
গরুগুলো দেখাশোনার জন্য রাখাল ছিলো, নাম- রহম আলি। তখন বছরচুক্তিতে বাড়িতে বাড়িতে রাখাল রাখা হতো। রাখাল গৃহস্থের বাড়িতেই থাকতো, খেতো। মাঝে মাঝে হয়তো দু-একদিনের ছুটি নিয়ে নিজের বাড়ি থেকে ঘুরে আসতো। আমাদের যেহেতু চাষের কাজ ছিলো না, তুলনামূলকভাবে রহম আলির কাজের চাপ কম ছিলো। একইসঙ্গে ও ছিলো ভীষণ সৌখিন। গরুগুলোকে খুব আদর করতো। আমাদের গ্রামে একটা লড়াইয়ের ষাঁড় ছিলো। লড়াইয়ের ষাঁড় মানে গ্রামের ষাঁড়। গ্রামের মানসম্মান ওই ষাঁড়ের ওপর নির্ভর করতো। বাৎসরিক মেলায় যখন ষাঁড়ের লড়াই হতো তখন অন্য গ্রামের ষাঁড়কে হারাতে না পারলে গ্রামের মানসম্মান থাকতো না। ফলে এই ষাঁড়ের জন্য গ্রামের সবকিছু ছিলো উন্মুক্ত। ষাঁড়টা যথেচ্ছাচার ঘুরে বেড়াতো, যে-কোনো ফসলের ক্ষেতে মুখ ডুবাতো, কেউ কিছু বলতো না। আমাদেরও একটা ষাঁড় ছিলো, রহম আলির খুব ইচ্ছা ছিলো ওটাকে লড়াইয়ের ষাঁড় বানাবে। বাবার অনিচ্ছার জন্যে পারেনি বটে, কিন্তু শখটাকে সে বিসর্জনও দেয়নি। নিজেই বিশেষভাবে যত্ন নিতো, খাওয়া-দাওয়া করাতো, আর শিঙদুটো ব্লেড দিয়ে চোখা করে দিতো। খুব তাগড়া আর শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল ওটা। মাঝে মাঝে রহম আলি ইচ্ছে করে ষাঁড়টাকে ছেড়ে দিতো, বিশেষ করে লড়াইয়ের ষাঁড়টা বাড়ির কাছে এলে ছাড়তোই। ইচ্ছে- আমাদের ষাঁড়টার শক্তি পরীক্ষা করা। কানে কানে কী যেন বলেও দিতো, আর আমাদের ষাঁড়টা বিপুল বিক্রমে গিয়ে ওটাকে তাড়া করতো। একদিনের কথা মনে পড়ে- রহম আলি নিজের বাড়ি গেছে। সন্ধ্যার পর গোয়াল ঘর থেকে খুব শব্দ পাওয়া গেলো। আমরা গিয়ে দেখলাম- ষাঁড়টা খুঁটি উপড়ে ঘরের বেড়া ভেঙে মাঠের দিকে চলেছে। সম্ভবত সেদিন ওর খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো হয়নি। খিদের যন্ত্রণায় এই রাগ। রহম আলি নেই, বাবাও শহরে, ভাইয়াও নেই, বাড়িতে পুরুষ মানুষ বলতে আমি একা। কোনো উপায়ান্তর না দেখে মা খুব আদর করে ওটাকে ডাকতে লাগলো- ফিরে আয় বাবা, বাড়িতে কেউ নাই, আমি কি তোকে নিয়ে আসতে পারি? ফিরে আয়... ষাঁড়টা ঘাড় ঘুরিয়ে মা'র কথা শুনলো কিছুক্ষণ। ওর দোদুল্যমান অবস্থাটা বোঝা যাচ্ছিল। একদিকে খিদে পেটে সামনে ফসলের অবারিত মাঠ, অন্যদিকে মা'র ডাক। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে ষাঁড়টা সত্যি সত্যি ফিরে এসে মা'র কাছে দাঁড়ালো। মা ওর গলায় আর পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলতে লাগলো- 'খিদে লাগছে বাবা? দাঁড়া তোর জন্য খাবার নিয়ে আসি।' মা ওটার জন্য গরম পানির সঙ্গে লবন-ভুশি মিশিয়ে কী একটা খাবার যেন তৈরি করেছিল, মনে নেই। কিন্তু ও যে শান্ত হয়েই ছিলো, সেটা মনে আছে। রাতে আর ঝামেলা করেনি। একবার লড়াইয়ের ষাঁড়ের সঙ্গে গুঁতোগুঁতি করতে গিয়ে ওর একটা শিঙ ভেঙে গেলো। কী অদ্ভুত কাণ্ড, এত রাগী ষাঁড়, এত বলশালী, অথচ একটা শিঙ হারিয়েই কেমন যেন বদলে গেলো! কেমন চুপচাপ, শান্ত। রহম আলি মন খারাপ করে ঘুরে বেড়ালো বহুদিন, আর আস্তে আস্তে ওটার ওপর থেকে যেন আগ্রহ হারিয়ে ফেললো সে। কিন্তু উল্টো ঘটনা ঘটলো বাবার ক্ষেত্রে। শিঙ ভাঙার আগে ওটার অনেক রাগ ছিলো বলে বাবা খুব একটা পছন্দ করতো না ওকে, অথচ শিঙ-ভাঙা শান্ত ষাঁড়টি তার প্রিয় হয়ে উঠলো। খুব তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে যেতে লাগলো ওটা। সবাই বললো- ওটা বিক্রি করে আরেকটা কিনতে। বাবাও রাজি হয়ে গেলো। একদিন সকালে ওটাকে ঝিটকার হাটে নিয়ে যাওয়া হলো বিক্রির জন্য, কিন্তু এদিকে বাবার অবস্থা খারাপ। এমন হা-হুতাশ শুরু করলো যেন পুত্রশোকে কাতর! অদ্ভুত ব্যাপার- সন্ধ্যার দিকে ষাঁড়টা ফিরে এলো! শিঙ ভাঙা দেখে দাম ওঠেনি, তাই বিক্রি না করেই ওটাকে ফিরিয়ে এনেছে রহম আলি। 
পরের ঈদে ওটাকে কোরবানী করা হলো। 
কোরবানী করা হয়েছিল আমার ছাগলটাকেও। কী মনে করে বাবা আমাকে ওটা কিনে দিয়েছিল, জানি না। কিন্তু পেয়ে যে মহাখুশি হয়েছিলাম সেটা খুব মনে আছে। দুদিনেই ওটার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেলো আমার। বাবা-মা যেমন আমাকে আদর করে খোকা বলে ডাকতো, আমিও তেমন ওটাকে খোকা বলে ডাকতাম। মজার ব্যাপার হলো- আমাদের শোবার ঘরেই ওর থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল, গোয়াল ঘরে নয়। সারাদিন বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়াতো বটে, কিন্তু ঘরের ভেতরেও ওর ছিলো অবাধ যাতায়াত। অচিরেই ও আমাদের পরিবারেরই একজন হয়ে উঠলো যেন; বাবা-মা, ভাই-বোনরাও ওকে আপন করে নিলো। আর না নিয়ে উপায়ও ছিলো না। খুব আহ্লাদ শিখে গিয়েছিল ও। যেমন, ছুটিতে বাবা বাড়িতে এলে খোকা দৌড়ে গিয়ে তার দু-পায়ের মাঝখানে মাথা গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকতো আর এমন অভ্যর্থনা পেয়ে বাবাও খুশিতে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতো। আবার মা'র সঙ্গেও ছিলো ওর দারুণ ভাব। রান্না ঘরে গিয়ে মা'র কাছে দাঁড়িয়ে থাকতো ও, মা আদর করে বলতো, 'এখানে কি চাস, মাঠে গিয়ে খেলা কর, যা।' কিন্তু ও যেত না; উল্টো, নতুন গজানো শিং দিয়ে মা'র পিঠে আস্তে আস্তে গুঁতো দিতো। বোনদের মনও জয় করে নিয়েছিল খোকা। বোনরা যখন পড়তে বসতো, বা সাজতে দাঁড়াতো আয়নার সামনে, তখন ও গিয়ে তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো চুপচাপ। ওরা দুষ্টুমি করে বলতো, 'তুই তো ছেলেদের মতো দুষ্টু হয়েছিস রে খোকা, শুধু মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকিস !' খোকা তখন ছেলেদের মতো হওয়ার আনন্দে, অথবা অপমানেও হতে পারে, লাফ-ঝাঁপ শুরু করতো, আর বোনরা হেসে কুটিপাটি হতো। আমার সঙ্গে তো ওর আহ্লাদের কোনো সীমাই ছিলো না। আমি যখন স্কুলে যেতাম, ও আমার সঙ্গে সঙ্গে অনেকদূর পর্যন্ত আসতো, মা দাঁড়িয়ে থাকতো উঠোনে, আমি মাকে দেখিয়ে খোকাকে বলতাম - 'ওই যে মা দাঁড়িয়ে আছে, মা'র কাছে যাও, আমি স্কুল থেকে এসে তোমাকে নিয়ে খেলতে যাবো।' ও আমার মুখের দিকে একটু তাকিয়ে থেকে কি বুঝতো কে জানে, একছুটে মা'র কাছে গিয়ে দাঁড়াতো। স্কুল থেকে ফিরলে কোত্থেকে যেন লাফাতে লাফাতে এসে হাজির হতো। পড়তে বসলে টেবিলের নিচে গিয়ে আমার পায়ের কাছে বসে থাকতো, খেতে বসলে কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকতো, নিজে গিয়ে আদর করে ওকে শুইয়ে দিয়ে না এলে ঘুমাতে যেতে চাইতো না- ঠিক যেন একটা মানবশিশু, এমনই আচরণ ছিলো ওর। তখন 'পেয়াদা' নামক একটা ব্যাপার ছিলো। তার কাজ ছিলো কৃষকের ক্ষেতের ফসল খেতে থাকা গরু-ছাগল ধরে নিয়ে খোঁয়াড়ে রাখা। খোঁয়াড় থাকতো তার নিজের বাড়িতেই। একবার ধরা পড়লে খোঁয়াড়ে যেতেই হতো, আর মালিককে টাকা দিয়ে সেটা ছাড়িয়ে আনতে হতো। অনেকটা গরুছাগলের জেলখানার মতো ব্যাপার আর কী! তো, আমি খোকাকে কানে কানে বলে দিতাম- 'প্যাদা দেখলেই দৌড় দিবি, ধরতে পারে না যেন!' ওকে পেয়াদা লোকটাকে চিনিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাকে দেখলেই ও একদৌড়ে বাড়ি এসে ঘরে ঢুকে একবারে চৌকির তলায় গিয়ে লুকাতো। বিকেলে যখন মাঠে খেলতে যেতাম, তখন ও-ও যেত সঙ্গে, আর এই নিয়ে বন্ধুরা খ্যাপাতোও খুব, তবু খোকা ছিলো আমার অনিবার্য সঙ্গী। কয়েকবছরের মধ্যেই খোকা বুড়িয়ে যেতে লাগলো। আগের সেই চঞ্চলতা নেই, নেই ক্ষিপ্রতাও। দেখতে হয়েছে নাদুসনুদুস, খানিকটা ভারিক্কি চালে চলাফেরা করে, প্রায় সময়ই বসে থাকে। হয়তো এসব ভেবেই ওকে কোরবানী দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু ব্যাপারটা আমি কিছুতেই মানতে পারছিলাম না। মর্জি শুরু করলাম, ওকে আমি কিছুতেই মারতে দেবো না সেটাও ঘোষণা করলাম। আব্বা তখন নরম সুরে আমাকে বোঝাতে বসলেন- 'শোনো বাবা, কোরবানীর পশুরা বেহেশতে যায়, তুমি যখন বেহেশতে যাবে, তখন ওর সঙ্গে তোমার দেখা হবে, ও তোমাকে পিঠে নিয়ে বেড়াবে, সেটা কত ভালো হবে না?' কিন্তু্তু বেহেশত, কোরবানী, আল্লাহর সন্তুষ্টি এইসব ধোঁয়াটে ব্যাপারে আমার মন গললো না, ঈদের দিন সকালে আমি ওটার গলা জড়িয়ে ধরে বসে রইলাম। অবশ্য শেষ পর্যন্ত ওটাকে ছাড়তেই হয়েছিল, আর সেই প্রথম মনে হলো- কোরবানী একটা নিষ্ঠুর ব্যাপার- সারাজীবনেও এই ধারণা বদলায়নি আমার। কোরবানী ছাড়াও যে প্রতিদিন হাজার হাজার পশু জবাই করা হচ্ছে, সেসবের মাংস আমিও খাচ্ছি, এটা বুঝেও কোরবানীর ব্যাপারটাকে কখনো মেনে নিতে পারিনি আমি। বাবা যেমন ষাঁড়টাকে কোরবানী দিয়ে কেঁদেছিলেন, আমিও খোকাকে হারিয়ে খুব কেঁদেছিলাম। 
বহুদিন আমি খোকার শোক বুকে নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছি। 
শুধু কি পশুপাখি, বাড়ি ভরতি ছিলো নানা ধরনের গাছপালা! ফলের গাছ ছিলো অগুনিত। সবই দাদা নিজ হাতে লাগিয়েছিলেন বলে শুনেছি। আম-জাম-কাঁঠাল তো ছিলোই, ছিলো তাল, নোনাফল, জাম্বুরা, জামরুল, পেয়ারা, ডালিম, আমড়া, পেঁপে, বড়ই গাছও। সবচেয়ে বেশি ছিলো নারকেল আর খেজুর গাছ। বাড়ির আকারটা ছিলো উপবৃত্তাকার। উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি, পুব-পশ্চিমে চ্যাপ্টা। বাড়ির চারপাশে দাদা নারকেল আর খেজুর গাছ লাগিয়েছিলেন। দক্ষিণ দিকটাতে খেজুর আর উত্তর দিকটাতে নারকেল। দূর থেকে বাগান বলে ভুল হতো। আমি বড় হতে হতে গাছগুলো অনেক অনেক বড় হয়ে গিয়েছিল। শিমুল গাছটাকে মনে হতো আকাশছোঁয়া, দেবদারুও তাই। কৃষ্ণচূড়া ছিলো কয়েকটা। শিমুল আর কৃষ্ণচূড়ায় ফুল ফুটলে বাড়িটা যেন আগুন রঙে সাজতো! সুপারি গাছগুলোও চোখে পড়তো দূর থেকেই। শ্যাওড়া, সজনে, গাছআলু, বান্দরের লাঠি এইসব আরো কত কত গাছ! নানাজাতের ফুলগাছ ছিলো। ফুলের বাগান ঠিক নয়, এলোমেলোভাবে লাগানো ফুল গাছ। কোনো যত্নআত্তির ব্যাপার ছিলো না, গাছগুলো নিজের মতো করে জন্মাতো, বড় হয়ে উঠতো, ফুল-ফল-বর্ণ-গন্ধ ছড়িয়ে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিতো। ঘরের পাশে ছিলো রক্তজবা, দাদার কবরের ওপর ছিলো টগর ফুলগাছ। কোথাও ছিলো বেলি, কোথাও গাঁদা। গোলাপ ছিলো না, ছিলো না রজনীগন্ধাও। কিন্তু টগরের রঙ আর সৌরভ মন ভরিয়ে দিতো। জবার রঙটাও ছিলো মনকাড়া। ডালিম গাছে যখন ডালিম পেকে ফেটে যেত তখন তার রঙটাও ছিলো জবার মতোই। বেলি ফুটতো রাতে, গন্ধে মৌ মৌ করে উঠতো পুরো বাড়ি। আর গাঁদার হলুদ রঙটা প্রায় সোনালী হয়ে উঠতো দুপুরের রোদে। বাড়ির পেছনে, মানে উত্তর-পশ্চিম কোণের দিকটাতে, ছিলো বাঁশঝাড় আর বেতবন। এতই ঘন ছিলো সেই বন যে কোনোভাবেই সূর্যের আলো এসে মাটিতে পেঁৗছতে পারতো না! বাঁশঝাড় নিয়ে নানারকম গল্পকাহিনী ছিলো। রাতে, অল্প বাতাসেই শোঁ শোঁ শব্দ উঠলে বাড়ির বাচ্চারা ভয়ে সিঁটিয়ে যেত। আর বেতবনটা ছিলো রহস্যময়। ঋষীপাড়ার লোকজন ছাড়া ওখানে কেউ যেত না। ঋষীরা বেত নিতে এলে ওদের সঙ্গে বেতবনে যাওয়ার অনুমতি মিলতো। ওরা বেত কাটার আগে বেতফল এনে আমাদের হাতে দিতো। বেতফলের সেই রঙ, আহা, অবর্ণনীয়। অনেকদিন পর- 'বেতফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে'- লাইনটির সঙ্গে যখন পরিচিত হই, আমার সেইসব দিনের কথা মনে পড়ে যায়। মনে হয়, জীবনানন্দের কবিতা বুঝতে হলে ওইসব অভিজ্ঞতা থাকতে হবে! নইলে জগতে কে-ইবা পারবে এমন রহস্যময় পঙক্তির অর্থ উদ্ধার করতে! 

৮. 
বিকেল শেষ হয়ে আসছে। কী বিষণ্ন হয়ে আছে পৃথিবীর মুখ! সন্ধ্যাবেলায় সবকিছু এমন মন খারাপ করে ফেলে কেন? কেন এমন হু হু করে ওঠে বুকের ভেতর? কেন যাবতীয় আয়োজন ও প্রয়োজন তীব্র অর্থহীনতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে? 
অফিস থেকে বেরিয়ে বিকেলের নাস্তার নামে সামান্য কিছু মুখে দিয়ে হাঁটতে শুরু করেছিল কায়সার। রিকশা নিয়েও যাওয়া যেত, কিন্তু আজ তার হাঁটতে ইচ্ছে করছে। তাছাড়া আবিদের সঙ্গে আটটার দিকে দেখা হওয়ার কথা। এত তাড়াতাড়ি ওখানে গিয়ে কি লাভ? তারচেয়ে বরং যাওয়ার সময় ক্যাম্পাস ঘুরে যাওয়া যাক। কাউকে পাওয়ার জন্য নয়, বরং ওখানকার প্রতিটি মোড়ে মোড়ে সে যে দীর্ঘ স্মৃতি রেখে গেছে তার একটা খোঁজখবর নিয়ে যাওয়ার জন্য। সে সেভাবেই হাঁটতে শুরু করেছিল। প্রেসক্লাব ছাড়িয়ে বাঁয়ে মোড় নিতেই স্মৃতিময় দিনগুলো ঝাঁপিয়ে এলো সামনে। ঐ তো দেখা যাচ্ছে হাইকোর্ট মাজারের মোড়। তারপরই কার্জন হলের গেট। দীর্ঘ সাতটি বছর। আয়েশা-ডলি-পলিদি-শৈলী এইসব মায়াবতী মুখ, আর আলো-অন্ধকার মাখানো ভালো-মন্দে মেশানো বন্ধুরা, সবচেয়ে বড় ডিপার্টমেন্টে পড়ার অহংকার আর আনন্দ, প্রেম-প্রীতি-বন্ধুত্ব, আড্ডাবাজি, স্বৈরাচারি সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, নিরীহ মুখগুলোর প্রতিবাদী মুখে পরিণত হওয়া, চেনাজানা ভালো ছেলেগুলোর হঠাৎ করেই অস্ত্রবাজ সন্ত্রাসীতে পরিণত হওয়া, হঠাৎ কোনো সকালে উঠে চেনা কারো লাশ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া, আর এক এক করে জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া সাতটি বছর। চার বছরের কোর্স সাত বছরে! তিন বছরের সেশন জট। তবু এটাকে কখনো ক্ষতি বলে মনে হয়নি কায়সারের। ওইরকম সময় আর কখনো আসবে না জীবনে। এখন তিরিশ বছর চেষ্টা করলেও ওই তিন বছরের আনন্দময় অভিজ্ঞতা ফিরে পাওয়া যাবে না। 
কার্জন হল পেরিয়ে দোয়েল চত্বর পেছনে রেখে তিন নেতার সমাধির পাশের গেট দিয়ে সোহরোওয়ার্দি উদ্যানে ঢুকলো কায়সার। একবার পেছন ফিরে সমাধিগুলো দেখেও নিলো। 'শুয়ে আছো? থাকো। সুখে নিদ্রা যাও। বাঙালির দৈন্যদশা তো নতুন করে দেখার কিছু নেই। বেঁচে থাকতেও ঘুমিয়েই ছিলে, এখনো থাকো। তোমাদের ভাগ্য ভালো- কোনো বিচার-বিবেচনা না করে স্রেফ নাম শুনেই এই দেশে তোমাদের নামে জয়ধ্বনি দেয়া হয়। সেই মধুর ধ্বনি শুনতে শুনতে তোমাদের ঘুম আরো গাঢ় হোক।' বিড়বিড় করে এইসব বলতে বলতে সে হাঁটছিল। 
সন্ধ্যা নেমেছে এই অদ্ভুত শহরেও। উদাসপুরের সন্ধ্যাগুলো বড় বেশি স্পষ্ট ছিলো। পদ্মায় বিরাট সূর্যটা রক্ত মেখে ডুবে গেলে নৌকাগুলো উদাস পাল খাটিয়ে ফিরে আসতো, পাখিগুলো দুর্বোধ্য চেঁচামেচি করতে করতে ঘরে ফিরতো, মানুষগুলোর চোখে মুখেও থাকতো ঘরে ফেরার তৃষ্ণা। ওইসব সন্ধ্যা যেন কেবলই সবাইকে ঘরে ফিরিয়ে আনার জন্য নেমে আসতো পৃথিবীতে। আর এই শহরে সন্ধ্যা নামলে নিশিকন্যারা বাইরে বেরোয়, ছিনতাইকারী-চোর-ডাকাত-পকেটমার আর মাতালদের জন্যই যেন নেমে আসে এই রাত। সোডিয়াম বাতির ভুতুড়ে আলো জীবিত মানুষগুলোকেও মৃত করে তোলে। সন্ধ্যা হতে না হতেই ঘরে ফিরতে থাকা মানুষগুলো চোখে-মুখে ফুটে ওঠে আতংক। কোথায় কখন বোমা ফুটবে, কে-কখন-কোথায় ছিনতাই বা পুলিশের কবলে পড়বে, কিছুই বলা যায় না। সারাদিন কাজকর্মের পর ঘরে ফেরার মধ্যে যে আনন্দ আর প্রশান্তি থাকার কথা তার কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না কারো এঙ্প্রেশনে। সবাই দুশ্চিন্তাগ্রস্থ, সবাই আতংকিত, সবাই নিরাপত্তাহীনতার যন্ত্রণায় কাতর। কোথাও কোনো নিরাপত্তা নেই, নিছক আল্লার ওপর ভরসা করে চলছে এই শহরের এককোটি মানুষ। সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে বিকেলে বা সন্ধ্যায় সহিসালামতে ঘরে ফিরতে পারাটাই এখন একটা মিরাকল, যারা ফিরছে তাদের সবার জীবনেই প্রতিদিন মিরাকল ঘটে যাচ্ছে! সব নেগেটিভ উপাদান এই শহর জুড়ে! 
কয়েকজন নিশিকন্যার মুখোমুখি হলে আর তারা তাকে ইঙ্গিত ছুঁড়ে দিলে কায়সার অস্পষ্ট হেসে তাদেরকে এড়িয়ে যায়। বরাবর এদের দেখলে কায়সার কষ্টবোধ করে; কিন্তু জানে, কিছু করার নেই, কিছু করতে পারবে না সে। বহুবার এদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে দেখেছে সে, তাতে মন আরো খারাপ হয়ে যায়- এদের সমস্যাগুলো তার সমাধানের আওতার বাইরে বলে। 
হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল কায়সার। পায়ের নিচে নরম-স্নেহময় ঘাসগুলো তাকে জড়িয়ে ধরে যেন সান্ত্বনা দিতে চায়। অন্তত কায়সারের সেরকমই মনে হচ্ছিল। এই পার্কে সে আর কবীর কতদিন এসে বসেছে! কত দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দিয়েছে! ঘাসগুলো কি সেইসব দিনের কথাই মনে করিয়ে দিতে চায়? কায়সার এত মুগ্ধ হয়ে পড়ে যে, ঘাসগুলোকেই সহানুভূতিশীল বন্ধুর মতো মনে হয়। সে প্রথমে বসে পড়ে, তারপর আরো ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। নরম ঘাসের বিছানা তার কাছে মায়ের কোলের মতো স্নেহময় আর কোমল বলে মনে হয়। তার অবসন্ন শরীর জুড়ে তখন শান্তি নেমে আসছিল। মুঠো মুঠো ঘাস ধরে সে এই কোমলতাকে অনুভব করতে চাইছিল। একটা মায়াময় শীতল হাওয়া তার গা জুড়িয়ে দিয়ে গেলে সে- আহ, শান্তি!- বলে স্বস্তি প্রকাশ করলো। আমার দেশের মাটি, মায়াময় ঘাস, এই হাওয়া আর আকাশ, আর এই অসাধারণ মানুষগুলোর জন্য আমি মরেও যেতে পারি। চোখ বুজে এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ চোখ খুলে তাকালে সে দেখে শুকতারাটি তার দিকে নির্ণিমেষে তাকিয়ে আছে। 
কায়সার মৃদু হাসে। 
কেমন আছো তুমি? অনেকদিন তোমার সঙ্গে কথা হয় না। কতকাল আর একা একা ঘুরে বেড়াবে? এবার সঙ্গীসাথী কিছু জোটাও- এভাবে সে আলাপ শুরু করলো। বরাবরই এই গ্রহটি কায়সারের খুব প্রিয়। তার সবসময়ই মনে হয়- আকাশজোড়া ওই যে নক্ষত্রের মেলা আর এত গ্রহ-উপগ্রহ, তবু যেন শুকতারাটি নিঃসঙ্গ, একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনে হয়, সে ওটার ভাষা বোঝে। 'শুকতারাকে আমার বন্ধুর মতো মনে হয়, মনে হয় আমি ওর ভাষা বুঝি'- বন্ধুদের কাছে এই কথা বলে সে হাসির পাত্র হয়েছিল। বন্ধুরা বলতো- 
লেখক হলেই এরকম উদ্ভট চিন্তা করতে হবে, এমন কোনো কথা আছে নাকি? নাকি এটা তোদের ফ্যাশন? 
কেন, ফ্যাশন হবে কেন? 
তুই বিজ্ঞানের ছাত্র, অথচ বলছিস শুকতারার ভাষা বুঝিস। আরে ওটার কোনো ভাষা আছে নাকি, ওটা তো আমাদের পৃথিবীর মতোই একটা গ্রহ মাত্র! তুই যে তা জানিস না তা তো নয়! তারপরও এসব বলার মানে কি? 
কায়সার তখন গৌতম বুদ্ধের চমকপ্রদ জীবন কাহিনী শুনিয়ে দিয়েছিল, আর চাঁদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়েছিল বন্ধুদেরকে। 

রাজা শুদ্ধোধনের স্ত্রী রানী মায়া একদিন স্বপ্নে দেখলেন- স্বর্ণের পর্বতে পরিভ্রমণরত ছয় দাঁত বিশিষ্ট একটি সাদা হাতি কোনো ব্যথা না দিয়েই তাঁর শরীরের বাঁ পাশ দিয়ে ঢুকে পড়লো। তিনি জেগে উঠলেন, রাজাকে জাগিয়ে স্বপ্নটা জানালেন। রাজা স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে রাজ্যের সব জ্যোতিষিকে ডাকলেন। জ্যোতিষিরা ব্যাখ্যা দিলেন- রানী এমন একজন পুত্রের জন্ম দেবেন যিনি হয় জগতের সম্রাট হবেন অথবা হবেন জাগ্রত ও আলোকিত এমন একজন মানুষ যিনি মানবজাতির মুক্তির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করবেন। স্বাভাবিক প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজা চাইলেন, রাজপুত্রের ভাগ্যে প্রথমটিই ঘটুক- তাঁর পুত্র যেন জগতের সম্রাট হয়। 
রানী যে রাতে স্বপ্নটি দেখেছিলেন সেটি ছিলো পূর্ণিমার রাত। 
নির্দিষ্ট সময়ে কোনো বেদনা ছাড়াই রানী একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিলেন। একটি ডুমুর গাছ আনত হয়ে তাঁকে সহায়তা করলো। শিশুটি রানীর দাঁড়ানো অবস্থাতেই ভূমিষ্ট হলো এবং জন্মের পরপরই উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে যথাক্রমে চার পা হাঁটলো এবং সিংহের স্বরে বললো- আমি তুলনাহীন, এটিই আমার শেষ জন্ম। 
শিশুটি যে রাতে ভূমিষ্ট হলো সেটিও ছিলো পূর্ণিমার রাত। 
রাজা শুদ্ধোধন পুত্রের নাম রাখলেন সিদ্ধার্থ। তিনি তাঁর সন্তানকে নিয়ে একই সঙ্গে আশান্বিত এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্থ। আশান্বিত, কারণ, তাঁর পুত্র জগতের সম্রাট হবার সম্ভাবনা নিয়ে জন্মেছে। চিন্তিত, কারণ, তিনি জ্যোতিষিদের কাছে জানতে পেরেছেন, তাঁর ছেলের গৃহত্যাগী হয়ে যাবার মতো বিপদজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। রাজপুত্র সিদ্ধার্থ যদি বার্ধক্য, জরা, মৃতু্য এবং কঠোর তপশ্চর্যা- জীবনের এই চারটি সত্য সম্বন্ধে জানতে পারেন তাহলে তিনি গৃহত্যাগী হয়ে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করতে পারেন এবং জগতের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পারেন। 
বার্ধক্য, জরা, মৃতু্য এবং কঠোর তপশ্চর্যা- এই চারটি জিনিসের সঙ্গে যেন সিদ্ধার্থের কোনোভাবেই দেখা না হয় রাজা তার যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করলেন। পুত্রের জন্য রাজপ্রাসাদে একটি হেরেম তৈরি করলেন এবং সিদ্ধার্থকে এসব নিয়ে মেতে থাকার ব্যবস্থা করলেন। ষোল বছর বয়সে তাঁর বিয়ের ব্যবস্থাও করা হলো। 
রাজকুমার খুব সুখে জীবনযাপন করছেন- তিনি জানেনই না যে, জীবনে দুঃখকষ্ট নামক কোনো ব্যাপার আছে। তাঁকে বার্ধক্য, জরা, মৃতু্য এবং কঠোর তপশ্চর্যা এসব থেকে দূরে রাখা হয়েছে। 
একবার সিদ্ধার্থ বাইরে বেড়াবার বাসনা প্রকাশ করলেন। দিনও নির্ধারিত হলো, তাঁর বেড়াবার যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন হলো এবং তাঁর বেড়াবার পথে ঐ চারটির কোনোটিই যেন কোনোভাবেই তাঁর সামনে না আসতে পারে সেজন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো। 
পূর্ব নির্ধারিত দিনে তিনি আয়তাকার রাজপ্রাসাদের চারটি গেটের একটি দিয়ে, ধরা যাক উত্তরের গেট দিয়েই, বাইরে বেরুলেন। কিছুক্ষণ ভ্রমণের পর তিনি ভিন্ন রকমের একটি জীব দেখতে পেলেন- জীবটি সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকে পড়া এবং কুঞ্চিত, আর তার মাথায় কোনো চুল নেই। লাঠির ওপর ভর দিয়ে হাঁটে বলে সেটাকে কোনোভাবেই হাঁটা বলা যায় না। এই ধরনের কোনো জীব রাজপুত্র এর আগে কখনো দেখেননি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন- এটি কোন ধরনের জীব! গাড়োয়ান তাকে জানালো- সে মানুষ, তবে বৃদ্ধ মানুষ, বার্ধক্য তাকে আক্রান্ত করেছে- আর আমরা বেঁচে থাকলে সবাই একদিন তার মতোই হবো। কারণ মানুষের জীবনে বার্ধক্য এক অনিবার্য সত্য। 
রাজকুমার প্রাসাদে ফিরে এলেন। তার মাথায় নানা চিন্তা। বলাবাহুল্য, রাজার এত চেষ্টার পরও সিদ্ধার্থের চোখে এই বার্ধক্য ধরা পড়ার পেছনে প্রকৃতির কারসাজি ছিলো। 
এর ছয়দিন পর তিনি আবার বেরুলেন- ধরা যাক দক্ষিণের গেট দিয়ে। এবার তিনি একটি ডোবার মধ্যে একজন লোককে দেখতে পেলেন- লোকটির মুখ বিকৃত আর সারা শরীরে সাদা সাদা দাগ, লোকটি ছিলো কুষ্ঠরোগী। যথারীতি রাজকুমার এরকম কোনো ব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না এবং জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন- লোকটি জরাগ্রস্থ, এবং আমাদের সবাইকেই জীবনের কোনো-না-কোনো পর্যায়ে এরকম জরার মুখোমুখি হতে হবে। রাজকুমার প্রাসাদে ফিরে এলেন। তাঁর মাথায় নানা জটিল চিন্তা। 
এর ছয়দিন পর তিনি আবার বেরুলেন। এবার তিনি দেখলেন একজন মৃত ব্যক্তিকে। এবার তিনি জানলেন প্রতিটি মানুষকেই একদিন মরতে হবে। মৃতু্যর সঙ্গে পরিচয় ঘটলো তাঁর। রাজকুমার প্রাসাদে ফিরে এলেন। তাঁর মাথায় নানা জটিল চিন্তা। 
এর ছয়দিন পর তিনি বেরিয়ে দেখা পেলেন এমন একজন লোকের যিনি জীবনের সকল বৈষয়িক সুখ পরিত্যাগ করে সাধনার পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁর মুখে এক আশ্চর্য দীপ্তি ও সুখ দেখে প্রাসাদে ফিরলেন সিদ্ধার্থ। 
রাজপুত্রের জীবন থেকে সকল সুখ বিদায় নিয়েছে। বার্ধক্য, জরা, মৃতু্য এবং কঠোর তপশ্চর্যা এই চারটির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটেছে। রাজপ্রাসাদের সুখ তাঁর সহ্য হচ্ছে না- মানুষের চিন্তায় তিনি ব্যাকুল। ঘরে মন টিকছেনা তাঁর। এমনই এক সময়ে তিনি খবর পেলেন- তাঁর স্ত্রী একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। সংবাদ শুনে তিনি বললেন- 'রাহুলের জন্ম হলো!' রাহুল মানে শেকল, পুত্রের জন্মকে তিনি শেকলের জন্ম হিসেবে দেখেছিলেন! এর কিছুদিন পরই তিনি ঘর ছেড়ে গোপনে বেরিয়ে গেলেন। বেরুনোর আগে তিনি স্ত্রী-পুত্রকে দেখতে গেলেন এবং রাহুলকে চুম্বন করলেন। ইচ্ছে থাকা স্বত্ত্বেও স্ত্রীকে স্পর্শ করলেন না তিনি- করলে এদের ছেড়ে চলে যেতে পারবেন না এই ভয়ে! 
যে রাতে তিনি গৃহত্যাগ করলেন সেটা ছিলো পূর্ণিমার রাত। 
এরপর তিনি কঠোর তপস্যায় নিয়োজিত হলেন। তপস্যার এক পর্যায়ে তিনি একবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। স্বর্গের দেবতারা ভয় পেলেন যে, তিনি মারা গেছেন কী না। একটি বানর মধু দান করে তাঁকে বাঁচিয়ে তুললো। 
সেটিও ছিলো পূর্ণিমার রাত। 
সাধনা করতে করতে এলো এক দীর্ঘ রাত। এই রাতের পরই সিদ্ধার্থ আর সিদ্ধার্থ থাকলেন না, হয়ে গেলেন বুদ্ধ। জগতের সকল প্রাণীর দুঃখ নিজ কাঁধে তুলে নিয়ে যিনি সবার জন্য সুখ কামনা করলেন। 
যে রাতে তিনি এই বুদ্ধুত্ব অর্জন করলেন বা নির্বাণ লাভ করলেন সেটিও ছিলো পূর্ণিমার রাত। শুধু তাই নয় তিনি মৃতু্যবরণও করেছিলেন পূর্ণিমার রাতে। 

বুদ্ধের এই কাহিনী বলে কায়সার জিজ্ঞেস করেছিল - একজন মহাপুরুষের জীবনে এতসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কেবল পূর্ণিমার রাতেই ঘটার কারণ কি, বা ব্যাখ্যা কি? 
তাদের এক বন্ধু উল্টো প্রশ্ন তুলেছিল- সত্যিই সেগুলো পূর্ণিমার রাতেই ঘটেছিল কী না, সে ব্যাপারে নিশ্চয়তা দেবে কে? 
কায়সার বলেছিল- সেটা আদৌ গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেগুলো যদি পূর্ণিমার রাতে না-ও ঘটে থাকে, গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো- বুদ্ধ এভাবেই তাঁর জীবনের ঘটনাগুলোকে বর্ণনা করেছেন। এর মানে কি এই নয় যে, বুদ্ধের কাছে পূর্ণিমা একটা বিশেষ ব্যাপার ছিলো? শুক্র যেমন একটা সাধারণ গ্রহ মাত্র, চাঁদও তো একটা উপগ্রহ মাত্র, ওটাকে নিয়ে এত আদিখ্যেতার কি মানে হয়? তারপরও চাঁদকে নিয়ে সারা জীবন ধরেই মানুষ নানারকম আদিখ্যেতা করে। সেই যে ছোটবেলা থেকে- আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা- বলে মানুষের জীবনে চাঁদের প্রবেশ ঘটে, কারো কারো সারা জীবনেই তার প্রভাব থেকে যায়। চাঁদ থেকে তার মুক্তি মেলে না। এরা হচ্ছে চাঁদে পাওয়া মানুষ। চাঁদ দেখলে এরা ভাবুক হয়ে যায়, পূর্ণিমায় হয়ে পড়ে ঘোরগ্রস্থ। আমার তো মনে হয় বুদ্ধও ছিলেন চাঁদে পাওয়া মানুষ। কোনো এক পূর্ণিমার রাতে তাঁর ঘর ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। ঘর ছাড়ার প্রবণতা তার মধ্যে আগে থেকেই ছিলো, জোৎস্না হয়তো তাকে এই ব্যাপারে আরো বেশি ইন্ধন জোগাতো, আর পূর্ণিমা তাকে করে তুলতো ঘোরগ্রস্থ-পাগলপ্রায়। জীবনের কোনো এক সময়ে এই ঘোর এত ভয়ংকরভাবে ক্রীয়াশীল হয়ে ওঠে যে, ঘর-সংসার-স্ত্রী-পুত্র-পরিজন-রাজ্য-রাজপ্রাসাদ সবই তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়, তিনি ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। শুধু তাই নয়, তাঁর জন্ম-মৃতু্য ও বুদ্ধুত্ব লাভ সবই ঘটেছিল পূর্ণিমায়- এমনকি বৌদ্ধদের সমস্ত ধর্মীয় উৎসব কোনো-না-কোনো পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করেই ঘটে। পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্মে চাঁদের এই আধিক্য তো দেখা যায় না! শুধু বুদ্ধ কেন, এরকম চাঁদে পাওয়া মানুষ আমাদের আশেপাশেও দেখতে পাওয়া যায়। চাঁদের সঙ্গে এই প্রেম যদি সম্ভব হয়, তাহলে শুকতারার সঙ্গে হতে বাধা কোথায়? 
শুকতারার সঙ্গেও আমার অমন একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল- নিজের সঙ্গেই কথা বলছিল কায়সার। কারণ, আমার মনে হতো- ওটা ঠিক আমারই মতো। একা। আমার চারপাশেও ছিলো অসংখ্য মানুষ আর তাদের হৈ-হল্লা-কোলাহল, তবু আমি ছিলাম একা। কেউ আমাকে বোঝেনি, বুঝতে চায়নি। এত বন্ধু আমার, তবু বহু কথা অকথিত রয়ে গেছে। কাউকে বলা হয়নি। কেবল মৃন্ময়ীকে একটু বলেছিলাম, কেবল ওর কাছেই নিজেকে একটু খুলে ধরতে চেয়েছিলাম। ও-ই হয়তো আমাকে বুঝেছিল খানিকটা; তবু ও আমার সঙ্গী হলো না। ও তো কখনো পেতেই চায়নি আমাকে, খানিকটা হয়তো ভালোবেসে ফেলেছিল ভুল করেই; আর আমি বেসেছিলাম পাগলের মতো। ওকে তাই কিছুতেই ভুলে যাওয়া যাচ্ছে না। মৃন্ময়ীর কথা আমি কাউকে বলতে পারিনি। ভুল হলো। বলেছিলাম দু-একজন বন্ধুর কাছে। কিন্তু ওরা ব্যাপারটাকে হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিল। ও আমার কতখানি জুড়ে আছে কেউ তা বুঝতে পারেনি বলে, আর ওর কথা কাউকে বলতে ইচ্ছে করতো বলে, শুকতারা, আমি তোমাকেই ওর সব কথা বলতাম। তুমি কি সেসব মনে রেখেছ? 
শুকতারার সঙ্গে এইভাবে একতরফা কথা বলে যাচ্ছিল কায়সার। হঠাৎ ঘড়ির দিকে চোখ পড়তে সে আঁতকে ওঠে। এত বেজে গেছে! আবিদ আজ আমাকে খেয়েই ফেলবে। 


৯. 
প্রায় শত বছর আগে জগদীশ চন্দ্র বসুও মানুষের সঙ্গে তার পরিপাশ্বর্ের সম্পর্কগুলো বুঝতে চেয়েছিলেন, আর তাঁর গবেষণাগুলো মানব-ইতিহাসে সূচনা করেছিল এক নতুন অধ্যায়ের। দুঃখজনক হলেও সত্যি, জগদীশ-প্রবর্তিত এই ধারাটি পরবর্তীকালে আর অনুসরণ করা হয়নি। আসলে তাঁর সমকালে (এবং পরবর্তীকালেও) কেউ তাঁকে বুঝতেই পারেননি। দেশেও নয়, বিদেশেও নয়। সত্যি কথা বলতে কি, তাঁর ধারায় তিনিই প্রথম এবং শেষ বিজ্ঞানী। তাঁর কোনো পূর্বসূরি নেই, নেই উত্তরসূরিও। 
ইংরেজ সরকারের প্রতাপশালী ম্যাজিস্ট্রেট ভগবান চন্দ্র বসু তাঁর পুত্র জগদীশ চন্দ্র বসুকে তখনকার রীতি-অনুযায়ী ইংরেজি স্কুলে পড়তে না পাঠিয়ে পাঠিয়েছিলেন গ্রামের সাধারণ বাংলা স্কুলে। গ্রামের জল-হাওয়া-পাখি-গাছপালা-লতাপাতাফুল অর্থাৎ সমস্ত পরিবেশ-পরিপাশর্্ব কি তাঁর পরবর্তী জীবনের এইসব অসামান্য কাজের প্রাথমিক প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল? মাঝে মাঝে এই প্রশ্ন আমার মনে জাগে। কীভাবে তিনি গাছকে ভালোবেসেছিলেন তা তিনি নিজেই লিখে রেখে গেছেন- 

আগে যখন একা মাঠে কিংবা পাহাড়ে বেড়াইতে যাইতাম, তখন সব খালি-খালি লাগিত। তারপর গাছ, পাখি, কীট-পতঙ্গদিগকে ভালোবাসিতে শিখিয়াছি, সে অবধি তাদের অনেক কথা বুঝিতে পারি, যাহা আগে পারিতাম না। এই যে গাছগুলি কোনো কথা বলে না, ইহাদের যে আবার একটা জীবন আছে, আমাদের মতো আহার করে, দিন দিন বাড়ে- আগে এসব কিছুই জানিতাম না। এখন বুঝিতে পারিতেছি। এখন ইহাদের মধ্যেও আমাদের মতো অভাব, দুঃখ-কষ্ট দেখিতে পাই। জীবনধারণ করিবার জন্য ইহাদিগকেও সর্বদা ব্যস্ত থাকিতে হয়। কষ্টে পড়িয়া ইহাদের মধ্যেও কেহ কেহ চুরি ডাকাতি করে। মানুষের মধ্যে যেরূপ সদগুণ আছে, ইহাদের মধ্যেও তাহার কিছু কিছু দেখা যায়। বৃক্ষদের মধ্যে একে অন্যকে সাহায্য করিতে দেখা যায়, ইহাদের মধ্যে একের সহিত অপরের বন্ধুত্ব হয়। তারপর মানুষের সর্বোচ্চ গুণ যে স্বার্থত্যাগ, গাছে তাহাও দেখা যায়। মা নিজের জীবন দিয়া সন্তানের জীবন রক্ষা করেন। সন্তানের জন্য জীবনদান উদ্ভিদেও সচরাচর দেখা যায়। গাছের জীবন মানুষের জীবনের ছায়ামাত্র। 
মনে হয়, গাছ নয়, মানুষ সম্বন্ধেই কথা বলছেন তিনি! 
মজার ব্যাপার হলো- তিনি ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী, জীববিজ্ঞানী নন। যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন ওই 'জড়' যন্ত্রগুলোও মানুষের মতোই ক্লান্ত হয়, বিশ্রামে সেই ক্লান্তি দূরও হয়, যেন ওই যন্ত্রের মধ্যেও প্রাণের 'সাড়া' আছে। এই পর্যবেক্ষণটিই তাঁকে জড়জগৎ সম্বন্ধে আগ্রহী করে তোলে। তখন পর্যন্ত গাছকেও জড়বস্তু বলেই গণ্য করা হতো। তিনি একইসঙ্গে দুদিকেই মনোনিবেশ করেছিলেন আর এক আশ্চর্য পদ্ধতিতে পরিমাপ করেছিলেন জড়বস্তু এবং বৃক্ষের সংবেদনশীলতা, এবং দেখেছিলেন- এই সংবেদনশীলতা মানুষের সংবেদনশীলতারই হুবহু প্রতিরূপ। গাছকে তিনি দেখেছিলেন প্রাণসম্পন্ন স্বতন্ত্র এক সত্ত্বা হিসেবে, যার 'ইতিহাস' মানুষের পক্ষে উদ্ধার করা সম্ভব নয়, যদি না গাছ নিজে তার অনুমোদন দেয়! গাছের ইতিহাস বুঝতে হলে গাছের কাছেই যেতে হবে, এবং এই ইতিহাস 'বৃক্ষের স্বলিখিত এবং সাক্ষরিত' হতে হবে- মানুষ নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে যদি গাছের ইতিহাস উদ্ধার করতে গেলে ভুল হবে কারণ, 'মানুষ তাহার স্বপ্রণোদিত ভাব দ্বারা অনেক সময় প্রতারিত হয়'- এই কথা বলে তিনি মানব-ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন। 'আমাদের মূক সঙ্গী' গাছকে তিনি দেখেছিলেন গভীর মমতার চোখ দিয়ে- 
ঘর হইতে বাহির হইলেই চারিদিক ব্যাপিয়া জীবনের উচ্ছ্বাস দেখিতে পাই। সেই জীবন একেবারে নিঃশব্দ।... চিরসহিষ্ণু এই উদ্ভিদরাজ্য নিশ্চলভাবে আমাদের সম্মুখে দণ্ডায়মান। উত্তাপ ও শৈত্য, আলো ও অন্ধকার, মৃদু সমীরণ ও ঝটিকা, জীবন ও মৃতু্য ইহাদিগকে লইয়া ক্রীড়া করিতেছে। বিবিধ শক্তি দ্বারা ইহারা আহত হইতেছে, কিন্তু আহতের কোনো ক্রন্দনধ্বনি উত্থিত হইতেছে না। এই অতি সংযত, মৌন ও অক্রন্দিত জীবনেরও যে এক মর্মভেদী ইতিহাস আছে... কি প্রকারে এই অপ্রকাশকে সুপ্রকাশ করিব? 
গাছের প্রকৃত ইতিহাস সমুদ্ধার করিতে হইলে গাছের নিকটই যাইতে হইবে। সেই ইতিহাস অতি জটিল ও বহু রহস্যপূর্ণ। সেই ইতিহাস উদ্ধার করিতে হইলে বৃক্ষ ও যন্ত্রেও সাহায্যে জন্ম হইতে মৃতু্য পর্যন্ত মুহূর্তে মুহূর্তে তাহার ক্রিয়াকলাপ লিপিবদ্ধ করিতে হইবে। এই লিপি বৃক্ষের স্বলিখিত এবং সাক্ষরিত হওয়া চাই। ইহাতে মানুষের কোনো হাত থাকিবে না; কারণ মানুষ তাহার স্বপ্রণোদিত ভাব দ্বারা অনেক সময় প্রতারিত হয়।... 
এবং গাছের সামান্য একটি শাখা বা ফুল বা পাতা যে কেবল বর্তমানেরই নয়, বরং সহস্র বছরের ইতিহাস বহন করছে সেই কথাটিও বললেন প্রথমবারের মতো। এমনকি গাছের মৃতু্য-বর্ণনাও তাঁর হাতে যে-কোনো মানুষের মৃতু্য বর্ণনার মতোই হৃদয়স্পর্শী ও মর্মভেদী হয়ে উঠলো- 
প্রতি জীবনে দুইটি অংশ আছে। একটি অজর, অমর; তাহাকে বেষ্টন করিয়া নশ্বর দেহ। এই দেহরূপ আবরণ পশ্চাতে পড়িয়া থাকে, অমর জীববিন্দু প্রতি পুনর্জন্মে নূতন গৃহ বাঁধিয়া লয়। সেই আদিম জীবনের অংশ, বংশপরস্পরা ধরিয়া বর্তমান সময় পর্যন্ত চলিয়া আসিয়াছে। আজ যে পুষ্প-কলিকাটি অকাতরে বৃন্তচু্যত করিতেছি, ইহার অণুতে কোটি বৎসর পূর্বের জীবনোচ্ছ্বাস নিহিত রহিয়াছে।... 
পরিশেষে উদ্ভিদের জীবনে এরূপ সময় আসে যখন কোনো এক প্রচণ্ড আঘাতের পর হঠাৎ সমস্ত সাড়া দিবার শক্তির অবসান হয়। সেই আঘাত মৃতু্যর আঘাত। কিন্তু সেই অন্তিম মুহূর্তে গাছের স্থির সি্নগ্ধ মূর্তি ম্লান হয় না। হেলিয়া পড়া কিংবা শুষ্ক হইয়া যাওয়া অনেক পরের অবস্থা। মৃতু্যর রুদ্র-আহ্বান যখন আসিয়া পেঁৗছে তখন গাছ তাহার উত্তর কেমন করিয়া দেয়? মানুষের মৃতু্যকালে যেমন একটা দারুণ আক্ষেপ সমস্ত শরীরের মধ্য দিয়া বহিয়া যায়, তেমনি দেখিতে পাই,অন্তিম মুহূর্তে বৃক্ষদেহের মধ্য দিয়াও একটা বিপুল কুঞ্চনের আক্ষেপ প্রকাশ পায়। 

বহুকালের চর্চিত জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করতে গিয়ে তাঁকে বহু বাধা-বিপত্তির সম্মুখিন হতে হয়েছিল। তবু হাল ছাড়েননি, অসামান্য দৃঢ়তায় দেখিয়ে দিয়েছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যেও জ্ঞান-চর্চার পার্থক্য, আর পরিশেষে তিনি দেখেছিলেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে বহুবিধ শাখা প্রসারিত হয়েছে, তার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য আসলে একটিই- জীবন ও পৃথিবীর রহস্য অনুসন্ধান; বহুত্বের মধ্যে 'এক'-এর সন্ধান- 
পাশ্চাত্য দেশে জ্ঞানরাজ্যে এখন ভেদবুদ্ধির অত্যন্ত প্রচলন হইয়াছে। সেখানে জ্ঞানের শাখা-প্রশাখা নিজেকে স্বতন্ত্র রাখিবার জন্যই বিশেষ আয়োজন করিয়াছে; তাহার ফলে নিজেকে এক করিয়া জানিবার চেষ্টা এখন লুপ্তপ্রায় হইয়াছে।... অপরদিকে বহুর মধ্যে এক যাহাতে হারাইয়া না যায়, ভারতবর্ষ সেইদিকে সর্বদা লক্ষ্য রাখিয়াছে।... 
এই যে প্রকৃতির রহস্য-নিকেতন, তাহার নানা মহল, ইহার দ্বার অসংখ্য। প্রকৃতি-বিজ্ঞানবিৎ, রাসায়নিক, জীবতত্ত্ববিৎ ভিন্ন ভিন্ন দ্বার দিয়া এক-এক মহলে প্রবেশ করিয়াছেন; মনে করিয়াছেন সেই সেই মহলই বুঝি তাঁহার বিশেষ স্থান, অন্য মহলে বুঝি তাহার গতিবিধি নাই। তাই জড়কে, উদ্ভিদকে সচেতনভাবে তাহারা অলঙ্ঘ্যভাবে বিভক্ত করিয়াছেন। কিন্তু এই বিভাগকে দেখাই যে বৈজ্ঞানিক দেখা, এ কথা আমি স্বীকার করি না। কক্ষে কক্ষে সুবিধার জন্য যত দেয়াল তোলাই যাক না, সকল মহলেরই এক অধিষ্ঠাতা। সকল বিজ্ঞানই পরিশেষে সেই সত্যকে আবিষ্কার করিবে বলিয়া ভিন্ন ভিন্ন পথ দিয়া যাত্রা করিয়াছে। সকল পথই যেখানে একত্রে মিলিয়াছে সেইখানেই পূর্ণ সত্য। সত্য খণ্ড খণ্ড হইয়া আপনার মধ্যে অসংখ্য বিরোধ ঘটাইয়া অবস্থিত নহে। সেইজন্য প্রতিদিনই দেখিতে পাই জীবতত্ত্ব, রসায়নতত্ত্ব, প্রকৃতিতত্ত্ব আপন আপন সীমা হারাইয়া ফেলিতেছে।... 
বৈজ্ঞানিক ও কবি, উভয়েরই অনুভূতি অনির্বচনীয় একের সন্ধানে বাহির হইয়াছে। প্রভেদ এই- কবি পথের কথা ভাবেন না, বৈজ্ঞানিক পথটিকে উপেক্ষা করেন না।... 
এই আমাদের মূক সঙ্গী, আমাদের দ্বারের পাশ্বর্ে নিঃশব্দে যাহাদের জীবনের লীলা চলিতেছে তাহাদের গভীর মর্মের কথা তাহারা ভাষাহীন অক্ষরে লিপিবদ্ধ করিয়া দিল, এবং তাহাদের জীবনের চাঞ্চল্য ও মরণের আক্ষেপ আজ আমাদের দৃষ্টির সম্মুখে প্রকাশিত করিল। জীব ও উদ্ভিদের যে কৃত্রিম ব্যবধান রচিত হইয়াছিল তাহা দূরীভূত হইল। কল্পনারও অতীত অনেকগুলি সংবাদ আজ বিজ্ঞান স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করিয়া বহুত্বের ভিতরে একত্ব প্রমাণ করিল। 
হায়, প্রকৃতির রহস্য অনুসন্ধানে আজীবন নিজেকে ব্যয় করে দিয়েছিলেন যিনি, 'বহুত্বের মধ্যে একত্বের সন্ধান' করেছিলেন যিনি, তাঁকেই প্রকৃতি উপহার দিয়েছিল অকৃত্রিম নিঃসঙ্গতা। শেষ জীবনে কারো সঙ্গেই কথা বলতেন না তিনি, কথা বলার মানুষই ছিলো না আসলে! 

১০. 
কায়সার দ্রুত হাঁটলো, অনেক দেরি হয়ে গেছে, আবিদ খেপে কাঁই হয়ে যাবে!। কিন্তু আবিদের দেখা পাওয়া গেলো না। ও এসে চলে গেছে, নাকি আসেইনি- বোঝা যাচ্ছে না। এরকম অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকার কোনো মানে হয় না। সে তাই আজিজ মার্কেটের দিকে রওনা হলো। এতদিন পরে যেহেতু এদিকে আসাই হলো তাহলে ওদিকটায় একটু ঢুঁ মারা যাক। আজিজ মার্কেটের চেহারা অনেক পাল্টে গেছে। তারা যখন আড্ডা মারতো তখন এত জমজমাট ছিলো না। মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে সে এদিক-ওদিক খুঁজে দেখলো- কোনো পরিচিত মুখ চোখে পড়ে কী না! না, সবই নতুন মুখ। এমনই হয়, এটাই নিয়ম। নতুনরা এসে পুরনোদের হটিয়ে দেয়। যেমন তারা দিয়েছিল তাদের আগের প্রজন্মকে। আড্ডার বন্ধুরা হয়তো এখন আর এখানে আসেই না। হয়তো তারাও তারই মতো জীবনের নানা জটিলতায় আটকে গেছে, কিংবা আড্ডার নতুন কোনো জায়গা খুঁজে নিয়েছে। সে চলে যাবার কথা ভাবছিল- তখনই দেখা হলো জামিলের সঙ্গে। একসময় খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিলো তাদের, তুমুল আড্ডায় অনেকটা সময় কেটে গেছে ওর সঙ্গে। সেইসব দিন! এখন বিশ্বাসই হতে চায় না। জীবন অমন ছিলো! জামিল বেশ কিছুক্ষণ কোনো কথাই বলতে পারলো না, যেন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছে। তারপর বললো- 
তুই বেঁচে আছিস! আমি ভেবেছিলাম বেহেশতের হুরদের সঙ্গে রংতামাশা করছিস! 
না রে বেঁচেই আছি, আর মরলেও তো বেহেশত জুটবে না, নির্ঘাত দোজখে যাবো। তাতে অবশ্য আপত্তি নেই। ওখানেও নিশ্চয়ই ঐশ্বরিয়া বা মাধুরীর মতো হুররা থাকবে! আমার তাতেই চলবে। বেহেশতের হুরদের চেয়ে মাধুরী কম কিসে? 
তুই সিওর হলি কিভাবে যে মাধুরী দোজখেই যাবে? 
বেহেশত-দোজখের যে কনসেপ্ট, অর্থাৎ যা যা করলে বেহেশত বা দোজখ প্রাপ্তি ঘটে বলে জানি আমরা, তা বিশ্লেষণ করে বলা যায়, মাধুরীর বেহেশতে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। 
তুই কিন্তু আগে উল্টোটা বলতি! 
কি বলতাম? 
বলতি- তুই বেহেশতেই যাবি, মাধুরীও যাবে। তুই যাবি- কারণ তুই একজন পারফেক্ট ভালোমানুষ, আর মাধুরী যাবে ওর রূপের জন্য। এত রূপসী একটা মেয়েকে আল্লা নাকি দোজখে পাঠাতেই পারবে না। মরার পর নাকি ওকে হুর পদে নিয়োগ দেয়া হবে! এখন নিজের দোজখে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখে মাধুরীকেও নিয়ে যেতে চাইছিস, ব্যাপারটা খুব আনফেয়ার হচ্ছে দোস্ত! 
তাতে তোর আপত্তি কি? আমি যেখানেই যাই মাধুরীকেও যদি সেখানে নিয়ে যেতে চাই, তাতে তোর সমস্যা কোথায়? 
সমস্যা হলো- মাধুরী বেহেশতে যাবে, তোর এই কথা শুনে আমিও বেহেশতে যাবার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম, এখন তুই বলছিস উল্টোটা! 
তাতে কি! এবার দোজখে যাওয়ার জন্য চেষ্টা কর। অবশ্য চেষ্টা করার দরকার নেই, ওখানে চাইলেই যাওয়া যায়, খুবই সহজ। বেহেশতে যাওয়াই বরং কঠিন। 
আমি যে দোস্ত এর মধ্যেই অনেক ভালো কাজ করে ফেলেছি, এই জন্য যদি বেহেশতে চলে যাই! আমার ভয় লাগছে রে কায়সার। তুই আমাকে কথা দে, মাধুরীকে নিয়ে যাবার সময় আমাকেও নিয়ে যাবি, আমাকে ফেলে তুই কিছুতেই দোজখে যেতে পারবি না। 
জামিল রীতিমতো অনুনয়ের সুরে বললো। কায়সার বললো- তোকে নিয়ে গেলে আবার মাধুরীকে নিয়ে আমার সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি করবি না তো? 
না, খোদার কসম! করবো না। 
আচ্ছা ঠিক আছে যা, তোকে নিয়েই যাবো। 
বাঁচালি। জামিল স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। তারপর বললো- কেমন আছিস বল! আসিস-টাসিস না কেন? 
সে অনেক কথা। বরং অন্য সবার খবর বল। কাউকেই দেখছি না। কেউ এদিকে আসে না, নাকি! 
চল ওপরে যাই। বলছি সব। 
ওপরে মানে দোতলা। তারা আগে নিচতলাতেই আড্ডা দিতো। দোতলায় গিয়ে অবশ্য অনেককেই পাওয়া গেলো। তার মানে আড্ডার জায়গা বদলেছে। 'নিচতলা এখন অপেক্ষাকৃত তরুণদের দখলে। আর দোতলা আমাদের'- জামিল একে একে সবার খবর দিতে দিতে বলছিল- 'টোকন এখন আর এদিকে আসে না, সিনেমা বানানো নিয়ে ব্যস্ত, কামু-মারজুকও টিভি নাটকে মজে গেছে, অথচ ওরা একসময় বলতো- কবিতার জন্য এই শহরে এসেছে! কী অদ্ভুত না! আলফ্রেডও খুব ব্যস্ত, ভালো ভালো টিভি অনুষ্ঠান বানাচ্ছে। ব্রাত্যও খুব একটা আসে না, সম্পাদক হয়েছে তো, এখন কবিতা লেখার চেয়ে ওটাই ওর কাছে বড় কাজ। অনেকখানি বদলে গেছে ও-ও। আগের চেয়ে অনেক স্থির, চুপচাপ। প্রশান্ত, কামাল, খোকন কায়সার বিয়ে করেছে, বাবাও হয়েছে। তিনজনেই ছেলের বাবা। গর্বে ওদের মাটিতেই পা পড়ে না, ছেলের বাবা বলে কথা! প্রশান্ত সিলেটে, খোকন চট্টগ্রামে- কালেভদ্রে দেখা যায়! কামালও খুব একটা আসে না, ওর আসলে কিছু হবে না, আগেই বলেছিলাম! শামীম সাময়িকী সম্পাদনা আর প্রকাশনা নিয়ে ব্যস্ত, এখনো আড্ডায় নিয়মিত, লিখছেও খুব। জাফর আর নন্দিতা ঘর বাঁধার পর এ এলাকায় আসা বন্ধ করে দিয়েছে। মুজিব এখনো শুধু লিটল ম্যাগাজিনে লিখবে বলেই গোঁ ধরে আছে, মজনু ইতালিতে গেছে, নজরুল আগের মতোই, নতুন একটা লেখা না লিখেও লেখক সেজে বসে আছে!' ইত্যাদি। পরে বললো, 'তোর খবর বললি না তো! তোর হয়েছেটা কি? এদিকে আসিস না, বহুদিন লিখছিসও না। শীতঘুম দিচ্ছিস নাকি?' 
কায়সার প্রসঙ্গ এড়াতে চাইলো। মনে হলো- কী হয়েছে, একথা বলতে গেলে এক ইতিহাস হয়ে যাবে। তাছাড়া তার ব্যক্তিগত জীবনের এতসব দুর্ঘটনার কথা বলে লাভই বা কি? সেই সুযোগও অবশ্য নেই। তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক খুব একটা এগোয়নি। এত দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাটিয়েও তারা পরস্পরের ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে খুবই কম জানতো। সত্যি বলতে কি, প্রায় কিছুই জানা ছিলো না। তার জীবনে এতসব দুর্ঘটনা ঘটে গেছে এরা তার সামান্যই জানে, আসলে জানার চেষ্টাই করেনি। এর জন্য অবশ্য সে কাউকে দায়ী করে না। সেও তো কারো জীবনের গল্প জানে না। এইসব ঘটনা যদি তার জীবনে না ঘটে অন্য কারো জীবনে ঘটতো, আর সে লেখালেখি-আড্ডাবাজি ছেড়ে দিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতো, তাহলে কায়সারও হয়তো নিজে থেকে তার খোঁজখবর নিতে যেত না। সম্পর্কের ধরনটাই এমন- কেউ কারো ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে কিছুই জানবে না- ওসব নিয়ে যেন আলাপ করাও নিষেধ। 
তাদের কথা বলার মধ্যেই কয়েকজন তরুণ এলে আর জামিল ওদের সঙ্গে কায়সারের পরিচয় করিয়ে দিলে ওদের উচ্ছ্বাস কায়সারকে অবাক করে দেয়- 
আপনিই কায়সার ভাই! মাই গুডনেস। আপনার কথা কত শুনেছি! আপনি তো আমাদের কাছে রীতিমতো হিরো। 
কেন? হিরো কেন? 
কেন নয়! এখন একজন তরুণ গল্প লিখতে আসবে আর আপনার কথা জানবে না, তা কি হয়? কিন্তু কায়সার ভাই, আপনার কথা কেবল শুনেই গেলাম, আপনার সবগুলো গল্প আর পড়া হলো না। আপনি তো ইদানিং আর লেখেনই না। আপনার তো ওই একটাই বই, আর কোনো বইও করেননি, না? 
নাহ! 
কেন? 
সুযোগ হয়নি। কিংবা বলতে পারো, প্রয়োজন বোধ করিনি। 
কেন? আপনার কি কখনো মনে হয়নি যে, আপনার পরে যারা আসবে অন্তত তাদের জন্য হলেও এসব গল্প গ্রন্থিত হয়ে থাকা দরকার? 
নিজেকে অতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করিনি কখনো। করার কারণও ছিলো না। তাছাড়া লেখালেখিতে নিয়মিত থাকলে বই এমনিতেই হয়ে যেত। আলাদাভাবে ভাবার দরকার হতো না। 
তাহলে ছাড়লেন কেন? 
ছেড়েছি বলা যায় না। একটু বিশ্রাম নিচ্ছি বলতে পারো। আমি তো লিখতেই চাই। সারাজীবন শুধু লিখতেই চেয়েছি, আর কিছু নয়। এবার হয়তো আবার আমার লেখা দেখতে পাবে তোমরা। 
সুখবর কায়সার ভাই। কিন্তু আপনার পুরনো গল্পগুলো কিভাবে পড়তে পারি বলেন তো! 
আমার কাছ থেকে নিয়ে পড়তে পারো। 
আপনি দিলে তো খুবই ভালো হয়। আমরা তাহলে আপনার বাসায় আসবো কায়সার ভাই। 
নিশ্চয়ই। 
কবে আসবো বলুন! 
যে-কোনোদিন, তবে সন্ধ্যার পরে, নইলে পাবে না। 
আচ্ছা তাই হবে। আপনার সাথে কথা বলতে পেরে ভালো লাগছে, আপনি মাঝে মাঝে আসবেন কিন্তু। আপনার বন্ধুরা না দিলেও আমরা আপনাকে সময় দেবো। 
শেষ কথাটা বন্ধুদেরকে খোঁচা মেরে বলা- বোঝা গেলো। 
জামিল বললো- ওদের খোঁচা মারার রাইট আছে। ওরা অনেকদিন তোর কথা আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করেছে। আমরা কিছুই বলতে পারিনি। জানলে তো বলবো! তুই তো ডুব দিয়ে আছিস। তবে দোস্ত যাই বলিস- ডুব দিয়ে তুই ভালোই করেছিস। তোর সম্বন্ধে একটা মীথ খাড়া হয়েছে। আমাদের সময়ে তো অনেক গল্পকারই আছে- কিন্তু তোকে নিয়ে ওদের যে কৌতূহল সেটা আর কারো সম্বন্ধে দেখা যায় না। আর শুনলিই তো- ওরা তোর সব গল্প না পড়েই তোর ভক্ত! এটা হওয়ার কারণ হলো- ওরা লিখতে আসার পর থেকেই তোর নাম শুনছে। যাকগে, সত্যি আবার লেখা শুরু করছিস? 
কিছু বলবে না মনে করেও কায়সার বললো- লেখার চেষ্টা তো করছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর হয়ে উঠছে না। বড়ো ক্লান্ত হয়ে আছি রে দোস্ত, বড়ো ক্লান্ত। 
কায়সারের কণ্ঠ থেকে সত্যি ক্লান্তি ঝরে পড়েছিল। জামিল আর কোনো কথা না বলে চুপ করে রইলো। পরস্পরের ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে কিছু না জানলেও এই সম্পর্ক এমন যে, একটা বাক্য থেকে একটা জীবন বুঝে নেয়ার চেষ্টা করা হয়। 
আজিজ মার্কেট আস্তে-ধীরে খালি হয়ে আসছে। আগে এত তাড়াতাড়ি খালি হতো না। জামিল বললো- চল পিজির মোড়ে গিয়ে দাঁড়াই। 
তুই কি আরো কিছুক্ষণ থাকবি? 
আমি সবসময়ই আছি। এখন পর্যন্ত আমিই হচ্ছি শেষ আড্ডাবাজ। কি করবো বল, কাউকে না কাউকে তো এই দায়িত্বও নিতে হবে! কে কখন আসে আর কাউকে না পেয়ে মন খারাপ করে চলে যায়, এই বিবেচনায়ই প্রতিদিন আসি। এই যেমন দ্যাখ, আজকে তুই এসে কাউকে না পেলে মন খারাপ হয়ে যেত না! 
হঁ্যা, তুই তো সারাজীবনই বেশ জনদরদী। তার চেয়ে বেশি নারী দরদী! তা, তোর এই স্কীম কেমন চলছে? 
তুই অন্তত আমাকে এভাবে বলিস না, আমি তো এটা তোর কাছে থেকেই শিখেছি। 
আমার কাছে? আমি আবার নারী দরদী ছিলাম কবে? 
তা না থাকলেও থিয়োরিতে তো ওস্তাদ ছিলি। তুই একবার খুব সম্পর্কবোধ নিয়ে কথা বলা শুরু করলি, মনে আছে? শুধু শুরু করলি বললে ভুল হবে, বরং বলা ভালো, ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের সবাইকে ভাবতে বাধ্য করলি। তখন তুই বলতি- একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের সম্পর্ক কখনো একমাত্রিক হতে পারে না, এটা অবশ্যই বহুমাত্রিক ব্যাপার। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে- আমরা সম্পর্ককে একমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে চাই, সংজ্ঞায়িত করতে চাই। আর এজন্যই আমরা একেকটা সম্পর্ককে একটা মাত্র নাম দিয়ে চিনে নিতে চাই। কিন্তু সব সম্পর্ককের কি নাম দেয়া সম্ভব? এমন অনেক সম্পর্ক কি নেই যাকে ঠিক বন্ধুত্ব বলা যায় না, আবার কেবলমাত্র পরিচিতও তারা নয়, বলা যায় এ দু'য়ের মাঝামাঝি কিছু! তার মানে এটা একটা ট্র্যানজিশন পিরিয়ড। অর্থাৎ সম্পর্কটা বন্ধুত্বের দিকে টার্ন নিতে পারে, আবার নষ্টও হয়ে যেতে পারে, কিংবা একই জায়গায় স্থিরও থাকতে পারে। কিন্তু এমন একটা ট্র্যানজিশন পিরিয়ডকেও আমরা বন্ধুত্ব বলে অভিহিত করি। আবার একজন যুবকের সঙ্গে একজন যুবতীর সম্পর্ককেও আমরা কোনো-না-কোনো নাম দিতে চাই- প্রেম, বন্ধুত্ব, কিংবা দাম্পত্য সম্পর্ক ইত্যাদি। কিন্তু আমরা আমাদের অভিজ্ঞতার দিকে তাকালেই দেখতে পাবো- আসলে সব সম্পর্কের নাম হয় না, নাম দেয়া যায় না। কেউ কেউ আছে বন্ধু নয়, প্রেমিকাও নয় কিন্তু সম্পর্কটা অসাধারণ মধুর- সেই সম্পর্কের নাম কি? এরকম সমস্যায় আমরা প্রায় সবাই পড়েছি। সমস্যাটা সম্পর্কের নাম নিয়ে, সংজ্ঞা নিয়ে নয়- ছোটবেলা থেকেই এই সমস্যা আমাদেরকে ফেইস করতে হয়। অমুকের সাথে তোমার কি সম্পর্ক- এই ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি আমাদের সবাইকেই কোনো-না-কোনো সময় হতে হয়েছে এবং কোনো সদুত্তর দিতে না পেরে বিব্রত হয়ে চুপ করে থাকতে হয়েছে। উত্তর দিতে পারিনি, কারণ আমরা ওসব সম্পর্কের নাম জানতাম না। কিন্তু আমরা যদি মেনে নিতাম, কোনো কোনো সম্পর্ক অসংজ্ঞায়িতও হতে পারে, তাহলে সম্ভবত এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যেত। 
তোর এতসব কথা মনে আছে? 
না থাকার কি হলো? ব্যাপারটা আমাদেরকে খুব ভাবিয়ে তুলেছিল না! ওই সময়ই তো আমরা তোকে আমাদের কালের ফিলোসোফার বলে ডাকা শুরু করলাম, ভুলে গেছিস! 
হঁ্যা জামিল, আমি সব ভুলে গেছি। 
কায়সারের গলায় বিষণ্নতা কিংবা বিপন্নতা বা অন্যরকম কিছু একটা ছিলো। কিংবা একবাক্যে বহু কথা বলার যে পুরনো অভ্যাসের সঙ্গে তার বন্ধুরা পরিচিত সেটাই আবার শুনতে পেলো জামিল- তার মানে এ বিষয়ে আর কোনো কথা নয়। জামিল তাই চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর একটু বিরতি দিয়ে বললো- আমি জানি না তুই কেন লেখালেখি ছেড়ে আছিস, কেন এদিকে আর আসিস না, কিন্তু বুঝতে পারি- বড় রকমের কোনো সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিস। আমরা কখনো আমাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলিনি, এখন নতুন করে সেটা হয়তো সম্ভবও না। কিছু জিজ্ঞেস করতে অস্বস্তি লাগে। কিন্তু আমার মনে হয়, তুই যদি এভাবে বিচ্ছিন্ন না থেকে যোগাযোগটা রাখতি, আড্ডা-টাড্ডা দিতি তাহলে অনেক ফ্রি থাকতে পারতি, হয়তো তোর লেখালেখিটাও বন্ধ করতে হতো না। আমরা সবাই তো কোনো-না-কোনো সমস্যার ভেতর দিয়ে যাই। তাই না! কারো কারোটা হয়তো সাংঘাতিক ভারি হয়ে ওঠে, সেটা তখন তার একার পক্ষে বহন করা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এইরকম সংকটের মুহূর্তে আমরা বন্ধুদের কাছে যাই, হয়তো সমস্যার কথাটা বলি না, তবু শান্তি পাই এই ভেবে যে, আমার বন্ধুরা আছে- এখানে আমি একা নই। তোর সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান হয়তো আমাদের কাছে নেই, কিংবা সেগুলো আমাদের কাছে বলার মতো নয়, হয়তো ওই পার্টিকুলার ব্যাপারগুলোতে আমাদের কিছু করারও নেই। আমাদের যা আছে তা হলো আন্তরিকতা আর ভালোবাসা। আমরা যারা এই শহরে বহিরাগত, তাদের এই বন্ধু ছাড়া আর আছেটা কি বল? 
এটা নিয়ে অনেক কথা বলা যায় জামিল। কিন্তু এই মুহূর্তে বলতে ইচ্ছে করছে না। শুধু বলতে পারি- বন্ধুত্বের একটা দায় এবং দাবিও তো থাকে, থাকে দায়িত্বও- একজন কেউ যখন দুঃসময়ের ভেতর দিয়ে যায়, তখন তার বন্ধুদের উচিত তাকে সেখান থেকে বের করে আনা। তাকেই কেন বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, বন্ধুরা করতে পারে না? 
তোর এই অভিযোগ আমি মেনে নিচ্ছি। কিন্তু আমাদের সম্পর্কের এই ধরনগুলো তো অন্য সবার চেয়ে তুই-ই ভালো বুঝতি। তোর তাহলে এই অভিযোগ কেন? তুই কি জানতি না যে আমরা এমনই! তাছাড়া আমরা তো সচেতনভাবেই ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলো অ্যাভয়েড করে যেতাম ... 
সেটা আমিও মানি, কিন্তু ওই প্রসঙ্গ ছাড়াও তো যোগাযোগ করতে পারতি... 
হঁ্যা, এটা আমাদের ভাবা উচিত ছিলো... 
যাকগে, বাদ দে, এতদিন পরে দেখা হলো, আজকেই এসব নিয়ে আলোচনা না করলেও চলবে... তারচেয়ে যা নিয়ে কথা হচ্ছিল তাই নিয়ে বল। 
কি নিয়ে কথা হচ্ছিল? 
ওই যে তোর নারী ও সম্পর্ক নিয়ে। 
ও হঁ্যা, তা দোস্তো এটা তো আমি তোমার কাছ থেকেই শিখছি। সম্পর্ক যে বহু ধরনের হয়, সম্পর্কের যে ট্র্যানজিশন পিরিয়ড থাকে, এটা তো ওদের শিখাইতে হইবো, নাকি! নইলে ওরা এইসব জানবো কৈত্থেইকা? এইসব জটিল বিষয় জানানোর দায়িত্বও তো কাউরে না কাউরে নিতে হইবো! আমি সেইটাই নিছি। একেকজনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক তৈরি হয়, আর আমি সেইটারে একটা পর্যায় পর্যন্ত টাইনা নিয়া ছাইড়া দেই। যেন ওরা বিষয়টা ভালোভাবে বুঝতে করতে পারে। 
মহান কর্মকাণ্ড! তুমি তো মামা মহামানব হইয়া যাইবা দেখতাছি!- জামিলের ইয়ার্কির জবাবে কায়সারও টিপ্পনি কাটতে ছাড়লো না! 
জামিলকে কায়সারের ঈর্ষা হচ্ছিল। একদম আগের মতো আছে। সেইরকম কৌতুকপ্রবণ, আড্ডাবাজ, সিরিয়াস ভঙ্গিতে ইয়ার্কি করার পুরনো ভঙ্গি ইত্যাদি। সে প্রায় কারোরই কোনো খোঁজখবর রাখে না অনেক দিন ধরে- ওরা কেমন আছে, কী করছে, কতটুকু এগোলো লেখালেখিতে- কিছুই না। এখনো আগের মতো সেইরকম পারস্পরিক ঈর্ষা, দূরত্ব আর ভুল-বোঝাবুঝি আছে কী না, তাও না। পত্রপত্রিকায় বন্ধুদের কবিতা কি গল্প প্রকাশিত হলে হয়তো পড়ে নেয়, কখনো কখনো খুব ভালো লেগে গেলে জানাতে ইচ্ছে করে, কিন্তু হয়ে ওঠে না। 

১১. 
সমসাময়িকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে সময় লাগলেও বেশ অল্প বয়সেই অগ্রজদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম আমি, এবং তাঁদের সঙ্গে চমৎকার একটা সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল আমার। অগ্রজরা তো আর নিজে থেকে অনুজদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েন না, এজন্য আমাকেই উদ্যোগী হতে হয়েছিল। শামসুর রাহমান, সৈয়দ হক, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হক, রাহাত খান, আহমদ ছফা, হুমায়ূন আজাদ, মোহাম্মদ রফিক, মান্নান সৈয়দ, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, মঈনুল আহসান সাবের, ইমদাদুল হক মিলন- এঁরা সবাই নানা সময়ে সম্ভাবনাময় লেখক হিসেবে নাম উল্লেখ করে আমাকে খানিকটা খ্যাতিমানও করে তুলেছিলেন। সবার সঙ্গে একরকম সম্পর্ক ছিলো না আমার, বলাই বাহুল্য। শামসুর রাহমান যতটা বন্ধুসুলভ ছিলেন, সৈয়দ হক তা নন। বরং তাঁর মধ্যে সবসময় এক ধরনের পিতৃসুলভ স্নেহ দেখেছি বরাবর। সহজ-স্বাভাবিক আচরণ সত্ত্বেও হাসান ভাই বা রাহাত ভাইয়ের সঙ্গেও একটা দূরত্ব রয়েই গেছে। ছফা ভাই ছিলেন উদাত্ত, খানিকটা পাগলাটেও বটে। হুমায়ুন আজাদও তাই। 
কবিরা স্বভাবসুলভ, কখন যে কোন মুডে থাকেন বলাই মুশকিল। 
আমার সম্পর্ক সবচেয়ে জমে উঠেছে মাহমুদুল হক ওরফে বটু ভাইয়ের সঙ্গে। এর কারণ হয়তো বহুবিধ। তার মধ্যে একটি নিশ্চিতভাবে এই যে, একজন লেখক খ্যাতির তুঙ্গে থাকা অবস্থায় কীভাবে লেখা ছেড়ে দেয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন- এই কৌতূহল ও প্রশ্ন! কী এক অজানা কারণে, দীর্ঘদিন ধরে, তিনি নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন তাঁর অতিপ্রিয় সাহিত্যের জগৎ থেকে, অবলম্বন করে চলেছেন এক রহস্যময় নীরবতা, বেছে নিয়েছেন স্বেচ্ছানির্বাসন! কিছু লেখেন না তো বটেই, এ সম্বন্ধে কোনো কথাবার্তাও বলেন না কারো সঙ্গে। সাক্ষাৎকার দেয়ার ব্যাপারে, পত্রপত্রিকার মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারে তার অনীহার কথা এখন সবাই জানে। 'বাংলা গদ্যে প্রভুত্ব করার ক্ষমতা' নিয়ে যিনি আবিভর্ূত হয়েছিলেন, সেই বটু ভাই গত ২৪ বছরে একটিমাত্র গল্প ছাড়া আর কিছুই লেখেননি! এখন প্রায় সারা দিনরাত নিজের ঘরে একা বসে থাকেন তিনি, কোথাও যান না, কারো সঙ্গে মেশেন না, মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেন না, সময় কাটান বই পড়ে বা ব্যালকনিতে বসে রাস্তায় মানুষের স্রোত দেখতে দেখতে। তবে কেউ তাঁর বাসায় গেলে খুশি হন, আড্ডায় মেতে উঠতে পছন্দ করেন, গল্পের স্রোতে ভাসিয়ে দেন তাকে- যদি সুস্থ থাকেন। কত বিষয় নিয়ে যে কথা বলেন তিনি! বিশেষ করে যখন তাঁর লেখক জীবনের স্মৃতিচারণ করেন, তখন যেন পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর দশকের ঢাকা শহর, এর সাহিত্যিক পরিমণ্ডল আর সাহিত্যের মানুষগুলো একেবারে জীবন্ত হয়ে ওঠে। বহুদিন আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি, বুঝে উঠতে চেয়েছি- কেন এত শক্তিশালী কলমটিকে তিনি খাপবন্দি করে রেখেছেন! এ বিষয়ে তিনি মুখ খুলতে চান না মোটেই, প্রশ্নটি করলে এড়িয়ে যান, গল্পের মুখ ঘুরিয়ে দেন এমনভাবে যে প্রশ্নকর্তা ভুলেই যান- তিনি কী প্রশ্ন করেছিলেন! 
জিগাতলার যে বাসাটিতে থাকেন তিনি, সেটি এতই সাধারণ আর বৈশিষ্ট্যহীন যে, কারো পক্ষে ধারণা করাও সম্ভব নয়- এখানে এত বড়ো একজন লেখক বাস করেন! আপনি যদি কখনো যান সেখানে, মৃদুহাস্যে সম্ভাষণ জানাবেন তিনি, অপরিচয়ের দূরত্ব কয়েক মিনিটেই কেটে যাবে তাঁর আন্তরিকতায় এবং অচিরেই মেতে উঠবেন তুমুল আড্ডায়- ভেসে যাবেন তাঁর গল্পের স্রোতে। তাঁর লেখার মতোই তাঁর কথা বলার ঢংটিও জাদুকরি, একবার সেটি শুরু হলে আপনার বেরিয়ে আসা কঠিন হবে, পাঁচ-ছঘণ্টা এমন এক ভঙ্গিতে গল্প চলবে যে, আপনি বুঝতেই পারবেন না- কখন এতখানি সময় কেটে গেছে! 
তাঁর সঙ্গে এত এত কথা হয়, কিন্তু আমার ভেতরে উন্মুখ হয়ে থাকে তাঁর লেখালেখি বন্ধ করার বিষয়টি। কেন আর লেখেন না- এ বিষয়ে কি সত্যিই তিনি কোনোদিন কিছু বলবেন না? তারপর একদিন অপেক্ষার পালা শেষ হলো, তিনি তাঁর ক্লান্তির কথা বললেন, বললেন ব্রেকডাউন অব কমিউনিকেশনের কথাও- 

লিখতে লিখতে একসময় একঘেঁয়েমিতে ভুগছিলাম আমি, তাছাড়া এসবকিছুকে ভীষণ অর্থহীনও মনে হচ্ছিল আমার কাছে। কি করছি, কেন করছি, এসবের ফলাফল কি, আদৌ এসব করার কোনো অর্থ হয় কী না - এইসব আর কি! সব মিলিয়ে লেখালেখিটা আর ভালোলাগেনি। অবশ্য একেবারে পরিকল্পনা করে, সিদ্ধান্ত নিয়ে লেখালেখি বন্ধ করেছিলাম তা নয়। এরকম তো সব লেখকেরই হয় যে, মাঝে মাঝে ক্লান্তি আসে, মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে করে, মাঝে মাঝে বন্ধ্যাত্নও দেখা দেয়। আমার সেটাই হয়েছিল। কিন্তু সব লেখকই সেই সময়টি পেরিয়ে আবার লেখালেখিতে ফিরে আসেন। আমার আর ফিরে আসা সম্ভব হয়নি...। আমার এখন ক্লান্ত লাগে, ভীষণ ক্লান্ত লাগে। জীবনটাকে ভীষণ অর্থহীন মনে হয়। আর তাছাড়া, লিখে কি হয়? লেখালেখি করে কি কাউকে কমিউনিকেট করা যায়? মিউজিক বরং অনেক বেশি কমিউনিকেটেবল ল্যাংগুয়েজ। লেখালেখিতে যা কিছু বলতে চাই তা বলা হয়ে ওঠে না, আমি অন্তত বলতে পারিনি। যেটুকু বলেছি তা-ও যে বোঝাতে পেরেছি বলে মনে হয় না। যাকে বলে ব্রেকডাউন অব কমিউনিকেশন সেটা আমাদের প্রায় সবার জীবনে ঘটে, আমার জীবনেও ঘটেছে। 
তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার চোখে পড়লো আমার। আমাদের চারপাশে যে ভাষাহীন বিপুল সৃষ্টিজগৎ রয়েছে তাদেরকে দিয়ে তিনি কথা বলিয়েছেন তাঁর গল্প-উপন্যাসে। তাঁর লেখায় পাখি কথা বলে ওঠে, কথা বলে বৃক্ষ ও নদী, ফুল ও পাতা। এমনকি জড়জগৎকেও তিনি করে তোলেন অনুভূতিসম্পন্ন- 
যা কিছু নিঃশব্দ, যা কিছু শব্দময়, যা কিছু দৃশ্যগোচর, দৃশ্যাতীত, সবকিছুই একজোট হয়ে হাত ধরাধরি করে ঘিরে ধরে; অদভুত এক বাজনার তালে তালে আসত একটি রাত মোমের মতো গলে পড়ে... 
নিঃশব্দ বা শব্দময়, দৃশ্যগোচর বা দৃশ্যাতীত জগৎটির মধ্যে তিনি কীভাবে প্রাণসঞ্চার করেছেন, তার কিছু নমুনা দেখা দেয়া যাক। 
...ঐ গাছটার সঙ্গে কথা বলতাম। গাছটা উত্তর দিতো না ঠিকই, কিন্তু জন্তুর কানের মতো চওড়া চওড়া পাতা নেড়ে খুব মনোযোগ দিয়ে সব শুনতো। [অথবা-] ..একটা মাছরাঙা গলাপানিতে নামা হিজলের ডালে গিয়ে বসলো। এটা একটা সম্পর্ক... অলিখিত- যুগ যুগ ধরে এইভাবে চলে আসছে সবকিছু। না বসলেও চলে মাছরাঙার, একটা আধডোবা খাড়া কঞ্চির ওপর বসলেও তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়, তবু হিজলের একটা শাখা, গোছা গোছা পাতার মনোরম একটা আড়াল সে যখন বেছে নেয়, তখন এক ধরনের নির্ভরশীলতা সত্য হয়ে ওঠে। বড় ক্ষণিকের এই সম্পর্ক, তবু দিব্যকান্তি। [কিংবা-]...এ পথে যতোবারই এসেছে, চোখে পড়েছে গাছটা; কেমন যেন ছন্নছাড়া চেহারা ছিলো। মনমরা মনমরা।... [দেখা মেলে এমন সব পঙক্তিরও-]...গোটাগ্রাম জুড়ে ছিল কদমের বন, বর্ষার নদী ধীরে মন্থর গতিতে ফেঁপে ফেঁপে উঠে শেষে কদমের বনে গিয়ে ইচ্ছে করে পথ হারিযে 'এ আমার কি হল গো' ভান ধরে ছেলেমানুষিতে মেতে উঠতো। এখন গ্রাম কি গ্রাম উজার; দেশলাইয়ের কারখানা গিলে ফেলেছে সবকিছু। কদমের সে বনও নেই, নদীর সেই ছেলেমানুষিও নেই; এখন ইচ্ছে হলো তো এক ধারসে সব ভাসিয়ে দিলো, সবকিছু ধ্বংস করে দিলো, 'আমি তোমাদের কে, আমার যা ইচ্ছে তাই করবো' ভাবখানা এমন। 
আমাদের চারপাশের এই বিপুল সৃষ্টিজগৎ- যা কিছু নিঃশব্দ, যা কিছু শব্দময়, যা কিছু দৃশ্যগোচর, দৃশ্যাতীত- তার সবকিছুরই যে নিজস্ব ভাষা আছে, আমরাই কেবল তা বুঝতে পারি না; তিনি যেমন সেদিকে আমাদের চোখ ফিরিয়েছেন তেমনি সেই ভাষাটিকে বুঝতে চেয়েছেন, চেয়েছেন এই সৃষ্টিজগতের সঙ্গে মানুষের অলিখিত দিব্যকান্তি সম্পর্কটি আবিষ্কার করতে। এই বিষয়টিই, বিশেষ করে, আমাকে বটু ভাই সম্বন্ধে অধিকতর কৌতূহলী করে তোলে এবং এক গভীর মুগ্ধতা নিয়ে তাঁর সঙ্গে দিনের পর দিন কথা বলে যেতে থাকি আমি। কত কত স্মৃতি তাঁকে নিয়ে, কত দুর্দান্ত আড্ডা! অনেকদিন বটু ভাইকে দেখতে যাওয়া হয় না, তাড়াতাড়িই একবার যেতে হবে! 
বটু ভাইয়ের মতো ইলিয়াস ভাইও ছিলেন অসম্ভব আন্তরিক। প্রথম দেখায় ভালো লেগে যাওয়ার মতো, প্রথম পরিচয়ে আপন করে নেয়ার মতো, প্রখর আলোয় বুকের মধ্যে এক হিরন্ময় দু্যতি জ্বালিয়ে দেয়ার মতো মানুষ। কিন্তু প্রাথমিক মুগ্ধতা কাটিয়ে জটিল সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আশায় আমি যখন ক্ষেত্র প্রস্তুত করছি, তখনই তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেন। একটা পা কলকাতার এক নার্সিং হোমে বিসর্জন দিয়ে এসে কেমোথেরাপির তোপে ঝাঁকড়া চুলগুলো হারিয়ে দেখতে না দেখতে বুড়িয়ে গেলেন; আর তার বছরখানেকের মাথায় 'নিরুদ্দেশ যাত্রা' করলেন। 
ইলিয়াস ভাইয়ের এই চলে যাওয়া আমার মধ্যে ব্যাপক ভাংচুর ঘটিয়েছিল, এখনো মনে পড়ে। এভাবে এমন একজন লেখক চলে যেতে পরেন, এটা মানতেই পারছিলাম না। অক্ষম ক্ষোভে ও বেদনায় কয়েকদিন ভীষণরকম এক অস্বাভাবিক জীবন কাটিয়েছি। তারপর একটু থিতু হয়ে ব্যক্তি ইলিয়াসকে সরিয়ে লেখক ইলিয়াসকে বুঝতে চেয়েছি। বুঁদ হয়ে পড়ে থেকেছি এইসব পঙক্তি নিয়ে : 
এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেকদিন পর আজ সুন্দর বৃষ্টি হলো। রাত এগারোটা পার হয় হয়, এখনো রাস্তায় রিকশা চলছে ছল ছল করে...আমার জানলায় রোদন-রূপসী বৃষ্টির মাতাল মিউজিক, পাতাবাহারের ভিজে গন্ধভরা সারি, বিষাদবর্ণ দেওয়াল; অনেকদিন পর আজ আমার ভারি ভালো লাগছে। ছমছম করা এই রাত্রি, আমারি জন্যে তৈরি এরকম লোনলি-লগ্ন আমি কতোদিন পাইনি, কতোকাল, কোনোদিন নয়। বৃষ্টি-বুনোট এইসব রাতে আমার ঘুম আসে না, বৃষ্টিকে ভারি অন্যরকম মনে হয়, বৃষ্টি একজন অচিন দীর্ঘশ্বাস। এইসব রাতে কিছু পড়তে পারি না আমি, সামনে বই খোলা থাকে, অক্ষরগুলো উদাস বয়ে যায়, যেনো অনন্তকাল কুমারী থাকবার জন্যে একজন রিক্ত রক্তাক্ত জন্মদান করলো এদের। চায়ের পেয়ালায় তিনটে ভাঙা পাতা ঘড়ির কাঁটা হয়ে সময়কে মন্থর কাঁপায়। ষাট পাওয়ারের বাল্বে জ্বলছে ভিজে আলো, আর চিনচিন করে ওঠে হঠাৎ, কতোদিন আগে ভরা বাদলে আশিকের সঙ্গে আজিমপুর থেকে ফিরলাম সাতটা রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে, 'তুই ফেলে এসছিস কারে', সেই সোনার শৈশবে ভুল করে দ্যাখা একটি স্বপ্ন, স্বপ্নের মতো টলটল করে। আমার ঘুম আসে না, আলোর মধ্যে একলা জেগে রই।... 
তাঁর লেখালেখির প্রথম জীবনের এই গল্পটি পড়ে মনে হতো- যেন কবিতা পড়ছি! যেন কোথাও থেকে বিষণ্নতা ঝরছে! যেন এইমাত্র একটা কথাহীন অব্যাখ্যাত সুর শুনে উঠলাম! মনে হতো, যে রাগী ইলিয়াসের ছবি আমার মনে গেঁথে আছে, তার থেকে এই ইলিয়াস আলাদা, এই ইলিয়াসকে যেন চিনি না! এই গল্পেই পরিচয় ঘটে রঞ্জুর সঙ্গে- এক বিষণ্ন একাকী যুবক, খানিকটা অস্বাভাবিক, হয়তো ব্যাখ্যহীন কোনো অসুস্থতায় আক্রান্ত। গল্পের তোড়ে এগিয়ে গেলে তার মতো নিজেও বিষণ্ন হতে থাকি, একা হতে থাকি; আর পড়া শেষ হয়ে গেলে মনে হয়- একবার পড়ে এই গল্পটি বোঝা হয়ে উঠলো না। আবার পড়ার জন্য হাত বাড়াই, আবারও বিষণ্ন হই, কখনো হয়তো চোখের কোণ ভিজেও ওঠে, কিন্তু এবারও মনে হয়- আবার পড়তে হবে এই গল্প। কী হলো রঞ্জুর, কী হলো- এই ভাবনায় আক্রান্ত হয়ে ইলিয়াস ঘাঁটি এবং বহুদিন পর তাকে পেয়ে যাই চিলেকোঠায়। সেই একইরকম- বিষণ্ন ও একাকী। অসুস্থ ও চলমান জীবনে অংশগ্রহণহীন। অবশেষে তাকে হাড্ডিখিজিরের দেখানো পথে হারিয়ে যেতে দেখলে আবারও তার পরিণতি জানার জন্য ইলিয়াস হাতড়াই এবং দেখি তাঁর শেষ উপন্যাস 'খোয়াবনামা'য় এই রঞ্জুই তমিজের বাপ হয়ে উপস্থিত হয়েছে। দেখি, ইলিয়াস বারবার রঞ্জুর কাছে ফিরে এসেছেন। 'নিরুদ্দেশ যাত্রা'র রঞ্জু, 'চিলেকোঠার সেপাই'-এর ওসমান আর 'খোয়াবনামা'র তমিজের বাপ- এই তিনজন আসলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই চরিত্র। তিনজনই খানিকটা অস্বাভাবিক, অসুস্থই বলা চলে, তিনজনই ঘোরগ্রস্থ, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কহীন নিস্ক্রিয় মানুষ। তিনজনের পরিণতিও এক- অস্বাভাবিক মৃতু্য। অথচ এর ঠিক বিপরীত চরিত্রও নির্মাণ করেছেন ইলিয়াস। 'চিলেকোঠার সেপাই'-এর আনোয়ার কিংবা 'খোয়াবনামা'র তমিজ সেই ধরনের চরিত্র। আমাদের চারপাশেই এমন কিছু মানুষ আছে যারা বাস্তবতার মধ্যে বাস করেনা, করে ফ্যান্টাসি বা কল্পনার জগতে, সমাজে থেকেও এই লোকগুলো জনজীবনের সঙ্গে সম্পর্কহীন। ইলিয়াস তাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি, এমনকি বিদ্রুপও করেননি তাদের নিয়ে, যেমন করেছেন মধ্যবিত্তদের, বরং তাদের প্রতি তাঁর এক গভীর সহানুভূতি টের পাওয়া যায়। যে রঞ্জুকে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন তাঁর প্রথম জীবনে, তাকেই ফিরিয়ে এনেছিলেন ওসমান এবং তমিজের বাপের মধ্যে, মনে হয় যেন ওসমান ও আনোয়ার একই চরিত্রের এপিঠ-ওপিঠ, কিংবা তমিজ ও তমিজের বাপও একই চরিত্রের এপিঠ-ওপিঠ- একজন নিঃসঙ্গ, অসহায়, নৈরাশ্যপীড়িত, বিচ্ছিন্ন; আরেকজন সক্রিয়, আশাবাদী, সমকালের আয়োজন ও প্রয়োজনের সঙ্গে একাত্ন। একজন মানুষের মধ্যে একইসঙ্গে পরস্পরবিরোধী মানুষ বাস করে- এইসব স্প্লিট পার্সোনালিটি নির্মাণ করে ইলিয়াস কি সেটিই দেখাতে চেয়েছিলেন? রঞ্জু সম্বন্ধে আমাদের কৌতূহল মেটে না, তার পরিণতি জানবার জন্য আবার ইলিয়াস হাতড়াই, কিন্তু আর কিছু জানাবার আগে তিনি নিজেই এক অনন্ত যাত্রায় পথিক হন। আমাদের খোঁজ তবু থামে না। এবার অতঃপর- একটি দৈনিক পত্রিকায় মামুন হুসাইন 'স্বগত মৃতু্যর পটভূমি' শিরোনামের গল্প অথবা স্মৃতিকথা ধারাবাহিকভাবে লিখতে শুরু করেন- মঞ্জু ভাই, অর্থাৎ ইলিয়াস ভাই, যার প্রধান চরিত্র। কিন্তু আমরা ধন্ধে পড়ি- একি মঞ্জু ভাই নাকি রঞ্জুর কাহিনী? ইলিয়াস কি তবে নিজেকেই নির্মাণ করেছিলেন 'নিরুদ্দেশ যাত্রা' গল্পে? গল্পটি আমরা পড়ে যাই, ইলিয়াসের বাগ্মিতায় মুগ্ধ হই- মানুষ, মানব জীবন আর মৃতু্যবিষয়ক দার্শনিক উপলব্ধি আমাদের ঘোর বাড়িয়ে দেয়। শুনতে পাই, ইলিয়াস ভাই বলছেন- 

'ওয়ান মাস্ট হ্যাভ সাইকোলজিক্যাল প্রিপারেশন ফর ডেথ; বলছেন - লাইফ ইজ টু বি লিভড টু ইটস ফুলেস্ট সো দ্যাট ডেথ ইজ জাস্ট অ্যানাদার চ্যাপ্টার... যখন তুমি মরবে... দেখবে স্মৃতি উড়ছে বাতাসে...অ্যান্ড অল আওয়ার মেমোরিস, অল আওয়ার ওয়ার্কস অ্যান্ড অল আওয়ার ডিডস উইল কনটিনু ইন আদার্স।' 
'দেখেছি সরলতাই মানুষের স্বাস্থ্যের একমাত্র উপায়...' 
'বড় দুঃখের চেয়ে ছোটো দুঃখ যেন বেশি দুঃখকর। ছোটো দুঃখের কাছে আমরা কাপুরুষ কিন্তু বড়ো দুঃখ আমাদের বীর করে তোলে...' 
'আমি অনেক দিন ভেবে দেখেছি, পুরুষেরা কিছু খাপছাড়া আর মেয়েরা সুসম্পূর্ণ ...' 
'দুনিয়া হলো চারদিনের আয়ু, তা দুদিন গেলো চাইতে চাইতে, দুদিন গেলো অপেক্ষায়...' 
'জীবন একটা গম্ভীর বিদ্রুপ, এর মজাটা বোঝা একটু শক্ত...' 

মামুনের অসামান্য গদ্যে আমরা তাঁর শেষ-মুহূর্তগুলো পড়ে উঠি- 

মঞ্জু ভাইয়ের অবসন্ন হাতের লেখা ঘুরে ঘুরে পড়ি। দরখাস্তের তলায় আপনার বিশ্বস্ত কেটে আপনার অধস্তন কর্মচারী করেছেন। আর পদ্যের মতো সরু-ভাঙা একহারা কয়েকটি লাইন ঘষে ঘষে লেখা... 'তমাল ছায়ায় বধূ অস্তগামী শরীরের তাপমাত্রা লিখে রাখছেন, এইটুকু মানদণ্ড আজ সকালে, অতএব আমরা তাঁর কাছাকাছি আছি... সরীসৃপের ভেতর থেকে এক ভ্রমর এসে আমাকে বলেছিল, আমায় আলো দেবে... মানুষ আসলে কিছুই পারে না, মৃতু্যর অধস্তন কর্মচারী হইয়া কাটাইবে দিন আলোর ছায়া মানিয়া মানিয়া... এক পাশে লেখা, অস্ত্রপচার অথবা অস্ত্রপাচার! শরণার্থীরা আজ নামঞ্জুর!...অথবা ঈশ্বরের উদাসীনতায় মানুষ কেবলই ব্লাড ব্যাংক খোলার পাঁয়তারা করছে। মাঝে মাঝে পরাজিত হওয়া দরকার। যেমন, ড্যাণ্ডেলিন ফুল দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া...। আই হ্যাভ মাচ টু টেল ইউ এ্যান্ড মেনি থিংস টু আস্ক- সময় হবে কি আমাদের কখনো?' 

এই সব শুনি আর তাঁর মৃতু্য বিবরণ পড়ে আমাদের চোখ ভিজে ওঠে- 

'তুতুল ভাবি দেখলেন ভোর হয়েছে। মঞ্জু ভাই মেলা ডাকাডাকি, এত রোদ, পাখির চঁ্যাচামেচি, ওষুধের গন্ধ, অঙ্েিজন, আঙুর, বেদানার রস, কলিগদের রজনীগন্ধা, সব অবহেলা করে বহুদিন বাদে পেইন কিলার ছাড়াই দিব্যি ঘুমিয়ে আছেন। একটা মৃদু খটকা এলেও, ভাবলেন- তাহলে স্বপ্নের রাজ্যি লোপাট হলো! কে একজন অঙ্েিজন মাস্ক সরিয়ে নিলো। লম্বা একটি চাদর দিয়ে ফেস ক্লথ বানানো হলো। পাঁজা পাঁজা আগর বাতির ভেতর সূরা আর রাহমান পড়ছিলেন কেউ। গাড়ি দাঁড়ালো সার-সার। পুলিশ এলো। মন্ত্রী-সেক্রেটারি এলো, এমনকি রাষ্ট্রপতির ফর্সা কোমল একখানা খামও এলো বেলা উঠলে। চশমা সরিয়ে অনেক স্নানের পর তুলাতে কর্পূর জড়িয়ে নাকে কানে গুঁজে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ভিড় এড়াতে মঞ্জু ভাই ঘুমের মধ্যেই আম্মার কাছে মালতি নগর রওয়ানা হয়ে গেলেন। ভাবি গাড়ির ভেতর থেমে যাওয়া ঘড়িটা মেলান; সকাল সাড়ে ছয়, তারিখ, চার! পার্থ অগত্যা বাবার সুখ্যাতি শুনতে শুনতে মায়ের ঘড়িতে তারিখ দেখে, কিংবা গাড়ির জানালা দিয়ে দেখে- কুয়াশাময় জানুয়ারির আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাবার শাদা রঙের সাধ, মায়ের রাঙা আঁধার, নিশ্চিন্তিপুরের মাঠ, নদীর জল অথবা শোনে কেবল গাছের শব্দ, উড়ে বেড়ানো পাতা ভাঙার শব্দ, পাখির শব্দ, কান্নার শব্দ আর গভীর এক মৃতু্য গান। 

এর প্রায় বছর ছয়েক পর মামুন আবার 'ইলিয়াস পুনর্লিখনের কথকতা' নামে এক বক্তৃতা দেন একটি অনুষ্ঠানে। আমরা তাঁর নানা কথার ফাঁকে এইসব কথা শুনতে শুনতে বুঝতে পারি, সর্বদা নিস্পৃহ-নিরাসক্ত মামুন ঠিকভাবে কথা বলতে পারছেন না, তার গলা ধরে আসছে, হয়তো চোখ ও মন এবার একসঙ্গে ভিজে উঠেছে- 

...১৯৯৭-এর ৪ঠা জানুয়ারি ওঁর সমস্ত আয়োজন আচমকা হত্যা করে। কয়েকমুহূর্তের জন্য ঠোঁট নড়লে ইলিয়াস বসা গলায় উচ্চারণ করেন- ও পড়ষষবপঃ সু ঃড়ড়ষং; ংরমযঃ, ংসবষষ, ঃড়ঁপয, ঃধংঃব, যবধৎরহম, রহঃবষষবপঃ. ঘরমযঃ যধং ভধষষবহ, ঃযব ফধু্থং ড়িৎশ রং ফড়হব. ও ৎবঃঁৎহ ষরশব ধ সড়ষব ঃড় সু যড়সব, ঃযব মৎড়ঁহফ. ঘড়ঃ নবপধঁংব ও ধস ঃরৎবফ ধহফ পধহহড়ঃ ড়িৎশ. ও ধস হড়ঃ ঃরৎবফ. ইঁঃ ঃযব ংঁহ রং ংবঃ. আমরা অগত্যা ওঁর দেশে ফেরার খাতা গুছিয়ে দিই। ... কি ভেবে, আমার ভীরুতা, আমার অর্বাচিনতাকে আড়াল করার জন্য তুর্গেনিভের বাজার যে কবরখানায় ঘুমন্ত, তার কাছে এসে দাঁড়াই; ইলিয়াসের সমাধিস্থল যেন কোথায়, কেউ হাত দিয়ে চেনায়! দেখতে পাই 'দূর প্রান্তের অজপাড়াগাঁয়ে একটা ছোট কবর। চারপাশের খানাখন্দগুলো বহুকাল হল আগাছায় ভরে গেছে। কাঠের ধূসর ক্রসগুলো ঝুঁকে পড়ছে, পড়ছে।... ন্যাড়া ন্যাড়া দুইতিনটি গাছ সামান্য ছায়া দেয় কি দেয় না। সমাধির ওপর স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে ভেড়ার দল। ... কেউ কেউ বছরের একটি দুটি দিন নতজানু হয়ে অঝোরে কাঁদে, নিজেদের মধ্যে দুই একটা কথাবার্তা বলেন, পাথরের ওপরকার ধুলো ঝাড়েন, তারপর আবার প্রার্থনা করতে বসেন। তাঁদের প্রার্থনা, তাঁদের অশ্রু- এসবই কি নিস্ফল? তাহলে কি মানতে হবে যে স্নেহ, ভালবাসা, প্রেম, নিষ্ঠার পবিত্র অনুভূতি সর্বশক্তিমান নয়? না, তা হতে পারে না। সমাধিশিলার নীচে যে হৃদয় শায়িত আছে, তা যত আবেগপূর্ণ, যত পাপী, যত বিদ্রোহী-ই হোক না কেন, সমাধির ওপর যে ফুল ফুটছে তা শান্ত অক্ষুব্ধ নিস্পাপ চোখে দেখছে আমাদের। সে ফুল আমাদের কেবল চিরশান্তির কথা, উদাসিনী প্রকৃতির, সেই শান্তির বাণীই বলছে না, সেই সঙ্গে বলছে অনন্ত মিলন ও অনন্ত জীবনের বাণী।...' 
কবরস্থান থেকে তখন দমকা বাতাস এসে ইলিয়াসের ডাইরির পাতা উড়িয়ে দেয়। মৃতমানুষের রক্তরস শুষে নেয়া সেই মাটি সরাতে সরাতে আমি পাঠ করি, ১৯৮৯, ৮ই জুলাই- ওভ ুড়ঁ যবধৎ রহ সু াড়রপব ধহু ৎবংবসনষধহপব ঃড় ধ াড়রপব ঃযধঃ ড়হপব ধিং ংবিবঃ সঁংরপ রহ ুড়ঁৎ বধৎং, বিবঢ় ভড়ৎ রঃ, বিবঢ় ভড়ৎ রঃ. ওভ ুড়ঁ ঃড়ঁপয রহ ঃড়ঁপযরহম সু যধরৎ, ধহুঃযরহম ঃযধঃ ৎবপধষষং ধ নবষড়াবফ যবধফ ঃযধঃ ষধু ড়হ ুড়ঁৎ নৎবধংঃ যিবহ ুড়ঁ বিৎব ুড়ঁহম ধহফ ভৎবব, বিবঢ় ভড়ৎ রঃ, বিবঢ় ভড়ৎ রঃ... 

ইলিয়াস ভাই, আমরা কাঁদছি! 

১২. 
হাঁটতে হাঁটতে পিজির মোড়ে চলে এসেছিল তারা। দেখা গেলো, সেখানে আরো অনেকেই, আবিদও। আবিদ দাঁড়িয়ে ছিলো রাগী ভঙ্গিতে। কায়সার বললো- 
তুই এখানে কতক্ষণ? 
আমি তো সন্ধ্যা থেকেই। তুই কোথায় ছিলি? 
আজিজ মার্কেটে। তোকে না পেয়ে ওখানে গেলাম। 
তারপর ভুলে গেলি যে আমি তোর জন্য অপেক্ষা করবো! 
না, ঠিক তা না! অনেকদিন পর এলাম তো.. দেখতে দেখতে সময় চলে গেলো.. 
এদিকে আমি অপেক্ষা করতে করতে গাছ হয়ে গেলাম, তুই তো আবার মোবাইল ইউজ করিস না, বাসায় ফোন করেছিলাম, ভাবী বললো তুই বাসায়ও ফিরিসনি। আজিজ মার্কেটে যেতে পারিস, ভুলেও ভেবে দেখিনি, তুই তো ওখানে যাওয়া একেবারেই ছেড়ে দিয়েছিস। 
হঁ্যা, আজকে যে কী মনে করে গেলাম... 
যাকগে, বাদ দে। রাগ হচ্ছিল, মাফ করে দিলাম। আড্ডা দিয়ে ভালো করেছিস, অন্তত অনেকদিন পর তোর সময়টা ভালো কেটেছে। তোর একটু বেরিয়ে আসা দরকার। যাইহোক, এখনই বাসায় ফিরবি? 
তাড়া নেই কোনো। তুই কি জন্য ডেকেছিলি? 
হঁ্যা, বলবো। কিন্তু বলতে তো অনেক সময় লাগবে! 
ঠিক আছে, বাসায় একটা ফোন করে দিচ্ছি। তারপর কোথাও বসি। 
জামিলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফোন করে এসে তারা পিজি হাসপাতাল কম্পাউন্ডের ভেতরে বটতলায় এসে বসলো। 
তাদের বসার জন্য এরকম অনেকগুলো পয়েন্ট ছিলো। আজিজ মার্কেট ছেড়ে পিজির মোড়ে কিছুক্ষণ, তারপর আবার পিজির ভেতরে কিছুক্ষণ, তারপর হাঁটতে হাঁটতে বাংলা মোটর মোড়ে এসে কিছুক্ষণ, এইভাবে বাসায় ফিরতে ফিরতে মধ্যরাত হয়ে যেত। নিয়মিতভাবে মা'র বকা শুনতে হতো আর সেগুলোকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে একই রুটিন প্রতিদিন চালিয়ে গেলে, মা বলতো- 'তুই কি আমাকে আর শান্তি দিবি না?' শান্তি সে এখন দিয়েছে, সন্ধ্যা হতেই বাসায় ফেরা, লক্ষী ছেলের মতো ঘরে বসে থাকা- কিন্তু মা কেন এখন আর সুখী নয়? কারণ- মা তার লেখালেখিটা পছন্দ করতো; লেখকরা যে একটু এরকমই হয়, কোত্থেকে যেন তার এ ধারণাও হয়েছিল। মা'র দায়িত্বমতো বকাটকা দিলেও নিশ্চয়ই সে চায়নি- তার ছেলে লেখা থামিয়ে দিয়ে গৃহবন্দি হয়ে যাক! 
কায়সার আজকে নস্টালজিয়ায় ডুবে ছিলো। আবিদের সঙ্গে বসেও তাই কোনো কথা বলছিল না। আবিদ কি কি যেন বলে যাচ্ছিল, সে ঠিক শুনছিলও না। আবিদ- 'এই, তোর আজকে কি হয়েছে'- জিজ্ঞেস করলে সে সচেতন হয়। 
না কিছুনা। 
মন খারাপ নাকি? 
নাহ! 
মনে হচ্ছে। তুই খুব বিষণ্ন হয়ে আছিস। ব্যাপারটা কি? 
ব্যাপার কিছু না। ভাবছিলাম, আমার লেখালেখি বন্ধ করাটা হয়তো উচিত হয়নি। 
তাতো বটেই। কিন্তু তাই বলে তো সময় শেষ হয়ে যায়নি। তোর তো এমন কিছু বয়সও হয়নি। আবার শুরু কর। 
বললেই তো শুরু করা যায় না। এ বড় রহস্যময় ব্যাপার- লেখালেখির মধ্যে থাকলে ওটাই ভাবনাচিন্তাকে দখল করে রাখে, ফলে একটা নতুন লেখা শুরু করতে সমস্যা হয় না। কিন্তু অনেকদিন বিরতির পর নতুনভাবে কিছু শুরু করা ভীষণ সমস্যা। বাদ দে এসব, তুই কি বলতে চাচ্ছিলি সেটা বল। 
আজকে না হয় থাক। তোর মন ভালো নেই। আজকে এসব শুনতে তোর ভালো লাগবে না। 
লাগবে, তুই বল। তাছাড়া, কালকেও যে আমার মন ভালো থাকবে তা তোকে কে বললো? আজকের কথা আজকেই বলা ভালো। 
আমার একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে। 
কি ব্যাপারে? 
আমি বীথিকে বিয়ে করতে চাই। তুই কি বলিস? 
কায়সার একটু চমকে ওঠে। এত অপ্রত্যাশিতভাবে এই প্রসঙ্গটা এসে হাজির হবে, সে ভাবতেও পারেনি। সামলে নিতে সামান্য সময় নেয় কায়সার। তারপর মৃদু হাসে। 
বেশ তো কর। আমার অনুমতি নিচ্ছিস কেন? 
ছি ছি- আবিদ বলে- ব্যাপারটাকে ওভাবে দেখছিস কেন? অন্য কাউকে বিয়ে করলেও তো আমি তোকে বলতাম। বলতাম না? তাহলে এটাকে তুই অনুমতি নেয়া বলে ভাবছিস কেন? তাছাড়া আমাদের সম্পর্কটাতো তোর কাছে লুকানো-ছাপানো কোনো ব্যাপার না। আমি আসলে তোর মতামত জানতে চাচ্ছিলাম- তুই অন্যভাবে নিস না। 
আবিদ যাই বলুক, ওর কথার ধরনই বলে দিচ্ছে- ও স্রেফ অনুমতি চাচ্ছে। কায়সার মৃদু ম্লান হাসে। এতদিন হয়ে গেলো- বীথির ব্যাপারটা তবু তার পিছু ছাড়লো না। 

১৩. 
সব সম্পর্ককেই মানুষ কোনো-না-কোনো নাম দিয়ে সংজ্ঞায়িত করতে চায়। সম্পর্কের বহুমাত্রিকতায় বিশ্বাস নেই তার, নেই আস্থাও, কিংবা বহুমাত্রিক সম্পর্কের বিষয়টি সে বোঝেই না। ফলে একটি নাম না দিলে সে অস্বস্তিতে ভোগে, অশান্তিতে ভোগে। কিন্তু যখনই একটি সম্পর্কের নাম দেয়া হয় তখনই তাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়, সেই সম্পর্কে নতুন কোনো মাত্রা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়। সম্পর্ক হয়ে পড়ে স্থির, বদ্ধ। 
অথচ সম্পর্ক বিষয়টিই পরিবর্তনশীল, বিবর্তনশীল। এক জায়গার দাঁড়িয়ে থাকার জিনিস নয় এটা। সম্পর্ক ক্রমাগত তার ধরন পাল্টায়, তার স্বভাব পাল্টায়- যদি না পাল্টায় তবে তা পরিণত হয় অভ্যাসে। সম্পর্কের সঙ্গে অভ্যাসের পার্থক্যটা এখানেই। সম্পর্ক বিবর্তনশীল, পরিবর্তনকামী, নতুন মাত্রা যোগের সম্ভাবনাপূর্ণ; আর অভ্যাস স্থির, পরিবর্তনহীন, একঘেঁয়েমিপূর্ণ। 
মানুষ যে সম্পর্কের একটি নাম দিতে চায় তার কারণটি হয়তো এই যে, সে সম্পর্কের একমাত্রায় বিশ্বাস করে, স্বস্তি পায়- সম্পর্কটিকে একটি মীমাংসায় পেঁৗছে দিতে চায়, একটি সংজ্ঞায় বেঁধে ফেলতে চায়। 
অথচ অমীমাংসিত সম্পর্কই সুন্দর, যদিও তা বেদনাদায়ক। অসংজ্ঞায়িত সম্পর্কই সম্ভাবনাপূর্ণ, যদিও তা বহন করা কষ্টকর। কিন্তু এই বেদনা, এই কষ্টও মধুর। মানুষ, এমনকি, মধুর কষ্টও কেন ভোগ করতে চায় না কে জানে! 

বীথির কথা ভাবতে গিয়ে কায়সারের এইসব কথা মনে এলো। 
১৪. 
বাসায় ফিরতে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে গেলো। আবিদের সঙ্গে আড্ডাটা আজকে আর জমলো না, পরস্পরের কাছে কিছুতেই সহজ হতে পারলো না তারা। এমনকি বিদায় নেয়ার সময়ও দুজনের মধ্যেই কেমন এক অস্বস্তি আর আড়ষ্ঠতা কাজ করছিল। অথচ বিষয়টা তো এখন সুস্পষ্ট ও সুনির্ধারিত। বীথির সঙ্গে কায়সারের কোনো সম্পর্কই নেই এখন- যা কিছু সেটা আবিদের সঙ্গেই। বিষয়টা অস্বাভাবিকও কিছু নয়- সবকিছু ঘটেছে কায়সারের গোচরেই। এমনকি মাঝে মাঝে সে আবিদকে উৎসাহও যুগিয়েছে। তবু কী যেন একটা দুঃখবোধ কাজ করছিল কায়সারের মধ্যে! ব্যর্থতাবোধ? না, বীথির ব্যাপারটাকে সে ব্যর্থতা বলে মনে করে না। একটু জটিল বটে বিষয়টা- যা তাকে দীর্ঘদিন ধরে ভুগিয়েছে, এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। 
শাহবাগ থেকে ফেরার সময়ও সে রিকশা নেয়নি। হাঁটতে তার ভালো লাগে। শহরময় হেঁটে বেড়ানো কায়সারের পুরনো অভ্যাস। ইদানিং অবশ্য আর সেটা হয়ে উঠছে না- এত ব্যস্ততা, সময়ের এত স্বল্পতা, আর শরীর-মনে এত বেশি ক্লান্তি আর অবসন্নতা যে, হাঁটাহাঁটি করাটা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। আজকে একটা সুযোগ পাওয়া গেছে- যদিও সে এই মুহূর্তে ক্লান্ত ও অবসন্ন, তবু হাঁটতে ভালো লাগছে, হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে ভালো লাগছে। 
আজকে জামিল বলছিল- বন্ধুরা, এমনকি অনুজরাও এখনো তার কথা বলে, তার লেখা নিয়ে আর এই দীর্ঘ নীরবতা নিয়ে আলোচনা করে। তরুণ ছেলেগুলোর কথা মনে পড়ছে- 'আপনি তো আমাদের কাছে হিরো!' হাস্যকর। হিরো হওয়ার মতো কিছুই করেনি সে, এমন কিছু লিখে ফেলেনি যে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মডেল বা হিরো হয়ে হওয়া যায়। তবু ওরা এমনটা বললো কেন? ওরা যে তার সব লেখা পড়েনি সেটা তো নিজেরাই বললো- এই সরল স্বীকারোক্তি তার ভালো লেগেছে- তবু সে কিভাবে ওদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠলো? তার মানে কি এই যে, তাকে নিয়ে সত্যিই আলোচনা-টালোচনা হয়! সে বিস্ময় বোধ করলো। সে যে কোথাও আছে এটা সে ভাবতেও পারেনি কখনো। কিন্তু ওদের কথায়, এমনকি জামিলের কথায়ও বোঝা গেলো- সে আছে। এভাবেই তাহলে একজন লেখকের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়! একজন মানুষ এর চেয়ে বেশি আর কী-ই বা চায়? মানুষ তো কেবলই নিজেকে দেখতে চায় বিবিধ ধারাবাহিকতার মধ্যে- এর জন্যই তার সমস্ত উদ্যোগ ও আয়োজন। এমনকি মানুষ যে সন্তানের জন্ম দেয় তা-ও হয়তো ওই একই উদ্দেশ্যে। সে হয়তো নিজেকে প্রবাহিত দেখতে চায় সন্তানের মধ্য দিয়ে। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের কথা মনে পড়লো তার। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন- 'বাবা হওয়াটা আমি উপভোগ করি। ছেলে দুটোকে বড় হতে সাহায্য করা আমার জীবনের সবচেয়ে উত্তেজনাময় অভিজ্ঞতা এবং আমি সত্যিই মনে করি যে আমার পুত্ররত্নদ্বয়, আমার বই নয়, হলো আমার শ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব।' - এত বিরাট একজন লেখক যখন এই কথা বলেন, তখন বিষয়টা সত্যিই ভাবায়। অসাধারণ সব সৃষ্টিকর্মের চেয়ে তাঁর কাছে তাঁর সন্তানরাই শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা পাওয়ার কারণ কি এই যে, তিনি নিজেকে অধিকতর চমৎকারভাবে নিজেকে প্রকাশিত ও প্রবাহিত হতে দেখেন তাঁর সন্তানদের মধ্যে দিয়েই? 
হাঁটতে হাঁটতে এইসব ভাবছিল কায়সার। রাত বাড়লে এই শহরেও খানিকটা নীরবতা নামে। রাস্তাঘাটের যানজট হৈ-হল্লা কমে আসে, আর একটা শীতল হাওয়া- এই মুহূর্তে যা বইছিল চরাচর জুড়ে- মাঝে মাঝে বৃক্ষরাজির মধ্যে ফিসফিসানি তৈরি করে। কেয়ারলেস হুইসপার! কায়সার সেই রহস্যময় ফিসফিসানির মধ্যে হেঁটে হেঁটে আসছিল। মাথায় এক ধরনের ভোঁতা যন্ত্রণা হচ্ছে। চোখ জ্বালা কমে গিয়ে সেখানে এখন ঘুমের আবেশ। আহ, এখনই যদি ঘুমিয়ে পড়া যেত! নিজের অজান্তেই সে রমনা পার্কের ভেতর দিয়ে পথ ধরেছিল। এবার সে বিনা দ্বিধায় ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ে। 
হঠাৎ একটা স্মৃতি এসে হানা দেয় কায়সারের করোটিতে। একবার, তারা তিনজন- আবিদ, বীথি ও সে- নাটক দেখতে গিয়েছিল মহিলা সমিতি মঞ্চে। 'ঈর্ষা'। সৈয়দ শামসুল হকের অসাধারণ নাটক। তখনো বীথির সঙ্গে ততটা ঘনিষ্ঠতা জন্মায়নি তার। তো, সেই প্রথম প্রায় হঠাৎ করেই বীথি ওর লজ্জা সংকোচ ও নতুন পরিচয়ের দূরত্ব ভুলে গিয়ে প্রগলভ হয়ে উঠেছিল। কায়সার সেই হঠাৎ প্রগলভতার জন্য প্রস্তুত ছিলো না। বীথি মেতে উঠেছিল দুষ্টুমি, ইয়ার্কি, ঠাট্টায়। এমনকি কায়সারের কোটরাগত চোখ, শীর্ণ শরীর, ধূসর হয়ে আসা চোখের জ্যোতি- কোনো কিছুই ওর ঠাট্টার তালিকা থেকে বাদ যায়নি। ওর ওই অকস্মাৎ খোলস ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসা কায়সারের ভালো লাগছিল না। সে ওই মুহূর্তে বীথির মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও বিস্ময় দেখতে চাইছিল। সেই প্রথম বীথি প্রগলভ হয়ে উঠেছিল, সেই প্রথম ওর কারণে কায়সারের মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল, সেই প্রথম বীথিকে মনে হচ্ছিল দূরের কেউ, যাকে কখনো কাছে টানা যায় না, টানা বোকামি- সেই প্রথম কি আবিদের চোখে স্বপ্ন ও আনন্দ ঝিলিক দিয়ে উঠেছিল? কায়সারকে বিপর্যস্ত হতে দেখলে আবিদের খুশি হওয়ার কথা- তাদের বন্ধুত্ব গভীর হলেও পরস্পরের প্রতি ছিলো প্রবল ঈর্ষাবোধ- একথা তারা দুজনেই জানতো। তো, সেই চমৎকার নাটকটি দেখতে দেখতেও কায়সার আর সহজ হতে পারেনি। নাটক শেষ হওয়ার পর আবিদ বীথিকে পেঁৗছে দেয়ার জন্য একসঙ্গে এক রিকশায় চলে যায়। ঘটনাটা অন্যরকমও হতে পারতো- তিনজন একসঙ্গে যাওয়া যেত অথবা কায়সার বীথিকে পেঁৗছে দিতে পারতো, কেন যেন তা হলো না। ওরা চলে যাওয়ার পর কায়সার অচেনা এক যন্ত্রণা অনুভব করেছিল। ঈর্ষা? হতে পারে। - 'অবশেষে আমার প্রিয়জনকে নিয়ে আমারই বন্ধু আনন্দ ও সমৃদ্ধির ভেতর দিয়ে চলে যায়, আর আমি করোটিতে যন্ত্রণার অনুভূতি নিয়ে হেঁটে হেঁটে আমার চারদেয়ালঘেরা ছোট্ট ঘরে ফিরে আসি।'- এরকম একটা পংক্তি তার লেখক সত্ত্বার ভেতরে জেগে উঠেছিল। সে বহুবার তার কোনো একটা লেখায় এই পংক্তিটি ব্যবহার করার কথা ভেবেছে- পারেনি। অনেক কিছুই পারেনি সে। না লেখক হিসেবে, না সামাজিক মানুষ হিসেবে। এমন কিছু লিখতে পারেনি যা পাঠকের আদৌ কোনো কাজে লাগবে, একজন সচেতন মানুষের কাছ থেকে সমাজ যেসব ভূমিকা আশা করে সে তার কিছুই রাখতে পারেনি, ব্যক্তিগত জীবনে কাউকে নিজের করে রাখতে পারেনি, কাজলকে দুর্বৃত্তের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি, কতবার ভেবেছে নিজেকে ফিরিয়ে নেবে স্বপ্নের লেখালেখির জগতে- পারেনি। সবক্ষেত্রেই সে নিজেকে ব্যর্থ বলে মনে করে, সবছিুতেই তার বিশাল অপূর্ণতা। 
বাসায় ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। নিশি বসেছিল থমথমে মুখে। এমনকি কায়সারের সামান্য হাসিটুকুও ফেরত দিলো না। কাপড় ছেড়ে, হাতমুখ ধুয়ে, খাওয়ার টেবিলে যেতে যেতে মা'র ডাক শুনলো কায়সার। 
খোকা একটু শুনে যা তো। 
কায়সার চমকে ওঠে। মা তাকে কতদিন পরে খোকা বলে ডাকলো। মা'র ঘরের দিকে পা বাড়াতেই ওদিকে নিশির ডাক- ভাইয়া, আগে খেয়ে নিয়ে আমাকে উদ্ধার কর। 
ওদিকে আবার মা- খোকা! 
ভাইয়া! 
কায়সার একটা দোটানায় পড়ে মা'র কাছেই গেলো। 
তোকে কয়েকটা জরুরী কথা বলবো। আগে খেয়ে নে। আর শোন, নিশি আজকে সারাদিন কিছু খায়নি, দ্যাখ কিছু খাওয়াতে পারিস কী না। 
খাওয়ার টেবিলে নিশি রেগে বসে আছে- কী! মা আমার নামে একগাদা লাগালো, না! 
কথাই তো হলো না, লাগাবে কখন? 
তা আমাকে বলতে হবে না, আমি জানি। 
কায়সার দেখলো- তার একার জন্য খাবার ব্যবস্থা। তার মানে, নিশি রাতেও না খেয়ে থাকার মতলব করেছে। কেন? অভিমান? কার ওপর? যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাবলী তাদের সবার জীবন-যাপনকে অস্বাভাবিক করে তুলেছে তার জন্য দায়ী কে? কাজল? হঁ্যা, ওকে হয়তো দায়ী করা যায়। কিন্তু ও তো এখন সব মান-অভিমানের ঊধের্্ব। পৃথিবী ও মানুষের প্রতি এক প্রচণ্ড অবিশ্বাস, প্রগাঢ় অভিমান আর ঘৃণা নিয়ে ও চলে গেছে। ওর ওপর রাগ করে কি লাভ? নিশির অভিমান তাহলে কার ওপর? মা? বাবা? কায়সার? নাকি তার নিজেরই ওপর? 
কি রে, তোর প্লেট কোথায়? 
আমি খেয়েছি। 
মিথ্যা কথা বলিস না। যা প্লেট নিয়ে আয়। 
মা বললো, না? 
মা বলবে কেন, আমি বুঝি না? 
বুঝিস? তুই বুঝিস? আমি না খেয়ে থাকলে, আমি কষ্ট পেলে তুই বুঝিস? আমার জন্য তোর এত দরদ ভাইয়া!- নিশি যেন ফেটে পড়লো হঠাৎ। 
সেটা না হয় পরে প্রমাণ করা যাবে। এখন যা, প্লেট নিয়ে আয়। 
বললাম তো, আমি খেয়েছি। 
আবার মিথ্যা বলছিস! আমাকে রেখে তুই আবার কবে খেয়েছিস? 
তুই এটাও জানিস! তুই তো প্রায় মহামানব হয়ে গেছিস রে ভাইয়া। মানুষ সম্বন্ধে তুই এত জানিস-বুঝিস! 
ঝগড়া করার ইচ্ছে, না? আচ্ছা তাও না হয় করা যাবে। আগে খেয়েদেয়ে শক্তি সঞ্চয় করে নে। 
কায়সার চেষ্টা করছিল নিশির রাগটা হালকা করে দিতে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। মেয়েটা আজকে এত রেগে আছে কেন কে জানে! 
না, আমি খাবো না। 
কী পাগলামী করছিস নিশি! 
পাগলামী? এটাকে তোর পাগলামী মনে হলো? আমি যে দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়ছি সেটাও কি তোর কাছে পাগলামী বলে মনে হচ্ছে? তোরা যা ইচ্ছে করতে পারবি, আমি করতে পারবো না কেন? তুই কিছু কম পাগলামী করেছিস? কম জ্বালিয়েছিস মা-বাবাকে? বড় ভাইয়া স্টুপিডের মতো মরে গেলো, বুবু এরকম একটা কাণ্ড করে বাবাকে চিরদিনের জন্য অসুস্থ করে দিয়ে গেলো, কই তাতে তো দোষ হয় না! আর আমি এখানে দমবন্ধ হয়ে মরতে বসেছি, তবু কারো নজর নেই। একবেলা না খেয়ে না থাকলেই সেটা হয়ে যাবে পাগলামী! 
নিশির গলা বোধহয় ধরে আসে। টেবিলে মাথা রেখে এবার সে নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করে। কায়সার কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে নিশির মাথায় হাত রাখে; তার কষ্ট লাগে; নিজস্ব অক্ষমতা তাকে পীড়িত করে- নিশির জন্য তার কিছুই করার নেই। 
নিশি, এই নিশি! - ম্লান, ভেজা স্বরে সে ডাকে। 
নিশি নিশ্চুপ কেঁদেই চলেছে। কায়সার অতঃপর নিশিকে টেনে ওঠায়, ওর মাথা নিজের কাঁধে চেপে ধরে রুমে নিয়ে আসে। খাটে বসে গভীর মমতায় মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করে- নিশি, এই পাগলী, কি হয়েছে তোর? আমাকে বল। বলবি না? 
নিশি এবার দুই হাতে কায়সারের গলা জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ওঠে- আমি পাগল হয়ে যাবো রে ভাইয়া। আর কিছুদিন এখানে থাকলে আমি পাগল হয়ে যাবো। 
কায়সার কিছু বলে না। ভাবে, কতটুকুই বা বয়স নিশির। ওর বয়সী মেয়েরা তো পড়াশোনা করছে, প্রেম করছে, বন্ধুদের সঙ্গে তুমুল আড্ডা দিচ্ছে, নানারকম চমৎকার অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, স্বপ্ন দেখছে একটা সুন্দর জীবনের; অথচ এই বয়সেই নিশিকে কী অদ্ভুত সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে! কায়সার যেন চোখের সামনে ছোট্ট নিশিকে দেখতে পেলো। কতটুকুই বা ব্যবধান ছিলো বয়সের- পাঁচ কি ছয়! অথচ ছোটবেলা থেকেই নিশির সঙ্গে ওর আচরণটা ছিলো টিপিক্যাল বড় ভাইয়ের মতো। নিশি তার একমাত্র ছোট বোন। ভাইয়া আর কাজল কায়সারকে ছোট পেয়ে কতৃত্ব ফলাতো বলে তার ভারি একটা আক্ষেপ ছিলো। 'ইস, আমি যদি বড় হতাম!' - এরকম একটা ইচ্ছে তার প্রায়ই হতো। নিশি যখন বড় হয়ে উঠছে- সেই সুদূর কৈশোরের কথা, তবু সব স্পষ্ট মনে পড়ে- সে ভারি আমোদ বোধ করতো। যাক, বড়োগিরি তাহলে ফলানো যাবে এবার! সেটা করতে গিয়ে অবশ্য ঝগড়া হতো খুব, মারামারিও। কিন্তু স্কুলে গেলেই খারাপ লাগতে থাকতো- 'ইস, কেন ওকে মারতে গেলাম! আমি না বড়, বড় হয়ে কেউ ছোট বোনের সাথে ঝগড়া করে! ও না হয় ছোট, কিছু বোঝে না, তাই বলে আমিও অমন করবো! সে তখন টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে নিশির জন্য চকলেট কি চুইংগাম কিনে আনতো।' বাড়িতে ফিরলে নিশি তাকে পাত্তাই দিতো না; কথা বলতে গেলে- 'তোর সঙ্গে কথা বলবো না, এই যে আড়ি। তুই পাজি, যা'- বলে ফিরিয়ে দিতো। কিন্তু চকলেট কি চুইংগাম দেখামাত্র কেড়ে নেয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তো। কোথায় চলে যেত রাগ অভিমান! মুহূর্তেই- তুই কি ভালোরে ভাইয়া- বলে রায় ঘোষণা করতো! নিশি বড় হচ্ছিল আর সে বুঝতে পারছিল, বড় ভাইগিরি আর ভালো লাগছে না! তখন থেকেই নিশি হয়ে উঠলো বন্ধুর মতো। সেই নিশি- ছোট্ট একটা মেয়ে, ঝগড়াঝাঁটি-মারামারিতে হেরে গিয়ে কথায় কথায় আড়ি নিতো, চকলেট কি চুইংগাম পেয়ে আবার মুহূর্তে সব ভুলেও যেত। এমনই সরল-সহজ ছিলো সেই সোনার শৈশব। দেখতে দেখতে সবকিছু কেমন বদলে গেলো! জীবন এখন জটিল হয়ে গেছে। নিয়তি তাদেরকে পরিত্রাণহীন এক শৃঙ্খলে বন্দী করে ফেলেছে। নিয়তি? হঁ্যা, নিয়তিই তো! কায়সার যদিও নিয়তিতে ঠিক বিশ্বাস করে না, কিন্তু মাঝে মাঝে বিশ্বাস করাটাই সুবিধাজনক। নইলে বহু ঘটনার ব্যাখ্যা মেলে না। বহু প্রশ্নের উত্তর মেলে না। যে ঘটনার ব্যাখ্যা নেই, যে প্রশ্নের উত্তর নেই তাকে নিয়তির খামখেয়ালিপনার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে শান্তি পাওয়া যায়। এ জন্যই হয়তো বিশ্বাসীরা সুখী। কায়সার এইসব ভাবছিল, আর নিশি কাঁদছিল- 
তুই সারাদিন বাসায় থাকিস না, তোকে বলাও হয় না। তুই তাই জানিস না- পরিস্থিতি কতটা খারাপ হয়ে গেছে। তুই চলে যাওয়ার পর থেকেই বাবার অস্থিরতা শুরু হয়। আধাঘণ্টা আমাকে না দেখলে চিৎকার শুরু করে। আমাকে তাই নিয়ম করে আধাঘণ্টা পর পর বাবার সামনে যেতে হয়। তুই ভাবতে পারিস- এটা আমার জন্য কি ভয়াবহ একটা শাস্তি! একজন অসুস্থ মানুষের- হোক না সে আমার বাবা- অস্থিরতার সাথে তাল মিলিয়ে আমার সারাটা দিন কাটে। আমি আর পারছিনা রে ভাইয়া। তুই আমাকে এখান থেকে নিয়ে যা, তুই আমাকে বাঁচা ভাইয়া। 
কায়সার অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে- কি করবি বল, তুই তো বুঝিস.. 
হঁ্যা আমি বুঝি। বুঝি যে আমাকে না দেখলে বাবা আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়ে, হয়তো তার মনে হয় আমিও বুবুর মতো হারিয়ে যাবো। কিন্তু তুই-ই বল এই দুঃসহ পরিস্থিতি আমি কিভাবে সামলাবো? 
কায়সার আবারও চুপ করে থাকে। 
তুই যতক্ষণ বাসায় থাকিস, ততক্ষণ আমি ভালো থাকি। কিন্তু তুই তো আছিস নিজেকে নিয়ে। একবারও আমার কথা ভাবিস? আজকে তোকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে বললাম, ফিরলি না। কেন ফিরলি না? 
নিশির কান্না বেড়ে যায় নতুন করে। এখন কিছু বলাটা সঙ্গত হবে না ভেবে কায়সার চুপ করে থাকে। ও যে জীবন যাপন করছে- সেটা নিঃসন্দেহে দুর্বিসহ। বাবা অসুস্থ না হলেও জীবনের এই প্যাটার্নকে স্বাভাবিক বলা যায় না। সারা বছরেও বোধহয় ওর একবারের জন্যও বাসার বাইরে যাওয়া হয়না। কোনো বিনোদন নেই, যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, অদূর ভবিষ্যতে এই জীবনে কোনো পরিবর্তন আসারও সম্ভাবনা নেই- ভাবা যায় না এটা কত ভয়াবহ ব্যাপার! কিন্তু তারপরও কায়সার তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগসমূহ মেনে নিতে পারে না। সে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত- এটা একেবারেই মিথ্যে। সে ব্যস্ত এই সংসার নিয়ে- গত দু-আড়াই বছর ধরে তার পুরোটা সময় ব্যয় হয়েছে এই সংসারের পেছনে। এই সময়ের মধ্যে সে এক লাইনও লেখেনি, একবারের জন্যও কোথাও আড্ডা দেয়নি, আগে প্রায়ই এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াতো- গত দুবছরে একবারের জন্যও ঢাকার বাইরে পা রাখেনি। 
নিশি কিছুক্ষণ পর শান্ত হয়ে যায়। আঁচলে চোখ মুছে নিয়ে বলে-চল ভাইয়া খেয়ে নিবি, তোর নিশ্চয়ই খুব খিদে লেগেছে, তাই না! 
খাওয়ার টেবিলে নিশি স্বাভাবিক। হাসিমুখে- বুবু তো তোকে রেগুলার খাইয়ে দিতো, আজকে আমি খাইয়ে দেই? - বললে, বিনিময়ে কায়সারও- তারচেয়ে বরং আমিই তোকে খাইয়ে দেই- বললে নিশি হেসে মাথা কাত করে। কিন্তু একটু পরেই- তুই সারাজীবন একটা গাড়ল রয়ে গেলিরে ভাইয়া, কী যে হবে তোর! এত ঝোল দিয়ে যে ভাত মাখালি লোকমা বানাবি কিভাবে, যে খাইয়ে দিবি! - বলে খিলখিল করে হেসে ওঠে। 
কায়সার মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে। এই তো তার বোন। তার হাসিখুশি ছোট্ট বোন। কে বলবে একটু আগে সে এমন কান্নামুখর ছিলো! 
আহ, এইভাবে যদি জীবনের সমস্ত অস্বাভাবিকতা দূর হয়ে যেত! যদি সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যেত একসঙ্গে! 

১৫. 
বাড়ি ছাড়া আমার যাওয়ার সীমানা ছিলো স্কুল, পদ্মার পাড়, আর কখনো কখনো হাট বা মেলা বা বাজার। এর বাইরে অন্য কোথাও যাওয়া যে নিষেধ ছিলো, তা নয়। যাওয়া হতো না, এই আর কী! স্কুল বা বাজারে যেতাম প্রয়োজনে, কিন্তু পদ্মার পাড়ে যেতাম নেশায়। কী যে আকর্ষণীয় ছিলো জায়গাটা! এক অমোঘ টানে প্রতিদিন বিকেলে গিয়ে হাজির হতাম ওখানে, ফিরতাম সন্ধ্যা পার করে। বিরাট সূর্যটা যখন সারা দিগন্তকে লাল রঙে রাঙিয়ে পদ্মায় ডুব দিতো, তখন চোখে ঘোর লাগতো। পদ্মার রূপও একেক ঋতুতে একেক রকম। বর্ষার পদ্মা রাগী, প্রমত্ত; জল তখন ঘোলাটে। আর শীতের পদ্মা শান্ত, অনুপম; জল তখন স্বচ্ছ, মনকাড়া। এই দুই সময়ে স্রোতের শব্দও পাল্টে যেত! বর্ষায় স্রোতের প্রতিকূলে মাঝিদের নৌকা বাইতে হতো প্রায় যুদ্ধ করে, আর শীতে প্রায় অলস ভঙ্গিতে। গতিময়তার মধ্যেও এইরকম পার্থক্য রচনা করতো বিভিন্ন ঋতু। 
একদিনের কথা খুব মনে পড়ে। যে সময়ের ঘটনা বলছি, তখন আমি কিশোর ছিলাম, অনির্দিষ্ট সময় ধরে নদীর পাড়ে বসে থাকার স্বাধীনতা ছিলো না। আমাদের বাড়ির কঠোর নিয়ম ছিলো- সন্ধ্যার মধ্যে অবশ্যই বাড়ি ফিরতে হবে। বিশেষ করে ছোটরা সন্ধ্যার পর কোনোভাবেই বাইরে থাকতে পারবে না। তো সেদিন, প্রতিদিনের মতোই, আমি বিকেলে গেছি পদ্মার পাড়ে। সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আসার কথা- কিন্তু ফেরা হলো না। সন্ধ্যা হতে না হতেই বিরাট এক চাঁদ উঠলো আকাশে, আর একটু পরই শুরু হলো চাঁদ ও নদীর এক অপরূপ খেলা। নদীর ঢেউয়ে চাঁদের আলো পড়ে ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে, আর চিকচিক করে উঠছে এমনভাবে যেন হাজার হাজার হিরকখণ্ড কেউ ছড়িয়ে দিয়েছে পদ্মার জলে। আরো মজা শুরু হলো খানিক পরই। প্রায় বিনা নোটিশে বৃষ্টি নেমে এলো ঝমঝমিয়ে। জোৎস্না রাতে বৃষ্টি হয় না, এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল- আমি আমার জীবনে বহুবার হতে দেখেছি। যাহোক, নদীর নিজস্ব শব্দ, বৃষ্টির শব্দ, আর চাঁদের আলো এই তিন মিলে এমন এক ঘোর তৈরি করলো যে, আমি যে ভিজে একাকার হয়ে গেছি, বাড়িতে গিয়ে বকা শুনতে হবে সেটা ভুলেই গেলাম। যখন বাড়িতে ফিরলাম ততক্ষণে দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে গেছে। একে তো রাত করে বাড়ি ফিরেছি, তার ওপর কাপড়-চোপর ভেজা, কপালে মার আছে বলে মনে হলো। বড়দের পক্ষ থেকে রাগারাগি-বকাবাজি শুরুও হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু মা থামালো। আমি অপেক্ষা করে ছিলাম কখন মা বকবে, কিন্তু মা কিছুই বললো না। রাতে যখন শুতে গেছি তখন মা আমার পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করলো- 
ফিরতে এত দেরি করলি যে, কোথায় গিয়েছিলি? 
পদ্মার পাড়ে। 
ওখানে তো রোজই যাস, কোনোদিন তো দেরি করিস না, আজকে করলি কেন? বৃষ্টিতেও তো ভিজেছিস! 
আমি নদী-চাঁদ-বৃষ্টির কম্বিনেশনে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিটা মাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু মনে হচ্ছিল কিছুতেই পরিস্থিতিটা বর্ণনা করতে পারছি না, কী এক ঘোর যে তৈরি হয়েছিল সেটা কিছুতেই বোঝাতে পারছি না। বোঝাতে না পেরে আমি একসময় কাঁদতে শুরু করলাম। 
মা আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো- কাঁদছিস কেন? আমি তো তোকে বকাবাজি করিনি... 
আমি সেজন্য কাঁদছি না মা। 
তাহলে কাঁদছিস কেন? 
আমি তোমাকে বোঝাতে পারছি না, বোঝাতে পারছি না... 
কি বোঝাতে পারছিস না? 
কী যে হয়েছিল, মানে কেন আমি ফিরতে পারলাম না... 
তাহলে তোর কাঁদাই উচিত- মা নির্বিকারভাবে বললো- যা বলতে চাস সেটা না বলতে পারলে কাঁদাই উচিত । 
তখন কথাটার মানে বুঝিনি। এখন মনে হয়- মা আসলে বলেছিলেন- যে কমিউনিকেট করতে পারে না, তার কাঁদাই উচিত। 
সেই থেকে আমি কমিউনিকেট করার চেষ্টা করে যাচ্ছি, কিছু একটা বোঝাতে চাইছি। পারছি না। পারছি না বলে কেঁেদ চলেছি। কেউ তা দেখতে পায় না। নিঃশব্দ-অন্তর্গত এই কান্না। 
আরো বহুকাল পরে, আমার মাথায় যখন লেখালেখির ভূত চাপে, নানা ধরনের বই পড়তে পড়তে হাতে আসে এক আশ্চর্য বই, আর সেটি পড়ে মা'র কথাটি আমি আরো ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারি। ভিটগেনস্টাইনের সেই অতি জটিল 'ট্র্যকটাটাস লজিকো ফিলোসফিকাস' নামক বইটি পড়তে পড়তে কিছুটা বুঝে বেশিরভাগ না বুঝে যখন মাথা এলোমেলো হবার অবস্থা, তখনই দেখি তিনি তাঁর থিসিসের শেষ পঙক্তিতে পেঁৗছেছেন এক আশ্চর্য বাক্য দিয়ে- ্তুযিধঃ বি পধহ হড়ঃ ংঢ়বধশ ধনড়ঁঃ, বি সঁংঃ পড়হংরমহ ঃড় ঃযব ংরষবহপব্থ- 'আমরা যে বিষয়ে কিছু বলতে অক্ষম সেখানে নীরবতার কাছে সমর্পিত হওয়াই উত্তম।' এই একটি বাক্যই আমাকে বুঝিয়ে দেয়, এক আশ্চর্য প্রতিভাবান মানুষের একটা বই আমি বুঝে হোক না বুঝে হোক পড়ে শেষ করে ফেলেছি। আগ্রহ জন্মে তাঁর ব্যাপারে। জানতে পারি, এ্যারোনেটিক ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য পড়াশোনা শুরু করেছিলেন তিনি, সেখানেই গণিতের ঘনিষ্ঠ সানি্নধ্যে আসেন তিনি, হাতে আসে বার্টান্ড রাসেলের প্রিন্সিপলস অব ম্যাথমেটিঙ্, যেটি তাকে দর্শন সম্পর্কেও উৎসাহী করে তোলে। রাসেল নিজেই ভিটগেনস্টাইনের সঙ্গে তার কথাবার্তার বিবরণ দিয়েছেন এভাবে, (ভিটগেনস্টাইন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন)- 
্তুডরষষ ুড়ঁ ঢ়ষবধংব ঃবষষ সব যিবঃযবৎ ও ধস ধ পড়সঢ়ষবঃব রফরড়ঃ ড়ৎ হড়ঃ?্থ 
ও ৎবঢ়ষরবফ, ্তুগু ফবধৎ ভবষষড়,ি ও ফড়হ্থঃ শহড়.ি ডযু ধৎব ুড়ঁ ধংশরহম সব?্থ 
ঐব ংধরফ, ্তুইবপধঁংব, রভ ও ধস ধ পড়সঢ়ষবঃব রফরড়ঃ, ও ংযধষষ নবপড়সব ধহ ধবৎড়হধঁঃ; নঁঃ, রভ হড়ঃ, ও ংযধষষ নবপড়সব ধ ঢ়যরষড়ংড়ঢ়যবৎ.্থ 
ও ঃড়ষফ যরস ঃড় ৎিরঃব সব ংড়সবঃযরহম ফঁৎরহম ঃযব াধপধঃরড়হ ড়হ ংড়সব ঢ়যরষড়ংড়ঢ়যরপধষ ংঁনলবপঃ ধহফ ড়িঁষফ ঃবষষ যরস যিবঃযবৎ যব ধিং ধ পড়সঢ়ষবঃব রফরড়ঃ ড়ৎ হড়ঃ. অঃ ঃযব নবমরহহরহম ড়ভ ঃযব ভড়ষষড়রিহম ঃবৎস যব নৎড়ঁমযঃ সব ঃযব ভঁষভরষষসবহঃ ড়ভ ঃযরং ংঁমমবংঃরড়হ. অভঃবৎ ৎবধফরহম ড়হষু ড়হব ংবহঃবহপব, ও ংধরফ যরস, ্তুঘড়, ুড়ঁ সঁংৎঃ হড়ঃ নবপড়সব ধহ ধবৎড়হধঁঃ.্থ 
কমপ্লিট ইডিয়ট হলে ইঞ্জিনিয়ার হবেন আর না হলে দার্শনিক হবেন! ভীষণ মজার আর মধুর এক চরিত্র মনে হয় তাকে। শুধু কি তাই, পিএইচডির জন্য থিসিসটি হাজির করার পর মৌখিক পরীক্ষার দিন তিনি তাঁর পরীক্ষকদ্বয় বার্টান্ড রাসেল আর জি ই মূরকে বলে বসেন, 'আমি জানি আপনারা এটা বুঝবেন না!' মৌখিক পরীক্ষার সময় পরীক্ষকদের কেউ একথা বলতে পারেন, এবং সেটি শুনেও পরীক্ষকরা তাকে ডিগ্রি দিতে পারেন- এটা বোধহয় পৃথিবীর ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি। শুধু এখানেই নয়, তার চরিত্রের অদ্ভুতত্ব আরো অনেক ক্ষেত্রেই ধরা পড়েছে। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি তিনি বিলিয়ে দিয়েছিলেন, কারণ তিনি মনে করতেন, দার্শনিকের কোনো সম্পত্তির প্রয়োজন নেই! প্রায় ছ-বছর গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করে কাটিয়েছেন। এই সময় কোলাহল এড়ানোর জন্য তিনি কিছুদিন এক সরাইখানার পরিত্যক্ত বাথরুমে থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন! কেমব্রিজে ফিরে তিনি দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিলেন বটে, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে স্বেচ্ছায় সেই পদ ত্যাগ করে কাজ করলেন হাসপাতালে প্রথমে পোর্টার এবং পরে ল্যাবরেটরি এ্যাসিটেন্ট হিসেবে। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে নিজ চিকিৎসকের বাড়িতে মৃতু্যর আগে তিনি বলেছিলেন : দঞবষষ ঃযবস, ও্থাব যধফ ধ ড়িহফবৎভঁষ ষরভব!্থ হঁ্যা, ড়িহফবৎভঁষ -ই বটে। জীবন নিয়ে এইভাবে ছিনিমিনি কজন-ই বা খেলতে পারেন! কজন-ই বা বলতে পারেন- 'হোয়াট উই ক্যান নট স্পিক অ্যাবাউট, উই মাস্ট কনসাইন টু সাইলেন্স'! 
মনে হয়, যেন, এতকিছু বলার পরও যে কথাগুলো বলা হলো না, সেগুলো সম্বন্ধে নীরবতা পালন করা ছাড়া উপায় নেই। নীরবতারও তো নিজস্ব একটা অর্থ আছে। যদি অনুবাদ করে নেয়া যায়, তাহলে নীরবতাই সর্বোত্তম ভাষা- এই কথা মনে হয়েছিল আমার। আর জীবনে বারবার তেমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, যেখানে উচ্চারিত শব্দের চেয়ে নীরবতাই অধিকতর বাঙময় হয়ে উঠেছে। 

১৬. 
অবশেষে তুমি স্থির হলে বীথি, অথচ একসময় মেতেছিলে এক অস্থির যুবকের সঙ্গে। সেই যুবক এখনো একইরকম রয়ে গেছে। পরিবর্তন যেটুকু তা বাইরের, ভেতরে বদলায়নি তেমন। 
কোথাও আমি স্থির হতে পারলাম না, কখনো আর গন্তব্যে পেঁৗছানো হলো না আমার। আসলে কি কোনো গন্তব্য ছিলো আমার? অন্ধকার ঘরে সিগারেট হাতে এইসব ভাবছিল কায়সার। অন্ধকারে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগছে তার- তাকিয়ে আছি, তবু কিছু দেখা যাচ্ছে না, এ যেন অন্ধত্বেরই মহড়া। অন্ধদের সে ঈর্ষা করে, আরো করে জন্মান্ধদের; তাদের অন্তত পৃথিবীর বীভৎস দৃশ্যগুলো দেখতে হয় না! এই শহরে অবশ্য নিরেট অন্ধকার পাওয়াটাও দুস্কর। স্ট্রিট লাইটের আলো, নিয়ন সাইন, দোকানপাট-বাসাবাড়ির আলো শহরের প্রতিটি কোণকে আলোকিত করে রেখেছে। এমনকি পার্কেও ফ্লাড লাইট বসানো হয়েছে! এই শহরের সবকিছুই উৎকট বাহ্যিক আলোয় উদ্ভাসিত, ভেতরে প্রগাঢ় অন্ধকার। অন্ধ মানুষের দল সেই ভুল আলোয় জীবনকে আলোকিত করতে চায়! হা ঈশ্বর, কী অদ্ভুত কুশলতায় তুমি মানুষকে অন্ধ করে রেখেছ! - তার ভাবনা এইভাবে ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাচ্ছিল। 
খাওয়ার পর মা এসেছিল। কতদিন পর মা এলো এভাবে! সে শুয়েছিল আর মা পাশে বসে তার বুকে-পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। তা-ও কতদিন পর! কতদিন সে মাকে এই রূপে পায় না! তার জীবনের সব ভালো ঘটনা এখন কতদিন পরপর ঘটে। 
তুই কত বদলে গেছিস বাবা- এইভাবে মা তার আলাপ শুরু করেছিল, আর সে মৃদু হেসেছিল কেবল। 
আগের মতো তুই আর পাগলামী করিস না! 
তুমিই তো পছন্দ করো না মা। 
না রে বাবা, এটা তোর ভুল ধারণা। তুই তো সবসময়ই আমাদের আনন্দ হয়ে ছিলি। তোর পাগলামী দুষ্টুমি হইচই দিয়েই তো সারাটা বাড়ি ভরে থাকতো। কেন তুই এত বদলে গেলি খোকা? বাড়িটা যে একদম মরে গেছে! 
আমি তো বদলাতে চাইনি মা, বদলেছ তোমরাই, বাধ্য হয়ে আমাকেও তাই বদলে যেতে হলো। 
কায়সার বুঝতে পারছিল, এগুলো মা'র আসল প্রসঙ্গ নয়- অন্যকিছু বলার আছে তার। তবু কায়সার নিজের থেকে কিছু জিজ্ঞেস করে না। বরং কথার পিঠে কথা বলে মাকে একটু সহজ করে নিতে চায়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চেপে রাখা কান্না আর বাধ মানে না মা'র। 
সবকিছুই তো ওলটপালট হয়ে গ্যালোরে খোকা। কেন এমন হলো বাবা? কি পাপ আমি করেছিলাম যে আমার সংসারটা এমন তছনছ হয়ে গ্যালো? 
পাপ? কোনটিকে মানুষ পাপ বলে, কোনটিকে পূণ্য? পৃথিবীর সবকিছু যদি পূণ্যের পুরস্কার বা পাপের শাস্তি হিসেবে নির্ধারিত হতো তাহলে পৃথিবীর ভয়ংকর পাপী মানুষগুলো এত ভালো থাকতো না! কিংবা কে জানে, ঈশ্বও এবং মানুষের কাছে পাপ ও পাপীর সংজ্ঞা হয়তো এক নয়! আসলে পাপ-পূণ্য আর এর প্রেক্ষিতে ঈশ্বর প্রদত্ত শাস্তি বা পুরস্কারের ধারণাটিকে বড্ড ধোঁয়াটে বলে মনে হয় কায়সারের। কিন্তু এসব কথা মাকে বলে লাভ নেই- বুঝবে না। বুঝলেও মানবে না। ধর্মগ্রন্থে পাওয়া ধারণার বাইরে এক পা-ও যাবে না মা। এইসব ভাবতে ভাবতে কায়সার মায়ের কথা শুনতে থাকে। 
আমার চাওয়াটা খুব বেশি কিছু ছিলো না রে বাবা। সারাজীবন আমি অল্পতে খুশি থেকেছি। কোনোদিন কোনোকিছুতেই অভিযোগ করিনি, অন্যায় দাবি করিনি। আল্লাহর কাছে কেবল বলেছি- তিনি যেন তোদেরকে ভালো রাখেন। একজন মায়ের জন্য এই চাওয়া কি খুব বেশি রে খোকা? 
মা যেন আজ মন খুলে দিয়েছে। স্রোতের মতো কথারা এসে তার দীর্ঘদিনের ধৈর্যের বাধ ভেঙে দিয়েছে। তার মুখে কায়সার কখনো এসব কথা শোনেনি। নিজের মা বলে নয়, এই মহিলাকে তার এমনিতেই এক ব্যতিক্রমী মানুষ বলে মনে হয়। এমন অসামান্য সহ্যশক্তি সে খুব কম মানুষের মধ্যেই দেখেছে। বরাবরই খুব চাপা স্বভাবের মানুষ মা। নিজের প্রয়োজন, কষ্ট বা চাহিদা নিয়ে কখনো তাকে মুখ খুলতে দেখেনি কায়সার। যে-কোনো মানুষের পক্ষেই নিজের প্রয়োজনের প্রশ্নে এমন নির্মোহতা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। আজকে সেই মায়ের দুঃখ-কষ্ট আর হাহাকারের পাঁচালি শুনতে শুনতে বিস্মিত হচ্ছিল সে। বিস্মিত, কারণ এসবই তার জানা, নতুন করে জানার কিছু নেই। তবু মা তার স্বভাবের বিরুদ্ধে গিয়ে কেন এসব বলছে কে জানে! হয়তো এটাই নিয়ম। একজন মানুষ প্রতিটি বিষয়েই একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত যেতে পারে। মা'র একলা সহ্য করার সীমা ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই, এখন তার প্রয়োজন শেয়ার করার মতো কেউ। কার সঙ্গে শেয়ার করবে মা? বাবার সঙ্গে করতে পারতো। কিন্তু কায়সারের মনে হয় না যে, মা কোনোদিন কোনোকিছু বাবার সঙ্গে শেয়ার করতে পেরেছে; এখন তো তিনি অসুস্থ- সেই প্রশ্নই এখন আর ওঠে না। মা হয়তো সেইজন্যই কায়সারকে বেছে নিয়েছে। 
তোর বাবার অসুস্থতা দিন দিন বেড়েই চলেছে- মা বলতে থাকে- বড় চিন্তা হয়, কোথায় যে এর শেষ, বুঝি না। তার জন্য নিশিও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ও এখন সবসময় আতংকের মধ্যে থাকে। তুই বাসায় থাকলে তোর বাবা একটু স্বাভাবিক থাকে, বোধহয় ভরসা পায়- নইলে আধাঘণ্টা পরপর নিশিকে ডেকে পাঠায়। না দেখলে এমন অস্থির হয়ে পড়ে যে, কোনোকিছু বলেই তাকে বোঝানো যায় না। তাকে কে বোঝাবে যে, পৃথিবীর সব মেয়ের পরিণতি কাজলের মতো হয় না! তুই একটা কিছু কর খোকা, নিশির জীবনটা যে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে! তোর বাবার জন্য ওর পড়াশোনাটাও বন্ধ হয়ে গেলো। পারলে কোনো কলেজে ওকে ভর্তি করে দে, ডিগ্রিটা পাশ করুক, নইলে কোনো একটা ভালো ছেলে দেখে ওর বিয়ে দিয়ে দে। 
এটাই আসল কথা- কায়সারের মনে হলো। সে নিজেও যে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছে না, তা নয়। কিন্তু 'ভালো ছেলে' পাওয়া যাচ্ছে কোথায়? নিশির জন্য মাঝে মাঝে দুচারটে প্রস্তাব আসে বটে, কিন্তু বেশিদূর এগুনোর আগেই কি করে যেন ওদের কাছে কাজলের প্রসঙ্গ চলে যায়! 'বড় বোনের যখন এই কীর্তি, ছোট বোন আর কেমন হবে'- ধরনের একটা খোঁড়া বোধবুদ্ধিহীন যুক্তি দিয়ে প্রস্তাবগুলো ফিরে যায়। কায়সারের রাগ হয়, আবার মনে মনে হাসেও। একটা গাছের দুটো পাতাও কখনো এক হয় না- অথচ ওইসব মুর্খের দল দুজন মানুষকে এক করে দেখতে চায়! যারা এইসব উদ্ভট কথায় কান দেয়, সে তাদের জন্য করুণা বোধ করে। এদের পাশে নিশিকে সে কল্পনাই করতে পারে না। ওরা তো জানে না নিশি কী চমৎকার একটি মেয়ে! 
ওই প্রস্তাবগুলো ফিরে গেছে বলে কায়সারের বিশেষ দুঃখ নেই। সে চায় যেন উদার হৃদয়ের একজন যুবক তার সঙ্গী হয়- যে ভালোবাসা, মমতা আর সহানুভূতি দিয়ে সবকিছু বিচার করবে। তেমন ছেলে সে কোথায় খুঁজে পাবে? 
এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করেই ছোট্ট নিশি এসে তার স্মৃতির দরজায় কড়া নাড়লো। এই তো সেদিনের মেয়ে। তখনো হাঁটা শেখেনি, কথা শেখেনি। হামাগুড়ি দিয়ে, হামহুম শব্দ করে নিজের অস্তিত্বের জানান দেয়। হাত বাড়ালে ঝাঁপিয়ে কোলে আসে। তখন সে-ও তো ছোট। কষ্ট হয়, তবু স্কুল থেকে ফিরেই বোনকে কোলে নিতে ভারি আনন্দ। মা বলতো- তুই পারবি না, ফেলে দিবি, নেয়ার দরকার নেই- সে শুনতো না। নিশি কোলে এসে তার শার্ট আর গাল কামড়ে, চুল টেনে, কান টেনে একাকার করে দিতো। যখন কয়েকটা দাঁত গজালো তখন দেখতে চাইলে ই ই করে দেখিয়ে দিতো। তারপর টলোমলো পায়ে হাঁটতে শিখলো, কথা শিখলো, কায়সারকে 'ডাডি' বলে ডাকতে শিখলো। শিশুদের কতরকম অদ্ভুত ব্যাপার থাকে! অনেকদিন পর্যন্ত নিশি কায়সারকে 'ডাডি' বলেই ডেকেছে! আদিত্য থেকে আদি, আর ছোট্ট নিশির কাছে 'ডাডি'! তারপর একটু বড় হয়ে কত কাণ্ড, কত আব্দার, কত দাবি-দাওয়া! আর মারামারি। কায়সার অবশ্য কমই মেরেছে, খেয়েছে বেশি। নিশি রেগে গেলে আঁচড়ে-কামড়ে-খামচে তাকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলতো। এখনো তার মুখে-বুকে-হাতে-পায়ে নিশির অনেক আঁচড়ের দাগ রয়ে গেছে। ও যেমন মারতো, কাঁদতোও তেমন। নিজেই মেরে নিজেই কেঁদে অস্থির। অর্থাৎ মেরেও জিততো, কেঁদেও জিততো। কোনোদিন মারামারিতে হেরে গেলেই আড়ি নিতো- কায়সারকে চকলেট কি চুইংগাম ঘুষ দিয়ে সেই আড়ি ভাঙাতে হতো! 
ভাইয়া- নিজের ভাবনায় এমন মগ্ন হয়ে ছিলো কায়সার যে কখন নিশি এসে দাঁড়িয়েছে, বুঝতেই পারেনি। নিশির কণ্ঠ কেমন ভেজা- আজকে আমার মাথার ঠিক ছিলো না রে ভাইয়া, তোকে কত আজেবাজে কথা বললাম। রাগ করিস না। 
কায়সার ঝাপসা চোখে তাকিয়েছিল। নিশির কথার প্রেক্ষিতে কিছুই না বললে নিশিই আবার বলে- অন্ধকারে বসে আছিস, আলো জ্বেলে দিই? 
থাক লাগবে না। তুই বোস। 
তারপর অনেকক্ষণ কোনো কথা নেই। নিশিই আবার ডাকে- ভাইয়া, তোর মনটা এত খারাপ কেন রে, কি হয়েছে? 
না কিছু হয়নি। 
ফিরতে এত দেরি করলি কেন? কাজ ছিলো? 
না তেমন কিছু না। 
ওরকম ছাড়া ছাড়া ভাবে কথা বলছিস কেন? কি হয়েছে বল না! 
শাহবাগ গিয়েছিলাম, অনেকদিন পর একটু আড্ডা দিলাম। আবিদের সঙ্গে দেখা হলো। 
ও, তুই তো ওদিকে আর যাসই না। এতদিন পর গেলি, আর আজকেই কী না আমি এমন বকাবাজি করলাম। মাফ করে দে ভাইয়া। 
দূর, কি যে বলিস ... 
আবিদ ভাইও তো অনেকদিন এদিকে আসেন না, কেমন আছেন উনি? 
ভালোই মনে হয়। বিয়ে করবে বললো। 
তাই! মজার খবর তো! কাকে? চিনিস তুই? 
হঁ্যা। 
কে? 
বীথি। 
বীথি আপা! - নিশি চমকে ওঠে। 
হুঁ। 
নিশি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললো- শেষ পর্যন্ত বীথি আপা... 
নিশির অসমাপ্ত বাক্য পরিবেশটাকে ভারি করে তুলছে দেখে কায়সার গলায় একটু ঠাট্টার আমেজ ঢেলে জিজ্ঞেস করলো- আবিদের ব্যাপারে তোর আগ্রহ-টাগ্রহ ছিলো নাকি রে নিশি? 
একথা বললি কেন ভাইয়া? - নিশি অবাক গলায় জিজ্ঞেস করলো। 
না, মনে হলো ওর বিয়ের কথা শুনে তুই একটু চমকে উঠলি! 
ছি ভাইয়া! 
কেন, ছি'র কি হলো? 
আবিদ ভাইয়ের বিয়ের কথা শুনে চমকাইনি, চমকে গেছি বীথি আপার নাম শুনে। আর তাছাড়া ওসবের প্রতি আমার ঘেন্না ধরে গেছে। 
কেন, ঘেন্না ধরার কি হলো আবার? 
কি হয়েছে তা তুই ভালো করেই বুঝিস। খামোখা জিজ্ঞেস করছিস কেন? 
কায়সার একটুক্ষণ চুপ করে থাকে। হঁ্যা, সে বোঝে বৈকী। কিন্তু নিশির এই দৃষ্টিভঙ্গিটাকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেয়া যায় না, সেটা হলে ও খুব সাফার করবে জীবনে। সে তাই বোঝানোর প্রস্তুতি নিয়ে বলে- কাজলের ঘটনার কথাই বলবি তো? 
হঁ্যা। এত কাছ থেকে এমন একটা ঘটনা দেখার পরও কি প্রেম-ট্রেমের প্রতি কারো কোনো আগ্রহ থাকতে পারে? 
একটা মাত্র ঘটনা দিয়ে সবকিছু বিচার করলে তো হবে না নিশি! 
এটা তোর কাছে একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হতে পারে, আমার কাছে না। আমি বুবুর ব্যাপারটাকে একটা মডেল ঘটনা হিসেবেই দেখি। 
এটা কিন্তু ঠিক না নিশি। কেন তুই তা দেখবি? পৃথিবীর সবার জীবনেই তো আর এমনটা ঘটছে না! 
প্রকাশ্যে সেটা না হলেও গোপনে গোপনে সব প্রেমেরই শেষ হয় প্রতারণা দিয়ে। অন্তত আমি তাই মনে করি। এই প্রতারণায় মাত্রা কম বেশি হতে পারে। বুবু প্রতারিত হয়েছিল চূড়ান্ত মাত্রায়। সব ক্ষেত্রে এমন হয় না, আমি জানি। কোনো কোনো প্রেম বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়, কিন্তু সেটাই কি সব? আর বিয়েটা যে ভালোবাসার পরিণতি হিসেবেই হয় তা তোকে কে বললো? এটা তো এক ধরনের অবলিগেশনের জন্যও হতে পারে! একজনের সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পর্ক থাকার পর ওই অবলিগেশন তো তৈরি হতেই পারে, তাকে বিয়ে না করলে কেমন দেখায়- এরকম চিন্তা থেকেও তো বিয়েটা হতে পারে! আমার ধারণা, প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাই ঘটে। 
কায়সার অবশ্য নিশির এই কথাটা মেনে নিলো, তবে মনে মনে। সে-ও বিশ্বাস করে- কোনো প্রেমই শেষ পর্যন্ত মধুর থাকে না। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী প্রেমগুলো আসলে প্রেমই থাকে না, পরিণত হয় ওই অবলিগেশনে। প্রেমের বিয়েটা আসলে অবলিগেশনেরই বিয়ে। যে-কোনো সম্পর্কই- যার সঙ্গে দায়িত্ব নেয়ার বাধ্যবাধকতা আছে- একসময় ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে, হতে বাধ্য। কিন্তু চক্ষুলজ্জার খাতিরে তা বলা যায় না, বিয়ে করে ফেলতে হয়। এটা তো প্রতারণাই। আর তারপরও এই দম্পতি সারাটা জীবন পাশাপাশি থেকে জীবন-যাপন করে যায়! কীভাবে যে পারে এরা, কায়সার বোঝে না। হতে পারে তারা পরস্পরের কাছে সত্যি কথাটা বলে না, কিন্তু নিজেরা তো সত্যটা জানে! তাহলে! 
কিন্তু এসব কথা তো আর নিশিকে বলা যায় না, বলতে হয় অন্য কথা- দ্যাখ নিশি, জীবন সম্বন্ধে খুবই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কথাগুলো বলছিস তুই। মানুষের সম্পর্কগুলো কেবল প্রতারণার ওপর দাঁড়িয়ে থাকেনা, থাকলে মানব জাতি এই পর্যন্ত আসতে পারতো না, অনেক আগেই ধ্বংস হয়ে যেত। 
ঠিক আছে বুঝলাম, সম্পর্ক শুধু প্রতারণাময় নয়, তাহলে আর কি আছে এর মধ্যে? 
নিশ্চয়ই মমতা ও ভালোবাসা আছে, একজনের প্রতি আরেকজনের দায়িত্ববোধ আছে। বিষয়টা নির্ভর করে তুই কেমন মানুষ বেছে নিচ্ছিস তার ওপর। কাজল একজন ভুল মানুষকে বেছে নিয়েছিল, তার মানে এই না যে, পৃথিবীর সবাই একেকজন ভুল মানুষ... 
কিন্তু সেটা আমি বুঝবো কি করে যে সে ভুল না শুদ্ধ মানুষ? 
সেই বিচার-বিবেচনা একজন মানুষের মধ্যে থাকাই উচিত। কেউ যদি এতটুকু বুঝতে না পারে যে, কোন মানুষ তার জন্য ভুল কোনজন সঠিক, তাহলে তার সম্পর্ক গড়তে যাওয়ার দরকার কি? 
এইখানেই তোর সাথে আমার মিলছে না ভাইয়া। একজন লোক যখন প্রেমে পড়ে তখন সে আর সেই বিচার বিবেচনার অবস্থায় থাকে না। সে থাকে ঘোরের মধ্যে, অন্য কোনো এক জগতে- যার সঙ্গে বাস্তব জগতের সম্পর্কই থাকে না। বুবু যখন ওই লোকটার প্রেমে পড়েছিল, তখন নিশ্চয়ই ওর মনে হয়নি যে, ও একজন ভুল মানুষকে ভালোবেসেছে! লোকটাকে নিশ্চয়ই ও নিজের জন্য সঠিক বলেই ভেবেছে! নইলে তো কোনো অর্থেই তার সঙ্গে বুবুর প্রেম হওয়ার কথা নয়! এরকম একজন লোককে ঠিক লোক হিসেবে ভেবে নেয়ার কারণ কি ? তোর কি মনে হয় না- বুবু তখন এমন এক ঘোরের মধ্যে ছিলো যে, স্বাভাবিক চিন্তার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছিল? 
কায়সার নিশির এসব কথাবার্তায় ভীষণ চমকে যাচ্ছিল। ওর চিন্তাভাবনা এত স্বচ্ছ আর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, সে জানতো না। এত কাছে থেকেও, প্রতিদিন কথা বলেও ব্যাপারটা বোঝা যায়নি। তাহলে? মানুষকে দূর থেকে বিচার করাটা সত্যিই এক ভয়াবহ ব্যাপার। কায়সারকে চুপ থাকতে দেখে নিশিই আবার বলে- নিজের কথা বল তো ভাইয়া। তুই মনের মতো কাউকে পেয়েছিস কখনো? 
হয়তো পেয়েছি। 
হয়তো কেন, নির্দিষ্ট করে বল। 
হঁ্যা, পেয়েছি। 
পেয়েছিস? তাই নাকি? আমাকে বলিসনি তো? 
বলার মতো কিছু না। 
কেন? তুই মনের মতো একজনের দেখা পেয়েছিস, এটাই তো চমৎকার একটা ব্যাপার, বললি না কেন আমাকে? 
আরে সম্পর্ক তো তৈরিই হয়নি, বলবো কি? 
কি বলছিস তুই ভাইয়া! মনের মতো একজন মানুষ পেয়েও তুই সম্পর্ক গড়লি না! 
এটা তো আর এক তরফা ব্যাপার নয় যে, শুধু আমি চাইলেই হবে। তারও তো চাইতে হবে! 
সে চায়নি! এটা অবিশ্বাস্য। 
কেন? তাকে চাইতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা আছে নাকি? 
দ্যাখ ভাইয়া, তুই আমার ভাই বলে বলছি না, আমার মনে হয়- পৃথিবীর দশজন শ্রেষ্ঠ মানুষের একটা তালিকা বানালে সেখানে তোর নাম থাকা উচিত। অথচ তোর ওই মনের মতো মেয়েটি তা বুঝতেই পারেনি, পারলে যে-কোনো মূল্যে তোকে সে পেতে চাইতোই। যে তোর কিছুই বুঝতে পারে না, সে তোর মনের মতো হয় কিভাবে ভাইয়া? 
কায়সার এবার আমূল চমকে ওঠে। না, তাকে পৃথিবীর দশজন শ্রেষ্ঠ মানুষের একজন বানিয়ে দেয়া হয়েছে বলে নয়- ওটা অতিশয়োক্তি, বাড়াবাড়ি; পৃথিবীর সব বোনের কাছে তাদের অপদার্থ ভাইয়েরাও একেকজন বিশ্বজয়ী রাজকুমার- বরং নিশির ওই মন্তব্যটি তাকে চমকে দিয়েছে। মৃন্ময়ী কি সত্যিই তাকে বুঝতে পেরেছিল? আর কিছু না হোক, কায়সার নিজেকে সব অর্থেই একজন ইতিবাচক মানুষ বলে মনে করে, মৃন্ময়ীর জন্য তার গভীর প্রেমও ছিলো- এ দুটো জিনিস একজনের মধ্যে থাকলে তার কাছে আর কি চাওয়ার থাকতে পারে অন্য একজন মানুষের? মৃন্ময়ী কি তাকে এভাবে দেখেছিল? 
সরি ভাইয়া- নিশির কথায় তার ঘোর ভাঙে- তোকে কষ্ট দিতে চাইনি। কিন্তু যা-ই বলিস- তোর ওই ভুল মানুষ ঠিক মানুষের ধারণাটাকে আমার বানোয়াট বলেই মনে হচ্ছে। আর এইসব ক্ষতিকর ধারণা তৈরী করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য তোরাই দায়ী। 
আমরা? মানে? 
তোরা, মানে লেখকরা। তোরা সব বায়বীয় চরিত্র তৈরি করে তাদের মধ্যে মমতা-প্রেম-মহত্ত্ব এইরকম নানা গুণাবলী আরোপ করে পাঠকদের মোহমুগ্ধ করে ফেলিস। বাস্তবে তো আর অমন মানুষের অস্তিত্ব নেই। সারা পৃথিবীর লেখকরা এ পর্যন্ত যতগুলো চরিত্র তৈরি করেছেন- তার একটারও বাস্তব অস্তিত্ব নেই, ছিলো না। 
নিশিকে যেন আজ কথায় পেয়েছে, আক্রমণাত্নক কথাবার্তা বলে কায়সারকে প্রায় পর্যুদস্ত করে ফেলছিল সে। তার মনে পড়ে- কাজলও একবার এভাবে তাকে আক্রমণ করেছিল, বীথির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হলো ওই সূত্র ধরেই। কাজল বলেছিল- তুই তো অন্ধ জাদুকর; এখনো তেমন ঝানু হয়ে উঠিসনি, তবে হয়ে যাবি। জাদু দেখিয়ে মানুষকে ঘোরের মধ্যে ফেলে দিচ্ছিস, অন্ধ বলে তা দেখতেও পাচ্ছিস না! - কাজলের ওই আক্রমণ ছিলো শুধু তাকেই উদ্দেশ্য করে করা, কিন্তু নিশি পৃথিবীর সব লেখক আর তাদের তৈরী করা চরিত্রদেরকে একসঙ্গে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কায়সার, স্বাভাবিকভাবেই, এসব ব্যাপারে স্পর্শকাতর। নিছক গল্প-উপন্যাসের অনেক চরিত্রের জন্য তার যে মমতা, তা অনেক বাস্তব মানুষের জন্যও নেই। কোনো কোনো চরিত্রের জন্য সে যে পরিমাণ কেঁদেছে তা কোনো বাস্তব মানুষের জন্য কাঁদেনি। মনে পড়ে- 'পথের পাঁচালি'র দুর্গার মৃতু্যর কথা পড়ে সে অনেকদিন ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়াও করতে পারতো না, গোপনে গোপনে দুর্গার জন্য যে সে কত কেঁদেছে- তার কোনো হিসেব নেই। এদের বিরুদ্ধে এরকম ঢালাও অভিযোগ মেনে নেয়া যায় না। কায়সার তাই তর্কের জোর প্রস্তুতি নিয়ে বলে- কি বলছিস তুই, নিশি? আমরা সব বায়বীয় চরিত্র তৈরি করি? এর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই? 
থাকেলেও খুব সামান্য। 
তোর এ কথা মনে হওয়ার কারণ কি? 
আচ্ছা তুই-ই বল না, বুবুকে নিয়ে তুই কখনো লেখার কথা ভাবিস না? 
হঁ্যা ভাবি, খুব ভাবি। 
ওকে নিয়ে তুই যাই লিখিস না কেন, গল্প বা উপন্যাস, সেটা কেমন হবে রে ভাইয়া? 
কায়সার নিশির প্রশ্নের ধরন বুঝতে না পেরেও বলে- লিখতে পারবো কি না জানি না, কিন্তু ওকে নিয়ে আমি আমার লেখক জীবনের সেরা লেখাটি লিখতে চাই। 
এখন ভাইয়া, তুই ভেবে দ্যাখ, বুবুকে নিয়ে লিখলে তোর কি কোনো বাস্তব জ্ঞান থাকবে, না লোপ পাবে? আর কেউ না জানুক, আমি তো জানি- বুবুকে তুই কী পরিমাণ ভালোবাসিস! ওর মৃতু্য যেমন তোর জীবনটাকেই এলোমেলো করে দিয়েছে, তেমনই ওর সম্বন্ধে তোর আবেগ-মমতা-ভালোবাসা অস্বাভাবিক রকম ভাবে বেড়ে গেছে। সেই বুবু যখন তোর গল্প বা উপন্যাসের চরিত্র হয়ে আসবে তখন কি তার সম্বন্ধে নির্মোহ হয়ে থাকা সম্ভব হবে তোর পক্ষে? ওর ঘটনাটাকে কি তুই অন্যরকম একটা রূপ দেয়ার চেষ্টা করবি না? তুই হয়তো ওর কার্যকলাপে একটা মহত্ত্ব আরোপের চেষ্টা করবি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- ও কোনো মহৎ কাজ করেনি, করেছে নিছক বোকামি। ও একটা বদমাশ লোককে বিশ্বাস করেছে, প্রতারিত হয়ে আত্নহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু তুই ওর এই বোকামিটা দেখাবি বলে মনে হয় না, কারণ, তাহলে তোর পাঠকরা ওকে করুণা করবে, ওর প্রতি বিরক্ত হবে। তোর এত প্রিয় বোনকে কেউ করুণা করবে, এটা আবার তোর সহ্য হবে না। ফলে বুবুকে তোর মহত্ত্বের পোশাক পড়াতে হবে। তুই সম্ভবত দেখাবি- ও একজন মানুষকে বিশ্বাস করে ভালোবেসেছিল, নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়েছিল, কিন্তু প্রতারিত হয়ে, প্রেমের এই অপমান সইতে না পেরে আত্নহত্যা করেছিল। ওর পরিণতির এই মহৎ ব্যাখ্যা পাঠকদের মুগ্ধ করবে, তারা ভাববে- আহা, প্রেমের জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে পারে, এমন একটা মেয়েকে যদি জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতাম! অথচ ভেবে দ্যাখ, কেউ যদি সত্যিই বুবুর মতো কাউকে খুঁজে বেড়ায়, তাহলে সে আসলে একটা নিরেট বোকা মেয়েকে খুঁজে বেড়াচ্ছে! তুই যদি কোনোদিন বড় লেখক হতে পারিস, আর সত্যি সত্যি বুবুকে নিয়ে জীবনের সেরা লেখাটা লিখে যেতে পারিস, আর তোর যদি হাজার হাজার পাঠক তৈরি হয়- তাহলে তারা তোর সমস্ত আবেগ-মমতা-স্বপ্ন আর ভালোবাসা দিয়ে তৈরি ওই চরিত্রের মধ্যে তাদের স্বপ্নের মেয়েটিকে খুঁজে বেড়াবে। তুই-ই বল, এটা কি ওই পাঠকদের জন্য বিরাট বিভ্রান্তি না? 
নিশির কথা শুনে কায়সার চমৎকৃত ও বিস্মিত হলো। ওর এই বিশ্লেষণের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই অনেক কথা বলা যায়, কিন্তু কায়সারের ভালো লাগলো এই ভেবে যে, মতামতটি নিশির নিজস্ব এবং মৌলিক। বোনকে এমন পরিণত এবং নিজের ব্যাখ্যার পক্ষে এমন আস্থাশীল দেখে তার ভালো লাগছিল। কতদিন যে এসব বিষয়ে আর নিশির সঙ্গে কথা হয় না! কাজলের দুর্ঘটনার পর আসলে এ বাসায় আর কিছুই হয়নি। একসময় কায়সার প্রায় নিয়ম করে কাজল আর নিশির সঙ্গে এ সব বিষয় নিয়ে কথা বলতো। কোনো একটি বই পড়ে তার ভালো লাগলে বোনদেরকেও পড়াতো, ওটা নিয়ে আলোচনা করতো, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ-তর্ক-বিতর্ক চলতো। লেখকদের পরিবারের সদস্যরা সবসময় লেখালেখির বিরুদ্ধে অবস্থান করে- এমন একটা ধারণা তার বন্ধুমহলে প্রচলিত ছিলো। ধারণাটি হয়তো একেবারে মিথ্যেও নয়। একজন লেখক সাধারণত যে জীবন যাপন করেন, সেটা কোনো স্বাভাবিক জীবন নয়, এবং সেটা একটা পরিবারের কাছে কাম্যও হতে পারে না। খানিকটা উদাসীন, বিষয়-বুদ্ধিহীন, ক্যারিয়ারের ব্যাপারে অজ্ঞ- এ ধরনের লোকজন সামাজিক জীব হিসেবে তো খুব বেশি গ্রহণযোগ্য হয় না! এই ধরনের জীবন পছন্দ নয় বলেই হয়তো লেখকদের কাছের মানুষরা লেখালেখি ব্যাপারটাকেই অপছন্দ করে ফেলে। কায়সার তাই পরীক্ষামূলক ভাবে নিজের বোনদেরকে বই পড়াতে শুরু করেছিল। তার বিশ্বাস ছিলো- বই পড়ার মজাটা পেয়ে গেলে একজন মানুষের পক্ষে লেখালেখির বিরুদ্ধে যাওয়া অসম্ভব। ব্যাপারটা অবশ্য কাজলের সঙ্গেই বেশি ঘটতো, কিন্তু নিশিও ছিলো এই দলের আগ্রহী সদস্য। কাজল চলে যাওয়ার পর সবই ওলটপালট হয়ে গেলো, কোনোদিন আর নিশির সঙ্গে এসব নিয়ে কোনো কথা হয়নি, একটা বইও দুজন মিলে ভাগাভাগি করে পড়েনি তারা। সত্যি বলতে কি, কায়সার নিজেই বই পড়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছে। সে জানতোও না নিশি ভেতরে ভেতরে এমন পরিণত হয়ে উঠেছে- এসব নিয়ে তার একটি নিজস্ব মতামতও দাঁড়িয়ে গেছে। 
নিশির ব্যাখ্যা সে অস্বীকার করতে পারলো না। হঁ্যা, সে কাজলের চরিত্র নির্মাণ করবে সমস্ত আবেগ দিয়ে, মমতা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে। এমনকি সে মৃন্ময়ীকেও সৃষ্টি করতে চায় এমন করেই। সে জানে, মৃন্ময়ী রহস্যময় হলেও খুবই সাধারণ একটা মেয়ে, একজন লোকের ঘর করছে, সন্তান উৎপাদন করছে- রান্নাঘর সামলানো আর বাচ্চাদের দেখাশোনা করা ছাড়া ওর কোনো কাজই নেই। কিন্তু তার কলমে সে নির্মিত হবে এক ভীষণ রহস্যময়ী আর আকর্ষণীয় চরিত্র হিসেবে। এতে হয়তো নির্মোহতা থাকবে না, নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হবে। হোক না! সে তো নির্মোহ থাকার জন্য কারো কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়! সাহিত্যের ইতিহাসের সমস্ত সফল চরিত্রই লেখকের আবেগের ফসল- নির্মোহতার নয়। সেই আবেগের ফলে একটা চরিত্র যদি অমরত্ব পেয়ে যায়, তাহলে দোষ কি? নিজের কলমে চিত্রিত কাজল আর মৃন্ময়ীর অমরত্বের সম্ভাবনা ও স্বপ্নে কায়সার রীতিমতো স্বপ্নঘোরগ্রস্থ হয়ে পড়ে। নিশির- 'এই ভাইয়া তোর কি হলো রে'- শুনেও তার ঘোর ভাঙেনা। প্রায় শোনা যায় না এমন করে বলে- 'উঁ, না কিছু না।' 
তুই তো একেবারে নিঝুম হয়ে গেলি। এইসব প্রসঙ্গ থাক। তারচেয়ে বরং বল মেয়েটা কে? 
কোন মেয়েটা? - কায়সারের ঘোর তখনো ভাঙেনি। 
আরে এতক্ষণ ধরে যাকে নিয়ে কথা হলো। তুই আমাকে ওর কথা বলিসনি কেন রে ভাইয়া? 
এমনি। 
এবার অন্তত বল। কে মেয়েটা? 
মৃন্ময়ী। 
মৃন্ময়ী! বাহ, সুন্দর নাম তো! কিন্তু, এটা কোনো পরিচয় হলো? ভালো করে বল! 
কায়সার হাসলো। বললো- কি বলবো? ওকে নিয়ে আসলেই কিছু বলার নেই আমার। আমি এখনো বুঝে উঠতে পারিনি- ও আমার কে! ... 
তার ঘোর লেগে যায়, কী বলছে, কাকে বলছে, সে অনেকক্ষণ ধরে খেয়ালই করেনি। হঠাৎ মনে পড়ায় খানিকটা অবাক হয়ে দেখে, সামনে নিশি নয়, ভাবী বসা। সে একটু সচেতন হয়। মৃন্ময়ীর কথা ভাবী জানতো, এসব কথা শুনলেও অসুবিধা নেই। তবু, তার মনে হয়- মা আর নিশির মতো ভাবীরও কিছু বলার আছে। আজকে বোধহয় সবার সবকিছু বলার দিন আর তার সবকিছু শোনার দিন! 
ভাবীও একই প্রসঙ্গে কথা তোলে। নিশি বিয়ের কথা, বাবার অসুস্থতার কথা। সেই সঙ্গে এটাও জুড়ে দিতে ভোলে না- তোমার বয়সও তো আর বসে নেই। এভাবে আর কতদিন? এবার একটা বিয়ে করো! 
কায়সার এবারও মৃদু হেসেছে কেবল, বলেনি কিছুই। বরাবরই এ প্রসঙ্গটা সে এড়িয়ে যায়। বিয়ে করবে, ঘরে বউ আসবে, সে আরো বেশি সংসারী হয়ে পড়বে- এসব সে ভাবতেই পারেনা। চবি্বশ ঘণ্টা আরেকজন মানুষের পাশাপাশি থাকতে হবে, এই চিন্তা করলেও তার দমবন্ধ হয়ে আসে। সে তো নির্জনতা আর নিঃসঙ্গতাকে উপভোগ করে- আরেকজন মানুষ এলে সারাজীবনের জন্য সেই নির্জনতাকে বিসর্জন দিতে হবে। উহ, ভাবা যায় না। তাছাড়া বাস্তব কিছু কারণও আছে বিয়ে না করার। তার ওপর অনেক বড় দায়িত্ব। বাবা-মা ছাড়াও নিশি, ভাবী আর তার দুই ছেলেমেয়ে পুরোপুরি তার ওপর নির্ভরশীল। বিয়ে করে বসলে বউ যদি এদেরকে সহজভাবে গ্রহণ না করে? যদি নিজের মতো আলাদা সংসার পাততে চায়- সে তখন কোনদিকে যাবে! এদেরকে ছেড়ে দেয়ার প্রশ্নই ওঠেনা, দিলে এরা যাবে কোথায়? আর বিয়ে একবার করে ফেললে বউকেও তো ছাড়া যাবে না- তাহলে? সারাদিন বাসার মধ্যে ঠাণ্ডা যুদ্ধ, এই মানুষগুলোর অসহায়ত্ব বেড়ে যাওয়া, বাসায় ফিরে বউয়ের বিস্তর অভিযোগ, অশান্তি, অশান্তি- ওহ, ভাবলেও মাথা ব্যথা করে। সে তাই ওই চিন্তা দূরে সরিয়ে রেখেছে। যদি তার কোনো প্রেম-ট্রেম থাকতো, কোনো মেয়ের সঙ্গে বোঝাপড়া থাকতো সেক্ষেত্রে না হয় একটা রিস্ক নেয়া যেত। যদিও তার মনে হয়, প্রেম হলেও সেটা বেশিদিন টিকতো না! তাছাড়া, দাম্পত্য সম্পর্কটাকেই কায়সার ইতিবাচক চোখে দেখে না। একবার সে দাম্পত্য সম্পর্কের একটা সংজ্ঞা দিয়েছিল তার বন্ধুদের কাছে- এই সম্পর্কের শতকরা ষাট ভাগ হচ্ছে অভ্যাস; দুজন মানুষ একসঙ্গে অনেকদিন থাকলে, বিশেষ করে তারা যদি জেনে যায় যে, যে-কোনো কারণেই হোক না কেন, তারা একসঙ্গে থাকতে বাধ্য, তাহলে ওই একসঙ্গে থাকার একটা অভ্যাস তৈরি হয়ে যায়; বাকি চলি্লশ ভাগের তিরিশ ভাগই হচ্ছে দায়িত্ব বা কর্তব্যবোধ, এটা হচ্ছে সামাজিক সম্পর্কগুলোর প্রতি মানুষের যে স্বাভাবিক দায়িত্ববোধ থাকে তারই একটা রূপ; বাদবাকি দশভাগ হচ্ছে এই অভ্যাস ও দায়িত্বজনিত কারণে তৈরি ভালোবাসা। 
জেনেশুনে এমন এক অভ্যাসে কে পড়তে যাবে? 
তবু বিয়ের কথা আসে। ঘুরে-ফিরে আত্নীয়স্বজনরা বারবার এই প্রসঙ্গ তোলে। এই আজকে যেমন ভাবী তুললো। ভাবীর সঙ্গে অবশ্য প্রতি রাতেই সে দীর্ঘক্ষণ গল্প করে। ভাবীর সঙ্গ দরকার, আর তাছাড়া মহিলাকে সে খুব পছন্দও করে। সে জীবনে অনেক রূপসী দেখেছে কিন্তু ভাবীর মতো এমন আকর্ষণীয় মেয়ে আর একজনও দেখেনি। ভাইয়ার মৃতু্যর আগে এ নিয়ে অনেক ঠাট্টা দুষ্টুমি হয়েছে। ভাবীকে সে বলতো- কেন যে ভাইয়া তোমাকে আগে দেখে ফেললো! 
তুমি আগে দেখলে কি হতো? 
নির্ঘাত বিয়ে করে ফেলতাম। এই ভাবী চলো না, আমরা দুজন পালিয়ে যাই! 
সেটা খারাপ হয় না। পরদিন থেকে দেবর-ভাবীর কেলেংকারি নিয়ে পত্রপত্রিকাগুলো লেখার একটা সুযোগ পায়! 
পাক! আরে কে কি বললো, তাতে আমাদের কি যায় আসে? আমরা দুজন দুজনের থাকলেই হলো... 
এই আস্তে বলো, তোমার ভাই শুনলে হার্টফেল করবে! 
ঠাট্টা-দুষ্টুমিতে চমৎকারভাবে রেসপন্স করার একটা সহজাত স্বভাব ও ক্ষমতা ছিলো ভাবীর। কায়সার একবার বলেছিল- তুমি আমার ভাবী না হলে নির্ঘাৎ তোমার প্রেমে পড়ে যেতাম। 
ভাগ্যিস সেরকম কিছু ঘটেনি। 
কেন, ঘটলে অসুবিধাটা কি ছিলো?- কায়সার একটু আহত গলায় বলেছিল। 
সেক্ষেত্রে তোমাকে কেবল প্রেমিক হিসেবে পেতাম, এমন চমৎকার একটা দেবর কোথায় পেতাম বলো! এখন দুটোই পেয়েছি... 
দুটোই পেয়েছ মানে! 
মানে একইসঙ্গে দেবর এবং প্রেমিক, দেবরের সাথে প্রেম করার মজাই আলাদা, আহা... 
মানে! আমার সাথে তোমার প্রেম চলছে নাকি? 
সেটা চলুক আর না চলুক, তুমি যে আমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছো সেটা তো পরিষ্কার বুঝতে পারছি... 
কিন্তু এখন এসব নিয়ে কথাই বলা যায় না। আজকে যেমন, ভাবী যখন কায়সারের বিয়ের প্রসঙ্গ তুললো তখন দুষ্টুমি করে সে বলেছিল- হঁ্যা বিয়ে তো করা দরকার, তা চেনাজানার মধ্যে এক তুমি আছো, রাজি থাকো তো তোমাকেই করে ফেলি... 
ভাবী আগের মতো রেসপন্স করলো না। বরং গম্ভীর হয়ে বললো- এসব কথা বলো না, এমনিতেই নানা লোকের নানা কথা শুনতে শুনতে আমি টায়ার্ড হয়ে গেছি। তুমি একটা বিয়ে করলে এসব কথা থেকে অন্তত মুক্তি পাই আদি। আমাকে তুমি মুক্তি দাও। আমি ভীষণ টায়ার্ড, ভীষণ, টায়ার্ড অব এভরিথিং। - বলতে বলতে ভাবী কেঁদে ফেলেছিল, আর কায়সার বিব্রত হয়ে চুপ করে ছিলো। 
হঁ্যা ভাবী বেশ সমস্যায়ই আছে, সে-ও, এমনকি মা-ও, আর বাবা অসুস্থতার কারণে বেঁচে গেছে- এসব তাকে শুনতে হয় না। বেশ অনেকদিন ধরেই তাদের সম্পর্ক নিয়ে নানাজন নানা কথা বলছে। স্বামীর মৃতু্যর পর কোনো মেয়ের জন্যই শ্বশুর বাড়ি আর নিরাপদ স্থান নয়, বিশেষ করে শ্বশুর-শ্বাশুড়ি যদি তাদের অন্য সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল হন। স্বামীহারা বউ কেন শ্বশুর বাড়ি থাকবে, সেটাই যেন এক বিরাট প্রশ্ন সবার কাছে। না, ভাবীর উপস্থিতির কারণে এ বাসার কারো কোনো অসুবিধা হচ্ছে না, বরং ভাইয়ার অনুপস্থিতির শোক অনেকখানি থিতিয়ে এসেছে ভাবী আর তার বাচ্চাদের জন্যই। কিন্তু সামাজিক জীবন তো শুধু পরিবারের সদস্যদের নিয়েই নয়- আত্নীয়স্বজন-পাড়াপ্রতিবেশি আছে, 'শুভাকাঙ্ক্ষী' আছে, তাদের মধ্যে অনেকে আবার কুচক্রি ধরনেরও, তারাই প্রথমে মা'র কানে কথাটা তোলে- কায়সারকে একটা বিয়ে করিয়ে দাও, নইলে দেখবে তোমার এই ডাইনী বউ তোমার এই ছেলেকেও গিলে খেয়েছে। তোমার এই বউয়ের স্বভাব চরিত্র ভালো না। - হঁ্যা, এ কথা তো সহজেই বলা যাায়। যে মেয়ে দেখতে রূপসী আর অসম্ভব আকর্ষণীয়, এবং অল্প বয়সে বিধবা হয়েছে তার স্বভাব-চরিত্র যে ভালো হবে না, এ যেন সামাজিকভাবে স্বতঃসিদ্ধ এক সত্য! সে যে নানা ছলাকলা দেখিয়ে তার কাজ উদ্ধার করে নেবে- এতে আর সন্দেহ কি? এইসব অতি উৎসাহী আত্নীয়-স্বজনদের যন্ত্রণায় তাদের সবার জীবনই কমবেশি অতিষ্ট। এরা কোনোদিন কোনো দুঃসময় বা সংকটে পাশে এসে দাঁড়াবে না, উল্টো ঝামেলা পাকাবে। মা, এমনকি, প্রতিবাদ করেও সুবিধা করতে পারছে না। এসব কথাবার্তা এক কান দু-কান করে এখন বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এ বাড়িতে কায়সার আর তার ভাবী যে কী লীলাখেলা করে যাচ্ছে, এ তাদের কাছে এক রসালো আলোচনার বিষয়বস্তু। অথচ ওরা কেউ একবার ভেবে দেখে না- ভাবী মেয়েটা কী অসম্ভব ভালো! এমনকি ভাইয়ার মৃতু্যর পর সে এমন রিজার্ভ হয়ে গেছে যে ভুলেও কায়সারের ঠাট্টা-দুষ্টুমিতে রেসপন্স করে না। তারা এ-ও ভাবে না যে, এ বাসায় না থাকলে দুই বাচ্চা নিয়ে সে যাবে কোথায়, বাঁচবেই বা কিভাবে? ভাবীর মা-বাবা নেই যে তাদের কাছে যাবে, নিজেও চাকরিবাকরি কিছু করে না যে একা একা থাকবে, তাহলে? আর তাছাড়া সবচেয়ে বড় কথা হলো, একজন দেবরের সঙ্গে তার ভাবীর সম্পর্ক আর কতদূরই বা যেতে পারে? এটা সত্যি যে, বাঙালি সমাজে ভাবী/বৌদি তার দেবরদের কাছে এক বিশেষ চরিত্র। কারণ দেবররা এই প্রথম এমন একজন নারীকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পায় যে আত্নীয় হয়েও নিষিদ্ধ নারী নয়, তার সঙ্গে যে-কোনো কথাবার্তা বলা চলে, ঠাট্টা-দুষ্টুমি করা চলে, তাকে নিয়ে গোপন মুহূর্তে কল্পনাও করা চলে- প্রকাশিত না হলে সেটাকে কেউ দোষের বলে গণ্য করে না, যার সঙ্গে নিষিদ্ধ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যায়, যার কাছ থেকে এসব বিষয়ে অনেক কিছু শেখাও হয়- সেই এ বিষয়ে প্রথম শিক্ষক, তার সঙ্গে আবার বন্ধুর মতো নানা সংকটের শেয়ার করা চলে, পরিবারে সে হচ্ছে দেবরদের জন্য বিশেষ দূত, দেবরদের প্রেম-ট্রেম, টাকা-পয়সা ইত্যাদি সমস্যার সমাধান সে-ই করে, যদি সম্পর্কটা ভালো হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেবরদের মধ্যে প্রেমজ অনুভূতিও জন্মায়, প্রায় সবার মধ্যেই একমুহূর্তের জন্য হলেও কামজ অনুভূতিরও জন্ম নেয়। এমন কোনো বাঙালি দেবরের সন্ধান হয়তো পাওয়াই যাবে না যে তার গোপন মুহূর্তে তার ভাবী/বৌদিকে একবারও কামনা করেনি। কিন্তু ওই পর্যন্তই। সম্পর্ক আর বেশিদূর এগোয় না, আফটার অল ভাইয়ের বউ, আর কতদূরই বা এগুনো যায়? বিশেষ করে ব্যাপারটা যখন সিরিয়াসলি সামনে চলে আসে, তখন দেবরদের মধ্যে এক ধরনের ক্রাইসিস দেখা যায়, সেটা প্রধানত কামজ অনুভূতির- যে শরীরে আমার ভাই উপগত হয়েছে সেখানে আমি... কিভাবে? কিভাবে সেটা সম্ভব? অন্তত কায়সারের ক্ষেত্রে অনুভূতিটা এমনই। কিন্তু এগুলো ওই কুচক্রি মানুষগুলোকে বোঝাবে কে? সমস্যাটা তাই দিনদিন বেড়েই চলেছে। অন্য কোনো সমাধান না পেয়ে মা, ভাবী দুজনেই কায়সারের বিয়ের কথা ভাবছে- বিয়ে করলেই যেন এইসব কথাবার্তা বন্ধ হবে! কিন্তু কায়সার নিজেকে কিছুতেই বিয়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে পারে না, বাস্তব সমস্যাগুলো তো আছেই- নিজের নির্জনতা সারাজীবনের জন্য বিসর্জন দিতে হবে- এটাও কম বড় দুশ্চিন্তার বিষয় নয় তার জন্য। 
ভাবী আজকে খুব সিরিয়াস। বারবার বলছে- তুমি যে একটা মেয়ের গল্প করতে, সে কোথায়? তাকেই নিয়ে এসো না! - একটা মেয়ে মানে মৃন্ময়ী। মৃন্ময়ীর কথা ভাবী জানতো- পুরোটা নয়, খানিকটা। কিন্তু এখন ওকে নিয়ে সে ভাবীকে কি বলবে? ওর বিয়ে হয়ে গেছে সেই কবে! তবু বারবার পীড়াপীড়িতে কায়সার মুখ খোলে, আগের মতোই আবারও বলে- 
কি বলবো? ওকে নিয়ে আসলেই কিছু বলার নেই আমার। আমি এখনো বুঝে উঠতে পারিনি-ও আমার কে! 
এবার সে ঘোরগ্রস্থ, বলতে থাকে- ওই যে একটা কবিতার লাইন আছে না- 'তুমি মোর আঁখিপাতে চিরদিন জমে থাকা জল'- হয়তো মৃন্ময়ীও আমার কাছে তাই। চিরদিনই জমে আছে, ঝরেও পড়ছে না, শুকিয়েও যাচ্ছে না। তাই ভুলে থাকাও সম্ভব হচ্ছে না। 
হুঁ। বুঝলাম। কিন্তু দাদাভাই, আমি জানতে চাইছি সেই মেয়েটার অস্তিত্ব কি সত্যিই আছে, নাকি ওটা তোমার নিছক কল্পনা? 
দীর্ঘ খরার পর চৈত্রের কোনো এক বর্ষণমুখর অপরাহ্নে ওর সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল আমার - কায়সারের কণ্ঠে প্রায় আবৃত্তির ঢং চলে এলো। যেন আবৃত্তির জন্য এক দীর্ঘ কবিতা বেছে নিয়েছে সে। মৃন্ময়ী কি এক জীবন্ত কবিতা নয় তার কাছে? এক দীর্ঘ, অমীমাংসিত, রহস্যময়, বেদনাঘন কবিতা- সম্ভবত কয়েকবছরের মধ্যে সেটাই ছিলো সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী খরা। বৃষ্টির জন্য, একটু মেঘমেদুর আবহাওয়ার জন্য সারাদেশ তখন কাঁদছে। পুড়ে যাচ্ছে গাছপালা, ফসল, আর মানুষের জীবন। তো, যেহেতু পরস্পরকে ভালোবাসা-ভালোলাগার কথাটি তখনো না বলাই থেকে গেছে, আমি ওর মুখ থেকে সেটা শুনতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু ও ছিলো খুব বিষণ্ন হয়ে, জানি না আসন্ন বিচ্ছেদের ব্যাপারটা ও আগেই আঁচ করতে পেরেছিল কী না! কীভাবে ওর মুখ থেকে কথাগুলো শোনা যায় ভাবতে ভাবতে আমি ওকে বললাম- 
এই যে তুমি কিছুই বলছো না, তার কারণ তুমি এই শহরের পরিচিত গণ্ডির মধ্যে থেকে নিজের মনের দরজা খুলতে পারছো না। অথচ, মনে করো, তুমি এই শহরে নও, আছো নির্জন বনভূমির মধ্যে কোনো এক বাংলোয়। একা নও, ধরা যাক আমার সঙ্গেই আছো। তখন যদি তুমুল বৃষ্টি নেমে আসে, আর তোমার ভেতরের কান্নার সঙ্গে যদি বৃষ্টির কান্না মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, তখন দেখবে- এমনিতেই সব কথা বেরিয়ে আসছে ভেতর থেকে, অর্গল খুলে যাবে, অবচেতনের দেয়াল দুর্বল হয়ে যাবে... 
ও নিঝুম হয়ে কথাগুলো শুনছিল। আমার কথা শেষ হতে একটু হেসে বললো- সবকিছু রোদে পুড়ে যাচ্ছে আর আপনি বলছেন বৃষ্টির কথা! আপনি যে কী না! (তখনো সে 'আপনি' থেকে 'তুমি'তে আসেনি।) 
আমাদের কথা থামলো না, বরং ডালপালা ছড়িয়ে মোকাররম ভবনের করিডোর ছেড়ে সেই কথাগুলো আকাশে ডানা মেললো। তারও অনেকক্ষণ পর খেয়াল করলাম, আকাশ কালো হয়ে এসেছে। কিছুক্ষণ পরই ঝড়ো হাওয়া আর তুমুল বৃষ্টি শুরু হলো। হাওয়ায় ওর চুল আর অাঁচল উড়ে এসে আমার চোখে-মুখে পড়ছিল। কিন্তু ও ছিলো ভ্রুক্ষেপহীন। বিষণ্ন। একা। ওর চোখে ঘনিয়ে এসেছিল স্বপ্ন। অথবা ঘোর। অথবা মেঘমেদুর বিকেলের ঘন ছায়া। প্রায় শোনা যায় না, এমনভাবে, ফিসফিস করে ও বললো- 
দেখেছ, প্রকৃতি তোমার কথা শুনেছে! (এই প্রথম সে আমাকে তুমি করে বললো, আমার শরীর জুড়ে শিহরণ বয়ে গেলো।) 
প্রকৃতি তো শুনলো, মানুষটি যে শুনছে না! 
মানুষটি তো অনেক আগেই শুনেছে, তুমি বোঝোনি? 
না বোঝালে কি করে বুঝবো? 
শুধু কি কথা শুনেছে, সে তো তার সর্বস্ব তোমাকে দিয়ে বসে আছে- বলতে বলতে ওর ঘোরলাগা চোখ ভরে উঠলো জলে। 
জলভরা চোখ নিয়েই চলে গেলো ও। 
মেয়েটিকে নিয়ে প্রায় কবিতার মতো বর্ণনা শুনতে শুনতে ভাবীর মনে হচ্ছিল- মেয়েটি কী অসম্ভব ভাগ্যবতী! ওর ভেতরে সত্যিই কী আছে না আছে তা আর কোনোদিনই জানা সম্ভব হবে না- কারণ, আদিত্যর কাছে সে এখন স্বপ্নে দেখা কোনো এক নারী, বাস্তবের সঙ্গে যার সম্পর্ক সামান্যই। ও হয়তো ঠিকভাবে জানেও না, মেয়েটি সম্বন্ধে সে যেটুকু ভাবে তার কতটুকু সত্যি আর কতটুকু স্বপ্ন-কল্পনা। কোনো এক চমৎকার যুবকের স্বপ্ন হয়ে বেঁচে থাকার সৌভাগ্য কজন মেয়ের হয়? ভাবী মনে মনে মেয়েটির প্রশংসা করলো- চলে গিয়ে ভালো করেছ তুমি, পরিণত হয়েছ স্বপ্নে; নইলে সব ভেঙে পড়তো দুদিনেই। 
একসময়- অনেক রাত হলো আদি, এবার শুয়ে পড়ো- বলে ভাবী চলে গেলেও কায়সার ভূতগ্রস্থের মতো বসে থাকে। অনেকদিন পর আজ মৃন্ময়ী আবার এত স্পষ্টভাবে ফিরে এসেছে তার স্বপ্নে, কল্পনায়। আজ অনেকদিন পর কেবল মৃন্ময়ীর কথা ভেবে ভেবেই সারাটা রাত কাটিয়ে দেয়া যাবে! 



১৭. 
ইউনিভার্সিটিতে, মাস্টার্স পরীক্ষার আগে আগে মৃন্ময়ীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আমার। ততদিনে কৈশোরিক আবেগের বয়স পেরিয়ে এসেছি, অনেক মেয়ের সঙ্গে ঘুরেছি-ফিরেছি, মেয়েবন্ধুও হয়েছে কিছু, প্রেমেও পড়েছি দু-চারবার। কৈশোরে মেয়েদের ব্যাপারে যে তীব্র কৌতূহল ছিলো, ততদিনে সেটি ফিকে হতে শুরু করেছে। খুব বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেনি মৃন্ময়ীর সঙ্গে আমার ওই সম্পর্ক। কিন্তু তাতে কি! ওকে প্রথম দেখায় ভালো লেগেছিল, দ্বিতীয় দেখায় যেচে পড়ে পরিচিত হয়েছিলাম, তৃতীয় দিনেই মনে হয়েছিল- এই মেয়েটিকেই আমি সারাজীবন ধরে খুঁজছি। অর্থাৎ যে কথাটি আর কোনোদিন কারো ব্যাপারে মনে হয়নি, মৃন্ময়ীর ব্যাপারে সেটিই মনে হয়েছিল। আর সেজন্যই ওর সঙ্গে সম্পর্কটি অন্য সব সম্পর্ককে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। 
মনে পড়ে- কোনো এক খরাতপ্ত চৈত্রের দুপুরে মোকাররম ভবনের করিডোরে ব্যালকনিতে হাঁটতে হাঁটতে আর ওর সঙ্গে কথা বলতে বলতে আকাশে মেঘ ঘনিয়ে এসেছিল। আর একসময় অঝোরধারায় নেমে এসেছিল বৃষ্টি। সেদিনই ও আমাকে প্রথমবারের মতো প্রায় নিজের অজান্তে 'তুমি' বলে সম্বোধন করেছিল। আর আমি বুঝে নিয়েছিলাম, এতদিনে মৃন্ময়ী আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছে। ওকে বলা হয়নি ভালোবাসি, সে-ও বলেনি। তখন অতো বলা-কওয়ার চল ছিলো না, অনেককিছু ইঙ্গিতে-আচরণে বুঝে নিতে হতো। যেমন, এখনকার মতো পরিচয়ের শুরুতেই 'তুমি' করে বলার চল ছিলো না আমাদের, 'আপনি' থেকে 'তুমি'তে পেঁৗছতে অনেকখানি সময় লাগতো। প্রথমবার 'তুমি' বলার মধ্যে যে কী সাংঘাতিক রোমাঞ্চ ও রোমান্টিকতা ছিলো সেটি বলে বোঝানো যাবে না। শুধু তাই নয়, কোনো মেয়ে যদি একবার আপনি থেকে তুমিতে পেঁৗছতো তাহলে তার মুখ ফুটে আর কিছু বলতে হতো না, অন্যপক্ষ বুঝে নিতো। যাহোক, আমি তখন জানতাম না, ওটাই ওর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। সেদিনই ওর বাবা এসে প্রায় বিনা নোটিসে ওকে বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। ব্যাপারটা এতই আকস্মিক ছিলো যে, ও আমাকে বলে যাবার সুযোগই পায়নি। ওর এক বান্ধবীর- শীলা- কাছে বলে গিয়েছিল, ওর মা নাকি খুব অসুস্থ, তাই হঠাৎ করে যেতে হচ্ছে, আমাকে যেন জানায়। তখনো বাংলাদেশে মোবাইল ফোন আসেনি যে, যখন-তখন যোগাযোগ করা যাবে। তাছাড়া দু-জন থাকতাম দুই হলে। মেয়েদের হলগুলোতে তখন আবার সান্ধ্য-আইন চালু ছিলো, অর্থাৎ সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে হলে ঢুকে যেতে হতো। এরপর একমাত্র মৃতু্য ছাড়া অথবা অনুমোদিত অভিভাবকের উপস্থিতি ছাড়া বেরুবার কোনো উপায়ই ছিলো না। যাহোক, মৃন্ময়ী সেই যে গেলো, আর ফিরলো না। আমি অপেক্ষা করি, শীলার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, সে-ও কিছু বলতে পারে না। একটা চিঠি যে লিখবো তারও উপায় নেই। ওর বরিশালের ঠিকানা বা ফোন নম্বর জিজ্ঞেস করিনি কখনো, করার কথা মনেও আসেনি। শীলার বাড়িও বরিশাল, সে-ও মৃন্ময়ীর বাড়ির ঠিকানা বলতে পারলো না। যাহোক, অবশেষে ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার সময় আমি শীলার কাছে একটা চিঠি দিয়ে দিলাম মৃন্ময়ীকে পেঁৗছে দেবার জন্য। সেই চিঠিতে আমি মৃন্ময়ীকে দিযেছিলাম আমার সকল আনন্দ-বেদনার ভার আর আমাকে পোড়াবার মোহনীয় অধিকার। ছুটি শেষে শীলা ফিরে এলো, মৃন্ময়ী এলো না, আমার চিঠির কোনো উত্তরও এলো না। শীলাও যেন একটু এড়িয়ে চলতে লাগলো আমাকে, মৃন্ময়ীর কথা জিজ্ঞেস করলে বলতে চাইতো না, এ-কথা ও-কথা বলে এড়িয়ে যেত। অনেক চেষ্টা-চরিত্রের পর জানলাম, মৃন্ময়ীর মা-র ক্যান্সার হয়েছে, মেয়ের বিয়ে দেয়ার জন্য তিনি অস্থির হয়ে গেছেন, জোরেশোরে পাত্র দেখা চলছে। তারও কিছুদিন পর জানলাম- মৃন্ময়ীর বিয়ে হয়ে গেছে। 
তারও বহুদিন পর, জীবন ওলটপালট করে দেয়া অনেক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর, আরেক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় ওর সঙ্গে দেখা হয় আমার। আমার ফিকে হয়ে আসা অভিমানবোধ যেন প্রবল হয়ে ওঠে তখন! চোখ ফিরিয়ে নিই। কিন্তু মৃন্ময়ী নিজেই এগিয়ে আসে, তুচ্ছ কুশল বিনিময় হয়, কিন্তু আমার কথা চালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে না। মৃন্ময়ী অবশ্য হাল ছাড়ে না, বলে- তুমি একদমই চুপ করে আছো। আমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না? 
আমি সোজাসুজি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলি- দ্যাখো, তোমার সঙ্গে আমার কিছু অমীমাংসিত বিষয় রয়ে গেছে। সেগুলো পরিষ্কার না হলে শুধু কার্টেসি করে কথা চালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। 
জীবন তো কতগুলো অমীমাংসিত বিষয়েরই সমষ্টি- কথাটা একসময় তোমার কাছেই শুনেছিলাম। যাহোক, আমিও বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে চাই। 
বলো। 
তুমি জিজ্ঞেস করো। 
আমার একটাই প্রশ্ন। যা কিছু ঘটে গেছে, তুমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছ বা নিতে বাধ্য হয়েছ, সেসব নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই, শুধু একটা মাত্র প্রশ্ন। 
কি প্রশ্ন? 
তুমি আমাকে কিছু জানালে না কেন? 
জানানোর সুযোগ পাইনি। মা-র অসুস্থতার খবর পেয়ে হঠাৎ চলে যেতে হলো। গিয়ে এমন এক অবস্থার মধ্যে পড়লাম যেটা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আমার ছিলো না। মা আমার বিয়ের জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন, বাবা পাত্র দেখছেন এসবের কিছুই আমার জানা ছিলো না। মা-র ব্রেস্ট ক্যান্সার হয়েছিল, ওই সময়টায় তার অবস্থা ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছিল, কিন্তু কথাটা কাউকে বলার মতো অবস্থা ছিলো না। আমার বিয়ের জন্য মা-র এত অস্থিরতা ছিলো কেন জানো? কারণ, মায়ের ব্রেস্ট ক্যান্সার হলে মেয়েরও হয়- এরকম একটা ধারণা এখন পর্যন্ত আমাদের সমাজে চালু আছে। মা-র খবরটা জানাজানি হয়ে গেলে আমার আর বিয়েই হবে না, এই জন্য এত লুকোচুরি। এদিকে চিকিৎসার অভাবে মহিলা মরতে বসেছেন! তো অবস্থাটা তখন এতটাই প্রতিকূলে চলে গেলো যে, তোমার কথা মা-বাবাকে বলারই সাহস পাচ্ছিলাম না। আর বলবোই বা কোন ভরসায়; তোমার মুখে তো কোনোদিন বিয়ে-সংসার এইসব প্রসঙ্গে কিছু শুনিনি! 
সেসব বলার মতো সম্পর্ক কি তৈরি হয়েছিল আমাদের? আমি কি সেই সময়টুকু পেয়েছিলাম? 
না। হতে পারতো, হয়নি। সেজন্য আমি তোমাকে দায়ী করছি না। দায়টা আমারই। আমিই বেশি সময় নিয়ে ফেলেছিলাম। 
কেন নিয়েছিলে? 
সেটাও বলবো। তার আগে ওই প্রসঙ্গটা শেষ করি। আমি ওই সময় অন্তত একটিবারের জন্য ঢাকায় আসতে চেয়েছিলাম, শুধুমাত্র তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্য। বাবা আসতে দেননি। জোর করে আসার মতো পরিস্থিতিও ছিলো না। তো, তখন একবার শীলা গিয়েছিল আমাদের বাড়িতে। কিন্তু ও আমাকে বলেইনি যে, তোমার সাথে ওর দেখা হয়েছে বা তুমি চিঠি দিয়েছ। আমার অভিমানও হয়েছিল খুব, আমি তোমার কাছ থেকে একটা চিঠি আশা করেছিলাম। 
কিন্তু শীলা তোমাকে চিঠিটা দেয়নি কেন? ওর এই আচরণের মানে কি? 
সেটা তখন জানতাম না। বিয়ের অনেকদিন পর ও একদিন আমার বাসায় গিয়ে বলেছিল- 'আমি হয়তো ভুল করেছি, কিন্তু তোর অমঙ্গল কামনা করিনি। ওই পরিস্থিতিতে তোকে চিঠিটা দিলে তুই বিপদে পড়তি। বিয়েতে রাজিও হতে পারতি না। ওদিকে কায়সার ভাইয়েরও কোনো ঠিকঠিকানা নেই যে তোকে বিয়ে করে ঘরে তুলবে! কিন্তু এই চিঠিটার ভার আমি আর বইতে পারছি না। তোর চিঠি তোকেই দিতে এলাম।' বিয়ের পর স্বামী-সংসার-শ্বশুরবাড়ি-মায়ের মৃতু্য এই সবকিছু মিলিয়ে তোমাকে প্রায় ভুলেই যাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল- যা হয়েছে ভালোই হয়েছে, এরচেয়ে বেশিকিছু পাওয়ার কথা ছিলো না আমার। কিন্তু ওই চিঠিটা পড়ে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেলো। মনে হলো, সবকিছু অস্বীকার করে তোমার কাছে চলে না গিয়ে বিরাট অপরাধ করেছি। আমার সেই অপরাধবোধ এখনো কমেনি। এখন তো পুরোপুরি সংসারী, তবু সবসময় মনে হয় তোমাকে আমি ঠকিয়েছি। 
না, ঠকানোর প্রশ্ন নয়। আমার ওই একটাই প্রশ্ন ছিলো। উত্তর পেয়ে গেছি। আরেকটা প্রশ্ন করতে পারি? 
মৃন্ময়ী হাসলো- খুব কার্টেসি করছো যে! 
তোমার মা-র অবস্থা তুমি আগে থেকেই জানতে, সেটা আমাকে জানাওনি কেন তা-ও বললে। কিন্তু আমার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে তুমি এতখানি সময় নিয়েছিলে কেন? 
তার কারণ ছিলো। তোমার নামে ক্যাম্পাসে অনেক আজেবাজে কথা ছড়ানো ছিলো। এরকম একজন মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়ার ব্যাপারে যে-কোনো মেয়েই অনেক সময় নেবে, কেউ কেউ হয়তো প্রথম বিবেচনাতেই বাদ দিয়ে দেবে। 
আজেবাজে কথা! আমার নামে! কি রকম?- আমার সাংঘাতিক-রকম বিস্ময়বোধ হলো! 
এই যেমন, তুমি নেশাটেশা কর... 
কিন্তু আমি তো কখনো নেশা করিনি। 
নেশা ঠিক নয়। মদটদ খাও... 
তা খেতাম অবশ্য। সুযোগ পেলে, মাঝে মাঝে। নিয়মিত না। কিন্তু নেশা করা বলতে যা বোঝায়, অর্থাৎ অ্যাডিকশন, সেটা আমার কখনো ছিলো না। রোজ রোজ মদ খাওয়ার মতো পয়সাই তো ছিলো না। 
প্রতিদিন খাও নাকি মাঝে মাঝে খাও, সেটা তো প্রশ্ন নয়। বিষয়টা আমার জন্য খুব বিপর্যয়কর ছিলো। মদ খাওয়া নিয়ে আমার মধ্যে একটা অযৌক্তিক ভীতি আর আতংক ছিলো। মদ খাওয়া লোকও যে ভালো হতে পারে, সেই ধারণাই আমার ছিলো না। বোঝোই তো, মফস্বলের মধ্যবিত্ত একটা মেয়ের পক্ষে এসব সংস্কার কাটিয়ে ওঠা কত কষ্টের! 
হুঁ, বুঝলাম। তা, আমার নামে আর কি কি আজেবাজে কথা শুনেছিলে? 
একটা তো বললামই, আরো অনেক কথা... 
কিন্তু আমার নামে এত কথা ছড়াবে কেন? কথা ছড়ায় বিখ্যাতদের নামে। আমি তো তেমন কেউ ছিলাম না। 
ছিলে। বিখ্যাতই ছিলে। যারা রাজনীতি-টাজনীতি করতো তাদের বাইরে তুমিই সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলে। 
অবিশ্বাস্য। 
না, সত্যি বলছি। প্রমিজিং রাইটাররা, কবিরা, শিল্পীরা ক্যাম্পাসে বিখ্যাতই থাকে। তোমার লেখালেখি, জীবন-যাপন নিয়ে অনেক অচেনা ছেলেমেদেরকেও কথা বলতে শুনেছি। চেনারা তো বলতোই। তুমি হয়তো সেটা জানতে না। কিন্তু ব্যাপারটা আমি টের পেয়েছিলাম তোমার সঙ্গে পরিচয়ের পরপরই। সম্পর্কটা অন্যদিকে যাওয়ার আগেই অনেকেই- বিশেষ করে ছেলেরা- এসে তোমার নামে আজেবাজে কথা বলে যেত। 
কি কথা? 
তুমি নাকি সারারাত পার্কে গিয়ে খারাপ মেয়েদের সঙ্গে গল্প করো, আরো কী কী করো, শহরের সব গুন্ডা-বদমাশদের সঙ্গে নাকি তোমার বন্ধুত্ব! 
আমি হা হা করে হেসে উঠলাম। 
হাসছো কেন? 
এমনি। 
এমনিই হাসোনি, কেন হাসলে বলতে হবে। 
আচ্ছা বলবো। তার আগে তুমি বলো, এসব কথা তুমি বিশ্বাস করতে? 
আমি বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ধারে-কাছেই যাইনি। এমনকি কথাগুলো সত্যি কী না তা-ও যাচাই করে দেখিনি। আমার বোঝাপড়াটা ছিলো আমার নিজের সাথেই, তোমার সাথে না। আমি এর সবকিছুকেই সত্যি ধরে নিয়ে ভাবতাম- তোমার এই চরিত্রটা আমার অচেনা, আর যে চরিত্রটা আমি চিনেছি, এই দুই মিলিয়ে যে তুমি, তাকে আমি সারাজীবন ধরে নিঃশর্তভাবে ভালোবেসে যেতে পারবো কী না! আমার জন্য বিষয়টা সহজ ছিলো না। সংস্কারগুলো তো ঝেড়ে ফেলতে পারিনি, সহজ হবে কিভাবে? কিন্তু তোমার আকর্ষণ উপেক্ষা করাও সম্ভব ছিলো না আমার পক্ষে। ওই জন্যই সময়টি নিয়েছিলাম। 
শেষ পর্যন্ত কি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে? 
সেটা কি তুমি বোঝোনি? শেষ যেদিন দেখা হলো, তুমি কি বোঝোনি, আমি তোমার কাছেই এসেছি? 
হঁ্যা বুঝেছিলাম। 
তুমি কিন্তু বলোনি, আমার কথা শুনে হাসলে কেন! 
হাসলাম... তুমি যা শুনেছিলে সবই সত্যি, তবে একটু টুইস্ট হয়ে তোমার কানে গেছে। আমি সত্যিই মাঝে মাঝে মদ খেতাম, পার্কে গিয়ে সারারাত ধরে নিশিকন্যাদের সাথে গল্প করতাম... 
নিশিকন্যা নামটাও তোমার দেয়া, তাই না? তুমি কখনো তোমার লেখায় পতিতা, বেশ্যা এইসব শব্দ ব্যবহার করো না, মুখেও বলো না! 
হঁ্যা, আমারই দেয়া। তো, ওদের সঙ্গে আমার খুব আড্ডা হতো, ওদের কার্যকলাপ দেখতাম। শেষ রাতের দিকে ওদের পাশে শুয়ে ঘুমিয়েও পড়তাম কোনো-কোনোদিন। কিন্তু ওই যে, কী কী যেন করা, ওটা করিনি কখনো। করার সুযোগ ছিলো না। ওদের সঙ্গে একটা সহজ সম্পর্ক তৈরি করতে হলে ওটা করা যাবে না। ওরা যাদেরকে কাস্টমার বলে মনে করে, তাদের সঙ্গে জীবনের কথা বলে না। ওরা আমাকে কি বলে ডাকতো জানো? 
কি? 
আউলা দাদা। 
মানে? 
মানে পাগল, এলোমেলো। আমি ওদেরকে ডাকতাম দিদি বলে। হরেকরকম নাম দিয়েছিলাম ওদের- রাঙাদি, বৃক্ষদি, পুষ্পদি, কাঞ্চনদি, মণিদি এইসব... 
কিন্তু কেন এসব করতে? 
আমার ভালো লাগতো। শুধু ওদের সাথেই নয়, নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত লোকজনের সঙ্গেও আমার সুসম্পর্ক ছিলো। আমি মাঝে মাঝে সারারাত ধরে এই শহরের রাস্তাঘাটে অলিগলিতে ঘুরে বেড়িয়েছি। কতবার আমাকে পুলিশে ধরেছে, ছিনতাইকারীরা ধরেছে। তারপর আমার কথাবার্তা শুনে ছিনতাই করার বদলে রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাইয়েছে। এই শহরে কেউ যদি সারারাত ধরে ঘুরে বেড়ায় তাহলে মাতাল-ভবঘুরে-চোর-গুন্ডা-হাইজ্যাকার-নিশিকন্যা-পুলিশ এদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হবেই। আমি এগুলো খুব এনজয় করতাম। 
এনজয় করতে! 
হঁ্যা। ওরা তো আসলে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রচলিত নিয়ম-কানুন, আইন-আদালতকে বুড়ো আঙুল দেখানো মানুষ। কেউ তো আর ইচ্ছে করে অপরাধী হয় না, সবার পেছনেই একটা করুণ গল্প থাকে। ওরা সেই গল্প থেকে বেরিয়ে আসা মানুষ, সমাজকে থোড়াই-কেয়ার করা মানুষ। নিজেদের মতো একটা জগৎ তৈরি করে নিয়েছে তারা, ওদের জগৎটা একেবারেই অন্যরকম, সেই জগতেরও নিয়ম-কানুন আছে, নৈতিকতা আছে, মূল্যবোধ আছে, কিন্তু সেটা ওদের নিজেদের মতো করে, প্রচলিত সমাজের ধারে-কাছেও যায় না ওসব। এসবই আমাকে খুব আকর্ষণ করতো। 
আমি কিন্তু তোমার এসব ব্যাখ্যা না জেনেই, এমনকি ব্যাপারটাকে খারাপ ধরে নিয়েই... 
কিন্তু তাতে তো কোনো লাভ হলো না মৃন্ময়ী। 
হঁ্যা, কোনো লাভ হলো না। জীবনটা পাল্টে গ্যালো...ওলটপালট হয়ে গ্যালো- বলতে বলতে ওর গলা ধরে এলো। 
আমিও কিছু বললাম না আর। কী-ই বা বলা যায়! সম্পর্ক, সম্পর্কের দায়, সম্পর্কের স্মৃতি এসব তো আর মধুর হয় না সবসময়। কখনো কখনো ভারি হয়ে চেপে বসে কাঁধে। হয়তো ওর ক্ষেত্রে তেমনটিই হয়েছে। একজনের সঙ্গে সম্পর্কিত হবার দায় ও স্মৃতি নিয়ে আরেকজনের সঙ্গে সংসারযাপন করা কঠিন ব্যাপার। আমার ক্ষেত্রে বিষয়টি অবশ্য একটু অন্যরকম। আমার মধ্যে কোনো অপরাধবোধ নেই। কারণ, আমার চাওয়ার মধ্যে যেমন কোনো ফাঁক ছিলো না, চেষ্টার কোনো কমতিও ছিলো না। ছিলো অনন্ত অপেক্ষা, অনন্ত প্রেম। ফলে দিনে দিনে দায়টুকু ঝরে পড়েছে- জেগে আছে স্মৃতি। এখনো, এই এতদিন পরও ওর সঙ্গে আমি নিয়মিত একা একা কথা বলি। আমার যাবতীয় গ্লানি ও বেদনার কথা, দুঃখ ও আনন্দের কথা, অপমান-হতাশা-স্বপ্নভঙ্গের কথা, ব্যর্থতা ও সাফল্যের কথা- যা আমি কাউকে বলতে পারি না, সেগুলো ওকেই বলি। বলতে পারি বলেই এখনো ভালো আছি, ক-জন মানুষেরই বা এমন একজন কথা বলার সঙ্গী থাকে! আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, ওর সঙ্গে আমার বিয়ে হলে, সংসার হলে সম্পর্কটা কেমন হতো? বুঝতে পারি না। বিয়ে না করেই সংসার জিনিসটার প্রতি ইতোমধ্যেই আমার প্রায় ঘৃণা জন্মে গেছে। খুব ক্লান্ত লাগে আজকাল। সংসার ব্যাপারটা ঠিক আমার স্বভাবের সঙ্গে যায় না। মৃন্ময়ী আমার সঙ্গে থাকলেও কি আমি এমন ক্লান্ত হয়ে পড়তাম? সেটা খুব মর্মান্তিক ব্যাপার হতো। ভালোবেসে কাউকে বিয়ে করার পর তার সঙ্গে জীবনযাপনে ক্লান্ত হয়ে পড়ার মতো বেদনাদায়ক ব্যাপার আর কি আছে? ওর সঙ্গে সংসার হলে জীবন হয়তো অন্যরকম হতো, কিন্তু সেটি যে সুখকরই হতো তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এসবই বুঝি। তবু কোনো কোনো সময় ওর জন্য বুকের খুব গহন-গভীরে গোপনে যে দীর্ঘশ্বাস পড়ে না, তা-ও নয়। এ হচ্ছে 'লাইফ ইজ এলসহোয়ার' বা 'অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে'র মতো ব্যাপার। কেবলি মনে হয়- এ জীবন আমি চাইনি, আমার কাঙ্ক্ষিত জীবন পড়ে আছে অন্য কোথাও। কিন্তু কোথায়, জানি না! 

প্রেমে পড়লে মানুষ বোকা হয়ে যায়- এটা খুবই প্রচলিত কথা। কেন এটা বলে সবাই? তার কারণ কি এই যে, প্রেমে পড়লে প্রেমিকটি এমন সব আচরণ করে যা তাকে মানায় না, যা তার বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে, ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যায় না! সম্ভবত তাই। কিন্তু কেনই বা সে এমন আচরণ করে? করে- কারণ তখন সে ইনোসেন্ট হয়ে যায়। প্রেম যত গভীর ততো বেশি আবেগময় এবং বেহিসেবি- আর প্রেমে পড়া মানুষটি ততো বেশি ইনোসেন্ট। কোথায় যেন পড়েছিলাম- সারাটি জীবন মানুষ যে তার শৈশবে ফিরতে চায় তার কারণ- তার ভেতরে থাকে সরলতার কাছে ফেরার আকাঙ্ক্ষা, থাকে ইনোসেন্ট হবার আকাঙ্ক্ষা। শৈশব মানেই তো সারল্য, নিস্পাপতা আর সহজতা। বয়স যত বাড়ে ততোই বাড়ে জটিলতা, বাড়ে ভার- জীবন ক্রমশ জটিল আর ভারি হয়ে ওঠে, মানুষ পরিণত হয় ভারবাহী প্রাণীতে। জটিলতায় আক্রান্ত মানুষ তাই শৈশবে ফিরতে চায়, সেখানে সে এক অসামান্য সরলতার কাছে আশ্রয় খোঁজে। কিন্তু চাইলেই কি ফেরা যায় শৈশবে? যায় না। আর প্রেম সেখানেই পালন করে দারুণ কার্যকরী ভূমিকা। প্রেম মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় শৈশব-কৈশোরের সরলতায়, সহজতায়, নিস্পাপতায়। 
কিন্তু এমন প্রেম কোথায় পাওয়া যায়? এখন, এই বস্তুবাদী সময়ে প্রেম মানেই হিসেব-নিকেশ, বিয়ে, সংসার, সম্পত্তি, সামাজিক মর্যাদা ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব হিসেব-নিকেশের মধ্যে প্রেম পালাবার পথ পায় না। জীবনের অন্যান্য জটিলতার মতোই প্রেম দেখা দেয় এক ভয়ংকর জটিলতা হিসেবে। সেখানে আর আবেগ থাকেনা, থাকে না উদ্দামতা, উচ্ছ্বলতা, আনন্দ- মাথা জাগিয়ে থাকে কেবলই হিসেব-নিকেশ। সমাজের রক্তচক্ষুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দুজন মানুষ আর পাশাপাশি হাঁটবার প্রেরণা পায় না নিজের ভেতরেই। 

মৃন্ময়ীর কথা ভাবতে ভাবতে এইসব লিখে রাখে কায়সার। 

১৮. 
টুকটুকে সুন্দর একটা বাচ্চা মেয়ে। মাথার দুপাশে ঝুঁটি বাঁধা আর চোখমুখ জুড়ে দুষ্টু হাসি। তার পেছনে আকাশের বিশাল চাঁদ তার মুখটাকে মায়াবী আলোয় ভরে তুলেছে আর সে ভীষণ আমোদে মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে, কখনো তালি বাজিয়ে সুর করে পড়ছে- 

বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই 
মাগো, আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই? 
পুকুর ধারে, নেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে 
ফুলের গন্ধে ঘুম আসেনা, একলা জেগে রই 
মাগো, আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই? 
সেদিন হতে দিদিকে আর কেনই বা না ডাকো 
দিদির কথায় আঁচল দিয়ে মুখটি কেন ঢাকো? 
খাবার খেতে আসি যখন দিদি বলে ডাকি তখন 
ও ঘর থেকে কেন মা আর দিদি আসে নাকো 
আমি ডাকি- তুমি কেন চুপটি করে থাকো? 
বল মা, দিদি কোথায় গেছে আসবে আবার কবে 
কাল যে আমার নতুন ঘরে পুতুল বিয়ে হবে 
দিদির মতো ফাঁকি দিয়ে আমিও যদি লুকাই গিয়ে 
তুমি তখন একলা ঘরে কেমন করে রবে? 
আমিও নাই দিদিও নাই- কেমন মজা হবে? 

এই পর্যন্ত এসে দীর্ঘ কবিতাটি পড়ার ক্লান্তিতেই হোক, কিংবা অজানা কোনো কষ্টেই হোক মেয়েটির ফুটফুটে মুখ কেমন ম্লান হয়ে গেলো। মেয়েটা কে? কাজল! কিন্তু ওর ছোটবেলার মুখ সম্বন্ধে কোনো স্পষ্ট ধারণা না থাকায় কায়সার ভীষণ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকে। মুহূর্তগুলো বেশিক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে না, পরের মুহূর্তেই মেয়েটা এবার বড় হয়ে কাজলের রূপ নিলো। সেই দুষ্টুমিভরা চোখ, চঞ্চল হাসি, গলায় স্পষ্ট ইয়ার্কি মেখে- 'এ্যাই গাধা, অমন হা করে কি দেখছিস'- বললে কায়সার বিস্ময়ে-আনন্দে অভিভূত হয়ে যায়- 'আরে কাজলা তুই!' কিন্তু কাজল- 'এ্যাই আমাকে কাজলা বলছিস কেন? আমি কি তোর কাজলা দিদি? মাগো, আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই? আমাকে মেরে ফেলতে চাস?' - বলতে বলতে মুখটাকে আবার বিবর্ণ করে ফেললো। কায়সার তখন ভীষণ অনুতপ্ত-'না রে কাজল, তুই মরে গেলে আমার আর থাকেটা কি, বল!' - বলতে বলতে তার চোখ ভিজে ওঠে; আর কাজল তখন- 'আরে গাধা কাঁদছিস কেন, আমি কি সত্যিই মরে গেছি নাকি? এই দ্যাখ, আমাকে ছুঁয়ে দ্যাখ' - বললে কায়সার সত্যি সত্যি হাত বাড়ায়। কিন্তু কাজল হঠাৎ কোথায় অদৃশ্য হলো? পরমুহূর্তে কাজল পাশের ঘর থেকে- 'আমাকে ছুঁতে পারলি না'- বলে টিটকারি করলে কায়সার ছুটে গিয়ে কাজলের যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া বীভৎস মুখটা দেখে চিৎকার করে উঠে বসে। 
তখন সকাল। কায়সার টের পায়- তার চোখ সত্যি ভেজা, বুকের ভেতর ধুপধাপ শব্দ। ভাবী ছুটে এসে তার গায়ে হাত রেখে- 'এই কায়সার কি হয়েছে?' - জিজ্ঞেস করলে সে ম্লান হাসে- 'না, কিছু না।' কিন্তু কাজলের যন্ত্রণাকাতর মুখটা যে চোখের সামনে ঝুলে আছে তো আছেই, কিছুতেই সরিয়ে ফেলা যাচ্ছে না। 'বেলা অনেক হয়েছে, হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা খাবে চলো'- ভাবীর এই কথা শুনে তাই সে- 'আর কিছুক্ষণ শুয়ে থাকি, ঘুমটা হঠাৎ করে ভেঙে গেলো'- বলে ভাবীকে ফেরত পাঠায়। আজকে ছুটির দিন। আলস্য করাই যায়। যাওয়ার আগে ভাবী তার কপালে হাত রেখে- 'জ্বর আসেনি তো, রোজ যেভাবে রাত জাগছো, শরীর খারাপ না করেই পারে না'- বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে, তারপর- 'ঠিক আছে আরেকটু শুয়ে থাকো'- বলে চলে যায়। এ দেশের মেয়েগুলো এত মায়াময়ী হয় কেন? ঠিক যেন মায়ের ডুপ্লিকেট। কায়সার ভাবলো। কাজলও ছিলো এইরকম, বা এরচেয়ে বেশি। কায়সারের জন্য তার মমতা-ভালোবাসা আর উৎকণ্ঠার অন্ত ছিলো না। যদিও দুষ্টুমিতে প্রায় সারাক্ষণই ব্যস্ত থাকতো ও, ব্যতিব্যস্ত করে রাখতো অন্য সবাইকেও- তবু কায়সারের সব বিষয়ে তার তীক্ষ্ন মনোযোগ সহজেই টের পাওয়া যেত। কায়সারের কান্না পেলো। কেন বিষয়গুলো ভুলে যাওয়া যায় না? কতবার সে চেয়েছে ভুলে থাকতে- পারেনি। সেই সুদূর শৈশব-কৈশোর আর তারুণ্য জুড়ে কাজলের বিপুল গভীর আর উচ্ছ্বাসময় উপস্থিতি- কিভাবেই বা ভুলে থাকা সম্ভব এতসব স্মৃতি ও কোলাহল? কিন্তু তার ভেতরে কি খানিকটা ঔদাসিন্যও ছিলো? নইলে ভেতরে ভেতরে যে কাজল বিষপাণ করছিল সে তা টের পায়নি কেন? 
কাজল প্রেমে পড়েছিল। 
প্রেম হচ্ছে মানব প্রজাতির সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও পবিত্র অনুভূতি- কায়সার অন্তত সেটাই বিশ্বাস করতো। এখনো সেই বিশ্বাস সে পুরোপুরি বিসর্জন দেয়নি, কিন্তু কাজলের ঘটনাটা তার জীবনটাকে আমূল পাল্টে দিয়ে গেছে বলে ওই বিশ্বাস এখন আর অতটা ধ্রুপদ নয়। 
কাজল একজন প্রতারকের প্রেমে পড়েছিল। 
লোকটা তাদের আত্নীয়। তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা-সংসার সবই আছে। কাজল তবু কেন তার প্রেমেই পড়েছিল, কায়সার এখনো বুঝে উঠতে পারেনি। বয়সের বিরাট ব্যবধান তাদের সম্পর্কটাকে প্রথমত সন্দেহের ঊধের্্ব রেখেছিল। লোকটা অবাধে এ বাসায় যাতায়াত করেছে, কিন্তু কখন কোন মুহূর্তে কাজল তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে, কেউ তা বুঝতেই পারেনি। কায়সারও নয়। কাজল তো কখনো কিছু গোপন করতো না তার কাছে, এ বিষয়টা কেন সম্পূর্ণ চেপে গিয়েছিল কে জানে! এটা যে এমনকি কায়সারও অনুমোদন করবে না, তা হয়তো বুঝতে পারতো। কেউ যা অনুমোদন করবে না, এমন একটা বিষয়ের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা হয়তো কাজলের মতো মেয়েদের পক্ষেই সম্ভব। কায়সার ঘুণাক্ষরেও ব্যাপারটা কল্পনা করতে পারেনি। মা'র চোখেই প্রথম কিছু একটা ধরা পড়েছিল। তারপর জেরা-শাসন-নির্যাতন। ওদিকে লোকটা বলে বেড়াচ্ছিল- কাজলের সঙ্গে তার শারীরিক সম্পর্ক আছে, অতএব সে কাজলকে বিয়ে করবেই। 
অতঃপর কোনো এক সন্ধ্যায় কাজলকে আর খুঁজে পাওয়া গেলো না। 
বাবা খুব হম্বিতম্বি করেছিল- ওই শুয়োরের বাচ্চাকে আমি দেখে ছাড়বো- জাতীয় হুংকার ছেড়েছিল। কিন্তু তার মেয়ে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে যার সঙ্গে চলে গেছে- তাকে দেখে নেয়ার আর কী-ই বা থাকতে পারে! বাবা থানা পুলিশের ঝামেলা করতে চেয়েছিল, ভাইয়া ফেরালো- 'কী লাভ বাবা! কাজল তো নিজে থেকেই গেছে। ও এখন ম্যাচিউর, থানা-কোর্ট করে কোনো লাভ হবে না, আইন-আদালত কাজলের কথাই গ্রহণ করবে। যে নিজে থেকে গেছে তাকে যেতে দাও, তুমি চাইলেও সে আর ফিরবে না।' 
কিন্তু কাজল ফিরে এসেছিল। 
প্রায় মাসখানেক পর কাজল ভিন্ন এক মানুষ হয়ে ফিরে এসেছিল তার চিরচেনা ঘরে। আগের সেই উচ্ছ্বাস, চাঞ্চল্য, দুষ্টুমি, হঠাৎ বাধভাঙা হাসিতে ফেটে পড়া- এসবের কিছুই আর অবশিষ্ট ছিলো না। থাকার কথাও নয়। কাজল তখন এক পরাজিত মানুষ। 
পরিস্থিতিটা ছিলো অস্বস্তিকর। ওর ফিরে আসার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলো না। ওকে দেখে তাই কে কী করবে, ভেবেই পাচ্ছিল না। সবাই ভেবেছিল- বাবা বোধহয় ওকে পিটিয়েই মেরে ফেলবে। কিন্তু কিছুই না বলে কেবল নিঃশব্দ হয়ে গেলো বাবা। তার এই নীরবতা সবাইকে হতভম্ব করে দিয়েছিল। বাসার পরিবেশটা বদলে গিয়েছিল। একটা গুমোট আবহাওয়া, একটা অস্বস্তিকর নৈঃশব্দ্য সবাইকে আক্রান্ত করে তুলেছিল। 
বাবার দেখাদেখি অন্য সবাইও প্রতিক্রিয়াহীনই রইলো। কাজলকে কেউ কিছু বললো না, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলো না, কেউ ওর কোনো কথা শুনতে চাইলো না। ধীরে ধীরে একেবারে কোণঠাসা হয়ে গেলো ও। খাবার টেবিলে ওর ডাক পড়তো না, আড্ডা-আলোচনা-আয়োজন-অনুষ্ঠানে কাজল থাকতো উপেক্ষিত। 
কাজল তখন এক ভয়াবহ অনাকাঙ্ক্ষিত বহিরাগত। 
কায়সারও এই আচরণের বাইরে যেতে পারেনি। কাজলের সঙ্গে কিছুতেই আর স্বাভাবিক হতে পারছিল না সে। সবার সঙ্গে তার পার্থক্য ছিলো এটুকুই যে, সে কেবল পালিয়ে বেড়াতো- পাছে কাজলের মুখোমুখি হয়ে যায়, এই ভয়ে। 
তার ভেতরে কষ্ট ছিলো। ছিলো ক্ষোভ ও অভিমান। ছিলো অক্ষমতার লজ্জা। এসবকিছু মিলিয়ে কায়সার এক ভয়ংকর অসংজ্ঞায়িত যন্ত্রণায় ভুগেছে বহুদিন। পথে-ঘাটে উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেরিয়েছে, আর বুঝতে চেয়েছে- কাজলের মতো একটা পরিণত মেয়ে লোকটার মধ্যে কী এমন খুঁজে পেয়েছিল! এই প্রশ্নের উত্তর তার আজও অজানা। 
কিছুদিন পর কাজলের মধ্যে আরেকটা প্রাণের অস্তিত্বের লক্ষণ প্রকাশ পেলো। এবারও কোনো চাঞ্চল্য নেই, এ বিষয়ে বাসার কারো কোনো বক্তব্য বা প্রশ্ন বা আগ্রহ নেই; কাজল যেন আর কেউ নয় এ বাড়ির! 
এই ভয়াবহ নীরবতার কারণ কায়সার আজও খুঁজে পায়নি। সবাই এমন নিস্পৃহ-নিরাসক্ত ছিলো কিভাবে? কেনই বা ছিলো? 
অবশেষে কোনো এক মধ্যরাতে কাজল কায়সারের দরজায় দাঁড়িয়েছিল। 
আদি! 
আয়- যেন সে জানতো যে কাজল আসবে, এমনভাবে আহ্বান জানায়। 
কাজল এসে কুণ্ঠিতভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। 
বোস না। 
কাজল কায়সারের কাছ ঘেঁসে বসে পড়ে। অনেকক্ষণ কারো মুখে কোনো কথাবার্তা নেই। কাজলই একসময় মুখ খোলে। না, কোনো কৈফিয়ত সে দেয়নি। হয়তো প্রয়োজন বোধ করেনি। কেবল তার একমাসের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলেছে। লোকটার কাছ থেকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি পেয়েই ঘর ছেড়েছিল কাজল। বিয়ে সে করেনি। এই একমাস কাজলকে একরকম বন্দী রেখে লোকটা বন্ধুবান্ধবসহ তার লালসা চরিতার্থ করেছে। 
থেমে-থেমে ছাড়া-ছাড়া ভাবে দীর্ঘ সময় নিয়ে কাজল এইসব কথা বলার পর আবার এক দীর্ঘ বিরতি নিয়ে শুধু একটা বাক্যই উচ্চারণ করেছিল- বড় ভুল হয়ে গেছে রে আদি, বড় বেশি ভুল। 
কায়সারের বলার কিছু ছিলো না। এমনকি জিজ্ঞেসও করতে পারেনি, কেন ও এরকম একজন বদমাশ লোকের প্রেমে পড়েছিল! সে তার মমতামাখা হাতটা কাজলের কাঁধে রেখেছিল, আর কাজল হঠাৎ তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেকে বিপুল কান্নায় ভাসিয়ে দিয়েছিল। 
দুর্ঘটনার পর ওটাই ছিলো কাজলের প্রথম কান্না। 
পরদিন সিলিং ফ্যানের সঙ্গে কাজলের বিকৃত লাশ ঝুলে থাকতে দেখা গেলো। 
ওই ঘটনার পর ওটাই ছিলো কাজলের প্রথম, শেষ, একমাত্র কান্না। 
কাজল মরে যাবার পর দ্রুত বদলে যাচ্ছিল সবকিছু। 
বাবার নীরবতা স্থায়ী হয়ে গেলো, তার সঙ্গে যুক্ত হলো বাধ্যতামূলকভাবে শুয়ে থাকা। কাজলের লাশ দেখেই তার স্ট্রোক করেছিল। কাজল ছিলো তার সবচেয়ে প্রিয় সন্তান, কাজলই তাকে সবচেয়ে বড় কষ্টটি দিয়েছিল। 
এর দেড় বছরের মাথায় ভাইয়ার হঠাৎ মৃতু্য। ভাইয়া যে ভেতরে ভেতরে এতটা ক্ষয়ে গিয়েছিল, কেউ টেরই পায়নি। একদিন সকালে সুস্থ মানুষ ঘর থেকে বেরুলো, সন্ধ্যায় ফিরলো লাশ হয়ে। প্রথম অ্যাটাকেই সব শেষ। ভাইয়ের অফিসেই কায়সারের চাকরি হলো। তার জীবনটাও বদলে গেলো। এতবড় একটা সংসারের দায়িত্ব হঠাৎ করে তার কাঁধে এসে পড়লো- আগের দিনও যা তার কল্পনার অতীত ছিলো। বাবার অসুস্থতা বাড়লো, ভাবীর মুখ থেকে হাসি মুছে গেলো, এসব দেখেশুনে মা সেই যে চুপ করে গেলো তো গেলোই, তার মুখেও আর হাসি ফিরে এলো না। 
কায়সার কাজলের বিষয়টি নিয়ে অনেকবার নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, প্রশ্ন করেছে নিজেকেই- তাদের কোথাও কোনো ভুল ছিলো কী না! ভেবেছে- কাজল হয়তো আমাদের মুক্তি দিতে চেয়েছিল অথবা চেয়েছিল নিজেই মুক্তি পেতে। কিংবা দুটোই। কাজল মরে গিয়ে আমাদেরকে একটা সামাজিক বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচিয়ে গেছে। কিন্তু একটা বিষয় আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না- কাজল কেন এমন একটা পদ্ধতি বেছে নিলো? আত্নহত্যাই যদি করবে, তাহলে ফিরে এসেছিল কেন? আমার সঙ্গে কথা-টথা বলে ঝুলে পড়ার অর্থ কি? এ বাসায় না ফিরে ট্রেনের তলায় ঝাঁপিয়ে পড়লেও তো ঝামেলা চুকে যেত! খামোখা এই নাটক করার মানে কি? নাকি সিদ্ধান্তটি হঠাৎ করে নেয়া? কাজল তো ওর সবই হারিয়েছিল। কুমারীত্ব, স্বপ্ন ও অহংকার। কিন্তু এরচেয়ে যা বেশি হারিয়েছিল তা হচ্ছে- বিশ্বাস, পবিত্রতা ও নির্ভরতা। যে বিশ্বাস নিয়ে সে বিবাহিত একজন লোককে ভালোবেসেছিল, যে পবিত্রতা নিয়ে সে স্বপ্নগুলো সাজিয়েছিল, যে নির্ভরতার আশ্বাস পেয়ে সে তার চিরচেনা প্রিয়জনদের ছেড়ে, সামাজিক হেনস্থার সম্ভাবনা মেনে নিয়ে অনিশ্চিত জীবনের পথে পা বাড়িয়েছিল- তার কিছুই আর অবশিষ্ট ছিলো না। তবু ও ফিরে এসেছিল কেন? বেঁচে থাকার তীব্র সাধ কি ওকে ফিরিয়ে এনেছিল? কাজল হয়তো ভেবেছিল- ওর প্রিয়জনরা আবার ওকে ভালোবাসা আর মমতা দিয়ে ওর হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলোকে ফিরিয়ে দেবে। ফেরার পর আমরা অমন নীরবতা পালন না করলে হয়তো ওকে মরতে হতো না। বাবা যদি চুপচাপ না থেকে ওকে মারধোরও করতো, তারপর স্বাভাবিক হয়ে যেত, তাহলে হয়তো বাসার অন্য সবার আচরণও একটু বদলাতো। ও কনসিভ করেছিল- এটা তো তেমন একটা বিরাট সমস্যা নয়, সহজেই সেটা সমাধান করা যেত। হয়তো ওর ভবিষ্যৎটা অনিশ্চিত হয়ে পড়তো, কিন্তু নিশ্চয়ই মরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতো না ও! নিজের পরিবারের এই আচরণ হয়তো ওকে মৃতু্যর দিকে ঠেলে দিয়েছে। কাজল সরল ছিলো- ওই সারল্যের কারণেই সে লোকটাকে বিশ্বাস করেছিল, প্রতারিত হয়ে ফিরেও এসেছিল সেই কারণেই। ও জানতো না- আমরা সামাজিক জীব, এই পরিচয়ই আমাদের কাছে বড় হয়ে উঠবে। ও আমাদের জন্য যে সামাজিক সংকট সৃষ্টি করেছিল, সেটা থেকে মুক্তি পাওয়াটা ওর জীবনের চেয়ে মূল্যবান হয়ে দাঁড়াবে আমাদের কাছে- ও তা কল্পনাও করতে পারেনি। একজন সরল-স্বপ্নাক্রান্ত কাজলের মৃতু্যতে কারই বা কি যায়-আসে? বরং ওর অস্তিত্ব আমাদের জন্য সৃষ্টি করে রাখতো প্রায় চিরস্থায়ী সংকট। কেন আমরা তা মেনে নেব? আমাদের সমাজ আছে না! আমাদের সংস্কার-মূল্যবোধ এবং নানা বিষয়ে অন্ধ বিশ্বাস এবং অলঙ্ঘনীয় নিয়মকানুন আছে না! কাজল এইসব জটিল হিসেব-নিকেশ বুঝতো না। আর সেজন্যই প্রিয়জনদের সীমাহীন অবহেলা আর ঔদাসীন্য সইতে না পেরে আত্নহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিল। 
কিন্তু এতসব ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েও কায়সার প্রশ্নমুক্ত হতে পারে না। কোথায় যেন বিরাট একটা ফাঁক রয়ে গেছে, কোথায় সেই ফাঁক কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। 

১৯. 
শৈশব-কৈশোরের সবকিছুই যে খুব সুন্দর আর স্বপ্নময় ছিলো, তা হয়তো নয়; এসবের বাইরে নিশ্চয়ই কঠিন একটা বাস্তবতাও ছিলো; ছোটবেলার রঙিন চোখে ধরা না পড়লেও এখন সেসব বুঝতে পারি। বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো ছিলো না। দাদা তার মৃতু্যর আগেই বাড়িঘর-জমিজমাগুলো ছেলেমেয়েদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে দিয়েছিলেন। বাবার ভাগে পড়া অংশটুকুই ছিলো তার একমাত্র স্থাবর সম্পত্তি। নিজে এক ছটাক সম্পত্তিও বাড়াতে পারেনি। সম্ভবত ওদিকে তার মনও ছিলো না। বাবার মধ্যে বোধহয় খানিকটা বৈরাগ্য ছিলো। অবশ্য, আমার এই ধারণা ভুলও হতে পারে। হয়তো অযোগ্যই ছিলো বাবা। ব্যর্থ বাবাদের সন্তানরা তাদের বাবাকে মমতাবশত দার্শনিক হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করে, আমিও হয়তো সেরকমই ভাবছি। 
যাহোক, যে কারণেই হোক না কেন, আমাদের সংসারে দারিদ্র ছিলো। আমার চাচারা কিন্তু এতটা দরিদ্র ছিলেন না! দাদা যথেষ্টই রেখে গিয়েছিলেন। আবার, এইসব সম্পত্তির ওপরই শুধু নির্ভরশীল ছিলেন না তারা। আমার বাবা ও চাচারা সবাই উচ্চশিক্ষিত। শহরে ভালো চাকরি করতেন। আমাদেরকে বলা যায় গ্রাম-সভ্যতার সর্বশেষ প্রজন্ম। বাবা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো, সেই বৃটিশ আমলের শেষদিকে, তখন নাকি ঢাকার অধিকাংশ অঞ্চলই ছিলো জঙ্গলময়। ঢাকায় নানা কাজে আসা মানুষের মধ্যে ঢাকাকেন্দ্রিক চিন্তা ছিলো না, চিন্তার কেন্দ্রে থাকতো গ্রাম। আমার দাদারও হয়তো তাই-ই ছিলো। গ্রামের বাড়িটার ঐশ্বর্য দেখে সেটা বোঝা যায়। আর এই ঐশ্বর্যই কাল হয়েছিল আমাদের জন্য। গ্রামের মানুষ আমাদেরকে সচ্ছল পরিবার হিসেবেই গণ্য করতো। অথচ বাবার আর্থিক অবস্থা খারাপ ছিলো বলেই নিজের পরিবারকে গ্রামে রাখতে বাধ্য হয়েছিল। মা'র দায়িত্ব ছিলো এই দারিদ্রকে ঢেকে রাখা, এবং মা তা পারতোও। নিপুণ কৌশলে পরিবারের ভেঙে পড়া অবস্থা ঢেকে রাখতো লোকচক্ষুর আড়ালে। 
নিজেদের গ্রামে দারিদ্রের রূপটি ঢেকে রাখতে পারলেও নানুবাড়িতে গেলে সেটা প্রকট হয়ে দেখা দিতো। তার কারণ একাধিক। গ্রামের মানুষ আমাদেরকে এমনিতেই সম্মান আর মর্যাদার স্থান দিয়ে রেখেছিল বলে ব্যাপারটা সহজ ছিলো, আবার গ্রামের মানুষের তুলনায় আমাদের আর্থিক অবস্থা নিশ্চয়ই ভালো ছিলো, ফলে তারা এটাকে বিবেচনা করতো সচ্ছলতা হিসেবে। কিন্তু নানুবাড়ির ব্যাপারটা আলাদা। বাবা বিয়ে করেছিলেন এক বনেদি পরিবারে, সেই পরিবারের সবাই ছিলেন শিক্ষিত ও সচ্ছল- তখনকার প্রেক্ষিতে উচ্চবিত্তই বলা যায় তাদের! বাবা তার শিক্ষা আর সরকারী চাকরি দিয়ে তাদের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারতেন না। কে জানে, হয়তো চাইতেনও না। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে আমাদেরকে নানুবাড়িতে যেতে হতো নানার মৃতু্যবার্ষিকীকে সামনে রেখে। নানার বংশধররাও শহর থেকে আসতো। এক মিলনমেলা বসতো সেখানে। কিন্তু আমাদের জন্য প্রীতিকর ছিলো না সেই যাওয়া। মা গিয়েই রান্নাঘরে ঢুকে পড়তো, আসার আগেরদিন পর্যন্ত মোটামুটি রান্নাঘরেই পড়ে থাকতো। যেন কেবলমাত্র রান্না করার জন্যই তার ওই বাড়িতে যাওয়া। এখন বুঝতে পারি, ওখানে গেলে খুব ছোট হয়ে থাকতো মা, কে জানে- হয়তো নিজেকে লুকানোর জন্য রান্নাঘরই উৎকৃষ্ট স্থান ছিলো তার জন্য। 
আমরা মা'র দেখাই পেতাম না। মামা ও খালাদের জন্য ওই বাড়িতে আলাদা আলাদা রুমের ব্যবস্থা ছিলো। ছেলেমেয়েদের নিয়ে তারা সেখানে থাকতেন। অথচ আমাদের জন্য তেমন কিছু ছিলো না। বাবা থাকতেন বাহির-বাড়িতে, মানে অন্দরমহলের বাইরে অতিথিদের জন্য যে ঘরটি ছিলো সেখানে। মা থাকতো অন্যান্য আত্নীয় মহিলাদের সঙ্গে একটা হলঘরে, আমরা যে কে কোথায় থাকতাম তার কোনো ঠিকঠিকানা ছিলো না। আমার জায়গা হতো মামার ঘরে। সমবয়সী এক মামাতো ভাই ছিলো, তার সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা। নিশি আর কাজলের জন্যও সেইরকম ব্যবস্থা, কারো না কারো সঙ্গে। শুধু শোয়ার ব্যাপারে নয়, খাওয়ার ব্যাপারটাও ছিলো এইরকম। মা পড়ে থাকতো রান্নাঘরে। একসঙ্গে যখন খাওয়ার ব্যবস্থা হতো তখন মা'র রান্না করা তরকারি খেতে খেতে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতো সবাই, কিন্তু আমাদের পাতে কখনো বড় মাছের টুকরো পড়তো না, সর-পড়া দুধ খেতে পেতো শুধু শহুরে কাজিনরা। ও বাড়িতে একটা সফেদা গাছ ছিলো। ফল পেকে মাটিতে পড়লে আমরা হয়তো কুড়িয়ে আনতাম, নানু সেই ফল আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বলতেন, এটা নাহিদের জন্য রেখে দে। বাড়িতে ভালো জাতের বড়ই গাছ ছিলো, সবাই বলতো কূল গাছ, নিশি আর কাজলের হাত থেকেও একইভাবে কূল কেড়ে নিতেন নানু। শুনেছি, বাবার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেয়ার ব্যাপারে নানুর আপত্তি ছিলো, নানার ইচ্ছেতেই বিয়েটা হয়। তার সেই জেদ তিনি আমৃতু্য আমাদের ওপর দেখিয়ে গেছেন। 
এইসব নিদারুণ অবহেলা-অপমান চুপ করে সহ্য করে গেছে মা। এতকিছুর পর ওই বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক না থাকাই ছিলো স্বাভাবিক, কিন্তু তবু, মার অসাধারণ স্নেহফল্গুধারা ও বাড়ির সবার জন্যও বাহিত হয়েছে। অবশ্য আমরা তেমন কোনো সম্পর্ক রাখিনি। আমি তো একেবারেই রাখিনি। এমনিতেই অসামাজিক মানুষ আমি, তার ওপর ওসব স্মৃতি যখন মনে পড়ে, তখন এত মন খারাপ হয়ে যায় যে, এইসব আত্নীয়স্বজনকে আত্নীয় বলে স্বীকার করতেই লজ্জা হয়। খারাপ লাগে, মনে হয়- এতখানি বৈষম্য না দেখালেও পারতেন তারা। বাবা দরিদ্র ছিলেন হয়তো, কিন্তু খারাপ মানুষ ছিলেন না, ছিলেন না অশিক্ষিতও। দারিদ্রের অপরাধে তাকে অপমান করতে চাইলেও মানা যেত, কিন্তু আমরা কি দোষ করেছিলাম? 
এইসব ঘটনা বা ঘটনার পেছনের কারণগুলো আমাকে একেকটা ধাক্কা দিয়ে বড়ো করে তুলতো! মনে হতো, টাকা থাকা আর না থাকার ওপরেই পৃথিবীর সকল সুখ-সম্মান-মর্যাদা-ভালোবাসা নির্ভর করে আছে! 
আরেকটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল সেই সুদূর কৈশোরে, যা আমাকে সবচেয়ে বড়ো ধাক্কাটি দিয়েছিল, কেড়ে নিয়েছিল আমার সোনার শৈশব-কৈশোর, হঠাৎ করেই যেন দেখতে পেয়েছিলাম- এইসব অতি ব্যক্তিগত জীবনের বাইরেও রাষ্ট্র নামক একটা ব্যাপার আছে, সেখানে পরিবর্তন এলে পারিবারিক জীবনেও অনিবার্য পরিবর্তন আসে। তখন স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ছি, পড়া শেষ হলে অন্য ভাইবোনদের মতো আমিও শহরে গিয়ে পড়বো, এই নিয়ে নানারকম রঙিন স্বপ্ন দেখছি, তেমনি এক সময়ে ঘটনাটি ঘটলো। এখনো মনে পড়ে, কৈশোরের কোনো এক সুন্দর সকালে ঘুম ভেঙেই শুনেছিলাম- এই দুর্ভাগ্যপীড়িত জাতিটিকে উদ্ধার করার মহান উদ্দেশ্য নিয়ে এক মহামানব নাজেল হয়েছেন। নাজেল হয়েই তিনি আদেশ জারি করেছেন- 'তাঁর' এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের কাজকর্মের কোনো সমালোচনা করা যাবে না, করলে এই শাস্তি ওই শাস্তি ইত্যাদি। শুধু তাই নয়- একসঙ্গে পাঁচজনের বেশি জমায়েতও করা যাবে না, করলে দেখামাত্র গুলি করা হবে! সামরিক শাসনের নামে এমনই এক বীভৎস, ভয়ংকর, পৈচাশিক শাসন চেপে বসেছিল সারা জাতির বুকের ওপর। এমনিতেই